জলবায়ু পরিবর্তন
মো. অহিদুর রহমান
প্রকাশ : ২৫ নভেম্বর ২০২৪ ০৮:২৯ এএম
মো. অহিদুর রহমান
ভোগবিলাস থামান সভ্যতা বাঁচান। পৃথিবীর কার্বন দূষণকারী দেশ তোমরা থামো, আর দূষণ করে পৃথিবী বসবাসের অযোগ্য করে তুলো না। আমাদের পৃথিবী একটাইÑ এ পৃথিবী ছেড়ে আমরা অন্য কোথাও যেতে পারব না। ধনী দেশগুলোর অধিকহারে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহারে পরিবর্তন হচ্ছে জলবায়ু। তারা অধিকহারে কার্বন নিঃসরণ করছে। এতে উত্তপ্ত হচ্ছে পৃথিবী। ধনী দেশ জলবায়ু চুক্তি মানছে না। বরং জালবায়ু পরিবর্তনের বিষয়ে নীরব ভূমিকা পালন করছে। তেলসমৃদ্ধ একটি রাষ্ট্র আজারবাইজান। জীবাশ্ম জ্বালানির জন্য বিখ্যাত। তার পরও কপ-২৯ জলবায়ু সম্মেলনের আয়োজক তারা। রাশিয়ার ভূরাজনীতি ও লবিংয়ের ফলে দেশটি এ সম্মেলন আয়োজনের দায়িত্ব পেয়েছে। এ দেশের অর্থনীতি পুরোপুরি নির্ভর করে জীবাশ্ম জ্বলানি উত্তোলনের ওপর। বিশ্ব পরিবেশ কর্মী গ্রেটাথুনবার্গ বলেছেন, কপ-২৯ হলো ‘গ্রিনওয়াশ সম্মেলন’। অন্যদিকে জীবাশ্ম জ্বালানির কর্ণধারেরা বলছেন, যারা জীবাশ্ম জ্বালানির বিরোধিতা করে তারা ভণ্ড। গত বছরও জীবাশ্ম জ্বালানির শহর দুবাইয়ে কপ-২৮ অনুষ্ঠিত হয়েছিল।

শিল্পোন্নত ও ধনী দেশগুলোর ভোগবিলাস, লোভ ও লাভের
কারণে অধিক কার্বন নিঃসরণ হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ওজোন স্তর। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে
বাংলাদেশে নেতিবাচক প্রভাবে বাড়ছে দুর্যোগ। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কৃষি, পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য,
বায়ু, পানি, মাটি। প্রভাব ফেলছে মানুষের জীবনযাত্রায়। জলবায়ু উদ্বাস্তু হচ্ছে হাওর,
পাহাড়, উপকূলসহ সমতলের মানুষ। আমরা নদী, জলাভূমি, গাছ, মাছ, জীববৈচিত্র্যসহ প্রকৃতির
সব উপাদান হারিয়ে ফেলছি। প্রকৃতিকে নিজের মতো থাকতে দিচ্ছি না। ফলে নানা দুর্যোগের
সম্মুখীন হচ্ছি। পৃথিবীর ধনী দেশের মানুষ তাদের নানা কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে আমাদের মতো
দেশের ক্ষতি করছে। পরিবেশ ভালো রাখতে হলে কার্বন দূষণ কমাতে হবে। জীবাশ্ম জ্বালানির
ব্যবহার কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার করতে হবে। আমরা চাই প্রতিটি মানুষ একটি
সুন্দর পরিবেশে নিরাপদে বেঁচে থাকুক। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য পৃথিবী
রেখে যেতে আমাদের কাজ করতে হবে।
ধনী দেশের মানুষের ভোগবিলাস ও লোভলালসার কারণে
পরিবর্তিত হচ্ছে জলবায়ুর। গরিব দেশের মানুষ জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী না হলেও দুর্যোগের
মোকাবিলা করে টিকে থাকতে হচ্ছে প্রতিনিয়ত। দেশের অনেক প্রান্তিক মানুষ জলবায়ু পরিবর্তনের
ফলে নিজ বাড়ি থেকে বিতাড়িত হচ্ছে। বসবাসের অনুপযুক্ত হয়ে পড়ছে। বিশ্বব্যাংকের ধারণা
অনুযায়ী আগামী ২৫ বছরের মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বে ২০ কোটি মানুষ নিজ বাড়ি
ছেড়ে অন্য স্থান যেতে বাধ্য হবে। বাংলাদেশে দিনদিন বেড়ে চলেছে জলবায়ু উদ্বাস্তুর সংখ্যা।
মানুষ লাখো কোটি বছর সাধনার পর একটি সভ্য সমাজ গড়ে তুলেছে। নিশ্চিত করেছে নিজের শান্তির
নীড়। আমার বাড়ি, আমার ঘর। কিন্তু মানুষের অবিবেচনামূলক কাজের ফলে, লোভ ও লাভের কারণে
বিপুলসংখ্যক জনগোষ্ঠী নির্যাতন, সংঘাত, যুদ্ধ, সহিংসতা, পরিবেশগত বিপর্যয়, রাজনৈতিক
সংঘাত, জলবায়ুগত কারণে স্থানীয়ভাবে, জাতীয়ভাবে উদ্বাস্তু হয়ে নিজের আবাস হারিয়ে শরণার্থী
হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। দিনদিন শরণার্থীর সংখ্যা বাড়ছে, বাড়ছে জলবায়ু শরণার্থী। জাতিসংঘের
তথ্যানুযায়ী বর্তমানে বিশ্বে বাস্তুচ্যুতের সংখ্যা প্রায় ১২ কোটি। ইউএনএইচসিআরের বৈশ্বিক
বাস্তুচ্যুতিবিষয়ক বার্ষিক প্রতিবেদনে রাশিয়ার আক্রমণের পর প্রায় ১ কোটি ১৪ লাখ ইউক্রেনীয়
বাস্তুচ্যুত হয়েছে বলে তথ্য প্রকাশিত হয়েছে।
সিডর, বিজলি, আইলা, বুলবুল, রেশমি, ১৯৭০, ১৯৮৫,
১৯৯১ সালের ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়, রেমাল, আমফান, মহাসেন, কোমেন, ভিয়ারু, রোয়ানু, ডিয়ামুসহ
অনেক সাইক্লোন ও ঘূর্ণিঝড় এ দেশের মানুষ মোকাবিলা করেছে। এসব দুর্যোগের ক্ষত এখনও
রয়ে গেছে। গবেষণা থেকে জানা যায়, সিন্ধু উপত্যকার নিকটবর্তী অঞ্চল ভূমিকম্পের উৎসস্থল
ছিল। ভূমিকম্পের ফলে এ সভ্যতার বিনাশ ঘটে।
ইতিহাসবিদদের মতে, হরপ্পা সভ্যতা ধ্বংস হওয়ার
কারণ প্রাকৃতিক দুর্যোগ। ভূপ্রকৃতির পরিবর্তনের ফলে ক্রমে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কমে
যায়। ফলে সিন্ধু অঞ্চলে মরুভূমির সূচনা ঘটে। ভূস্তরের নিচের জল ক্রমে নিঃশেষ হয়ে পড়লে
কৃষি উৎপাদন অত্যন্ত কমে যায় এবং খাদ্যাভাব দেখা দেয়। আবার অনেকের মতে, বন্যা ও প্লাবন
সিন্ধু সভ্যতার বিনাশ ঘটিয়েছিল। মায়া সভ্যতা ধ্বংসের প্রধান কারণ পানির সংকট। যুক্তরাষ্ট্রে
যে পরিমাণে পরিবেশদূষণ ও উষ্ণায়ন হয়, তার ৪০ শতাংশের জন্য দায়ী সেই দেশের মাত্র ১০
শতাংশ শীর্ষস্থানীয় ধনী। শুধু তাদের বিশাল আবাসনব্যবস্থা ও ব্যক্তিগত জেট বিমানের কারণেই
দূষিত হয় না, তারা যেসব কোম্পানিতে অর্থ বিনিয়োগ করছেন, সেগুলো থেকে নির্গত জীবাশ্ম
জ্বালানিজনিত দূষণও বেশ দায়ী। এ কারণেই মূলত বেশি পরিবেশ দূষিত হচ্ছে।
গবেষকরা কার্বন দূষণের সঙ্গে জড়িত আর্থিক লেনদেনকে
সংযুক্ত করতে প্রায় ৩০ বছরের আর্থিক তথ্য বিশ্লেষণ করেছেন। তারা যেসব কোম্পানি সরাসরি
পরিবেশ দূষণে ভূমিকা রাখছে, সেগুলোর পাশাপাশি যাদের উৎপাদিত পণ্যের মাধ্যমে পরিবেশ
দূষিত হচ্ছে, তাদেরও এ গবেষণার আওতায় রাখা হয়েছে। এতে বলা হয়, বিভিন্ন তেল উৎপাদনকারী
কোম্পানির জ্বালানি তেল যখন গ্রাহক ব্যবহার করেন, তাতেও ব্যাপকভাবে পরিবেশ দূষণ ঘটে।
প্রতিবেদনমতে, গবেষকরা যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিটি ডলারের অর্থনৈতিক কার্যকলাপে কী হারে
কার্বন দূষণ ঘটে, তা-ও পর্যালোচনা করেছেন। এ ক্ষেত্রে তারা একজন ব্যক্তি কোন ধরনের
শিল্পের সঙ্গ জড়িত, কোথায় কী পরিমাণে বিনিয়োগ করেছেন এবং তার আয়ই বা কত—
এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখেছেন। গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশটির ৪০ শতাংশ দূষণ, যা
বৈশ্বিক উষ্ণায়নে ভূমিকা রাখে এর জন্য দায়ী দেশটির মাত্র ১০ শতাংশ অতিধনী ব্যক্তি।
গবেষণা অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের ১ শতাংশ শীর্ষস্থানীয় ধনী তাদের অর্থ, খনিজ, জ্বালানি, শিল্পকারখানা এসব খাতে বিনিয়োগ করেছেন। তারা বছরে প্রায় ৩ হাজার টন দূষিত কার্বন উৎপাদন করেন। এ প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় তাদের বার্ষিক কার্বন দূষণের পরিমাণ ২ দশমিক ৩ টনের মধ্যে সীমাবদ্ধ করতে হবে। কার্বন নির্গমনের লাগাম টেনে ধরতে না পারলে আগামীর পৃথিবী মানুষের বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়বে। পৃথিবীর অনেক প্রাণ বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। পরিবেশদূষণের কারণে আমাদের রোগবালাই আরও বেড়ে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতির জন্য যারা দায়ী তারা এর প্রতিবিধানের শুধু প্রতিশ্রুতিই দিচ্ছে, কাজের কাজ কিছু করছে না। মানুষ এমন বিপন্নতার কবলে থাকতে পারে না।