পর্যবেক্ষণ
ড. মো. শামসুল আলম
প্রকাশ : ০৩ ডিসেম্বর ২০২৪ ১০:২৭ এএম
ড. মো. শামসুল আলম
ঢাকাকে তিলোত্তমা হিসেবে গড়ার স্বপ্ন বহুদিনের। তবে তিলোত্তমায় প্রাণের উচ্ছ্বাসের তুলনায় ভোগান্তি বেশি। সবখানেই সুশাসনের অভাব থাকায় নগরীর যানজট চিরস্থায়ী সমস্যায় পরিণত হয়েছে। সম্প্রতি ঢাকার বনশ্রীতে খালে বাস পড়ার ঘটনার পর ওই বাসের এক যাত্রী জানান, বাসচালক ইচ্ছে করেই খালে বাস চালিয়ে দিয়েছিলেন। মূলত যাত্রী ও চালকের বচসা থেকেই ওই বাসচালক এমনটি করেছেন। এমন ঘটনার পরও ওই বাসচালকের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে আমরা বিস্তারিত কিছু জানতে পারিনি। সড়কে সুশাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে যেমন লক্ষ্য নেই তেমন সামাজিক সংহতি স্থাপনেও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের অভাব বেশি। ফলত যান্ত্রিক শহরে রাষ্ট্রকাঠামো অনেকটা ধুঁকে ধুঁকে চলছে।

রাজধানী বা দেশের গুরুত্বপূর্ণ শহরে যাতায়াতে মানুষকে অসীম ধৈর্যের পরীক্ষা দিতে হয়। এখন তাদের ধৈর্যের আরও পরীক্ষা দিতে হচ্ছে জীবনযাত্রার মান আগের অবস্থায় রাখতে। পট পরিবর্তনের পর অনেকের প্রত্যাশা ছিল রাষ্ট্র এবার গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কারের পথে হাঁটবে। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই রাষ্ট্রের অর্থনীতিতে প্রভাব রাখে। কিন্তু যদি রাষ্ট্রে অর্থনীতির গতিপথ ভিন্ন কারণে স্থবির হয়ে পড়ে, তখন পরিস্থিতি কোথায় দাঁড়ায়? পুরোপুরি নৈরাজ্যকর এক পরিস্থিতিতে। আমরা দেখছি, প্রতিনিয়ত বিভিন্ন দাবিদাওয়া উত্থাপন করে আন্দোলন করছে অনেকে। কোনো গোষ্ঠী বা সংগঠন দাবি আদায়ের উদ্দেশ্যে সড়ক অবরোধ করে রাখে। তাদের কাছে এটি দাবি আদায়ের সৃজনশীল পদ্ধতি বলে মনে হয়। কিন্তু তা যে জনভোগান্তির সৃষ্টি করছে সেদিকে তাদের নজর নেই।
বস্তুত একটি অংশে জীবন থমকে যাওয়ায় শহরের জীবনযাত্রাও থমকে যায়। সেও না হয় হলো। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এ পদ্ধতিতে আদৌ কি দাবি আদায় হয়, নাকি সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বাড়ে? জাতীয় প্রেস ক্লাব, সায়েন্সল্যাব, কারওয়ান বাজার, বাংলামোটরÑ এমন গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোয় করা হয় মানববন্ধন, অবস্থান কিংবা সড়ক অবরোধ। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে চাকরি জাতীয়করণ, বেতন বৈষম্য দূরীকরণ, দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, পরীক্ষার ফলাফল বাতিল কিংবা নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দাবি। এসব কর্মসূচি জনগণের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য আয়োজিত হলেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে সাধারণ মানুষের ওপর। যারা অফিসে, হাসপাতালে বা জরুরি প্রয়োজনে বের হন, তাদের সময় এবং মানসিক স্থিতি দুটোই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ বিষয়গুলো নিয়ে মানুষ আলোচনা করার সুযোগ পায় কম। তাদের কাছে গোটা বিষয়টি ভোগান্তির নামান্তর। ফলে যারা আন্দোলন করছেন তারা অনেক সময় শান্তিপূর্ণ অবস্থানের দাবি করলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে তা শান্তিপূর্ণ থাকে না। ঢাকার রাস্তা অবরোধের ফলে সারা শহরে এক প্রকার স্থবিরতা নেমে আসে। জরুরি সেবা, যেমন অ্যাম্বুলেন্স কিংবা ফায়ার সার্ভিসের কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হয়। অনেক সময় রোগীরা সময়মতো হাসপাতালে পৌঁছাতে না পারার কারণে প্রাণহানিও ঘটে। একদিকে আন্দোলনকারীরা তাদের দাবির প্রতি কর্তৃপক্ষের নজর আকর্ষণ করতে চান, অন্যদিকে তাদের এ পদ্ধতি জনমনে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়।
সম্প্রতি শিক্ষার্থীদের মধ্যে এক ধরনের বিচ্ছিন্নতা দেখা যাচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত সাত কলেজের শিক্ষার্থীরা স্বতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের দাবিতে আন্দোলন করছে। তাদের দাবি যৌক্তিক না অযৌক্তিক সে প্রসঙ্গে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। নিজ অধিকার বা ন্যায্য দাবি আদায়ের ক্ষেত্রে তরুণ প্রজন্মের কাছে সৃজনশীল পন্থা সবাই প্রত্যাশা করে। তরুণ প্রজন্মকে বুঝতে হবে, সড়ক অবরোধকে দাবি আদায়ের উপযুক্ত পদ্ধতি বলা যায় না। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সংলাপ, স্মারকলিপি প্রদান এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনাÑ এসব পদ্ধতিতে সমস্যার সমাধান সম্ভব। এ পদ্ধতিগুলো জনজীবন অচল না করেও দাবি আদায়ের জন্য কার্যকর হতে পারে। যখনই আন্দোলনকারীরা রাস্তায় নামে, তখন তারা জনসমর্থন পেতে চায়। কিন্তু রাস্তায় যান চলাচল বন্ধ করার কারণে মানুষের অসন্তোষ সৃষ্টি হলে সেই সমর্থন নষ্ট হয়ে যায়। বরং প্রাসঙ্গিক এবং যৌক্তিক দাবি নিয়ে আলোচনা করলে তা সহজে সমাধান পায় এবং জনগণের মনোভাবও ইতিবাচক থাকে।
এ ক্ষেত্রে যে ধরনের দাবি উত্থাপন হচ্ছে সে বিষয়ে আলোচনার জন্য সংশ্লিষ্ট পক্ষের সঙ্গে সহযোগিতামূলক আচরণ করতে হবে। কিন্তু তা করা সম্ভব হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে না। এর একটি কারণ হতে পারে, শিক্ষার্থীদের মধ্যে নেতৃত্বসংকট বিদ্যমান। এ নেতৃত্বসংকটের কারণে প্রায়ই তাদের সংঘাতে জড়াতে হচ্ছে। যেমনটি আমরা সম্প্রতি ডেমরায় দেখেছি। ড. মাহবুবুর রহমান মোল্লা কলেজের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সহাবস্থান জানাতেই গিয়েছিল সরকারি সোহরাওয়ার্দী কলেজ। কিন্তু কেন তাদের মধ্যে মতবিরোধ এবং শেষ পর্যন্ত তা রণক্ষেত্রে পরিণত হলো তা প্রশ্নের বিষয়। জুলাই-আগস্টে যে একতা এবং সাম্যের ভিত্তিতে তরুণ প্রজন্ম আন্দোলন পরিচালনা করেছে তার সঙ্গে বর্তমানের মিল পাওয়া যাচ্ছে না। অভিযোগ আছে, কোনো কোনো রাজনৈতিক পক্ষ ইন্ধনের মাধ্যমে অন্তর্বর্তী সরকারকে বিতর্কিত করতে চাচ্ছে। দীর্ঘ ১৫ বছরে রাজনৈতিক দলগুলো ছাত্র রাজনীতিকে বাড়তি পেশিশক্তি হিসেবেই ব্যবহার করেছে। শিক্ষার্থীদের গায়ে রাজনীতির রঙ কম ছোঁয়ানো যায়। তাই তাদের ব্যবহার করা সহজ। কিন্তু সময় পাল্টানোর এই সময়ে কোনো কোনো রাজনৈতিক দল আখেরে নিজেদেরই ক্ষতি করছে। তরুণ প্রজন্মকে বরং দায়িত্বশীল রাজনীতি শেখানোর সময়কে কাজে লাগাতে হবে। যদি তা না করা যায়, তাহলে শেষ পর্যন্ত আমাদের গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি তরুণ প্রজন্মের জন্য সঠিক মঞ্চ গড়তে পারবে না।
অবরোধের মাধ্যমে দাবি আদায়ের প্রশ্ন তুলতে বাধ্য করে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রতি আমাদের আস্থা কতটা শক্তিশালী? আন্দোলনকারীদের উচিত তাদের দাবি একটি গঠনমূলক উপায়ে উপস্থাপন করা। স্মারকলিপি প্রদান, গণস্বাক্ষর সংগ্রহ কিংবা শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদÑ এগুলোই দাবি আদায়ের আরও সুশৃঙ্খল ও কার্যকর পদ্ধতি হতে পারে। সড়ক অবরোধের মাধ্যমে দাবি আদায়ের প্রবণতা শুধু জনজীবনই দুর্বিষহ করে তোলে না, বরং আন্দোলনকারীদের উদ্দেশ্যকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে। আমরা আশা করি, ভবিষ্যতে কোনো গোষ্ঠী বা সংগঠন তাদের দাবি আদায়ের জন্য রাস্তা বন্ধ করার মতো কর্মসূচি থেকে বিরত থাকবে। সমাধান আসুক গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে, আলোচনা, সমঝোতা এবং জনগণের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে। আর এ বিষয়টি বোঝানোর দায়িত্ব নিতে হয় রাজনৈতিক দলগুলোকে। রাজনৈতিক দলগুলো একের পর এক বিবৃতি, মিছিল, সমাবেশ এবং নিজস্ব কমিটি গঠনের কার্যক্রমেই ব্যস্ত। অধিকাংশ ছাত্র সংগঠনে এখনও আমরা দেখছি ছাত্রত্ব ফুরিয়ে যাওয়ার পরও অনেককে প্রধান দায়িত্বে রাখা হয়েছে, অর্থাৎ সেই পুরোনো ব্যবস্থাই রয়ে গেছে।
পট পরিবর্তনের পর দেশের তরুণ প্রজন্ম আমাদের রাজনৈতিক জগতের বাইনারি থেকে বেরিয়ে আসতে চেয়েছে। অর্থাৎ দুটি প্রধান দলই দেশের সর্বেসর্বা এমন রাজনৈতিক পোলার থেকে দেশকে বের করে আনার ইচ্ছে প্রকাশ করেছে। এ ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের নিজস্ব দল হওয়ার বিষয়টি সচেতন মহলের অনেকে উৎসাহ নিয়ে সমর্থন দিয়েছেন। তারা একটি বিষয় বোধহয় ভুলে যাচ্ছেন। শিক্ষার্থী হিসেবে তাদের কাজ পড়ালেখা করা। রাষ্ট্রীয় নীতিমালা বিষয়ে তাদের খোঁজখবর রাখা জরুরি। আর যদি তারা নির্দিষ্ট কোনো বিষয়ে দক্ষ হতে চায় তখন বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি বিষয়ে অধ্যয়ন করবে। আমাদের সমাজে পট পরিবর্তন ঘটলেও সামাজিক মনস্তত্ত্ব বদলায়নি। আমরা এখনও থিতু ভাবনায় সুখী হই। এ ধরনের থিতু ভাবনা আসলে পুরোনো শেকড়বাকড়কেই আশ্রয় দেয়। নতুন চারা গজানোর পর্যাপ্ত সূর্যরশ্মি সেখানে থাকে না। রাজনৈতিক দলগুলো তেমন সূর্যের কিরণ ছড়াতে পারছে না। ফলে আবারও সমাজে এক ধরনের বিষণ্নতা ও বিশৃঙ্খলার পাশাপাশি বিচ্ছিন্নতা তৈরি হচ্ছে। না হলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ভয়াবহ সংঘাত হবে কেন? এর একটিই অর্থ হতে পারে, শিক্ষার্থীরা কোনো না কোনো পক্ষে নিজেদের অবস্থান থিতু করছে।
আমরা চাই, জনপ্রত্যাশা অনুযায়ী সংস্কার হোক। একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতিগত প্রশ্নের নিরিখে আমাদের সামাজিক সংস্কার চালাতে হবে। এ কাজটি অন্তর্বর্তী সরকারের একার নয়। সুশীল সমাজ, বুদ্ধিজীবী, রাজনৈতিক দল বিভিন্ন পক্ষকেও কাজ করতে হবে সামাজিক সংস্কারে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের তত্ত্বানুসারে উপমহাদেশের একমাত্র আধুনিক রাষ্ট্র বাংলাদেশ। এ রাষ্ট্রটি ভাষাভাষীর ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত। ভাষার পূর্ণ মর্যাদা এবং অসাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প থেকে মুক্ত। কিন্তু রাষ্ট্রবিজ্ঞানের তত্ত্ব বাস্তবিক বাংলাদেশে লক্ষ করা যাচ্ছে না। সাক্ষরতা বেড়েছে কিন্তু মানুষের সচেতনতা পাষাণের চেয়েও প্রস্তরীভূত হয়ে উঠছে। তাই সমাজে মানুষ সহনশীল নয়। যে দাবিদাওয়ার জন্য সড়ক অবরোধ করা হচ্ছে, তার অধিকাংশই বৃহত্তর সমাজের জন্য আবশ্যক নয়; অন্তত এখনই জরুরি নয়। মূল্যস্ফীতি ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার মতো শঙ্কা রেখেও আমরা যখন সংকট বাড়াই তখন গোটা সমাজ হিসেবে নিজেদের অজ্ঞতাকেই বড় করে দেখতে হয়।