সম্পদের হিসাব
হোসেন আবদুল মান্নান
প্রকাশ : ২১ নভেম্বর ২০২৪ ০৮:৩৮ এএম
হোসেন আবদুল মান্নান
সরকারি কর্মচারীদের প্রতি বছর ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে তাদের সম্পদের হিসাব জমা দিতে হবে। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার সাম্প্রতিককালে বেশ কয়েকবার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করেছে। এ বিষয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কঠোর নির্দেশনাও রয়েছে। এ বিধান আগেও প্রচলিত ছিল, তবে তা যথাযথভাবে কার্যকর ছিল না। অনেকটা দায়সারা গোছের অনুশাসন ছিল। ফলে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা গুরুত্বের সঙ্গে নেননি। যদিও সরকারি কর্মচারী হিসেবে চাকরিতে যোগদানকালেই যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে তা জমা দেওয়ার কথা। পরে চাকরিকালীন তার সম্পদের হ্রাসবৃদ্ধি বিষয়েও সরকারকে অবহিত করার নিয়ম বহাল আছে। এমন নির্দেশনা ১৯৭৯ সালের সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালায় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এর ১১, ১২ ও ১৩ অনুচ্ছেদে সরকারি কর্মচারীর সকল প্রকার স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি কেনা, লেনদেন, ব্যবসা ইত্যাদি বিষয়ে কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমতি বা ঘোষণা দেওয়ার কথা রয়েছে। অবশ্য পাঁচ বছর অন্তর ডিসেম্বরে সম্পদের হ্রাসবৃদ্ধির হিসাব বিবরণী দিতে বলা হয়েছে। বলাবাহুল্য, ১৯৭৯ থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে সামরিক শাসনামলে সরকারি কর্মচারীদের বিষয়ে নানা অধ্যাদেশের মাধ্যমে অসংখ্য প্রজ্ঞাপন, বিধিমালা জারি করা হয়েছিল। সরকারি চাকরিবিধিতে আনা হয়েছিল নানাবিধ পরিবর্তন, সংশোধন ও সংযোজন। সে সময়ের সরকারি কর্মচারী (বিশেষ বিধান) অধ্যাদেশ, ১৯৭৯, গণকর্মচারী (নিয়মিত উপস্থিতি) অধ্যাদেশ, ১৯৮২, উদ্বৃত্ত কর্মচারী আত্মীয়করণ অধ্যাদেশ, ১৯৮৫ ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।

বর্তমান সরকারের
সর্বশেষ সিদ্ধান্তমতে প্রতি বছর ডিসেম্বরে হিসাব দিতে বলা হলেও এ বছর অর্থাৎ ৩০ নভেম্বর,
২০২৪-এর মধ্যে কর্মচারীদের হিসাব বিবরণী জমা দিতে হবে। উল্লেখ্য, এ বছরের মাঝামাঝি
বিষয়টি সামনে আনে মূলত হাইকোর্টের একটি রিট। দুজন বিচারপতির সমন্বয়ে গঠিত একটি বেঞ্চ
গত জুলাইয়েই এমন নির্দেশ দিয়ে বলেছিলেন, সরকারি কর্মচারীদের সম্পদের হিসাব বিবরণী দাখিল
এবং তা যথাসময়ে প্রকাশ করতে হবে। আদালত এ বিষয়ে সাবেক সরকারকে তিন মাসের মধ্যে ব্যবস্থা
নেওয়ার কথাও বলেছিলেন। বিষয়টি তাৎক্ষণিক আলোচনায় উঠে আসে মূলত প্রজাতন্ত্রের পদস্থ
চাকরিতে থেকে কয়েকজন পুলিশ ও কাস্টম সার্ভিসের কর্মকর্তার বেপরোয়া তথা সীমাহীন সম্পদের
মালিক হওয়ার সংবাদ মিডিয়ায় প্রকাশিত হওয়ার কারণে। তখন বরাবরের মতো জাতীয় সংসদসহ দেশে-বিদেশে
আলোচনার ঝড় ওঠে। তখন স্বতঃপ্রণোদিত রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগ থেকে
এমন পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
বাস্তবতা হলো,
কর্মচারীদের নিজের বা পরিবারের অর্জিত সম্পদের হিসাব সরকারের কাছে জমা দেওয়ার বিষয়ে
কঠোর আইনি বাধ্যবাধকতা না থাকায় এ ক্ষেত্রের বেশিরভাগ কর্মচারীর মধ্যেই চরম অনীহা রয়েছে।
এতে জীবনাচারে সৎ এবং অসৎ সবাই এক সারিতে অবস্থান করেন। অথচ বার্ষিক গোপনীয় অনুবেদন
ফরম (এসিআর) একজন সরকারি কর্মচারীর কাছে সর্বোচ্চ আকাঙ্ক্ষিত ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
তিনি সারা বছর ধরে খানিকটা শঙ্কা ও অধীরতা নিয়ে অপেক্ষমাণ থাকেন, বছরান্তে তার ঊর্ধ্বতন
কর্তৃপক্ষ তাকে কীভাবে মূল্যায়ন করেন। এমনকি এর জন্য ওপরের কর্তৃপক্ষকে বরাবরই যথেষ্ট
সমীহ করে চলতে হয়। অথচ এসিআরের সঙ্গে বার্ষিক হিসাব বিবরণীকে সম্পৃক্ত রেখে একটা ছোট্ট
প্রজ্ঞাপন জারিই এর সমাধান এনে দিতে পারত। বাংলাদেশে সরকারি কর্মচারীদের অবৈধ সম্পদ
অর্জন নিয়ে বিভিন্ন সময়ে জাতীয় সংসদে আলোচনা হলেও এর ওপর বিশেষ কোনো আইন প্রণয়নের প্রস্তাব
বা প্রয়োজনীয়তার কথা কখনও গুরুত্ব পায়নি। আলোচনা হয়েছে অনির্ধারিত পথে; হঠাৎ কোনো কর্মচারীর
পুকুর চুরির ঘটনা ‘টক অব দ্য কান্ট্রি’ হয়ে গেল তো জ্বালাময়ী ভাষণ। অন্যথায় সংসদগুলোর
সব সদস্যই তাদের নেতার দিকে তাকিয়ে সচরাচর মৌনতা অবলম্ব করতে পছন্দ করতেন।
জানা যায়, সরকারের
এ সিদ্ধান্তের মাধ্যমে ১৫ লাখ সরকারি কর্মচারীকে হিসাবের আওতায় আনা যাবে। তবে প্রশ্ন
আসছে, বছরান্তে সম্পদের হিসাব বিবরণী জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে জমা দিলেই কি দুর্নীতি
বন্ধ বা রোধ হয়ে যাবে? হয়তো হবে না। তথাপি একটা কার্যকর মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি হবে
বলে অভিজ্ঞ কর্মজীবীরা মনে করেন। এমনকি সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর বদলি, পদোন্নতি, বিদেশি
পদায়নে কর্তৃপক্ষ তা বিবেচনায় এনে নথি তলব করতে পারেন। পাশাপাশি একই কর্মচারীর আয়কর
রিটার্ন দাখিলের ক্ষেত্রেও একটা সমন্বয় করে দেওয়া যায়। অনুসন্ধানে জানা যায়, টিআইএনধারী
অধস্তন কর্মচারীদের একটা অংশ রিটার্ন জমা দেন না। উল্লেখ্য, পত্রিকার ভাষ্যমতে, দেশের
দুই তৃতীয়াংশ টিআইএনধারী নিয়মিত আয়কর রিটার্ন জমা দেন না। আশ্চর্য যে, ১৭ কোটি মানুষের
দেশে মাত্র ৯০ লাখ করদাতা। তা ছাড়া অন্তত ২৫ বছর নিয়মিত আয়কর রিটার্ন দাখিলকারী একজন
কর্মচারীকে পাহাড়সমান সম্পদের মালিক বলে যখন ইলেকট্রনিক মিডিয়া আলোচিত করে তোলে, তখন
কেউ তার দাখিলকৃত আয়কর রিটার্নকে আমলে নিতে চায় না। দেখা হয় না তিনি কী জমা দিয়েছেন,
আর বাস্তব চিত্র কী?
সরকারি কর্মচারীদের বার্ষিক সম্পদ বিবরণী দাখিলের মাধ্যমে প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োজিত কর্মচারীর মধ্যে একটা দৃশ্যমান শৃঙ্খলা ও সুশীল মনোভাব ফিরে আসতে পারে। তাদের মনোজগতে, আচরণ ও বিচরণে প্রকৃত সেবকের প্রবৃত্তি জাগ্রত হতে পারে। সরকারি চাকরি বিশেষ করে বেসামরিক পদে কর্মরতদের গতানুগতিক ধারার জীবনাচার থেকে বেরিয়ে আসার কোনো বিকল্প নেই এবং অরাজনৈতিক সরকারের অধীনে এমন সংস্কৃতি লালন ও কার্যকর করা অনেকাংশে সহজতর।