সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ২১ নভেম্বর ২০২৪ ০৮:৪২ এএম
ওপার বাংলার দর্শকনন্দিত ‘সবার ওপরে’ চলচ্চিত্রে আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে খ্যাতিমান অভিনেতা ছবি বিশ্বাসের সেই আর্তনাদ, ‘ফিরিয়ে দাও আমার বারোটি বছর’ আজও অনেকের মুখে মুখে ফেরে। ২০ নভেম্বর প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর ‘ফিরিয়ে দাও শুকুর আলীর সেই আঠারোটি বছর’ সংবাদ শিরোনামটি ওই সংলাপেরই প্রতিধ্বনি। মিথ্যা মামলায় ছয় বছরের মাথায় চূড়ান্ত দণ্ডে দণ্ডিত হন মুন্সীগঞ্জ সদর থানার রামপালের সিপাহীপাড়া গ্রামের শুকুর আলী। ডেথ রেফারেন্সে নির্দোষ প্রমাণিত হওয়ার পরও মুক্তি পেতে কেটে যায় তার আরও বারোটি বছর! প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর অনুসন্ধানে উঠে এসেছে মুন্সীগঞ্জ কারাগার থেকে যে কাগজটি কাশিমপুর কারাগারে পাঠানোর কথা ছিল সেটি তো পাঠানো হয়ইনি, উপরন্তু তা হারিয়ে যায়। একজন আইনজীবীর উদ্যোগে বিষয়টি নজরে আসে। শেষ পর্যন্ত সবই উদ্ধার হয় এবং সেই পুরোনো আদেশ বলেই কারাগার থেকে মুক্তি পান ভাগ্য বিড়ম্বিত শুকুর আলী। দায়িত্বশীলদের চরম গাফিলতির শিকার শুকুর আলীই শুধু এমন মর্মস্পর্শী ঘটনার শিকার নন।
আমাদের মনে আছে বিনা অপরাধে পাঁচ বছর কারাগারে আটক থাকা রাজধানীর পল্লবী এলাকার বেনারসী কারিগর মো. আরমানের কথা। যিনি উচ্চ আদালতের নির্দেশে ২০২১ সালের জানুয়ারি মাসে কাশিমপুর কারাগার থেকে মুক্তি পান। সংবাদমাধ্যমে তখন জানা গিয়েছিল, মাদকের একটি মামলায় ১০ বছরের সাজাপ্রাপ্ত এক আসামির পরিবর্তে পুলিশ তাকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল। আমাদের আরও মনে আছে, পাটকল শ্রমিক সেই জাহালমের কথাও, যিনি বিনা দোষে কারাভোগ করেছিলেন দীর্ঘদিন। শেষ পর্যন্ত বিষয়টি উচ্চ আদালতের নজরে এলে জাহালমকে অবিলম্বে মুক্তিদানের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল পক্ষগুলোকে লক্ষ্য করে আদালত কিছু নির্দেশনা দিয়েছিলেন। কিন্তু তারপরও দায়িত্বশীলদের ভুলের খেসারত দিতে হয়েছে আরও অনেককে। সিলেটের দক্ষিণ সুরমা উপজেলার ধরাধরপুর গ্রামের ফজলু মিয়াও এভাবেই জীবনের ২২টি বছর কারাবাসে হারিয়েছেন। পুলিশের অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী গুরুতর অপরাধে জড়িত থাকার খবর সংবাদমাধ্যমের কল্যাণে সাধারণ মানুষ যখন জানতে পারে, তখন সংগতই প্রশ্ন জাগেÑ ‘দুষ্টের দমন, শিষ্টের লালন’ই যাদের ব্রত তাদের ‘ভুল’ ও ‘অপরাধ’-এর কারণে আর কতো জীবনের ক্ষয় ঘটবে। হতাভাগা শুকুর আলীও পুলিশের ভুলের শিকার। ২০০১ সালের ৮ জুলাই মধ্যরাতে স্ত্রী-সন্তানসহ ঘুমন্ত শুকুর আলীর ঘরে আগুন লাগে। প্রতিবেশীদের চেষ্টায় তিনি অগ্নিদগ্ধ হয়ে বেঁচে গেলেও তার স্ত্রী ছেলেমেয়েসহ পরিবারের পাঁচ সদস্যকে হারান। কারও কোনো অভিযোগ ছাড়াই পুলিশ বাদী হয়ে মামলা দায়ের করে এবং একপর্যায়ে তাকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে জোরপূর্বক স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও আদায় করে। তারপর কেটে গেছে অনেক দিন এবং পুলিশের সাজানো মামলার সাক্ষী হন পুলিশেরই পছন্দের কয়েকজন।
২০০৬ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর ঢাকার অতিরিক্ত দায়রা জজ প্রথম আদালত শুকুর আলীকে দোষী সাব্যস্ত করে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার আদেশ দেন। কারা প্রকোষ্ঠে কাটতে থাকে তার জীবন। ২০১২ সালের ২৭ মে উচ্চ আদালতে ডেথ রেফারেন্স পর্যালোচনায় রায় দেওয়া হয় শুকুর আলী নির্দোষ এবং অবিলম্বে তাকে মুক্তি দেওয়ার। কিন্তু নির্দোষ শুকুর আলীর তারপরও মুক্তি মেলেনি, কেটে যায় আরও ১২টি বছর। আইনজীবী সুজা-আল-ফারুকী নাটকীয়ভাবে বিষয়টি জানার পর তিনি উদ্যোগ নেন এবং তার সঙ্গে হাইকোর্টের আরও কয়েকজন আইনজীবী যুক্ত হন। আমরা তাদের মানবিক বোধের তাগিদে দায়িত্ব পালন করায় সাধুবাদ জানাই। যে ভুলের বৃত্তে পড়ে শুকুর আলীর আঠারোটি বছর কেটে গেছে কারা প্রকোষ্ঠে এর জন্য সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের ভুলের দৃষ্টান্তযোগ্য প্রতিকার নিশ্চিত হওয়া জরুরি। আমরা মনে করি, আইনের নিয়মে পাওয়া ন্যায়বিচারই সভ্য সমাজের স্থায়ী নীতি। আইন নির্ভর করে প্রমাণের ওপর এবং প্রমাণ নির্ভর করে সঠিক তথ্যের ওপর। আর এই প্রমাণ ও সঠিক তথ্যের প্রতিপালনের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট মহলগুলোর দায়িত্বশীলদের। আইন-ন্যায়-অবিচারের সিদ্ধান্তের মাধ্যমে মানুষের জীবনধারা পরিবর্তিত হয়। আইনি বিচারব্যবস্থা অপরাধ প্রতিরোধের জন্য তৈরি করা হয়েছে, যা মানুষের স্বার্থে কাজ করে। কিন্তু আমরা দুঃখজনকভাবে লক্ষ করছি, যাদের ন্যায়বোধের তাগিদে আইনের প্রতিপালন যথাযথভাবে হওয়ার কথা তাদের ভুল কিংবা উদাসীনতায় তা অনেক পর্যায়েই প্রতিকার ছাড়া ক্ষতের মতো দৃশ্যমান হয়। আমরা জানি, আইনি পন্থায় বিচার হলো সব নৈতিক কর্তব্যের সমষ্টি।
আইনের শাসন নিশ্চিত করার বিষয়ে রাষ্ট্র বরাবরই জোর দিলেও, বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদেÑ কথাটি সত্যতা হারায়নি। রাষ্ট্রের পক্ষে দায়িত্ব পালনকারীদের অনেকের অবহেলা, দায়িত্বহীনতা, লোভ ও ভুলের বলি হতে হয় সাধারণ মানুষকে। শুকুর আলীরা এরই দুঃসহ স্মারক। যাদের গাফিলতি এবং দায়িত্বহীনতায় বিনাদোষে কারাবাসের ঘটনা ঘটছে, আমরা তাদের বিচার দাবি করি। পাশাপাশি ভুক্তভোগীদের ক্ষতিপূরণ পাওয়ার দাবিকে মানবাধিকার আন্দোলনের অংশ বলেও মনে করি। নির্দোষ কারও কারাভোগের প্রতিটি ঘটনার জন্য দায়ীদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। তা না হলে দেশে আইনের শাসনের বিষয়টি প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়বে এবং শুকুর আলীদের তালিকা দীর্ঘই হতে থাকবে। এমনটি তো সভ্য কিংবা মানবিক সমাজে কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হচ্ছে অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত করা এবং সুনাগরিকদের সুরক্ষা দেওয়া। বিষয়টি গণতন্ত্র চর্চার সঙ্গেও অঙ্গাঙ্গিভাবে সম্পর্কিত। আমরা আরও মনে করি, এ ধরনের আরও ভুক্তভোগী রয়েছেন কি না, এর জন্য প্রতিটি কারাগারে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের তরফে অনুসন্ধান জরুরি। একজন নিরপরাধ ব্যক্তিকে কেন বিনাদোষে এতদিন কারাবাস করতে হলো, এর যথাযথ অনুসন্ধানও প্রয়োজন। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হলে এ ধরনের মর্মস্পর্শী ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ করতেই হবে।
বিবাদী জামিন পাচ্ছেন না, ফরিয়াদি পাচ্ছেন না বিচার, আদালত সাক্ষী পাচ্ছেন না, পুলিশ খুঁজে পায় না আসামিÑ এমন অনেক ঘটনা বিগত সরকারগুলোর শাসনামলে নিত্যনৈমত্তিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ‘বজ্র আঁটুনি ফস্কা গেরো’ নীতিতে কোনো অপরাধী ‘ফস্কে’ বেরিয়ে যাবেন আর কোনো নিরপরাধ মানুষ ‘বজ্র আঁটুনি’র বাঁধন খুলে বেরুতে না পারার কারণে কারাবাস করবেন, সেটাকে নিয়তি বলার কোনো অবকাশ নেই। আমরা আশা করি, দেশের পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে আইনি ব্যবস্থা কিংবা প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও ন্যায়-নিষ্ঠতার বিষয়গুলো নিশ্চিত করার পাশাপাশি দায়িত্বশীলদের যথাযথ দায়িত্ব পালনে যাতে কোনো গাফিলতি না হয় তাও নিশ্চিত করা সমভাবেই গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হবে। আমরা কোনোভাবেই প্রত্যাশা করি না, বিনা দোষে কারও জীবন এভাবে কেটে যাক কারা প্রকোষ্ঠে।