শিক্ষক রাজনীতি
ড. মাহরুফ চৌধুরী
প্রকাশ : ২২ নভেম্বর ২০২৪ ১৫:০২ পিএম
দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোয় শিক্ষকদের দলীয় রাজনীতির ক্রমবর্ধমান প্রভাব একটি গুরুতর সমস্যা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, যা শুধু শিক্ষার মানই নয় বরং সমগ্র সমাজের কাঠামো পরিবর্তিত ও প্রগতি বাধাগ্রস্ত করছে। ব্যক্তিক ও সামাজিক উন্নয়নের নৈতিক দায় ও পেশাগত গুরুদায়িত্বের কারণে শিক্ষকদের বলা হয় জাতির বিবেক। পেশাগত জীবনে শিক্ষকদের যে নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করার কথা, তা দলীয় আনুগত্য এবং স্বার্থপর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত হওয়ায় প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। এর ফলে একদিকে শিক্ষকদের পেশাগত মানমর্যাদা হ্রাস পেয়েছে, অন্যদিকে শিক্ষক রাজনীতির নেতিবাচক প্রভাবে শিক্ষার্থীরা শিক্ষার অনুকূল পরিবেশ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন বা হচ্ছেন। শিক্ষকদের প্রধান দায়িত্ব হলো নতুন প্রজন্মকে সঠিক শিক্ষা প্রদান ও তাদের মাঝে কল্যাণমুখী জীবন গঠন ও পরিচালনার জন্য মূল্যবোধ গড়ে তোলা, যাতে তারা নিজস্ব মেধায় অর্জিত জ্ঞান ও দক্ষতা দিয়ে দেশ ও জাতির উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। শিক্ষক রাজনীতির যে চিত্রটা জনসাধারণের মনে অঙ্কিত, তা বিগত কয়েক দশকে অভিজ্ঞতার আলোকে মোটেও সুখপ্রদ নয়। তার পেছনে যত সব কারণই থাকুক না কেন, এটি শিক্ষার মতো সম্মানজনক পেশার ক্ষেত্রে গভীর উদ্বেগ ও হতাশার জন্ম দিয়েছে।
উচ্চশিক্ষা স্তরে প্রথাগত শিক্ষা ও গবেষণার পরিবেশ, যা একসময় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গৌরবের বিষয় ছিল, তা এখন শিক্ষকদের দলীয় রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হওয়ার কারণে ইতোমধ্যে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একদিকে দলীয় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হওয়ায় পাঠদান ও গবেষণায় তারা মনোনিবেশ করার সুযোগ পাচ্ছেন না। অন্যদিকে শিক্ষক ও প্রশাসনের মধ্যে দলীয় আনুগত্যের ভিত্তিতে বিভাজন তৈরি হওয়ায় অ্যাকাডেমিক কার্যক্রমে স্থবিরতা দেখা দিচ্ছে। এর ফলে শিক্ষার্থীরা শিক্ষক রাজনীতির দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছেন এবং তাদের যথাযথ শিক্ষার সুযোগ ও অর্জিত শিক্ষার গুণগত মান কমে যাচ্ছে। কার্যত অধ্যয়ন ও গবেষণার মাধ্যমে সঠিক প্রস্তুতি গ্রহণ করতে না পারায় তাদের ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থান গুরুতর ঝুঁকির মুখে পড়ছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চা ও দক্ষতার উন্নয়ন কেন্দ্র হয়ে ওঠার পরিবর্তে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা, পেশিতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা এবং ক্ষমতার দ্বন্দ্বের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়।
শিক্ষক রাজনীতির নেতিবাচক প্রভাবের ফল হিসেবে উচ্চশিক্ষায় যেসব নেতিবাচক বিষয় প্রকট হয়ে উঠেছে, সেগুলো উল্লেখযোগ্যভাবে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার মৌলিক কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো : শিক্ষকদের সরাসরি রাজনীতিতে অংশগ্রহণের ফলে উচ্চশিক্ষার মান উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় দলীয় ক্ষমতার বলয় সুসংহত করতে ও শিক্ষক সমিতির নির্বাচনে দলীয় ভোটার বাড়াতে শিক্ষক নিয়োগে মেধা ও যোগ্যতার চেয়ে দলীয় আনুগত্য প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। এ প্রক্রিয়া কেবল মেধাবী ও যোগ্য প্রার্থীদের জন্য বঞ্চনার কারণ হচ্ছে না, বরং সামগ্রিক শিক্ষার মান নিচের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। এমন প্রেক্ষাপটে দেশের অনেক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় বঞ্চিত হয় সেরা শিক্ষক, গবেষক ও প্রশাসকদের সেবা পাওয়া থেকে। এমন পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীরা উপযুক্ত জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন, যা তাদের ভবিষ্যৎ পেশাগত ও সামাজিক জীবনে দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
আমাদের দেশে উচ্চশিক্ষা স্তরে গবেষণার ক্ষেত্রে ক্রমাগত স্থবিরতা উচ্চশিক্ষার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাঠদান ও দক্ষতা উন্নয়নের পাশাপাশি নিত্যনতুন জ্ঞান সৃজন ও বিতরণ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অন্যতম কাজ। দলীয় রাজনীতিতে বেশি সময় দেওয়ায় শিক্ষকরা তাদের অ্যাকাডেমিক কর্মকাণ্ড তথা পাঠদান ও গবেষণার পাশাপাশি সৃজনশীল কার্যক্রমে পর্যাপ্ত মনোযোগ দিতে পারছেন না। ফলস্বরূপ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গবেষণার মানোন্নয়ন দূরের কথা, দেশের অভ্যন্তরীণ অত্যাবশ্যকীয় গবেষণাকর্মও স্থবির হয়ে পড়ে। গবেষণা প্রস্তাবনা পত্রের গুণগত মানের ওপর নয়, গবেষণার অনুদানও বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে দলীয় বিবেচনায়। এর ফলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জ্ঞান সৃষ্টি ও দক্ষতার উন্নয়নের সক্ষমতা দিনদিন হ্রাস পেতে থাকে।
উপাচার্যসহ অন্য প্রশাসনিক কর্মকর্তারা যখন দলীয় আনুগত্যের ভিত্তিতে নিয়োগপ্রাপ্ত হন, তখন তাদের প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায় রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকদের সন্তুষ্ট করা, যা প্রশাসনের নিরপেক্ষতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি একেবারে ধ্বংস করে দেয়। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, গত তিন দশকে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে নানা ঘটনা। যোগ্য প্রার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ার সুযোগ থেকে বাদ পড়েন, আর দলীয় আনুগত্যের ভিত্তিতে অযোগ্যরা শিক্ষক হওয়া থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনে উচ্চপদে আসীন হয়েছেন-এই অভিযোগ অমূলক নয়। এর ফলে শিক্ষকতায় ও প্রশাসনে পেশাদারির ঘাটতি তৈরি হয়েছে। বঞ্চিত প্রার্থীরা অনেকেই বিদেশে পাড়ি জমিয়েছেন এবং সেবা দিচ্ছেন বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে। দেশ হারাচ্ছে মেধাবীদের আর আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো হারাচ্ছে যোগ্য শিক্ষক, গবেষক ও প্রশাসকদের।
সাম্প্রতিক সময়ে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় নানা কেলেঙ্কারিতে শিক্ষার্থীদের ওপর শিক্ষক রাজনীতির নেতিবাচক প্রভাব অতিসহজেই দৃষ্টিগোচর হয়েছে। শিক্ষকরা যখন রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন, তখন শিক্ষক তার পেশাগত নিরপেক্ষতা হারান এবং অনিবার্য পরিণতি হিসেবে শিক্ষার্থীরাও রাজনৈতিক বিভাজনের শিকার হন। তা ছাড়া রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় অনেকেই ক্ষমতার অপব্যবহারে অভ্যস্ত হয়ে পড়েন এবং জড়িয়ে পড়েন নানা অন্যায়-অবিচারে। অপছন্দের শিক্ষার্থীদের প্রতি অবিচার করতে তাদের বাধে না। সাম্প্রতিক সময়ে শিক্ষকদের প্রতি শিক্ষার্থীদের অনিয়মের অভিযোগগুলো খেয়াল করলেই অন্যায়-অবিচারের মাত্রা সহজেই অনুমান করা যায়।
শিক্ষক রাজনীতির সবচেয়ে দৃশ্যমান নেতিবাচক প্রভাব হলো স্বজনপ্রীতি ও বৈষম্য যা শিক্ষার্থীদের ওপর পড়ে নানাভাবে। উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠানগুলোয় দলীয় প্রভাবের কারণে শিক্ষার্থীরা একে অন্যের প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়ান, গণতন্ত্রের পূর্বশর্ত পরমতসহিষ্ণুতার পরিবর্ততে বিরোধীদের প্রতি খড়্গহস্ত হয়ে ওঠেন তারা, যা তাদের ব্যক্তিগত সম্পর্ক, নৈতিকতা এবং ক্যারিয়ারের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীরা শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য থেকে বিচ্যুত হয়ে ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর দলীয় রাজনৈতিক স্বার্থপূরণের যন্ত্রে পরিণত হওয়ায় নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ বিপন্ন হয়ে পড়েছে।
শিক্ষক রাজনীতির অনিবার্য পরিণতি হিসেবে দেখা দিয়েছে নানা প্রশাসনিক সংকট, যা উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের স্থিতিশীলতা, টেকসই উন্নয়ন ও তার কার্যকারিতা মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে। প্রশাসনিক কার্যক্রমে দলীয় রাজনীতির ব্যাপক প্রভাবের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় সুশাসনের অভাব ক্রমে প্রকট হয়ে উঠছে। প্রশাসন যখন নিরপেক্ষতার পরিবর্তে দলীয় দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কাজ করে, তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারীসহ ছাত্রদের ন্যায্য দাবি উপেক্ষিত হয়। আর বিরোধী মতামত দমনে নিপীড়কদের সহযোগী হয়ে ওঠে প্রশাসন, যা সম্পূর্ণরূপে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের চরিত্র ও এর শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের পেশাগত নৈতিকতার পরিপন্থি। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় দলীয় রাজনীতির প্রভাবে আর্থিক দুর্নীতি তথা বাজেট ব্যবস্থাপনায় অনিয়মও ক্রমে সাধারণ ঘটনায় পরিণত হয়েছে। ফলে বার্ষিক বাজেটে গবেষণা ও শিক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ না দিয়ে দলীয় প্রভাবে ঠিকাদারির মাধ্যমে অর্থ বাগিয়ে নেওয়ার জন্য অনাবশ্যকীয় অবকাঠামোর উন্নয়নসহ অপ্রয়োজনীয় খাতে বাজেট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া অনিয়ম, অন্যায়, অবিচার বা অধিকার আদায়ের ছাত্র আন্দোলন দমনে পক্ষপাতমূলক আচরণ দলীয় প্রভাবের আরেকটি উদ্বেগজনক দিক।
বিদ্যমান পরিস্থিতিতে শিক্ষকদের উচিত তাদের মূল দায়িত্ব, অর্থাৎ নতুন প্রজন্মকে সঠিক পথে পরিচালিত এবং উচ্চশিক্ষা স্তরে শিক্ষার্থীদের জন্য মুক্তচিন্তা ও সৃজনশীলতার পরিবেশ নিশ্চিত করা। দলীয় রাজনীতি থেকে নিজেকে দূরে রেখে পেশাগত নিরপেক্ষতা বজায় রাখা শিক্ষকদের জন্য অত্যাবশ্যক। এটি করা না হলে উচ্চশিক্ষার মান যেমন আরও নিম্নমুখী হতে থাকবে, তেমন সমাজ ও জাতির ভবিষ্যৎও গভীর সংকটে পড়বে। এমনটি তো কাম্য হতে পারে না। সর্বোপরি শিক্ষক রাজনীতির নেতিবাচক প্রভাব রোধে অন্তর্বর্তী সরকারের উচিত শিক্ষা ক্ষেত্রে সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার জন্য নীতিমালা প্রণয়ন এবং শিক্ষা আইনের প্রয়োজনীয় সংস্কার সাধন। দলীয় প্রভাব এড়িয়ে যোগ্যতা, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার আলোকে মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ ও প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনার সুস্পষ্ট বিধান তৈরি করা। একই সঙ্গে শিক্ষকদের সংগঠনগুলোকে পেশাগত উন্নয়নে দলীয় রাজনীতির পরিবর্তে শিক্ষার পরিবেশ ও মানোন্নয়নে কাজ করার জন্য উৎসাহিত করা। এখনই সময় শিক্ষকদের তাদের পেশাগত নৈতিকতার প্রতি দায়বদ্ধতা বৃদ্ধির বাধ্যবাধকতার মধ্যে নিয়ে এসে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর গৌরবময় ঐতিহ্য পুনরুদ্ধার করা যাতে তারা নীতি-নৈতিকতায় দেশের মানুষের আস্থা প্রতিষ্ঠায় অগ্রণীর ভূমিকা পালন করতে পারেন।