× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

নগর পরিবহন ব্যবস্থা

পরিকল্পনায় সঠিক ব্যাকরণ অনুসরণ করতে হবে

ড. আদিল মুহাম্মদ খান

প্রকাশ : ৩০ নভেম্বর ২০২৪ ১২:৫৬ পিএম

ড. আদিল মুহাম্মদ খান

ড. আদিল মুহাম্মদ খান

নগরের পরিবহন ব্যবস্থাপনা জটিল কারিগরি বিষয় বলেই বিবেচিত। এই কারিগরি বিষয়কে পর্যাপ্ত পরিসরে বাস্তবায়নের জন্য নগরকে বোঝার কিংবা নগর কাঠামোকে অনুধাবনের বিষয়টিকে প্রাধান্য দিতে হয়। আর এই অনুধাবনের ক্ষেত্রে একটি সামগ্রিক উন্নয়ন দর্শনকে গুরুত্ব দিতে হয়। উন্নত বিশ্বে নগরপরিবহন অবকাঠামো বাস্তবায়ন এবং এ সংশ্লিষ্ট পরিকল্পনা সংস্থা সব সময় একসঙ্গে কাজ করে এবং একটি সামগ্রিক পরিকল্পনাবিজ্ঞান অনুসরণ করে। যদি পরিকল্পনাবিজ্ঞান যথাযথভাবে অনুসরণ না করা হয়, তাহলে সমস্যা থাকবেই। যানজট আমাদের নিত্য সমস্যা। অথচ এই সমস্যাটিই রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর হঠাৎ করেই যেন আরও বেড়েছে। এর পেছনে রয়েছে অটোরিকশা ও ব্যাটারিচালিত রিকশার সংখ্যা বেড়ে যাওয়া। দেখা যাচ্ছে যেসব রাস্তায় যান চলাচলে বিশৃঙ্খলা ছিল না, জট ছিল না রিকশার আধিক্যে সেখানেও এখন বিশৃঙ্খলা ও জট। 

সম্প্রতি অটোরিকশা নিয়েও তুঘলকি কাণ্ড ঘটেছে। প্রথমে উচ্চ আদালত সারা দেশে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চলাচল নিষিদ্ধ করেন। এই রায়ের বিরুদ্ধে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাচালকরা রাস্তায় নেমে পড়লেন এবং রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে মূল সড়ক অবরোধ করলেন। ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার সমস্যা শুধু বর্তমানের বিষয়ই নয়। কারণ দিনের পর দিন অটোরিকশাগুলো অনুমোদনহীনভাবে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় চলছে। গোটা রাজধানীতে অটোরিকশা বেড়ে যাওয়ার পেছনে একটি রাজনৈতিক মদদপুষ্ট চক্রের হাত রয়েছে। তারা অটোরিকশা ভাড়া দিয়ে এবং বিদ্যুৎবিল ফাঁকি দিয়ে দিনের পর দিন আয় করত। এ নিয়ে বহুবার অভিযোগ ও সমালোচনা হলেও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। অভিযোগ আছে, এক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অনেকেও জড়িত ছিলেন। সুষ্ঠু নগরপরিকল্পনার মাধ্যমে অটোরিকশাকে মূলধারার মধ্যে আনার বিষয়েও অতীতে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল পক্ষের কোনো মনোযোগ দেখতে পাওয়া যায়নি। 

বলা হয়, মহানগরীতে প্রায় ১০ লাখ অটোরিকশা রয়েছে। প্রকৃত সংখ্যা সম্ভবত আরও কম। তবে প্রকৃত সংখ্যা যা-ই হোক না কেন, এই অটোরিকশার সঙ্গে অনেক ব্যক্তির জীবিকা এবং তাদের পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতা নির্ভর করছে। এত অটোরিকশা তুলে দিলে যারা কর্মসংস্থান হারিয়ে ফেলবেন তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবনার বিষয়টিও এড়িয়ে যাবার সুযোগ নেই। তা ছাড়া ঢাকায় এখনও বিশালসংখ্যক যাত্রী রয়েছেন, যারা নিত্যদিনের যাতায়াতের জন্য এই যান ব্যবহার করেন। যদি এই অটোরিকশাগুলো তুলে নেওয়া হয়, তাহলে তারা অন্য কোন যাতায়াতমাধ্যম ব্যবহার করবেনÑতা আমাদের জানা নেই। অর্থাৎ প্রাক্কলন ছাড়া একটি বিষয়ের সমাধান সহজ নয়। যেসব আইনি ব্যবস্থার সঙ্গে অর্থনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থার সম্পর্ক রয়েছে সেসব ক্ষেত্রে সতর্ক হওয়া জরুরি এবং এক্ষেত্রে তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক হবে না। এক্ষেত্রে সতর্ক পদক্ষেপ নেওয়াই ভালো। আদালত রায়ে পরবর্তী নির্দেশ দেওয়ার আগ পর্যন্ত অটোরিকশা চলার কথা বলা হয়েছে কিন্তু  মহাসড়ক বাদে ঢাকার অন্যান্য সড়কে অটোরিকশা চলার কথা বলা হয়নি। ফলে রিকশাচালকদের মনে এমন একটি ভাবনা রয়ে গেছে, হয়তো ভবিষ্যতে তাদের ওপর আবার নিষেধাজ্ঞা আসবে এবং তাদের অনেকেই আবার এ বিষয়ে আন্দোলনের চেষ্টা করছেন। উন্নত বিশ্বে সড়ক অনুসারে যানবাহন চলাচলের নিয়ম রয়েছে। কোন ধরনের সড়কে কেমন যানবাহন চলাচল করবেÑ তা নির্ধারণ করে দেওয়া। অর্থাৎ সড়কে শৃঙ্খলার বিষয়টি সংশ্লিষ্ট প্রশাসন কঠোর হাতে নিয়ন্ত্রণ করে। 

আমরা দেখছি, সারা দেশের সড়কেই শৃঙ্খলা বলে কিছু নেই। অতীতে যা ছিল তাও অনেকাংশে ভেঙে গেছে। সড়কে জগাখিচুড়ির মতো অটোরিকশা, প্যাডেলচালিত রিকশা, সাইকেল, মোটরবাইক, সিএনজিচালিত অটোরিকশা, প্রাইভেট কার, বাস ও ট্রাক একসঙ্গে চলাচল করছে এবং যানজট সৃষ্টি করছে। বিভিন্ন আন্দোলন ও দাবিদাওয়ার ফলে সড়কে এমনিতেই ভোগান্তি চরমে। সড়ক অবরোধের ফলে যানবাহন চলাচলের উপযোগী নয়Ñএমন সড়কেও বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। যদি সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানো না যায়, তাহলে এই অবস্থার আরও অবনতি ঘটবেÑ এটুকু নিশ্চিত। এমন অবস্থায় সরকারকেই সড়কে নিয়ন্ত্রণ ফেরানোর উদ্যোগ নিতে হবে। অটোরিকশার বিষয়ে আমাদের এখন গভীরভাবে ভাবতে হবে। ঢাকার কোন সড়কে অটোরিকশা চলাচল করবে, কোন অটোরিকশাগুলো সড়কে চলাচলের উপযোগী এবং অটোরিকশার ক্ষেত্রে নির্ধারিত নিয়মকানুন প্রণয়ন করতে হবে। যদি এমনটি না করা যায়, তাহলে কোনোভাবেই সড়কে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার কাজ সম্পন্ন করা যাবে না। অটোরিকশা নিয়ে আমাদের দীর্ঘমেয়াদি আলোচনা জরুরি, কারণ স্থানীয় অর্থনীতিতে তাদের অবদান রয়েছে। এও সত্য, অটোরিকশার সঙ্গে নিরাপত্তার সম্পর্ক রয়েছেÑ যা আমরা এড়াতে পারি না। এই নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট সংকট কীভাবে এড়ানো যায়, তা নিয়ে ভাবতে হবে এবং নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে দীর্ঘ আলোচনার প্রয়োজন। এক্ষেত্রে অটোরিকশার গতি এবং মোটরে পরিবর্তন আনা যেতে পারে। ট্রান্সপোর্ট লাইনিংয়ের অংশ হিসেবে অটোরিকশাগুলোকে বিবেচনা করতে হবে। 

শুধু আন্দোলননির্ভর কিংবা কোর্টের মাধ্যমে আনা সিদ্ধান্তে সামাজিক অস্থিরতা মোকাবিলা করা সম্ভব হবে না। অটোরিকশার ক্ষেত্রে আরেকটি বিষয় প্রায়ই আমাদের নজর এড়িয়ে যায়। তা হলো এসব অটোরিকশার ব্যাটারিগুলো একসময় ব্যবহারযোগ্য থাকে না। সেগুলোকে কীভাবে পরিবেশ দূষণ না করেই বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অধীনে আনা যায়, তা নিয়ে ভাবতে হবে। বিদায়ী সরকার উন্নয়নের মহাসড়ক নামে অসংখ্য অবকাঠামো নির্মাণ করেছিল। এক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সরকার কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত দিয়েছে। যেসব ব্যয়বহুল প্রকল্প আমাদের অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করবে কিংবা আপাতত প্রয়োজন নেই অথবা বিতর্কিত, সেসব প্রকল্প বাদ দেওয়া হয়েছে। এ সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ দেওয়া যেতে পারে। পরবর্তীকালে কোন প্রকল্পগুলো অগ্রাধিকার পাবে এবং কোন প্রকল্পগুলো বাতিল করা হবে, তার জন্য পরিকল্পনা কমিশন গড়তে হবে। নিকট অতীতে আমরা দেখেছি, অনেক প্রকল্প পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর কিংবা সামাজিক জীবনের জন্যও ক্ষতিকর। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রকল্পের পরিকল্পনাগত বিশ্লেষণ করা হয় না। যেসব প্রকল্পে বিশ্লেষণ করা হয়েছে, সেখানে তথ্য-উপাত্তকে নষ্ট করার চেষ্টাও হয়েছে। যেমনÑ কর্ণফুলী টানেলে ভিআইপিদের থাকার জন্য বিভিন্ন রিসোর্টের মতো স্থাপনা গড়া হয়েছে। এসব স্থাপনার অর্থনৈতিক কোনো সুফল নেই। সংগত কারণেই যেসব প্রকল্প চলমান রয়েছে সেসব প্রকল্পের ব্যয়, অর্থনৈতিক সীমা-পরিসীমা, অর্থনৈতিক সুফল এবং বৃহৎ পরিসরে এর ইতিবাচকতা যাচাই-বাছাই ও প্রাক্কলন করতে হবে। না হলে এসব ব্যয়বহুল প্রকল্প অর্ধসমাপ্ত রেখে নির্দিষ্ট অঞ্চলে সৃষ্ট অবকাঠামোগত জট আরও বাড়বে। এও দেখতে হবে, কোনো প্রকল্পের ক্ষেত্রে যেসব রিপোর্ট দেওয়া হয়েছেÑসেখানে অতিরঞ্জিত কোনো তথ্য দেওয়া হয়েছে কি-না। যদি তা করা হয়ে থাকে, তাহলে অবশ্যই যথাযথ প্রতিবিধান নিশ্চিত করে প্রকল্পে সামঞ্জস্য তৈরি করতে হবে। এমনকি প্রকল্পের সঙ্গে যারাই যুক্ত ছিলেন, তাদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। 

আমাদের এখন প্রকল্পগুলোকে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে ভাগ করতে হবে। যেসব প্রকল্প থামানোর উপায় নেই, সেগুলো একটি ভাগে এবং যেসব প্রকল্পে অহেতুক ব্যয় হয়ে আসছে কিন্তু কাজের অগ্রগতি ১০-১৫ শতাংশও নয়, সেই প্রকল্পগুলোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাইকে দ্রুত জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। বিশেষত অর্থের অপচয়ের ফলে জাতির ওপর যে বোঝা চেপেছে সেগুলোর দায় যেন তারা এড়াতে না পারেন, তা নিশ্চিত করতে হবে। যেসব প্রকল্প ভবিষ্যতের জন্য সত্যিই কার্যকর সেগুলোকে পরিকল্পনামাফিক আবার যাচাই করে তারপর বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তা ছাড়া প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট প্রকল্প আর্থসামাজিকভাবে আমাদের কতটা সুবিধা দেবেÑতা নিশ্চিত করতে হবে। 

দুঃখজনক হলেও সত্য, অধিকাংশ বড় প্রকল্পেই স্থানিক পরিকল্পনাকে গুরুত্বের সঙ্গে ঠাঁই দেওয়া হয় না। এর ফলে আমরা বড় প্রকল্পের সুফল পাই না এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের পর তা নানা অভিযোগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অব্যবহৃত, পরিত্যক্ত হয়ে থাকা এসব প্রকল্প সম্ভাব্য নতুন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জায়গা যেমন নষ্ট করে, তেমনি তা সরিয়ে নতুন প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গিয়ে ব্যয় ও সময় বাড়ে। তাতে জনদুর্ভোগ অনেক বেড়ে যায়। আমাদের এই সমস্যা থেকে বের হতেই হবে। পরিকল্পনার সুষ্ঠু ব্যাকরণ অনুসরণ করতে না পারলে ক্ষতি আমাদেরই। এ বিষয়টি আমাদের মনে রাখতে হবে। 

নির্বাহী পরিচালক, আইপিডি ও অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা