× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

মূল্যস্ফীতি

অনিয়ন্ত্রিত বাজারের বহুমুখী অভিঘাত

ড. নীলাঞ্জন কুমার সাহা

প্রকাশ : ২০ নভেম্বর ২০২৪ ০৯:১১ এএম

ড. নীলাঞ্জন কুমার সাহা

ড. নীলাঞ্জন কুমার সাহা

দেশের রাজনীতির গতিপ্রকৃতি বোঝা কঠিন হয়ে পড়ছে। বিশেষত, অধিকাংশ সরকারি প্রতিষ্ঠানে এক ধরনের নির্লিপ্ততা দেখা যায়। এসবকিছুর গভীর প্রভাব সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রকাশিত হচ্ছে। বিশেষত, বাজারব্যবস্থায় এর নেতিবাচক প্রভাব সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান হচ্ছে। দেশের অর্থনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে বাজারব্যবস্থাকে গুরুত্ব দিতে হয়। যেকোনো দেশের সরকার ও জনগণের দৈনন্দিন পরীক্ষার একটি বড় ক্ষেত্র বাজার। যেকোনো শ্রেণির মানুষকে বাজারের মুখোমুখি হতে হয়। আর বাজারের ওপর নির্ভর করে যাপিত জীবন। বাজারে সুস্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে পারলে অর্থনীতিতে গতির পাশাপাশি জনজীবনের কার্যকরী ক্ষমতাও শক্তিশালী হয়। ধনী, নির্ধন, গরিব, শ্রমিক ও খেটেখাওয়া মানুষ সবাইকে বাজারে যেতে হয়, বাজার করতে হয়, বেঁচে-বর্তে থাকতে হয়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, সহনশীল বাজারব্যবস্থা গড়ে তোলার ব্যাপারে কার্যকর কোনো উদ্যোগ এখনও নেওয়া হয়নি। এ ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট তৎপরতার অভাবও লক্ষণীয়। এদিকে জিনিসপত্রের দাম হু হু করে বেড়েই চলেছে। সাধারণ মানুষের মধ্যে হতাশা তীব্র হচ্ছে। আর এই হতাশার সঙ্গে ক্রমেই যুক্ত হচ্ছে জনগণের খাদ্য অধিকার সংকুচিত হওয়ার সামাজিক সংকট। এ ক্ষেত্রে বাজার নিয়ন্ত্রণের দায় সরকারের ওপর বর্তায়। বাজারের ওপর রাষ্ট্রের ন্যূনতম নিয়ন্ত্রণ না থাকলে এ কাজটি অনেকাংশেই কঠিন হয়ে পড়ে। 

অতি সাধারণ সবজি, যা মৌসুমে অনেক সময় দুই অঙ্কের কোটায় থাকে কিন্তু এবার তা দুই-থেকে তিনগুণ বেড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে স্বল্প দূরত্বে দেখা যাচ্ছে, একই সবজির দাম ১০-২০ টাকা বেশি। স্বল্প দূরত্বের মাঝে কোনো ভূত এই দামবৃদ্ধি ঘটিয়েছে তা খতিয়ে দেখা জরুরি। সংগত কারণেই প্রশ্ন দাঁড়ায়, বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধবে কে? ব্যবসায়ীরা লাভের জন্য ব্যবসা করে। যেকোনো ব্যবসার ক্ষেত্রে লাভ অর্জন করবে এমনটাই স্বাভাবিক। তাই বলে বাজারে অযৌক্তিক হারে জিনিসপত্রের দাম বাড়া কোনোভাবেই মেনে নেওয়ার নয়। অযৌক্তিক এই কারণেÑ কারণ অন্তর্বর্তী সরকার এরই মধ্যে জরুরি কিছু খাদ্যপণ্য যেমনÑ ডিম, আলু, চাল ও ভোজ্যতেল আমদানিতে শুল্কহার কমিয়েছে। তারপরও বাজারে এর প্রভাব দৃশ্যমান হচ্ছে না। দেশে বাজারে তদারকির ক্ষেত্রে গাফিলতির বিষয়টি এখন অনেকটাই স্পষ্ট। অবশ্য এ সমস্যা গত দুই বছর ধরেই এবং বিগত সরকারও এ সমস্যা নিরসনে অনেক পদক্ষেপের আশ্বাস দিলেও কার্যত ফল মেলেনি। এবার অন্তর্বর্তী সরকারও বাজার নিয়ন্ত্রণে বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়ার পরও বিব্রত অবস্থায় রয়েছে। আমরা দেখেছি, পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়। ওই সময় শিক্ষার্থীদের একটি অংশ নিয়মিত ট্রাফিক কন্ট্রোল ও বাজার তদারকি করার সময় বাজারে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে সাফল্য দেখিয়েছিল। অর্থাৎ আমাদের সনাতনী বাজারব্যবস্থায় নিয়মিত তদারকি এবং নিয়ম বিধিবদ্ধ করে রাখার রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রয়োগ সহজেই সমাধান দিতে পারে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সরকার বাজার তদারকিতে পর্যাপ্ত লোকবল সংকটের কারণে সারা দেশে বাজার তদারকি করতে পারছেন না। ফলে বাজারে ক্রেতার আত্মমর্যাদা, মানসম্মান, পছন্দ ও রুচি সবই আহত-নিহত হচ্ছে।

বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা ভিডিও কিংবা রিলসে দেখা যায়, বাজারে গিয়ে ক্রেতারা অনেক সময় অশোভন আচরণের শিকার হচ্ছেন। নিম্ন বা স্বল্প-আয়ের মানুষ ব্যাগ হাতে কাঁচুমাচু হয়ে বাজার যাচ্ছেন। পছন্দসই পণ্যটির দরদাম করতে গিয়ে নিত্য হেনস্থার শিকার হচ্ছেন। কেবল স্বাভাবিক পণ্য নয় বাজারে ভাঙা ডিম, গিলা-কলিজা, আধাপচা সবজির দামও বেড়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তর কিছু অভিযান পরিচালনা করছে। কিন্তু এই কার্যক্রমের ক্ষেত্রে কিছুটা আশার বাণী পাওয়া গেলেও একটি বিষয় লক্ষ করা জরুরি। এ ধরনের অভিযানে পাইকার বা খুচরা বিক্রেতাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলেও আড়তদার বা আমদানিকারকদের ক্ষেত্রে তা করা হচ্ছে না। অর্থাৎ বাজারে অদৃশ্য সিন্ডিকেটের যে শক্তি তা দুর্বল হয়নি। বিশেষত, সংশ্লিষ্ট প্রশাসনও বিষয়টি সম্ভবত ওয়াকিবহাল এবং এ ক্ষেত্রে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারছে না। তাই আমরা এখনও বাজারে আড়তদার বা সিন্ডিকেটের দাপটের উৎস সন্ধান করতে পারছি না। এ ক্ষেত্রে সরকারের কঠোর পদক্ষেপ ব্যতীত কার্যত দৃশ্যমান ফল পাওয়া সম্ভব নয়। 

অমর্ত্য সেন আবারও সত্য হয়ে উঠছেন। বাজারে যে পণ্য নেই তা নয়, কিন্তু মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পাওয়ায় তারা কিনতে পারছেন না। পোর্ভাটি অ্যান্ড ফেমেইন গ্রন্থে অর্মত্য সেন বাংলাদেশের দুর্ভিক্ষ নিয়ে আলোচনা করেছেন। তিনি ১৯৪৩ মন্বন্তর এবং ১৯৭৪ দুটি দুর্ভিক্ষের প্রসঙ্গ উল্লেখ করেছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন, বাজারে পণ্য ছিল কিন্তু মানুষের ক্রয়ক্ষমতা না থাকায় দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। এ ক্ষমতাহীনতাকে তিনি উল্লেখ করেছিলেন এনটাইটেলমেন্ট বা রাষ্ট্রপ্রদত্ত অধিকারের সংকোচন হিসেবে। মানুষের পকেটে টাকা নেই। আয়-রোজগার কমেছে। চাহিদামাফিক পণ্য ক্রয়ের সুযোগ সংকুচিত হচ্ছে। মানুষকে নানাভাবে অভিযোজন করতে হচ্ছে, মানুষ বাধ্য হচ্ছে। জনগণ যদি জীবন-জীবিকা চালিয়ে নিতে না পারে, তাদের মধ্যে অধিকারবোধ কমে আসে তাহলে জনগণ রাষ্ট্রীয় বিন্যাসের সঙ্গে মিসফিট হয়ে যায়।

সরকারের কাছে সংস্কার গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু জনগণের কাছে অধিক গুরুত্বপূর্ণ হলো প্রতিদিনের বাজার, প্রতিদিনের বেঁচে থাকা। দুই বিপরীত মেরুতে দাঁড়িয়ে গেছে পুরো ব্যবস্থা। রাষ্ট্র বা সরকারের চেয়ে বাজার সিন্ডিকেটকে শক্তিশালী মনে হচ্ছে। প্রকৃত অর্থে সরকারের শক্তিমত্তাকে ছাপিয়ে যাচ্ছে বাজার। অসম বাজারব্যবস্থা থেকে সবাই সমান সুফল ভোগ করতে পারছে না। যেমন, উৎপাদক বা কৃষক উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছে না। অন্যদিকে, মধ্যস্বত্বভোগী ও ফড়িয়ারা তুলে নিচ্ছে সিংহভাগ মুনাফা। খুচরা ব্যবসায়ীরা মুনাফা লাভে কম যায় না। ছোট বাজারগুলো ঘিরে খুচরা ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেটও দেখা যাচ্ছে। এসব বাজারে সব দোকানে একই পণ্যের একই দাম। কেজি প্রতি ৭০ টাকা আলু, সব দোকানেই ৭০ টাকা। লক্ষ করার মতো বিষয় হলোÑ গ্রামের বাজার, শহরের বাজার, রাজধানীর বাজারের মধ্যে পণ্যের দামে বিশেষ কোনো পার্থক্য নেই। ব্যবসায়ীরা প্রায়ই শ্রম, পরিবহন ইত্যাদি ব্যয়ের অভিযোগ তোলেন। কিন্তু এসব অভিযোগে কার্যত পণ্যমূল্যের সীমার যুক্তিও থাকছে না। মোবাইল ও প্রযুক্তির কারণে সবাই জেনে যাচ্ছে স্থানীয় ও জাতীয় বাজারের মূল্য পরিস্থিতি।

প্রকৃত  অর্থে, বাজার দেখার কেউ নেই। অভিভাবকহীন বাজার। যার যা ইচ্ছা সেভাবে মুনাফা তুলে নিচ্ছে। পরিস্থিতি বদলের জন্য মানুষ সংগ্রাম করল, জীবন দিল, আহত হলো। কিন্তু বাজার বিষয়ে দৃশ্যমান কোনো পরিবর্তন নেই। একজন কৃষক সংস্কার পদবাচ্য বা নির্বাচন কমিশন সংস্কার মতো বিষয়গুলো হয়তো অত পরিষ্কার বোঝেন না, তিনি যা বোঝেন তা হলো রাষ্ট্র বা সরকার তাকে স্বস্তি দিতে পারছে কি না। চাল-ডাল, আটা, শাকসবজি, ওষুধপত্র কিনতে বা বিদ্যুৎ বিল দিতে গিয়ে আয়-ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে পারছে কি না। না তাকে বাড়তি অর্থ গুনতে হচ্ছে বা অন্যের কাছে হাত পাততে হচ্ছে। জনস্বস্তির রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মূল্য আছে। জনগণ জীবন-জীবিকা চালাতে গিয়ে যদি উৎকণ্ঠিত হয়, শঙ্কিত হয় তাহলে তা সরকারের জন্য কোনো স্বস্তিদায়ক খবর হতে পারে না। জনগণের মধ্যে যাতে অস্বস্তি তৈরি না হয় তা ম্যানেজ করতে হয়। অ্যারাবিয়ান একটি প্রবাদ রয়েছে, অঙ্গীকার হচ্ছে মেঘের মতো, কেবল মেঘ জমলে হবে না, বৃষ্টি নামতে হবে। একটি অঙ্গীকার তখনই পূর্ণতা পায় যখন তা সফল হয়। রাষ্ট্রকে তার প্রতিশ্রুত অঙ্গীকারগুলো সফল করতে হবে।

অনেকে বলছেন, পটপরিবর্তনের পর দেশে দাবিনির্ভর সমাজ দেখা দিয়েছে। এসব দাবি কারও পক্ষে পূরণ করা সম্ভব নয়। পটপরিবর্তনের পর মানুষের মধ্যে দাবি তোলার প্রবণতা বেড়েছে। বিষয়টি এমন, অনেক ত্যাগ হয়েছে এবার আমাদের চাই। প্রতিটি অংশই তাদের বৈষম্যের দাবি তুলে অন্তর্বর্তী সরকারকে বিব্রত করে তুলছে। অন্তত কবির ভাষায় : ‘রথযাত্রা, লোকারণ্য, মহা ধুমধামÑ/ভক্তেরা লুটায় পথে করিছে প্রণাম।/ পথ ভাবে ‘আমি দেব’, রথ ভাবে ‘আমি’,/ মূর্তি ভাবে ‘আমি দেব’Ñ হাসেন অন্তর্যামী।’ তারপরও মূল কথা হলো, বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারকে আরও আন্তরিকতা দেখাতে হবে, জনগণের পাশে থাকতে হবে। অনিয়ন্ত্রিত বাজারের অভিঘাত সবার ওপর সমান নয়। সমাজের প্রান্তিক পর্যায়ে যাদের অবস্থা বিশেষত দিনমজুর, নিম্ন ও স্বল্প-আয়ের মানুষ এ পরিস্থিতির করুণ শিকার। তা খুব স্পষ্ট বোঝা যায়, ওএমএস পণ্য সংগ্রহে নারী-পুরুষ বৃদ্ধ ও যুবকের সারি দেখলে। রাষ্ট্র নাগরিকদের স্বল্পমূল্যে ওএমএস পণ্য কিনতে বাধ্য করছে। ব্যক্তির মানবিক মর্যাদা ক্ষুণ্ন হচ্ছে। দরিদ্রদের পরিচয় জনসম্মুখে প্রকাশিত হচ্ছে। এমন নির্মম রাষ্ট্র তো কেউ চাইনি আমরা। গরিবের পরিচয় গোপন রাখার অধিকারও আজ সুরক্ষিত নেই। অথচ ওএমএস অ্যাপ্রোচকে রাষ্ট্র দেখছে জনগণের প্রতি তার বদান্যতা হিসেবে। জনগণের ঘরের যে সমস্যা তা সরকারকে বিবেচনায় নিতে হবে বাজারের ওপর ন্যূনতম নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে হবে, বাজারে জনগণের প্রবেশগম্যতা সহজ এবং নিশ্চিত করতে হবে। মোদ্দাকথা, বাজার নিয়ে কোনোভাবেই নির্লিপ্ত থাকার সুযোগ নেই।

  • অধ্যাপক, ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা