যুক্তরাষ্ট্র
চার্লি হান্ট
প্রকাশ : ২৯ নভেম্বর ২০২৪ ১০:০২ এএম
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে রিপাবলিকানরা প্রচলিত ভাষায় পরিচিত ‘ট্রাইফেক্টার’ শাসনভার নেবে। প্রেসিডেন্টের সহায়তায় ওয়াশিংটনের কার্যনির্বাহী বিভাগের পাশাপাশি হাউস এবং সিনেটের ক্ষমতাও যোগ হচ্ছে। ‘ট্রাইফেক্টা’ সচরাচর একটি সামগ্রিক সরকার বলেই রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের কাছে পরিচিত। আর এ ধরনের ব্যবস্থা যেকোনো নির্বাহী সফলতার মার্কিন সফলতা বলেই পরিচিত। তাত্ত্বিকভাবে, কোনো রাজনৈতিক দল একই সঙ্গে হাউস অব কমন্স, সিনেট এবং প্রেসিডেন্সি পায় তখন তাদের মধ্যে মতবিরোধ কম হওয়ার কথা। রাজনীতিকরা একটি রাজনৈতিক দলের অংশ হন, কারণ তাদের বৃহৎ লক্ষ্যও থাকে। এজন্য তাদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন কিংবা অনুমতি পাওয়াই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এ ক্ষেত্রে যারা সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি তারা অল্প প্রভাবই রাখতে পারে। কিন্তু সব ট্রাইফেক্টা যে সমানুপাতে তাত্ত্বিকভাবে কাজ করে এমনটি ভাবার কোনো কারণ নেই। এমনকি সেগুলো একই প্রভাব রাখতে পারে না।
একাধিক রাজনৈতিক গবেষণা অনুসারে একটি সমন্বিত সরকারের মধ্যে মতবিরোধের কিছু স্থবিরতা থেকেই যায়। আর রিপাবলিকানরা ক্ষমতায় আসার পর বিষয়টি যে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে না, এমনটি নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। তিনটি অঙ্গের মধ্যে সমান ক্ষমতা ডোনাল্ড ট্রাম্পকে শাসনকাজ চালানোর পথ সহজ করে দেবেÑ এটিও সত্য। ট্রাম্পের মেয়াদের দ্বিতীয় ধাপে অর্থাৎ ২০২১-২০২২ সাল পর্যন্ত ডেমোক্র্যাটরাই হাউসের নিয়ন্ত্রণে ছিল। কিন্তু কংগ্রেশনাল মেম্বারদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেও তা সহজেই যে সব নীতি বাস্তবায়ন করা যাবে এমনটিও নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে ট্রাম্প ষষ্ঠ ব্যক্তি যিনি শপথ গ্রহণের প্রথম দিন থেকেই ট্রাইফেক্টার ক্ষমতা পাচ্ছেন। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, ট্রাইফেক্টার অধীনে যারাই ক্ষমতা পেয়েছেন তারা সবাই নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আইন পাস থেকে শুরু করে অনেক কিছু করতে পেরেছেন। আর সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে নীতিমালা পাস করার সুবিধা মানে বিতর্কিত আইন পাস করার ক্ষেত্রেও কোনো বড় প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়তে হবে না। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের প্রথম ধাপে ট্রাইফেক্টার সুবিধা পেয়েছিলেন। হাউসে রিপাবলিকান প্রার্থীরাই ছিলেন সংখ্যাগরিষ্ঠ। তখন আইনি অনেক বিধিমালা সহজেই পার করতে পেরেছিলেন তিনি। এ ক্ষেত্রে ট্রাম্পের সহকর্মীদের সমর্থনও সহজেই আদায় করা গেছে। ২০১৭ সালে ট্রাম্প বড় আকারে ট্যাক্স সংশোধনের বিল পাস করেন, যা তার আইনি সিদ্ধান্তের বড় সাফল্য বলেই বিবেচিত।
কিন্তু দ্বিতীয় মেয়াদে ট্রাম্পের পক্ষে অফিসে বসে এত সহজে সাফল্য পাওয়া কিছুটা কঠিন হবে। বিল ক্লিনটনের পর যে প্রেসিডেন্টরাই ট্রাইফেক্টা জয় নিয়ে অফিসে প্রবেশ করেছেন তাদের মধ্যে ট্রাম্পের সংখ্যাগরিষ্ঠতা সবচেয়ে কম। সিনেটে সামান্য সংখ্যাগরিষ্ঠতাও নানা সংকটের মুখে পড়তে পারে। কারণ নিজ ক্যাবিনেটে তিনি এমন কিছু প্রস্তাবনা রেখেছেন, যা ইতোমধ্যে রিপাবলিকানদেরও তোপের মুখে পড়েছে। তা ছাড়া ট্রাম্পের বিপক্ষে ডেমোক্র্যাটরা যে সক্রিয় থাকবে তা এড়ানোর কোনো সুযোগই নেই। ফলে রিপাবলিকান দলের মধ্যেই দ্বিধাবিভক্তি দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। সিনেট কিংবা হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভে সংখ্যাগরিষ্ঠতার সীমা খুব বেশি না হওয়ায় ডেমোক্র্যাট কিংবা সংখ্যালঘু পার্টির অনেকেই অনেক কৌশল অবলম্বন করতে পারবেন, যা ট্রাম্পকে বাজে পরিস্থিতির মুখে ফেলবে। বাজেট নয় এমন আইন পাস করার ক্ষেত্রে রিপাবলিকানদের মধ্যে জোর করে ৬০টি ভোট আদায় করার চেষ্টা করতে হবে। ট্রাম্পের আগে অনেক বড় ট্রাইফেক্টা ধারণকারী বারাক ওবামাও তার দলের মধ্যে উপদলীয় কোন্দল এড়াতে পারেননি।
২০০৯ সালের তুলনায় ২০২৪ সালে এ প্রতিবন্ধকতা যে আরও বড় তাতে কোনো সন্দেহ নেই। সিনেটে ১৭ ভোট বেশি পাওয়ার পরও বারাক ওবামা শুধু অ্যাফর্ড্যাবল কেয়ার অ্যাক্ট কিংবা ওবামাকেয়ার বাস্তবায়ন করতে পেরেছিলেন। কনজারভেটিভ ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে মাত্র অল্প অংশের ব্যবধানই তাকে এই আইন বাস্তবায়ন করতে সাহায্য করেছে। ওবামার ট্রাইফেক্টা বিশাল ছিল। তবে বহুধাবিভক্ত যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক মতাদর্শ নানাভাগে বিভক্ত এবং মতাদর্শিক জায়গা থেকেও অনেক ব্যতিক্রমী। রিপাবলিকানদের অন্তর্দলীয় কোন্দল যদি কংগ্রেসেও চলতে থাকে তাহলে ট্রাম্পের সামনে বিপদ আছে। তাকে নিজ দলের ভেতরেই বড় সমস্যার মুখোমুখি হতে হবে। দ্বিতীয় মেয়াদে তার সামনে যত সমস্যা রয়েছে তার মধ্যে কোনো অংশেই বিষয়টি কম নয়। বিগত দুই বছর, হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভের ক্ষমতায় থাকা রিপাবলিকানরা নেতৃত্ব সংকটে ভুগেছে। এ ক্ষেত্রে তারা প্রায়ই লক্ষ্যহীন নানা নীতিমালার দিকেই ঝুঁকে পড়েছিলেন। এমনকি পার্টির কট্টর ডানপন্থিদের অসহযোগিতামূলক আচরণ সমস্যা আরও বাড়িয়ে তোলে। স্পিকার মাইক টাইসন আত্মবিশ্বাসীÑ পরবর্তী কংগ্রেসে আইন পাস করা সহজ হবে। আইন প্রণয়নকারীরাও সুবিধা পাবে। কিন্তু আইনি এজেন্ডা বাস্তবায়নে এখনও যে ধরনের বিশৃঙ্খলা দেখা যাচ্ছে, তা এড়ানোর কোনো সুযোগ নেই।
অতীত যদি আমাদের সামনে একটি নজির হয়ে থাকে তাহলে বর্তমানে বাজেট পাস করার কাজটিই অনেক বড় চ্যালেঞ্জ ট্রাম্পের জন্য। অভিবাসী সংকট কিংবা নীতিনির্ধারণী জায়গায় বড় সংস্কার করার বিষয়টি এখনও দূরের বিষয়। কংগ্রেসকে বহুধাবিভক্ত ও বৈচিত্র্যময় সাংবিধানিক অঙ্গ হিসেবেই বিবেচনা করা হয়। এখানকার সদস্যরা একেক ধরনের উদ্দেশ্য নিয়ে কাজ করেন। রিপাবলিকানদের মধ্যে বিভক্তি ওয়াশিংটনে কর্মরত জাতীয় নেতাদের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলবে। এমনকি জেলা পর্যায়ের নেতারা চাইলে পার্টির নেতাদের সঙ্গে সম্পর্কচ্যুতিও ঘটাতে পারেন। এমনটিও অস্বাভাবিক নয়। উদাহরণ হিসেবে আবার রিপাবলিকানদের কথা বলতে হয়। রিপাবলিকান জেলাগুলোর প্রতিনিধিত্বকারীই এখন বেশি এবং তারা ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের পক্ষেই থাকবে। এ ক্ষেত্রে ট্রাম্প যত কট্টরই হোন না কেন তারা যাবে। অন্যদিকে জো বাইডেন যেসব ডিস্ট্রিক্টে ২০২০ সালে জয়ী হয়েছিলেন সেগুলো কিছুটা মডারেট অবস্থানে থাকতে পারে। তারা ২০২৬-এর পরেও নিজেদের আসন ধরে রাখার চেষ্টা করবেন। কংগ্রেসকে ব্যবহার করে ট্রাম্প জীবনকে অনেকটা জটিল করে ফেলেছেন। তিনি জানিয়েছেন, রিপাবলিকান হাউস মেম্বার থেকে তিনজনকে উচ্চ পর্যায়ের পদ দেওয়া হবে। এভাবেই তিনি জনসনের আসনের সুবিধা শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছিল। আর ট্রাম্পের প্রশাসনে যত লোক আসবে জনপ্রশাসনিক জট ততই বাড়বে। বিষয়টি যথেষ্ট ভাবনার।
দ্য কনভার্সেশন থেকে অনুবাদ : আমিরুল আবেদিন