× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

নতুন নির্বাচন কমিশন

প্রত্যাশা ও চ্যালেঞ্জও দুই-ই সমান্তরাল

মুনিরা খান

প্রকাশ : ২৪ নভেম্বর ২০২৪ ০৯:১৫ এএম

মুনিরা খান

মুনিরা খান

প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন অবসরপ্রাপ্ত সচিব এএমএম নাসির উদ্দীন। একই সঙ্গে আরও চার কমিশনারকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। আজ তারা প্রধান বিচারপতির কাছে শপথ নেবেন। অতীতের প্রায় প্রতিটি নির্বাচনই প্রশ্নবিদ্ধ ছিল। এজন্য এবার প্রশ্ন ও বিতর্কের ঊর্ধ্বে নির্বাচন আয়োজনের জন্য ভোটাধিকার সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মতামতের ভিত্তিতে নির্বাচন আয়োজনের কাজটি ন্যায়পরায়ণতার সঙ্গে করতে হবে। দেশবাসী, এমনকি রাজনৈতিক পক্ষও এবার সুষ্ঠু, অবাধ, নিরপেক্ষ এবং অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের প্রত্যাশা করছে। ড. বদিউল আলম মজুমদারের নেতৃত্বে নির্বাচন কমিশন সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়েছে এবং তারা দ্রুতই এ বিষয়ে তাদের সুপারিশমালাও উপস্থাপন করবেন। তবে আইনগতভাবে নির্বাচন কমিশন সেখান থেকে তা কতটা গ্রহন করতে আইনগতভাবে বাধ্য, এ বিষয়ে এখনও আমাদের স্পষ্ট ধারণা নেই। আমরা এক্ষেত্রে স্বচ্ছতার ভিত্তিতে বিষয়টুকু স্পষ্ট হতে চাই। নির্বাচন সংস্কার কমিশন গঠনের তিন মাসের মধ্যেই আইন মোতাবেক সার্চ কমিটি এবং নির্বাচন কমিশন গঠনের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। স্বচ্ছ, সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে একটি দেশের গণতান্ত্রিক ও মানবাধিকারের প্রতি সত্যিকারের অভিব্যক্তি প্রকাশিত হয় বিধায় এই এই চ্যালেঞ্জটিকে সামনে রেখেই এ কমিশনকে কাজ করতে হবে। তাই ভোটারদের ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠার অধিকারের জন্য বর্তমান নির্বাচন কমিশনের সদস্যদের অঙ্গীকার বাস্তবায়নে গুরুত্ব দিয়ে কাজ করতে হবে।

আমরা জানি, কোনো রাষ্ট্রে নির্বাচনী ব্যবস্থা সুষ্ঠু, স্বচ্ছ ও অংশগ্রহণমূলক না হওয়ার পেছনে নির্বাচনী বিধিমালার সঙ্গে আইনের সমন্বয়হীনতা এবং সব অংশীজনের সঙ্গে পারস্পরিক সহযোগিতা না থাকাই বড় কারণ হয়ে ওঠে। এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোর সহযোগিতাও কাম্য। তাদের মধ্যে যদি গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের চর্চা এবং বহিঃপ্রকাশ না থাকে তাহলে নির্বাচন কমিশনের জন্য পক্ষে এত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষত, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সন্তোষজনক পর্যায়ে না থাকায় নির্বাচনী পরিবেশ শান্তিপূর্ণ রাখার পথটিও বন্ধুর দেখাচ্ছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, নির্বাচনের সময় অর্থলগ্নি ও অর্থকে ব্যবহার করে নির্বাচন প্রভাবের অপপ্রক্রিয়াও একটি বড় সমস্যা। নির্বাচনী পরিবেশ সুষ্ঠু রাখা এবং অর্থের প্রবাহের বিষয়টি নির্বাচন কমিশন একা নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না। দলগুলোর নীতিনির্ধারকদের রাজনৈতিক সদিচ্ছার মাধ্যমে জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার বিষয়ে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়ে কাজ করতে হবে এবং সিদ্ধান্তে আসতে হবে, তারা কিভাবে জনগণের রায়সাপেক্ষে দেশের শাসনভার গ্রহন করবে। দলগুলো কি জনগণের অকুণ্ঠ সমর্থন আদায়ের মাধ্যমে নির্বাচনে জয়ী হতে চায় নাকি যেভাবেই হোক নির্বাচনী লড়াইয়ে শ্রেষ্ঠত্বের আসনে পৌঁছার যেকোনো পথ বাছাই করার মনোভাব রাখতে চায়—এ প্রশ্নের সমাধানসূত্র খোজা জরুরি। রাজনৈতিক দলের কর্মকাণ্ডই নির্ধারণ করবে তারা নির্বাচন কমিশনকে কতটা সহায়তা করতে পারবে।

আমাদের অভিজ্ঞতায় আছে, অধিকাংশ রাজনৈতিক দল গণতান্ত্রিক রীতিনীতিকে প্রতিপালনের তুলনায় নির্বাচনের সময় সক্রিয় হয়ে ক্ষমতা দখলের তোড়জোড়েই ব্যস্ত থাকে। দলগুলোর নীতিনির্ধারকদের অনুধাবন করতে হবে, বিদায়ি সরকার যে ভুল করেছিল এমন রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার আশ্রয় নিলে তা দেশের মানুষ গ্রহন করবে না। এ ক্ষেত্রে সব দলকে নির্বাচনী প্রচারে ও সুষ্ঠু প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ দিতে হবে। বিশেষত, ছোট রাজনৈতিক দলগুলোর ভোটব্যাংক ছোট হওয়ায় তারা বিরোধী দলীয় শক্তি হিসেবে রাষ্ট্রকাঠামোয় অবদান রাখতে পারবেÑ এমন প্রত্যাশা সংগতই করা কঠিন। এ বিষয়টি লক্ষ রেখে নির্বাচন কমিশনকে রাজনৈতিক অধিকারের মাঠ সমতল করার জন্য কাজ করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলো গুছিয়ে ওঠার আগেই নির্বাচন সম্পন্ন হলে আমরা সেই পুরোনো ব্যবস্থার দিকেই যাব। কারণ রাজনৈতিক দলগুলোর মতাদর্শ এবং ভোটারদের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি উপস্থাপনের সময় প্রয়োজন। এই সময় না পেলে রাজনৈতিক দলের প্রতি জনগণের দীর্ঘদিনে গড়ে ওঠা অনাস্থা দূর করা সম্ভব না তা বিদ্যমান বাস্তবতাই সাক্ষ্য দেয়। আর এমনটি না হলে দেখা যাবে, দেশে একটি রাজনৈতিক দলেরই প্রাধান্য থাকবে এবং ছোট রাজনৈতিক দলগুলো পর্যাপ্ত শক্তি সঞ্চয় করতে পারবে না। আমরা সেই পুরোনো ব্যবস্থায় ফিরতে চাই না। বরং আমরা প্রত্যাশা করি, রাজনৈতিক দল ছোট হোক বড় হোক, সমানভাবে রাজনীতি করার সুযোগ নিশ্চিত করার কাজটি এ কমিশন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করবে। তাদের প্রচেষ্টার মাধ্যমে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক পরিবেশে সমতা নিশ্চিত করতেই হবে।

নির্বাচন কমিশন যদি সবাইকে বুঝিয়ে আনুপাতিক হারে একটি নির্বাচনব্যবস্থার দিকে এগোতে পারে তাহলে সংসদে সব রাজনৈতিক পক্ষের অংশগ্রহণ ও প্রতিনিধিত্বের বিষয়টি নিশ্চিত করা কঠিন হবে না। বিদ্যমান বাস্তবতায় অতি দ্রুত নির্বাচন করতে গেলে মধ্যবর্তী সমন্বয়ের কাজ ব্যাহত হবে। এমন নয় আমরা দ্রুত নির্বাচন চাই না। তবে তার আগে ব্যবস্থাটা সুচারু করতে হবে। ফিরে আসুক নির্বাচনের ঔজ্জ্বল্য। গণতান্ত্রিক দেশে দীর্ঘদিন জনগণের ভোটে নির্বাচিত রাজনৈতিক পক্ষ না থাকা শোভনীয় নয়। আবার আমরা এও চাই না, একটিই রাজনৈতিক শক্তি সব সময় ভোটব্যাংককে নিয়ন্ত্রণ করুক।

আমাদের প্রত্যাশা, জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের মাধ্যমে জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হবেন এবং নিজ নিজ আসনের ভোটার কিংবা জনগণের আশা-প্রত্যাশার প্রতিপালনে সর্বদা নিয়োজিত থাকবেন। এ ব্যবস্থা নিশ্চিত করার জন্য নির্বাচন কমিশনের যতটুকু সময় প্রয়োজন তা দিতে হবে এবং প্রয়োজনে সহযোগিতা করবে। নির্বাচন কমিশনকেও বিদ্যমান সংকট মোকাবিলা করে দ্রুত একটি নির্বাচন আয়োজনের রূপরেখা প্রস্তুত করতে হবে। নির্বাচন কমিশন জনগণের কাছে দায়বদ্ধ। তাই তারা তাদের পূর্ণশক্তি জনগণের চাহিদার প্রতিফলন বাস্তবায়নে নিয়োগ করতে পারে এবং পটপরিবর্তনের সময়ে এমন সক্ষমতাও তাদের রয়েছে বলেই বিশ্বাস। কোনোভাবেই যেন নির্বাচনের মাধ্যমে পুনরায় স্বৈরাচারী ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হতে না পারে সেদিকে নির্বাচন কমিশনকে শ্যেনদৃষ্টি রাখতে হবে। নির্বাচন কমিশনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা-পরামর্শ করা এবং তাদের আশ্বস্ত করতে হবে, কোনো বাধাবিপত্তি ছাড়াই নির্বাচনী প্রচারের সুযোগ তারা পাবে। নির্বাচন কমিশন যদি এ ক্ষেত্রে কঠোর ব্যবস্থা নিতে পারে তাহলে কাজটি কঠিন হবে না।

রাজনৈতিক পক্ষগুলোর আস্থা আদায়ের আগে নির্বাচন কমিশন কীভাবে গঠিত হয়েছে সে কথাও জানা প্রয়োজন। এ বিষয়ে জবাবদিহির মাধ্যমে জনগণ ও রাজনৈতিক পক্ষকে আশ্বস্ত করতে হবে। তারপর আসে নির্বাচনে অর্থলগ্নির বিষয়টি। রাজনৈতিক দলগুলো স্বচ্ছ ফান্ডরেইজিং ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে নির্বাচনী প্রচারের অর্থ ব্যয় করে থাকে। মনে রাখতে হবে, অর্থের প্রভাব অধিকাংশ ক্ষেত্রে নির্বাচন সুষ্ঠু করতে দেয় না। এজন্য এখন থেকেই নির্বাচন কমিশনকে সক্রিয় হতে হবে। শপথ নেওয়ার পরপরই নির্বাচন কমিশনকে অডিটর নিয়োগ দিতে হবে। তারা রাজনৈতিক দলগুলোর ক্যাম্পেইন ফান্ডরেইজিং, অর্থলগ্নি ও অর্থব্যয়ের দিকটি কঠোরভাবে পর্যালোচনা করবে। আমরা দেখি, বড় দলগুলো নির্বাচনী প্রচারে মহা আড়ম্বরে জনসভা, র‍্যালি করে। কিন্তু তুলনামূলক ছোট দলগুলোর পক্ষে এমনটি করা সম্ভব হয় না। এর প্রভাব ভোটারদের ওপরও পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে ছোট দলগুলো সম্পর্কে ভোটাররা জানতে পারেন না। তাই রাজনৈতিক দলগুলো প্রচারে কত অর্থ ব্যয় করছে, অর্থের উৎস কী, কীভাবে তারা ব্যয় করছেÑ এসব বিষয় এখন থেকেই নথিবদ্ধ করা জরুরি।

আমরা জানি, নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পর থেকেই রাজনৈতিক দলগুলো প্রচারে সক্রিয় হয়ে ওঠে। এ ক্ষেত্রে অনেক সময় নির্বাচন কমিশনের বিধিমালা ভঙ্গের অভিযোগ আসে। এসব অভিযোগ খতিয়ে দেখতে হবে এবং কোনো ধরনের দীর্ঘসূত্রতা এ ক্ষেত্রে মেনে নেওয়ার নয়। বিশেষত, প্রচারের সময় নির্বাচন প্রভাবিত করার জন্য ব্যয়ের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এই ব্যয় সব সময় পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে। দলগুলোকে তাদের ব্যয়ের জবাবদিহি করতে হবে। এরপর আসে ভোটার রেজিস্ট্রেশনের কথা। ভোটারদের তালিকায় অধিকাংশ ক্ষেত্রে ভোটারের বিভিন্ন তথ্যে ভুল থাকে। কোনো তালিকায় একজনের নামে ভুল থাকলেও সুষ্ঠু নির্বাচনের পথে বড় বাধা বলে বিবেচিত হবে। তাই ভোটার তালিকা প্রণয়ন এবং রেজিস্ট্রেশনের ক্ষেত্রে কোনো ভুলভ্রান্তি যেন না হয় এজন্য আধুনিকায়ন জরুরি। তা ছাড়া দেশের মানুষের মধ্যে ভোট দেওয়ার বিষয়ে এক ধরনের অনাগ্রহ রয়েছে। অনেকে ভোট কীভাবে দিতে হয় তা যেমন জানেন না তেমনি ভোটাধিকার মানবাধিকারÑ এ সচেতনতাও নেই। তাই নির্বাচন কমিশনকে ভোটার এডুকেশনের বিষয়টি নিয়েও ভাবতে হবে।

নির্বাচন কমিশনকে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হবে শুরু থেকেই। সব সময় রাজনৈতিক দলের ওপর পর্যবেক্ষণ রাখতে হবে এবং কোনো অভিযোগ এলে দ্রুত খতিয়ে দেখে সমাধান বের করতে হবে। নির্বাচন কমিশন যদি এসব দায়িত্ব সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে পারে তাহলে আমরা একটি স্বচ্ছ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের দিকে এগোতে পারবÑ এমনটিই প্রত্যাশা। আমাদের গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির অন্যতম ঐতিহ্য নির্বাচন ফিরে পাক হৃত ঐতিহ্য।

  • প্রেসিডেন্ট, ফেমা ও দেশে-বিদেশে নির্বাচন পর্যবেক্ষক
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা