অন্তর্বর্তী সরকার
মহিউদ্দিন খান মোহন
প্রকাশ : ২০ নভেম্বর ২০২৪ ০৯:০৮ এএম
মহিউদ্দিন খান মোহন
কিংবদন্তি সাহিত্যিক বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কপালকুণ্ডলা উপন্যাসের নায়ক নবকুমার সাগরতীরের এক বনভূমিতে আশ্রয়ের সন্ধানে যখন উদ্ভ্রান্তের ন্যায় এদিক-সেদিক হাঁটাহাঁটি করছিল, তখন কপালকুণ্ডলা সামনে এসে বলেছিল, ‘পথিক, তুমি পথ হারাইয়াছ?’ তারপর কপালকুণ্ডলা নবকুমারকে তার কুটিরে আশ্রয় দিয়ে কীভাবে তান্ত্রিক কাপালির হাত থেকে রক্ষা করেছিল তার রোমাঞ্চকর বর্ণনা রয়েছে সে উপন্যাসে। বিপদে পড়ে কিংবা পথ চলতে চলতে পথ হারানো বা দিগ্ভ্রান্ত হওয়া অস্বাভাবিক ব্যাপার নয়। গ্রামাঞ্চলে অন্ধকার রাতে আলো ছাড়া পথ চলতে গিয়ে অনেকে দিগ্ভ্রান্ত হয়ে অনেক সময় পথ হারিয়ে ফেলে। আমাদের বিক্রমপুরে এটাকে বলে ‘কানাহুলা’য় ধরা। এমনও দেখা গেছে, ওই ব্যক্তি পথ হারিয়ে সারা রাত ঘুরে সকালবেলায় দেখে গন্তব্যের খুব কাছেই সে রাতভর ঘুরেছে।

বাস্তবে পথ চলতে
গিয়ে পথ হারালে কষ্টসাধ্য হলেও তা হয়তো খুঁজে পাওয়া যায়। তবে জীবনের পথ যদি কেউ একবার
হারায়, তাহলে সে পথ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর হয়ে পড়ে। তেমনি রাজনীতিতেও পথ হারানোর ঘটনা
ঘটে। এ ক্ষেত্রে পথ হারালে তার খেসারত সংশ্লিষ্টদের পাশাপাশি জনগণকেও দিতে হয়। এজন্য
জ্ঞানী ব্যক্তিরা পথ চলতে সদাসতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। তা ব্যক্তিজীবনে যেমন, রাজনৈতিক
ক্ষেত্রেও তেমন। কর্তৃত্ববাদী স্বৈরশাসক শেখ হাসিনার পতন ও পলায়নের পর রাষ্ট্রক্ষমতায়
আসীন হয়েছে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। বিদ্যমান সংবিধানে
এ ধরনের সরকারের বিধান না থাকা সত্ত্বেও ‘ডকট্রিন অব নেসেসিটি’ তত্ত্বানুসারে সুপ্রিম
কোর্টের রেফারেন্সের ভিত্তিতে রাষ্ট্রপতি এ সরকারের শপথ করিয়েছেন। একটি সর্বাত্মক গণআন্দোলনের
প্রেক্ষাপটে গঠিত এ সরকারের কাছে তাই জনগণের প্রত্যাশা বিরাট। অতীতের বিভিন্ন সরকারের
স্বেচ্ছাচারিতার অবসান ঘটিয়ে দেশে একটি সত্যিকার গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার
পথ এ সরকার উন্মুক্ত করবে, এ প্রত্যাশা গণতন্ত্রপ্রিয় মানুষের। কিন্তু বিপুল জনসমর্থন
নিয়ে পথ চলতে শুরু করা অন্তর্বর্তী সরকারের তিন মাস পার হওয়ার পর অনেক কিছু কেমন যেন
এলোমেলো হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিভিন্ন ঘটনায় সচেতন ব্যক্তিদের কাছে প্রতীয়মান
হচ্ছে, ক্ষমতার একাধিক কেন্দ্র থেকে সরকার পরিচালিত হচ্ছে। পথ চলতে সরকার তার নির্দিষ্ট
পথ হারাতে বসেছে কি না এ সংশয় জেগেছে কারও কারও মনে।
ক্ষমতাসীন হওয়ার
পরপরই অন্তর্বর্তী সরকার রাষ্ট্রব্যবস্থার আমূল সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে। সে লক্ষ্যে
সংবিধান, প্রশাসন, নির্বাচনব্যবস্থাসহ ১০টি সেক্টরে সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়েছে। কমিশনগুলো
বর্তমানে কাজ করছে। তবে বিএনপিসহ কয়েকটি রাজনৈতিক দল শুরু থেকেই দ্রুত নির্বাচন দাবি
করে আসছে। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর দাবি ‘আগে সংস্কার পরে নির্বাচন’। অবশ্য রাষ্ট্র
সংস্কার ও একটি নিরপেক্ষ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনের ব্যবস্থা করার জন্য সরকারকে
দেশবাসী ও রাজনৈতিক দলগুলো ‘পর্যাপ্ত’ সময় দিতে অঙ্গীকার করেছে। যদিও কোনো কোনো রাজনৈতিক
দলের মধ্যে এ ব্যাপারে অসহিষ্ণুতা লক্ষ করা যাচ্ছে। তারা লাগাতার বলে চলেছে, সরকার
দীর্ঘমেয়াদে ক্ষমতায় থাকার লক্ষ্যে নির্বাচন দিতে অহেতুক বিলম্ব করতে চায়।
এদিকে বিভিন্ন
কর্মকাণ্ডে সরকারের ভেতর সমন্বয়হীনতার বিষয়টি অস্পষ্ট থাকছে না। সরকারের গৃহীত নানা
পদক্ষেপে এটা বেশ বোঝা যাচ্ছে, তাদের চলার পথে কোথাও বিঘ্ন ঘটছে, যেজন্য গতি শ্লথ হয়ে
পড়েছে। ১৩ নভেম্বর আগারগাঁওয়ের পঙ্গু হাসপাতালে যে ঘটনা ঘটেছে তাকে অবজ্ঞা করার উপায়
নেই। আন্দোলনে আহত ও চিকিৎসাধীন রোগীরা স্বাস্থ্য উপদেষ্টাকে ঘোরাও করে আটকে রেখে তাদের
এতদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছে। পরে উপদেষ্টা স্বীকার করেছেন, আমলাতান্ত্রিক
জটিলতার কারণে আহতদের প্রতি যথাযথ নজর দেওয়া যায়নি। তবে তার এ কৈফিয়ত কারও কাছে গ্রহণযোগ্য
মনে হয়নি। আহতদের চিকিৎসার ক্ষেত্রে আমলাতন্ত্র কীভাবে বাধার কারণ হতে পারে তা বোধগম্য
নয়।
এদিকে সম্প্রতি
যে তিনজন নতুন উপদেষ্টা নিয়োগ দেওয়া হয়েছে তা নিয়েও জনমনে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে
চলচ্চিত্র নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী ও ব্যবসায়ী শেখ বশির উদ্দিন কোন যোগ্যতায়
এবং যুক্তিতে উপদেষ্টার পদে বসলেন, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এর মধ্যে একজনের শিক্ষাগত
যোগ্যতা নিয়ে সর্বত্র মুখরোচক গল্প চলছে। কেউ কেউ তার শিক্ষাগত যোগ্যতাকে ‘টিটিএমপি’
মানে ‘টেনেটুনে ম্যাট্রিক পাস’ বলে কটাক্ষ করছেন। এহেন শিক্ষাগত যোগ্যতাসম্পন্ন একজন
ব্যক্তি কী করে ক্যাবিনেট মন্ত্রীর মর্যাদায় উপদেষ্টা হতে পারেন, এ নিয়ে অনেকেই প্রশ্ন
তুলেছেন। অন্যজনকে নিয়ে রয়েছে আরও গুরুতর প্রশ্ন। তার ভাই পতিত আওয়ামী লীগের সাবেক
এমপি। তা ছাড়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-গণ আন্দোলনে রাজধানীর বনশ্রীতে একজন ছাত্রের হত্যার
মামলায় তারা দুই ভাই-ই অভিযুক্ত আসামি। এমন একজন মানুষকে সর্বজনশ্রদ্ধেয় ড. ইউনূস কী
ভেবে তার পরিষদে ঠাঁই দিলেন এ এক বিস্ময়কর ব্যাপার। অন্যদিক প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ
সহকারী মাহফুজ আলম, যাকে তিনি গণঅভ্যুত্থানের ‘মাস্টারমাইন্ড’ খেতাবে ভূষিত করেছেন,
তাকে দপ্তরবিহীন উপদেষ্টা করা হয়েছে। যেখানে এখনও একেকজন উপদেষ্টার কাঁধে দুই বা ততোধিক
দপ্তরের ভার রয়েছে, সেখানে মাহফুজ আলমকে দপ্তরবিহীন উপদেষ্টা কেন করা হয়েছে তা-ও প্রশ্ন
।
সবচেয়ে বড় ব্যাপার হলো, যে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ফসল এ সরকার, সেই শিক্ষার্থীরাই এর বিরুদ্ধে বিক্ষোভ সমাবেশ করে দুজনের অপসারণ দাবি করেছেন। আরেকটি বিষয় অনকেরই দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। সাধারণত একটি সরকারের একজন নির্দিষ্ট মুখপাত্র থাকেন, যিনি সরকারের পক্ষ থেকে মিডিয়ায় কথা বলেন। কিন্তু লক্ষ করা যাচ্ছে, প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব, উপ-প্রেস সচিবরা একই দিনে ভিন্ন ভিন্ন বিষয়ে মিডিয়ায় কথা বলছেন। এটাকে যদি সমন্বয়হীনতা বলে চিহ্নিত করা হয়, তাহলে বোধকরি ভুল হবে না। ঘটনাদৃষ্টে অনেকরই মনে সংশয় জেগেছে, অন্তর্বর্তী সরকার পথ চলতে গিয়ে দিগ্ভ্রান্ত হয়ে খেই হারিয়ে ফেলছে কি না। পথ হারিয়ে উদ্ভ্রান্ত নবকুমারকে কপালকুণ্ডলা পথ দেখিয়ে উদ্ধার করেছিল। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারকে সঠিক পথের দিশায় ফিরিয়ে আনার জন্য কোনো কপালকুণ্ডলার আবির্ভাব কি ঘটবে? অন্তর্বর্তী সরকারকে ঘিরে জনপ্রত্যাশা যেন ভেস্তে না যায় সেটাই প্রত্যাশা।