সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ২৪ নভেম্বর ২০২৪ ০৯:১৭ এএম
যেকোনো রাষ্ট্রে অর্থনীতির গতি সঞ্চারে একই সঙ্গে কর্মসংস্থানের পরিসর বাড়াতে দরকার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিকাশ। আর্থিক খাতের পরিবেশ যদি প্রশ্নমুক্ত হয়, তাহলে ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগের পথও মসৃণ থাকে। কিন্তু ২৩ নভেম্বর প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর শীর্ষ প্রতিবেদনে যে চিত্র উঠে এসেছেÑ তা স্বস্তির নয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে- বিনিয়োগে অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে, একই সঙ্গে এর ফলে সংগতই বাড়ছে বেকারত্বও। ইতঃপূর্বে এই সম্পাদকীয় স্তম্ভেই আমরা বলেছিলাম, দেশে ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগের পথ যত সুগম করা যাবে, ততই বিকাশ ঘটবে অর্থনীতির এবং কর্মসংস্থানের সহায়ক পরিবেশও সৃষ্টি হবে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, এমনটি তো হয়ইনি উপরন্তু নানা রকম অস্বস্তিতে ভুগছেন ব্যবসায়ীরা। এর ফলে নতুন বিনিয়োগে দেখা দিয়েছে স্থবিরতা। একধরনের অনিশ্চয়তার ছায়া পড়েছে ব্যবসা খাতে। একই সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য সহায়ক তেমন কোনো উদ্যোগও সরকারের তরফে দেখা যাচ্ছে না।
স্বস্তিতে নেই ব্যবসায়ীরাÑএমন বার্তা সার্বিক প্রেক্ষাপটে নিশ্চয়ই
সুখকর কিছু নয়। ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদহার, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির
অবনতি এবং বিদ্যমান অস্থিতিশীলতা উৎপাদন খাতের গতিশীলতার অন্যতম প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রাজনৈতিক অস্থিরতা, শিল্প কারখানায় হামলা, ব্যাংক হিসাব জব্দ,
বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা ইত্যাদি। অথচ ব্যবসায়ীদের নির্বিঘ্নে ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য
এসবই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। আস্থাহীনতা-অনিশ্চয়তার কারণে চলতি বছরের জুলাই
থেকে সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে দেশীয় বিনিয়োগ প্রস্তাব তিনগুণ আর বিদেশি বিনিয়োগ প্রস্তাব
কমেছে ৮ দশমিক ৮০ শতাংশ। একই সঙ্গে বেসরকারি খাতের ঋণের প্রবৃদ্ধি গত তিন বছরের মধ্যে
চলে গেছে সর্বনিম্ন পর্যায়ে। এর বিরূপ প্রভাব পড়েছে কর্মসংস্থানে এবং বেকারত্বের হার
আরও ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক, বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) ও পরিসংখ্যান
ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ হালনাগাদ তথ্য বিশ্লেষণে এই চিত্র উঠে এসেছে।
প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর কাছে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে গিয়ে অনেক ব্যবসায়ীই
তাদের শঙ্কা ও আস্থাহীনতার বিষয়গুলো তুলে ধরেছেন। আমরা জানি, আমাদের বৈদেশিক মুদ্রা
অর্জনের অন্যতম খাত তৈরি পোশাক শিল্পে গত কয়েক মাস ধরে অস্থিরতা বিরাজ করছে এবং এর
নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে খাতটিতে। নিকট অতীতে প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর প্রতিবেদনে তৈরি
পোশাক খাতের ব্যবসায়ীদের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, দেশের বিদ্যমান পরিস্থিতির কারণে অনেক
ক্রয়াদেশ ইতোমধ্যে অন্য দেশে চলে গেছে এবং ডিসেম্বরের মধ্যে আরও চলে যেতে পারে। এমন
বার্তা আমাদের জন্য স্বস্তির নয়। আমরা জানি, যেকোনো পরিবর্তন ঘটার প্রেক্ষাপটে পরিস্থিতি
স্বাভাবিক হতে সময় নেয়। পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার ইতোমধ্যে তাদের
শাসনকার্য পরিচালনায় একশ দিন অতিক্রম করেছে। তাদের একশ দিনের কার্যক্রমের চুলচেরা বিশ্লেষণ
করা হয়েছে সংবাদমাধ্যমে। বিশেষ প্রেক্ষাপটে গঠিত এই সরকারের দায়িত্ব জনদাবির পরিপ্রেক্ষিতে
কিছু সংস্কারমূলক কার্যক্রম দ্রুত সম্পন্ন করে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পথ উন্মুক্ত
করা। একই সঙ্গে স্থিতিশীল সমাজব্যবস্থা নিশ্চিতকরণের পাশাপাশি সার্বিক স্বস্তির আবহ
সৃষ্টি করা। সরকার সেদিকে মনোযোগী নয়, এ কথা বলার অবকাশ নেই বটে, কিন্তু সার্বিক পরিস্থিতি
উন্নতিকরণ কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় ঘটছে না অনেকেরই এই অভিযোগ রয়েছে। সরকারের পক্ষে তা বিশ্লেষণ
করা দরকার।
কোনো কোনো ব্যবসায়ী মহলের তরফে প্রতিদিনের বাংলাদেশকে এও বলা হয়েছে,
রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণেই উদ্যোক্তারা বিনিয়োগের সাহস পাচ্ছেন না। একই সঙ্গে গ্যাস,
বিদ্যুৎ ও ডলার সংকট দূর করা, এলসি জটিলতা কমানো এবং কথায় কথায় শ্রমিক অসন্তোষের নামে
শিল্পে অস্থিরতার বিষয়টিও তারা তুলে ধরেন। আমরা মনে করি, দেশে ব্যবসা-বাণিজ্য-বিনিয়োগ
ও কর্মসংস্থান বাড়াতে ব্যবসায়ীদের মধ্যে আস্থার পরিবেশ ফিরিয়ে আনা অত্যন্ত জরুরি। ব্যবসায়ীরা
যদি প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হন এবং তারা যদি সরকারের সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল পক্ষগুলোর
যথাযথ সহযোগিতা না পান, তাহলে এর বিরূপ প্রভাব দৃশ্যমান হতে বাধ্য। ব্যবসায়ী কিংবা
বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগের নিরাপত্তা চাইবেনÑ সেটাই স্বাভাবিক। দেশের উন্নয়নে ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তা-বিনিয়োগকারীদের
ভূমিকা অস্বীকার করার অবকাশ নেই। সংগত কারণেই প্রশ্ন দাঁড়ায়, যাদের ইতিবাচক ভূমিকা
এতটা ব্যাপ্ত তাদের বিষয়ে মনোযোগ গভীর না করার কোনো অবকাশ আছে কি? বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ
নিশ্চিত করার পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্যের পথে বিদ্যমান সব প্রতিবন্ধকতা দূর করতে হবে
জাতীয় স্বার্থেই।
প্রয়োজনের নিরিখে দেশের অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলা, শিল্প অবকাঠামো
যথাযথ করা, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ অবকাঠামো নির্মাণ, সড়ক অবকাঠামো উন্নয়ন, অভ্যন্তরীণ
জলপথ বন্দর সুবিধা বৃদ্ধি ইত্যাদি ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগের পথ সুগম করার অন্যতম
অনুষঙ্গ। বিনিয়োগ ও ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য যথাযথ অনুকূল পরিবেশ কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় এখনও
নিশ্চিত হয়নি কিংবা এই পথে আমরা খুব একটা বেশি এগোতে পারিনিÑ তা অস্পষ্ট নয়। আমলাতান্ত্রিক
জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রতা ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে অন্যতম প্রতিবন্ধকতাÑ এও
আমরা ইতোপূর্বে এই সম্পাদকীয় স্তম্ভেই বলেছি। আমাদের সীমাবদ্ধতা আছে বটে, কিন্তু প্রয়োজনীয়
ক্ষেত্রগুলোতে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের অনেকেই কতটা নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন
কিংবা করছেনÑপ্রশ্ন আছে এ নিয়েও। রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারক, সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল পক্ষ
ও ব্যবসায়ী কিংবা উদ্যোক্তাদের মধ্যে যদি আস্থার সম্পর্ক গড়ে না ওঠে, তাহলে কাঙ্ক্ষিত
ফল পাওয়া কঠিন। আমরা মনে করি, দেশ-জাতির বৃহৎ স্বার্থে ব্যবসায়ী কিংবা উদ্যোক্তাদের
যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
আমাদের জনসংখ্যার হার ক্রমবর্ধমান এবং ঊর্ধ্বমুখী জনসংখ্যার এই দেশটিতে
প্রতিবছর যে লাখ লাখ শ্রমশক্তি প্রবেশ করছে, তাদের কর্মসংস্থানের জন্য অধিক হারে দেশি-বিদেশি
বিনিয়োগ এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিবেশ সুষ্ঠু করার কোনো বিকল্প নেই। ব্যক্তি খাতে পর্যাপ্ত
পরিমাণ বিনিয়োগ ব্যতীত কোনো অর্থনৈতিক উন্নয়নই টেকসই হতে পারে না। বিশ্বের যেসব দেশ
অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধি অর্জন করেছে, তাদের সবাই ব্যক্তি মালিকানাধীন উৎপাদনশীল খাতে
সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে। ব্যক্তি মালিকানাধীন আরও কোম্পানি যাতে গড়ে ওঠে এবং নিরাপদ
পরিবেশে যাতে তারা ব্যবসা-বাণিজ্য করতে পারেÑ সেদিকে বিশেষ করে মনোযোগ দেওয়া উচিত।
শুধু বড় উদ্যোক্তাই নয়, মাঝারি ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের প্রতিও সমগুরুত্বেই দৃষ্টি দিতে
হবে। একটি দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি কেমন, অবকাঠামোগত অবস্থা কেমন, এনার্জি সেক্টরের
পরিস্থিতি কেমন এবং সামাজিক স্থিতিশীলতা কতটুকু রয়েছেÑ এসব বিষয়ে বিনিয়োগকারী কিংবা
উদ্যোক্তারা সংগত কারণেই তাদের নজর গভীর রাখেন। তাদের মধ্যে যাতে বিনিয়োগের ও সহজে
ব্যবসা-বাণিজ্য করার ব্যবস্থা নিশ্চিত হয়, এর মুখ্য দায়িত্ব সরকারের। ব্যবসায়ী কিংবা
বিনিয়োগকারীদের মধ্যে শঙ্কার সৃষ্টি হয় এবং তাদের আস্থায় চিড় ধরেÑ এমন কোনো কিছুই
যেকোনো রাষ্ট্র কিংবা সমাজের জন্য কল্যাণকর বার্তা বয়ে আনতে পারে না। আমরা চাই, বিনিয়োগ
ও ব্যবসা-বাণিজ্যের যথাযথ পরিবেশ আশু নিশ্চিত হোক।