যুক্তরাষ্ট্র
চার্লি হান্ট
প্রকাশ : ০২ ডিসেম্বর ২০২৪ ০৮:৫৫ এএম
চার্লি হান্ট
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে এক ‘অশরীরী শক্তি’ হিসেবে অভিহিত করেছেন দেশটির খ্যাতিমান ডকুমেন্টারি চলচ্চিত্র নির্মাতা মাইকেল মুর। তার ধারণা, ট্রাম্প আরও একবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হবেন। ২০১৬ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্পের জয়ী হওয়ার প্রভাব নিয়ে মুরের মুক্তি পেতে যাওয়া ‘ফারেনহাইট ১১/৯’ চলচ্চিত্রের প্রচার-প্রচারণার সময় সিএনএনের সঙ্গে কথা বলেন তিনি। মুর বলেন, ২০১৬ সালের গ্রীষ্মে বহু লোক একদম নিশ্চিত ছিল যে, ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থী হিলারি ক্লিনটন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়ী হতে যাচ্ছেন। লোকজন বলছিল, এই ইডিয়টকে (ট্রাম্প) কেউ ভোট দেবে না। ট্রাম্পের জয়ের আগে মুরের বলা কথাগুলো অনেকের কাছে হাসির খোরাক বা সামান্য শ্লেষ হলেও বাস্তবে দেখা গেল আদতে তার কথাই ফলে গেছে।

এবারের নির্বাচনকে
যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম সন্ধিক্ষণ হিসেবে অভিহিত করছেন বিশ্লেষকরা।
বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিসহ মিত্ররাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক এবং বিশ্বব্যবস্থা
ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির ক্ষেত্রে দেশটির এত দিন ধরে চলা দৃষ্টিভঙ্গি এবং অবস্থানের
জন্য কঠিন পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট এবারের নির্বাচন
এমন একসময়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে, যখন সাম্প্রতিক কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে সংকটময় মুহূর্ত
কাটাচ্ছে আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও ভূরাজনীতি। একদিকে ইউরোপের ইউক্রেন-রাশিয়া, ফিলিস্তিন
ও লেবাননে ইতিহাসের নজিরবিহীন নির্মম এবং রক্তাক্ত আগ্রাসন চালাচ্ছেন ইসরায়েলি যুদ্ধবাজ
প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু। লেবাননের সঙ্গে আপাতত যুদ্ধবিরতির মধ্যস্থতা করছে যুক্তরাষ্ট্র
ও ফ্রান্স। তবে এই যুদ্ধবিরতিতে ট্রাম্পের কোনো আঁতাত নেই। তার পরও তিনি চেয়ারে বসলে
কেমন হবে পরিস্থিতি, তা নিয়েও দেখা দিয়েছে নানা শঙ্কা। তার আগ্রাসন ঘিরে ইতোমধ্যে উত্তপ্ত
পুরো মধ্যপ্রাচ্য। যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে ইরান-ইসরায়েল।
অপরদিকে তাইওয়ান
ঘিরে উত্তপ্ত দক্ষিণ চীন সাগর ও পূর্ব এশিয়া। এর পাশাপাশি অস্থিতিশীলতা ও গৃহযুদ্ধ
এবং সন্ত্রাসবাদে আক্রান্ত সুদান, মালি, সোমালিয়া, কঙ্গো, বুরকিনা ফাসোসহ আফ্রিকার
বহু দেশ। শুধু ভূরাজনৈতিক ক্ষেত্রেই নয়, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে এবং চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের
সম্ভাব্য বাণিজ্যযুদ্ধকে কেন্দ্র করে চরম অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারী
এবং ব্যবসায়ীদের মধ্যে। এই রকম পরিস্থিতিতে এসব ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের
ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলতে পারে ট্রাম্পের নানা বিষয়ে সিদ্ধান্ত। রাজনীতিবিষয়ক আন্তর্জাতিক
বিশ্লেষকরা এ ধরনের চিন্তাভাবনাই করছেন। স্বাধীনচেতা ট্রাম্পের এবারের প্রেসিডেন্সিতে
আমূল পরিবর্তন আসতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের বিগত কয়েক দশকের দৃষ্টিভঙ্গিতে সেটাই প্রমাণিত
হয়েছে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে এত
দিন ধরে গুরুত্ব পাওয়া ‘বৈশ্বিক নীতি’র পরিবর্তে তিনি গ্রহণ করতে পারেন ‘আমেরিকাই প্রথম’
নীতি।
এদিকে এবারের
নির্বাচনী প্রচারণায় ট্রাম্প এই ‘আমেরিকাই প্রথম’ নীতির পক্ষে খোলামেলা নিজের বক্তব্য
তুলে ধরেছেন। অর্থাৎ তার পররাষ্ট্র, অর্থনীতি ও যুদ্ধনীতি পরিচালিত হবে, ‘আগে আমেরিকা,
পরে অবশিষ্ট বিশ্ব’ নীতিতে। বিশ্লেষকরা বলেছেন, ট্রাম্পের এই নীতির অর্থ হচ্ছে যেখানে
আমেরিকার স্বার্থ নেই কিংবা তার স্বার্থ বিঘ্নিত হবে, এ রকম ক্ষেত্রে প্রয়োজন হলে মিত্রদের
স্বার্থকেও গুরুত্ব দেবেন না ট্রাম্প। আর ট্রাম্পের এই অবস্থানেই মূলত শঙ্কিত যুক্তরাষ্ট্রের
মিত্রদেশগুলো। বিশেষ করে ক্রমেই আগ্রাসী রূপ ধারণ করছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির
পুতিনের বিরুদ্ধে।
ন্যাটো ও ইউরোপীয়
নিরাপত্তার ভবিষ্যৎ কী হবে, তা নিয়ে শঙ্কিত যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে
পরিচিত ইউরোপীয় ও ন্যাটো জোটভুক্ত দেশগুলো। এ ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিকরা নানাভাবেই
নিজেদের উদ্বেগ তুলে ধরে আসছেন। তাদের আশঙ্কা হয়তো রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিনের সঙ্গে এমন
কোনো বোঝা পড়ায় আসবেন ডোনাল্ড ট্রাম্প, যার মাশুল দিতে হবে ইউরোপে আমেরিকার মিত্রদের।
পাশাপাশি ব্যবসা ও রাজনীতির মাঠে স্বাধীনচেতা স্বভাবের হিসেবে পরিচিত ডোনাল্ড ট্রাম্প
প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে আন্তর্জাতিক কূটনীতির ক্ষেত্রে ও ওয়াশিংটনের আমলাদের দেখানো
পথে না গিয়ে নিজের ইচ্ছামতো সিদ্ধান্ত নেবেন। এ ধরনের আশঙ্কাও রয়েছে। ট্রাম্পের এই
‘অনিশ্চিত’ স্বভাবের বিষয়টিই মূলত অনেক বেশি আতঙ্কিত করছে ইউরোপের কূটনীতিকদের।
ট্রাম্পের আমলে
ইউরোপের কাছে আমেরিকা ‘ঘনিষ্ঠ মিত্র’ হিসেবে বিবেচিত হওয়ার পরিবর্তে ‘অনিশ্চিত মিত্র’
হিসেবেও বিবেচিত হতে পারেÑএই আশঙ্কাও রয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। গত মাসে ইউক্রেনের
প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি যুক্তরাষ্ট্র সফরে গিয়েছিলেন। তখন হোয়াইট হাউস তাকে
আনুষ্ঠানিকভাবে উষ্ণ অভ্যর্থনা দিলেও ‘দ্য গার্ডিয়ান’ জানিয়েছে, রাশিয়ার বিরুদ্ধে তার
যুদ্ধ পরিকল্পনার ব্যাপারে ঘরোয়া আলোচনায় নেতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেছেন মার্কিন কর্মকর্তারা।
পাশাপাশি তিনি যখন ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে নিউইয়র্কের বিখ্যাত ট্রাম্প টাওয়ারে সাক্ষাৎ
করেন। তখন তার সঙ্গে স্বভাবসুলভ কৌতুক করছেন ট্রাম্প। তাই জানুয়ারিতে ট্রাম্পের শপথের
সঙ্গে সঙ্গে তিনি কী করেন তার দিকেই মনোযোগ সবার। ইউরোপীয় এক কূটনীতিক যুক্তরাজ্যের
সংবাদমাধ্যম ‘দ্য গার্ডিয়ান’কে জানিয়েছেন, ‘আমি নিশ্চিত নই, ট্রাম্প কি পুতিনের সঙ্গে
কোনো সমঝোতায় যাবেন, নাকি তিনি মস্কোর ওপর একটা পরমাণু বোমা ফেলার সিদ্ধান্ত নেবেন।
মূল সত্যটা হলো একটা ব্ল্যাক বক্স এবং যদি কেউ বলে যে, তার প্রশাসনের ভেতরে কী হচ্ছে,
সেটা শুধু তিনি জানেন।’
ট্রাম্প ক্ষমতায়
বসার পর ইসরায়েল-ফিলিস্তিন ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা কী হবে, তা নিয়েও শঙ্কা রয়েছে
বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ট্রাম্প নিজেই ইসরায়েলের কট্টর সমর্থক। সেই হিসেবে ফিলিস্তিন
ও লেবাননে ইসরায়েলি আগ্রাসনকে তিনি শেষ পর্যন্ত সমর্থন দেবেন বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
নেতানিয়াহুর সঙ্গে ট্রাম্পের ব্যক্তিগত শীতল সম্পর্ক এতে প্রভাব ফেলবে না-এও অনেকের
ধারণা। এ ব্যাপারে ইসরায়েলি সাংবাদিক ও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ইয়োসি মেলমান ‘দ্য গার্ডিয়ান’কে
বলেছেন, নেতানিয়াহুর প্রসঙ্গে কথা উঠলে ট্রাম্পের রেকর্ড অনুযায়ী তাকে খুব কট্টর ইসরায়েলি
সমর্থক হিসেবে দেখা যাবে না। আমি এই সম্ভাবনা উড়িয়ে দেব না যে, যখন ট্রাম্প নির্বাচিত
হবেন, তখন তিনি ‘গোল্লায় যাও’Ñ এটাও বলতে পারেন। যুদ্ধের বদলে ট্রাম্পের মনোযোগ যে
চীনের দিকে যাবে তার আভাসও ইতোমধ্যে পাওয়া গেছে। ফলে এখনও অনেক কিছু অনিশ্চিত। কিন্তু
যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকরা নিশ্চিত তারা এবার স্বস্তির আবহ খুঁজে পাবে।
এবিসি নিউজ
থেকে অনুবাদ : আমিরুল আবেদিন