সংস্কার
এলিনা খান
প্রকাশ : ২৫ নভেম্বর ২০২৪ ০৮:৩১ এএম
আপডেট : ২৫ নভেম্বর ২০২৪ ১৫:১৬ পিএম
এলিনা খান
বিচার বিভাগের সংস্কার নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। দেশে বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথক করার চূড়ান্ত রায় এসেছিল মাসদার হোসেন মামলায়। মাসদার হোসেনের সেই সংগ্রামের প্রায় ২৫ বছর পরও রায়ের ১২ দফা নির্দেশনার একটি ছাড়া বাকিগুলো বাস্তবায়ন হয়নি। বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথক করার রিট মামলায় সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ থেকে চূড়ান্ত রায় হয়েছিল ১৯৯৯ সালে। মামলার রায়ে বিচার বিভাগের একটি স্বতন্ত্র সচিবালয় গড়ে তোলার নির্দেশনা দেওয়া হয়। ১৯৯৪ সালে মামলাটি করেছিলেন জেলা জজ ও জুডিসিয়াল অ্যাসোসিয়েশনের তৎকালীন মহাসচিব মাসদার হোসেন। মামলার রায়ের আট বছর পর, অর্থাৎ ২০০৭ সালে মূল নির্দেশনাটি বাস্তবায়ন করে বিচার বিভাগকে আলাদা করা হয়। কিন্তু আনুষঙ্গিক বিষয়গুলোতে এবং অর্থনৈতিক স্বাধীনতার প্রশ্নে নির্দেশনাগুলো এখনও কার্যকর করা হয়নি, যা নিঃসন্দেহে দুঃখজনক।

স্বতন্ত্র সচিবালয় থেকেই বিচার কাঠামোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব ব্যক্তির নিয়োগ প্রদানের
কার্যক্রম হবে। সুনির্দিষ্ট আইনি প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিচারসংশ্লিষ্ট কাজে ব্যক্তির দক্ষতা,
অভিজ্ঞতা, মেধা ও আইনি জ্ঞানের পরিধি সূক্ষ্মভাবে যাচাই-বাছাই করার জন্যই এমন একটি
স্বতন্ত্র সচিবালয় জরুরি। কিন্তু এখনও এসব কাজ আইন মন্ত্রণালয় সম্পন্ন করে। এই মন্ত্রণালয়ের
অধীনে থাকায় বিচার বিভাগ এখনও নির্বাহী বিভাগের অধীনস্থ থাকছে এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা
এক্ষেত্রে সীমিত হয়ে পড়ে। বিচার বিভাগের কর্মীরা সব সময় তটস্থ থাকেন রাজনৈতিক প্রভাবের
কারণে। এমন নজির আছেÑ মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই তাদের স্থানান্তর করে দেওয়ার শঙ্কা থাকে
অনেকের মনে। ফলে অনেক গুরুত্বপূর্ণ মামলা পরিচালনার ক্ষেত্রে নির্বাহী বিভাগের এই প্রভাব
বিঘ্ন হয়ে দাঁড়ায়। তাই বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে আলাদা করতে পারলে বিচার বিভাগ
স্বাধীন এবং নির্বাহী বিভাগের অযাচিত হস্তক্ষেপ থেকে মুক্ত হতে পারবে।
বিচার বিভাগের সংস্কারের ক্ষেত্রে জিপি, পিপি, এপিপি, অ্যাটর্নি জেনারেল, ডেপুটি
অ্যাটর্নি থেকে শুরু করে সব গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগের কাজটি বিচার বিভাগের বিবেচনাতেই
হওয়া জরুরি। এই পন্থায় রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হবে বিচার বিভাগ। আমাদের তিক্ত অভিজ্ঞতা
বলে, যখনই রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঘটে এবং নতুন রাজনৈতিক শক্তি ক্ষমতা অধিগ্রহণ করে, তখন
তাদের অনুগত ব্যক্তিরাই এসব দায়িত্ব পান। এজন্যই বিচারের মান নিম্নমানের হয় এবং বিচার
বিভাগে রাজনৈতিক বলয়ের কারণে অনেক ক্ষেত্রেই ন্যায়বিচার পাওয়া দুরূহ হয়ে ওঠে। বিচারপ্রত্যাশীরা
তখন নিরপেক্ষভাবে আইনজীবী বা বিচারপতির কাছে যেতে পারেন না। তাদের মধ্যে ভাবনা থাকে
কোন আইনজীবীর কাছে গেলে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে হলেও সমাধান দ্রুত পাবেন। এভাবে বিচার
কার্যক্রম শিথিল হয়ে পড়ে যা মোটেও কাম্য নয়। এক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতি অবশ্যই সংশ্লিষ্ট
বিভাগের যাচাই-বাছাই ও সুপারিশের ভিত্তিতে কাউকে নিয়োগ দিয়ে থাকেন। এভাবে খুবই দক্ষ
কোনো ব্যক্তিকে পাবলিক প্রসিকিউটর হিসেবে নিয়োগ দেওয়া গেলে উপকৃত হবে নিম্ন আদালত।
তবে নিম্ন আদালতে পাবলিক প্রসিকিউটর দক্ষভাবে কাউকে নিয়োগ দেওয়া না গেলে তিনি সেখানকার
পরিস্থিতি সামলাতে পারবেনÑ এমনটি বলা যায় না। অন্তত আইনজীবী হিসেবে এই তিক্ত অভিজ্ঞতা
বহুদিনের। অনেক সময় নিম্ন আদালতে দীর্ঘদিন মামলা পরিচালনার পর তা উচ্চ আদালত কিংবা
সুপ্রিম কোর্টের দৃষ্টিগোচর হয়ে পড়ে। কিন্তু তত দিনে ভুক্তভোগীদের অনেকেই সর্বস্বান্ত
হয়ে পড়ে। দেশের অধিকাংশ মানুষই বিপাকে পড়ে আদালতের শরণাপন্ন হয়। তারা এই যন্ত্রণা থেকেই
মুক্তি পেতে চায়। ফলে বিচার পাওয়া যে তাদের অধিকারÑ এমন বোধ তাদের মধ্যে কম কাজ করে।
এসব মানবিক পরিস্থিতি বিচার করলে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা চাওয়ার যৌক্তিকতা অনুধাবন
করা কঠিন নয়।
আইনি পেশার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এবং ভুক্তভোগী অনেকেই জানেন, বিচার বিভাগে পেশকার এবং
প্রসেস সার্ভারের দায়িত্ব পালন করা ব্যক্তিরাই সবচেয়ে বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে থাকে।
বিশেষত প্রসেস সার্ভারের আইনি অনুমোদন না থাকলেও তারা ভুক্তভোগীদের আইন বিষয়ে জ্ঞানের
ঘাটতির সুযোগ নিয়ে অনেক টাকা হাতিয়ে নেয়। যেসব প্রসেস সার্ভারের সরকারি অনুমোদন নেই
তারা পেশকারের সঙ্গে আঁতাত করে বিচার বিভাগে কাজ করে। এক্ষেত্রে অভিযোগ রয়েছে, অনেক
প্রসেস সার্ভারার বাদী ও আসামি দুই পক্ষের সঙ্গেই যোগাযোগ করে এবং দুই পক্ষকেই আশ্বস্ত
করে সম্মানি নেয়। এমনভাবে প্রসেস সার্ভারদের আর বেতন নিয়ে দুর্ভাবনায় পড়তে হয় না। বরং
সামান্য বেতনটি কাঠামোগতভাবে তাদের কাজ করার বৈধতা দিচ্ছে। কিন্তু এই অনৈতিক পন্থায়
অনেকেই প্রতিদিন অন্তত ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা আয় করে। দেশে নিম্ন আদালতে যে পরিমাণ
মামলা হয় তার বিচারে এই অঙ্ক অস্বাভাবিক নয়। এমন অভিযোগও রয়েছেÑ অনেক সময় কোনো অভিযুক্তের
কাগজ আটকে রেখে টাকা দাবি করা হয়। এই দুর্নীতির আখড়াকে তৃণমূল পর্যায় থেকেই যদি উৎখাত
না করা যায়, তাহলে বিচারব্যবস্থা কোনোভাবেই ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার কেন্দ্র হতে পারবে
না। বিচার বিভাগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা এমনকি প্রসেস সার্ভারদেরও সম্পদের হিসাবের
খতিয়ানের তদন্ত করা জরুরি। পাশাপাশি এ বিষয়ে তাদের সব তথ্যই সংগ্রহ করা জরুরি। তারপর
যাদের বিরুদ্ধে অনিয়ম কিংবা অস্বাভাবিকতা লক্ষ করা যাবে, তাদের জবাবদিহির আওতায় নিয়ে
আসতে হবে। বিচার বিভাগে কর্মরত কেউ যেন নিজেকে হর্তাকর্তা ভাবতে না পারে, বরং মানবিকভাবে
বিচারপ্রক্রিয়ার গতিশীলতা নিশ্চিত করে এবং জবাবদিহিমূলক অবস্থানও গড়ে তোলা আবশ্যক।
রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কিশোর গ্যাংয়ের উৎপাত একটি বড় সমস্যা। লক্ষ্যণীয়,
কিশোরদের জন্য আদালত থাকলেও সে আদালতের অবকাঠামোগত সুবিধা নেই। অথচ এ ধরনের বিশেষায়িত
আদালত কিশোরদের পুনর্বাসনেরও দায়িত্ব পালন করে থাকে। আমরা দেখি সিনিয়র আদালতই অধিকাংশ
ক্ষেত্রে কিশোর আদালতে রূপান্তরিত হয়। এ ব্যবস্থার প্রধান সমস্যা হলো, কিশোরদের যখন
আইনের আওতায় নিয়ে আসা হয়, তখন তাদের দাগি আসামিদের সঙ্গেই ঠাঁই পেতে হয়। ফলে যখন তারা
পুনর্বাসনের জন্য সাজা পায়, তখনও এই আসামিদের প্রভাবে প্রভাবিত হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়।
তাতে পুনর্বাসনের বদলে ভবিষ্যতে আরও খারাপ কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার অভিপ্সা তাদের বেড়ে
যেতে পারে বলে একাধিক গবেষণা জরিপে পাওয়া গেছে। এজন্য বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত
করার সঙ্গে সঙ্গে কোর্ট অবকাঠামোর প্রসার ঘটাতে হবে। এই স্তম্ভে অতীতেও বলেছি, পারিবারিক
ও শিশু নির্যাতন আইনের আদালতের এজলাসের বড় সংস্কার জরুরি। রাজধানীর আদালতগুলোর ভয়াবহ
চিত্র দেখলে যে কেউই আতঙ্কিত হতে বাধ্য। এখানে বাদী, বিবাদী থেকে শুরু করে সংশ্লিষ্ট
অনেকেই একধরনের নির্যাতনের শিকার হয় উপযুক্ত অবকাঠামোর অভাব থাকায়। অবকাঠামোগত দুর্বলতার
কারণে বাদী ও বিবাদী উভয় পক্ষের জন্য একটি দুর্ভোগ। আর সাক্ষীরাও যেহেতু স্বস্তির পরিবেশ
পায় না তাই তারা সদিচ্ছা রাখলেও সচরাচর আদালতে আসতে রাজি হয় না। এমনটি মোটেও ইতিবাচক
নয়।
সংগত কারণেই বিচার বিভাগের জন্য আলাদা সচিবালয় গড়ে তুলতে হবে। এই সচিবালয় বিচার
বিভাগ নিয়েই কাজ করবে এবং বিচার বিভাগের অবকাঠামো, প্রসার ও দুর্ভোগজনিত সমস্যাগুলো
নিয়ে কাজ করবে। নির্বাহী বিভাগের প্রভাব থেকে বেরোতে পারলে এবং স্বতন্ত্রভাবে জবাবদিহির
আওতায় বিচার বিভাগের উন্নতি বাস্তবিকভাবেই সম্ভব। বিচারক যেমন বাড়াতে হবে তেমনি আদালতে
অবকাঠামো থেকে শুরু করে অন্যান্য সুযোগ-সুবিধাও বাড়াতে হবে। এজলাসকে উপযুক্তভাবে সাজাতে
হবে। বিচার বিভাগে অভিযুক্ত ও দুর্নীতিগ্রস্ত অংশটিকে শনাক্ত করে উপযুক্ত প্রতিবিধান
নিশ্চিত করাও জরুরি। যদি এমনটি নিশ্চিত করা যায়, তাহলে একটি সুন্দর বিচারব্যবস্থা পাওয়া
কঠিন কিছু নয়।
দেশের বিচার বিভাগের কাঠামো অনেক দিন ধরেই নাজুক। অতীতে জাতীয় সংসদেও বিষয়টি উত্থাপিত
হয়েছিল। এমনকি বিচারপতিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ও তাদের অপসারণের বিষয়টিও সম্প্রতি আলোচনায়
এসেছে। আলোচনায় এসেছে বিচারপ্রার্থীদের বিচার না পাওয়ার বিষয়টিও। পটপরিবর্তনের পর জুডিসিয়াল
কাউন্সিল আবার কার্যক্রম শুরু করেছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, বিচার বিভাগ যেখানে স্বতন্ত্র
সেখানে সংসদ কেন হস্তক্ষেপ বা সিদ্ধান্ত দেবে? রাজনৈতিক বিবেচনায় বিচারপতি নিয়োগ হলেও
তিনি সুশাসন প্রতিষ্ঠা করলে অভিযোগ থাকত না। কিন্তু রাজনৈতিক দল একচ্ছত্রভাবে বিচার
বিভাগকে আটকে রাখার জন্য নিয়োগ দিলে তা মেনে নেওয়ার নয়। সম্প্রতি বিচার বিভাগে শৃঙ্খলাভঙ্গের
নজির সংবাদমাধ্যমেই উঠে এসেছে। আসামিদের মারপিটের অভিযোগ এসেছে। অপরাধ প্রমাণ হওয়ার
আগ পর্যন্ত কেউ অভিযুক্ত থাকে এবং তারও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। এমনকি তার অপরাধের
উপযুক্ত বিচার করার দায়িত্বও বিচার বিভাগের। এক্ষেত্রে অন্য কেউ এসে আইন হাতে তুলে
নিলে তাকে অপরাধী বলেই শনাক্ত করতে হবে।
আমাদের সংবিধানেই লেখা রয়েছে, সব নাগরিক সমানভাবে আইনের আশ্রয় পাবে। ফলে আদালত প্রাঙ্গণে কেউ লাঞ্ছিত হওয়া মানে তা সংবিধানের সুষ্পষ্ট লঙ্ঘনও। আদালতের বারান্দায় মিছিল-মিটিং কিংবা আসামিদের সুযোগ পেয়ে মারধর করা সমর্থনযোগ্য নয়। এক্ষেত্রেও আমাদের আইনি অবকাঠামোর দিকটি প্রকাশ পায়। আসামিদের নিরাপত্তা দেওয়ার মতো আলাদা জায়গা নেই। এমন বিশৃঙ্খল পরিবেশে এমন ঘটনা আইনি পরিবেশের জন্যও লজ্জাজনক। ফলে আমাদের বিচার বিভাগের সংস্কারের জন্য নির্বাহী বিভাগের প্রভাব থেকে বের করে আনার বিষয়টিকে জোর দিতেই হবে।