খেলাপি ঋণ
ড. নীলাঞ্জন কুমার সাহা
প্রকাশ : ০৪ ডিসেম্বর ২০২৪ ০৮:১৮ এএম
ড. নীলাঞ্জন কুমার সাহা
খেলাপি ঋণ বর্তমানে দেশের জন্য বড় বিষফোড়া। চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিক শেষে দেশের ব্যাংকগুলোয় খেলাপি ঋণ বেড়ে হয়েছে ২ লাখ ৮৪ হাজার ৯৭৭ কোটি টাকা। অনেকেই বলছেন, ঠিকঠাক হালনাগাদ হলে এর পরিমাণ আরও বেশি হবে। প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, আদৌ এসব ঋণ ফেরত পাওয়া যাবে কি না! পুঁজিবাদী এ বিশ্বের নানা তথ্য, সর্বোচ্চ মুনাফায় বিশ্বাসী পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় ধনিক গোষ্ঠীর ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণের টাকা সত্যিকার অর্থে কখনোই আর ব্যাংকে ফিরে আসে না। দেশের চার দশকের ঋণের সংস্কৃতি দেখলেই প্রতীয়মান হয়, ধনিক গোষ্ঠীর ঋণ নেওয়া আর্থিক প্রতিষ্ঠান ঠেকাতেও পারে না।

দেশে এমএফএস বা
অন্য পন্থায় অর্থের লেনদেন সুগম হলেও দেশের আর্থিক ব্যবস্থা মূলত ব্যাংকনির্ভর। কিন্তু
কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্বাধীন নাকি সরকারের অধীন, তা এখনও পরিষ্কার নয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের
গভর্নর অর্থমন্ত্রীর অধীন। অর্থনৈতিক উন্নয়নে সিকিউরিটিজ মার্কেট বা শেয়ারবাজারের ভূমিকা
নগণ্য। এ খাতটিও পুঁজিপতি-রাজনীতিবিদ-আমলা লুটেরাদের দখলে। লুটপাট সহজ করতে এমন এক
অবস্থায় বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণের প্রকৃত মূল্য যে আদৌ আর ব্যাংকে ফিরবে যাবে না, তা
হলফ করেই বলা যায়। বিগত কয়েক বছরে আমরা দেখেছি, রাষ্ট্রীয় সম্পদ-সম্পত্তি কারও কাছে
কম দামে বিক্রি করে তাদেরই উৎপাদিত পণ্য বাজারমূল্যের চেয়ে বেশি দামে কেনা হয়। সরকারি
ক্রয়নীতির আইনকানুন এমনভাবেই সাজানো হয়। এভাবে একটি গোষ্ঠী বাড়তি সুবিধা পায়। এসবের
প্রভাব নেতিবাচকভাবে পড়ে বিধায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য থেকে শুরু করে জ্বালানি-গ্যাস-কয়লা
ইত্যাদিতে একচেটিয়া ব্যবসা করার সুবিধা বিন্যস্ত করা হয় এবং লুণ্ঠনমূলক মূল্য নির্ধারণ
সহজ হয়। এ ধরনের ব্যবস্থায় কোনো কোম্পানি তার প্রতিযোগীদের বাজার থেকে উচ্ছেদে প্রথমে
পণ্যের মূল্য কম রাখবে এবং প্রতিযোগীরা উচ্ছেদ হলে জাতীয় অজুহাত দিয়ে পণ্যমূল্য বাড়িয়ে
বাজারে একচেটিয়া কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করবে। আবার এ প্রতিষ্ঠানগুলোকে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায়
বিভিন্ন ধরনের কোটা এমনভাবে প্রদান করা হবে, যাতে কর-শুল্কসহ বাজারের বিভিন্ন আইনকানুন,
বিধিবিধান ফাও খাওয়াদের পক্ষে যায়।
ব্যাংকিং খাতে
প্রকল্প ঋণ থেকে শুরু করে এলটিআর (লোন অ্যাগেইনস্ট ট্রাস্ট রিসিট বা বিশ্বাসের ভিত্তিতে
আমদানি অর্থায়ন), ক্যাশ ক্রেডিট, পিএডি সুবিধা, পুনঃতফসিলিকরণ, ঋণের অবলোপনসহ খেলাপি
ঋণসমূহে বিভিন্ন ধরনের অনিয়ম উদ্বুদ্ধ করা হয়। অধিকাংশ আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপক-আমলাসহ
রাজনৈতিক দলসমূহের পাতিনেতাদের আত্মীয়রাও সুবিধা পায়। আমদানিতে ওভার ইনভয়েসিং আর রপ্তানিতে
আন্ডার ইনভয়েসিং এমনভাবে এড়িয়ে যাওয়া হয়, যাতে ঋণ করা অর্থ সহজে বিদেশে পাচার করা যায়।
দুর্যোগ এলে বিভিন্ন সেক্টরে প্রয়োজনীয় প্রণোদনা এমনভাবে প্রদান করা হয়, যাতে একটি
গোষ্ঠীই সম্পদশালী হয়। ঘুষবাণিজ্য প্রাধান্য পায়। কৃষি-শিল্প-বাণিজ্যসহ সব খাতে ধনীবান্ধব
সরকারি ভর্তুকি ও প্রণোদনা এমনভাবে দেওয়া হয়, যাতে আর ঋণ ফেরত দিতে না হয়। এসব ছাড়াও
বাজেটে ধনীবান্ধব কর-শুল্ক হার নির্ধারণ ও তা বাস্তবায়ন করা; বিভিন্ন পণ্য বাজারজাতকরণে
অযথা ও অযৌক্তিক মধ্যস্বত্বভোগী সৃষ্টি করা; আইন শিথিল করে পণ্যের বেআইনি মজুদ উৎসাহিত
করা; পুঁজিবাজারে অস্বচ্ছ ও তথ্য গোপনের খেলা করা; নিয়ন্ত্রক সংস্থা-প্রতিষ্ঠানে তেলবাজ-আলুবাজদের
নিয়োগ দেওয়া; গণমাধ্যমব্যবস্থা কিনে ফেলাসহ হেন অপকর্ম নেই যা করা হয় না। বাংলাদেশকে
কীভাবে খেলাপি ঋণ নামক অভিশাপ থেকে মুক্ত করা যায়, এ নিয়ে নানা মুনির নানা মত রয়েছে।
খেলাপি ঋণ আমাদের
দেশের মাথার ঘাম পায়ে পড়ার আগে শুকিয়ে যাওয়া সাধারণ মানুষের জীবন কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত
করছে ও বিষিয়ে তুলছে তা একবার বোঝা দরকার। শুরুতেই আসে ব্যাংকিং খাতে অস্থিতিশীলতার
কথা। খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেশি হলে ব্যাংকগুলোর কাছে পর্যাপ্ত নগদ অর্থ থাকে না বা পুঁজির
ঘাটতি দেখা দেয়। ফলে তাদের স্বাভাবিক ঋণ কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করে। ক্ষতিপূরণের জন্য
ব্যাংকগুলো সাধারণ গ্রাহককে ঋণের সুদহার বাড়িয়ে দেয়, যা সাধারণ মানুষ ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের
ঋণ নেওয়া কঠিন করে তোলে। দ্বিতীয়ত. উন্নয়ন প্রকল্প ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণে বাধা। খেলাপি
ঋণ বেশি হলে ব্যাংকগুলো সরকারের উন্নয়ন প্রকল্প বা ব্যক্তিগত ও ছোট ব্যবসায়ীদের ঋণ
দিতে অনীহা প্রকাশ করে, যা দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমিয়ে দেয়। ফলে অর্থের অভাবে
কর্মসংস্থান সৃষ্টির উদ্যোগ বাধাগ্রস্ত হয় এবং বেকারত্ব বৃদ্ধি পায়। তৃতীয়ত. জনগণের
ট্যাক্সের অপচয় হয়। খেলাপি ঋণ মেটানোর জন্য সরকারকে নিয়মিত হারে জনগণের ওপর অতিরিক্ত
করের বোঝা চাপাতে হয় অর্থ দিয়ে ব্যাংকগুলোকে বেলআউট বা পুনঃপুঁজি সরবরাহের জন্য, যা
সাধারণ মানুষের অর্থের অপচয় এবং অন্য উন্নয়ন খাতের জন্য বরাদ্দ কমিয়ে দেয়। চতুর্থত.
খেলাপি ঋণের কারণে দেশের ব্যাংকিং খাতের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমে যায়। ফলে বিদেশি
বিনিয়োগকারীরাও বিনিয়োগে নিরুৎসাহ হন, যা অর্থনৈতিক গতি ও প্রবৃদ্ধি কমিয়ে দেয়। পঞ্চমত.
সামাজিক বৈষম্য বৃদ্ধি। বড় বড় ঋণখেলাপিদের ক্ষেত্রে ঋণ মওকুফ, পুনঃতফসিল ও অবলোপন করা
হলেও সাধারণ ঋণগ্রহীতারা কড়া শর্তে চক্রবৃদ্ধি হারে ঋণ পরিশোধের বেড়াজালে পড়েন, যা
সমাজে বৈষম্য ও ক্ষোভ বাড়িয়ে তোলে (বিগত সরকারের ঝাড়েবংশ পতন অন্যতম উদাহরণ)। ষষ্ঠত.
মুদ্রাস্ফীতি-মূল্যস্ফীতি ও জনগণের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস। খেলাপি ঋণের ফলে আর্থিক বাজারে
চাপ তৈরি হয়, ফলে মুদ্রাস্ফীতি বাড়ে। সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়, যা জীবনযাত্রার
মানে গুরুতর প্রভাব ফেলে (উদাহরণ বাংলাদেশে বর্তমান উচ্চ মূল্যস্ফীতি প্রবণতা)।
মনে হতে পারে
আমাদের দেশেই কেবল ঋণ খেলাপি হয়। এমন ধারণা ভুল। পুঁজিবাদী ব্যবস্থা অনুসরণকারী কমবেশি
সব দেশেই খেলাপি ঋণ বড় সমস্যা। কিন্তু আমাদের দেশে এ অপসংস্কৃতি একটি নর্মে রূপ নিয়েছে।
এটা গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি না থাকার কারণেই হচ্ছে। সঙ্গত কারণেই বলে নেওয়া
যায়, এ অবস্থা বহাল থাকলে খেলাপি ঋণ কমা তো দূরে, ভবিষ্যতে বিপজ্জনক রূপ নেবে। পুঁজিবাদী
ব্যবস্থায় ব্যবসায়ীদের মূল লক্ষ্যই হচ্ছে সর্বোচ্চ মুনাফা অর্জন। অতিরিক্ত লাভ-লোভের
আকাঙ্ক্ষায় অনেকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ প্রকল্পে বিনিয়োগ করে, যা সফল না হলে ঋণখেলাপি বাড়ে।
আবার করপোরেট প্রভাবশালীরা রাজনৈতিক যোগসাজশে বড় অঙ্কের ঋণ গ্রহণ করে, যা পরিশোধ না
করে ছলে-বলে-কৌশলে বারবার আরও ঋণ গ্রহণ করে। এ অবস্থা পুঁজিবাদী ব্যবস্থার প্রধান পৃষ্ঠপোষক
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও আছে। দেশটির অর্থনীতি যদিও পুরোপুরি ঋণনির্ভর এবং সেখানে ব্যক্তি,
ব্যবসায়ী ও সরকার ঋণ নিয়েই তাদের যাবতীয় কাজকর্ম সারে। ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত দেশটির
ব্যাংকব্যবস্থায় খেলাপি ঋণ বা নন পারফর্মিং লোনের (এনপিএল) পরিমাণ মোট বিতরণকৃত ঋণের
মাত্র ১.৪ শতাংশ।
২০০৮-০৯ অর্থবছর
বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য মন্দার সময় ছিল, যা বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলেছিল।
তার পরও বাংলাদেশের অর্থনীতি তুলনামূলক স্থিতিশীল ছিল, খেলাপি ঋণের পরিমাণও ছিল খুবই
কম। এখন দমিয়ে রাখা হিসাবেই খেলাপি ঋণ প্রায় ১৭ শতাংশ। ২০০৮-০৯ অর্থবছরে বিতরণ করা
ঋণের অর্থাৎ ২ লাখ কোটি টাকার মধ্যে মাত্র ৮ হাজার কোটি টাকা ছিল কৃষি খাতে, বাকি টাকার
সিংহভাগই ছিল তৈরি পোশাক ও শিল্প খাতে। পরবর্তী দেড় দশকে কৃষিতে ঋণ কেবলই কমেছে, আর
শিল্প খাতে বেড়েছে; যা রাজনৈতিক দুর্বৃত্তদের যোগসাজশে লোপাট হয়েছে। ২০০৬ সালের ডিসেম্বর
পর্যন্ত বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে মোট সম্পদের মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকসমূহের হিস্সা
ছিল ৩২.৭ শতাংশ, যা পরে ক্রমাগত কমেছে বেসরকারি ব্যাংকের দৌরাত্ম্যে। দুর্বল ব্যাংক
যেখানে রয়েছে সেখানে আবার নতুন কয়েকটি ব্যাংক খোলার কথা ভাবা হচ্ছে-এমনটি শোনা গিয়েছিল।
বিষয়টি হাস্যকর, বিশ্ববাণিজ্যের অন্যতম কেন্দ্র এশিয়ার ধনী রাষ্ট্র সিঙ্গাপুরে ব্যাংক
পাঁচটি, মালয়েশিয়ায় নয়টি।
কীভাবে ঋণ না নিয়েও মাথার ওপর চেপে বসা ঋণ দেশের জনগণকে মুক্ত করা যায়, তা নিয়ে অর্থনীতি শাস্ত্রে অনেক উপায়-উপকরণ বাতলে দেওয়া আছে। কিন্তু বাংলাদেশে তত্ত্ব-উপাত্ত দিয়ে এ সমস্যা নিরসন যথেষ্ট প্রশ্নসাপেক্ষ। এখন তাই ঋণ পুনরুদ্ধারের জন্য কঠোর আইন ও এর কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে, যোগ্য ঋণগ্রহীতাদের ঋণ দিতে এবং রাজনৈতিক প্রভাব এড়িয়ে চলতে স্বচ্ছ ঋণ প্রদান প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ প্রতিরোধে সর্বাধুনিক প্রযুক্তির সমাহার করতে হবে। ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন ব্যবস্থাপনা ও ঋণগ্রহীতাদের কার্যক্রমের ওপর নজরদারির জন্য কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে জবাবদিহির মাধ্যমে। রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ থেকে ঝেঁটিয়ে বিদায় করতে হবে এবং সর্বোপরি বাংলাদেশ ব্যাংককে সরকার ও আমলাদের কবল থেকে মুক্ত করে স্বাধীনভাবে চলার নিশ্চয়তা দিতে হবে। খেলাপি ঋণের বোঝামুক্ত হতে সুশাসনই একমাত্র প্রতিবিধান।