দিবস
ডা. মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ
প্রকাশ : ২০ নভেম্বর ২০২৪ ০৯:০৫ এএম
১৯৮৯ সালের ২০ নভেম্বর বিশ্বনেতারা শিশু অধিকার বিষয়ে জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদ বাস্তবায়ন করেন, যা বিশ্বের ইতিহাসে ব্যাপকভাবে অনুমোদিত মানবাধিকার চুক্তি। তারপর থেকে সর্বজনীন শিশু দিবস নভেম্বরের ২০ তারিখ। শিশু অধিকার সনদের আলোকে শিশুদের জন্য এবং শিশুদের নিয়ে বিশ্বব্যাপী এই দিবস পালিত হয়। এই দিনে ইউনিসেফ শিশুদের সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলো সমাধানে সমর্থন আদায় করে, শিশু অধিকার বিষয়ে সচেতনতা বাড়ায় এবং প্রয়োজনীয় তহবিল সংগ্রহ করে। বিশ্বের প্রত্যেক শিশু যেন ন্যূনতম জীবন যাপন করতে পারে, সেটা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সবারই। এজন্য শিশুদের সুযোগ দিতে হবে নানা ক্ষেত্রে। এভাবে শিশু যেমন নিজের যোগ্যতা সম্পর্কে বুঝতে পারবে, তেমনি সমাজের প্রতি তার দায়িত্ববোধের জায়গাও তৈরি হবে। এতে করে শিশুরা নিজেদের অবস্থানকে শক্ত জায়গায় নিয়ে যেতে পারবে, নিজের জন্য, অন্য শিশুর জন্যও।
শিশু দিবসের জন্মের গুরুত্বটা কাগজে-কলমে প্রথমে বুঝেছিলেন
ড. চার্লস লিওনার্দো ১৮৫৭ সালে। জুনের দ্বিতীয় রোববার শিশুদের যত্নের জন্য দিনটি
বিশেষভাবে নির্ধারণ করেছিলেন তিনি। লিওনার্দো দিনটির নাম
দিয়েছিলেন রোজ ডে বা গোলাপের দিন বলে। আন্তর্জাতিকভাবে শিশু দিবসের ঘোষণা সামনে
আসে ১৯২৫ সালে জেনেভায় বিশ্ব সম্মেলনে। দেশের মোট জনসংখ্যার
শতকরা ৪০ ভাগেরও বেশি শিশু। তার মধ্যে আবার ১৫ শতাংশের বেশি শিশু দরিদ্র। ওয়ার্ল্ড
ভিশনের জরিপে জানা যায়,
করোনাভাইরাস সংক্রমণের কারণে বিশ্বের ৯১ শতাংশ শিশু ও তরুণ
মানসিক চাপ ও শঙ্কার মধ্যে রয়েছে। আমাদের শিশুরাও এ পরিস্থিতির বাইরে নয়।
ইউনিসেফের এক গবেষণায় জানা যায়, ২০২০ সালের মহামারির পর থেকে বাংলাদেশে
কিশোরীদের বিয়ের হার বেড়েছে ১৩ শতাংশ। অপুষ্টিকে দেখা হয় শিশুর
শারীরিক ও মানসিক উন্নতির সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে
শিশুর অপুষ্টি এখনও মারাত্মক একটি জনস্বাস্থ্য সমস্যা হয়ে রয়েছে। বিশ্বব্যাপী
তীব্রতম অপুষ্টিতে ভোগা শিশুর সংখ্যার দিক থেকে এখনও ওপরের তালিকায় বাংলাদেশ।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, মারাত্মক তীব্র অপুষ্টি
পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশুদের অসুস্থতা ও মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ।
শিশু দিবসের জাতিসংঘের চাওয়া শিশুকে শিশুর সঙ্গে মেলামেশার
সুযোগ করে দেওয়া। এতে করে শিশুরা নিজেদের মধ্যে ভাবের আদান-প্রদান করবে জাতিতে, গোষ্ঠীতে।
নিজেরা নিজেদের উৎসাহ দেবে,
নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করবে। আর
এসবের মাধ্যমে এই শিশুরাই একদিন হয়ে উঠবে সমাজ-সচেতন, রাষ্ট্র-সচেতন, সর্বোপরি
অধিকার সচেতন। বিশ্বে পনেরো কোটিরও বেশি পাঁচ থেকে ১৪ বছর বয়সি শিশু ঝুঁকিপূর্ণ
কাজের সঙ্গে যুক্ত, যা জাতিসংঘ সনদের পরিপন্থি, শিশু অধিকারের পরিপন্থি।
পৃথিবীর প্রত্যেক শিশু যেন ন্যূনতম জীবন যাপন করতে পারে, সেটা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সবারই। এজন্য শিশুদের সুযোগ দিতে হবে নানা ক্ষেত্রে। এমনকি রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ কাজেও। তাতে শিশু যেমন নিজের যোগ্যতা সম্পর্কে বুঝতে পারবে, তেমনি সমাজের প্রতি তার দায়িত্ববোধের জায়গাও তৈরি হবে। এতে করে শিশুরা নিজেদের অবস্থানকে শক্ত জায়গায় নিয়ে যেতে পারবে, নিজের জন্য, অন্য শিশুর জন্যও। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে, শিশু অধিকার তৈরির জন্য অভিনব কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর মধ্যে যেমন রয়েছে, এক দিনের জন্য কোনো শিশুকে কোনো শহরের মেয়র কিংবা, পুলিশ বিভাগের সর্বোচ্চ কর্তা বানিয়ে দেওয়া। কিংবা কোনো প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ ক্ষমতায় বসানো। দেশেও এমন অভিনব উদ্যোগ শুরু হয়েছে। শিশুদের আরও ব্যতিক্রমী সুযোগ করে দিতে হবে। এ-রকম ব্যতিক্রমী উদ্যোগ শিশুকে তার ভবিষ্যতের কর্মপন্থা সম্পর্কে অভিজ্ঞতা দেবে, তার অধিকার সম্পর্কে সচেতন করবে, তেমনি শিশুদের প্রতি আমাদের দায়িত্বের কথাও মনে করিয়ে দেবে। মনে করিয়ে দেবে শিশুরাও এই পৃথিবীর কেবল অংশীদারই নয়, ভবিষ্যতের পৃথিবীটাও তো একসময় আজকের শিশুদের হাতেই থাকবে।