× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

সম্পাদকীয়

আর্থিক খাতে সবার আগে চাই সুশাসন

সম্পাদকীয়

প্রকাশ : ১৯ নভেম্বর ২০২৪ ০৯:১৫ এএম

আর্থিক খাতে সবার আগে চাই সুশাসন

দেশের আর্থিক খাতগুলোর মধ্যে ব্যাংক খাতের দুরবস্থা নতুন করে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ নিষ্প্রয়োজন। ১৮ নভেম্বর প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর একাধিক প্রতিবেদনে আর্থিক খাতের বিশৃঙ্খলার কয়েকটি চিত্র উঠে এসেছে। সিপিডির গবেষণায় বলা হয়েছেÑ দুর্নীতি, মূল্যস্ফীতি, উচ্চ কর হারসহ ১৭ ধরনের বাধায় বিপর্যস্ত দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য। একই সঙ্গে সিপিডি সতর্কবার্তা দিয়েছেÑ আগামী দুই বছরে দেশের অর্থনীতিতে তিন ধরনের ঝুঁকি থাকবে। ১৭ নভেম্বর রাজধানীর মহাখালীর ব্র্যাক সেন্টারে ‘বাংলাদেশে ব্যবসায়িক পরিবেশ সংস্কার : অন্তর্বর্তী সরকারের এজেন্ডা’ শীর্ষক এক সংলাপে এসব বিষয় তুলে ধরেছে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি)। ভিন্ন এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত তিন মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৭৪ হাজার কোটি টাকা। এ নিয়ে আর্থিক খাতে মোট খেলাপি ‍ঋণ দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৮৪ হাজার ৯৭৭ কোটি টাকা।

দুর্নীতি আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজের স্তরে স্তরে কীভাবে জেঁকে বসেছে, এর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ নতুন করে প্রয়োজন হয় না। মূল্যস্ফীতির কশাঘাত সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা বিপর্যস্ত করে ফেলেছে। আমরা ইতঃপূর্বে এই স্তম্ভেই বহুবার বলেছি, অন্তর্বর্তী সরকার বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করেও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে না পারার পেছনে দুর্নীতিবাজদের কারসাজিই অন্যতম প্রধান কারণ। দুর্নীতি বরাবরই আমাদের অন্যতম সমস্যা এবং ক্ষমতাচ্যুত সরকারের শাসনামলে দুর্নীতি নামক ব্যাধি কতটা ছড়িয়ে পড়েছিল তাও এখন পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে একের পর এক উন্মোচিত হচ্ছেÑযা এক কথায় ভয়াবহ। দুর্নীতি, আমলাতন্ত্রের অদক্ষতা, বৈদেশিক মুদ্রার অস্থিতিশীলতা, অপর্যাপ্ত অবকাঠামো, নীতির অস্থিতিশীলতা ইত্যাদি বিষয়কে সিপিডি আর্থিক খাতের বড় উপসর্গ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

খেলাপি ঋণ সমস্যা এখন রীতিমতো সংকটে পরিণত হয়েছে। ক্ষমতাচ্যুত সরকারের আমলে অনেক ঋণখেলাপিই কৌশলে ঋণ নবায়ন করার পাশাপাশি নতুন ঋণ নিয়ে সেটাও সময়মতো পরিশোধ না করে আর্থিক খাতের উপসর্গ আরও বাড়িয়ে তোলেন। দেশের পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটেও খেলাপি ‍ঋণের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি প্রশ্নের উদ্রেক করে। আমরা দেখছি, দেশের কয়েকটি ব্যাংক চরম তারল্য সংকটে ভুগছে। ৯টি ব্যাংককে অধিকতর দুর্বল ব্যাংক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই ব্যাংকগুলোর গ্রাহকরা চরম বিপাকে পড়েছেন। প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সুশাসনের অভাব, অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার কারণে জুলাই-সেপ্টেম্বর মাসে খেলাপি ঋণের পরিমাণ আরও বেড়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিক তথা সেপ্টেম্বর শেষে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ২৬ হাজার ১১১ কোটি টাকাÑযা তাদের বিতরণ করা ঋণের ৪০ দশমিক ৩৫ শতাংশ। অন্যদিকে বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৪৯ হাজার ৮০৬ কোটি টাকাÑযা তাদের বিতরণ করা ঋণের ১১ দশমিক ৮৮ শতাংশ। অন্তর্বর্তী সরকার বিগত দিনের কদাচার-দুরাচার-অনাচারের বৃত্ত থেকে ব্যাংক খাতসহ অন্যান্য আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে বহুমাত্রিক চেষ্টা অব্যাহত রাখলেও এর সুফল দৃশ্যমান করা এখনও কঠিন বিষয় হয়ে আছে। অভিযোগ আছে, বিগত সরকারের দুর্নীতিবাজদের অপচ্ছায়া অনেক ক্ষেত্রেই রয়ে গেছে।

সম্প্রতি অর্থ উপদেষ্টা বলেছেন, পণ্য আমদানিতে শুল্ক হ্রাস করেও সাধারণ মানুষের কাছে এর সুফল পৌঁছে দেওয়া যাচ্ছে না। অসাধু ব্যবসায়ীদের নানা রকম কারসাজির পাশাপাশি তিনি আরও অনেক চিত্রই সামনে এনেছেন। প্রায় একই বক্তব্য দিয়েছেন, খাদ্য উপদেষ্টাও। বাজারের ‘নাটাই’ যারা ঘুরিয়ে ভোক্তার পকেট কেটে নিজেদের আখের গোছাচ্ছেন, তাদের চিহ্নিত করার তাগিদ নানা মহল থেকে বারবার উঠলেও এর কোনো প্রতিবিধান নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। বাজারে এখনও সিন্ডিকেটের দাপট কীভাবে চলছেÑএও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। আমরা মনে করি, সিপিডির গবেষণা প্রতিবেদনটি আমলে নেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে আমরা বিজনেস রেগুলেটরি রিফর্ম কমিশন গঠনের তাগিদও দিই।

আমাদের স্মরণে আছে, গত ফেব্রুয়ারি মাসে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) শর্ত বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও খেলাপি ঋণ কমানোর প্রত্যয় ঘোষণা করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ সংক্রান্ত একটি নীতিমালাও ঘোষণা করা হয় বাংলাদেশ ব্যাংকের তরফে। এ ছাড়া ব্যাংক খাতে করপোরেট সুশাসন নিশ্চিত করার মাধ্যমে সীমাতিরিক্ত, বেনামি স্বার্থসংশ্লিষ্ট এবং জালিয়াতির মাধ্যমে ঋণ বিতরণের পরিমাণ শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার লক্ষ্যও নির্ধারণ করা হয়েছিল। আমরা জানি, ক্ষমতাচ্যুত সরকারের শাসনামলে বাংলাদেশ ব্যাংকের তরফে এমন অনেক প্রত্যয়ই ঘোষণা করা হয়েছিল বটে, কিন্তু কার্যত সুশাসন প্রতিষ্ঠায় কোনো উদ্যোগ তো নেওয়াই হয়নি; উপরন্তু অনিয়ম-দুর্নীতির ক্ষেত্র আরও প্রসারিত করা হয়। পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে আমরা আশা করি, ব্যাংক খাতকে বাংলাদেশ ব্যাংক অনাচার-দুরাচারমুক্ত করার লক্ষ্যে কঠোর অবস্থান নেবে এবং এর সাফল্যও দৃশ্যমান করে তুলবে। ব্যাংক খাতকে অর্থনীতির লাইফ লাইন বলা হয়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, এই খাতে রাজনৈতিক সরকারের শাসনামলে হীনস্বার্থবাদীরা যে থাবা ফেলে এরই উত্তরাধিকার বহন করছে বর্তমান সরকার। আমরা জানি, সরকার জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলো সংস্কারের লক্ষ্যে ইতোমধ্যে সংস্কার কমিশন গঠন করেছে এবং এরই ধারাবাহিকতায় অনিয়ম-দুর্নীতিমুক্ত প্রতিষ্ঠান গড়ার লক্ষ্যে কাজও চলছে।

আর্থিক খাতের স্তরে স্তরে অনিয়ম-দুর্নীতি যেভাবে জেঁকে বসেছিল, এর শেকড়বাকড় এখনও রয়ে গেছে। আমরা মনে করি, দ্রুততম সময়ের মধ্যে এগুলো উপড়ে ফেলা জরুরি। পুরো খাতটিকে ঢেলে সাজানোর পাশাপাশি এর উৎস থেকে উৎসে নজর গভীর করাও সমভাবেই গুরুত্বপূর্ণ। শুধু সংস্কার করেই দায়িত্ব শেষ করা যাবে না, অনিয়ম-দুর্নীতির যারা ছায়া ছড়িয়েছে, তাদের অনুসন্ধান করে বিচারের আওতায় আনতে হবে। আর্থিক খাতে সুশাসন নিশ্চিত হলে এর ইতিবাচক প্রভাব বিভিন্ন খাতে পড়বে। দুর্নীতি এখনও কতটা ব্যাপক ও বিস্তৃত এরও সাক্ষ্য মিলেছে সিপিডির গবেষণা প্রতিবেদনে। তারা অনুসন্ধানে জেনেছে, কর সেবা পেতে ঘুষ দিতে হয় ৫৭ শতাংশ ব্যবসায়ীকে। ব্যবসায়ী প্রতিযোগিতার মানদণ্ডে বাংলাদেশ এখনও শ্রীলঙ্কা ও ভারতের চেয়ে পিছিয়ে রয়েছে। বছরের পর বছর জিইয়ে থাকা অদক্ষ আমলাতন্ত্রও উল্লিখিত ব্যাধিগুলোর উপসর্গ হয়ে আছে। আমরা মনে করি, এসব দিকেই সমগুরুত্বে নজর দেওয়া বাঞ্ছনীয়।

দেশের অর্থনীতির বৃহৎ স্বার্থে ব্যবসা-বাণিজ্যের পথে বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতা দূর করতেই হবে। একই সঙ্গে খেলাপি ঋণের ব্যাপারে নিতে হবে কঠোর অবস্থান। ঋণ নিয়ে ফেরত না দেওয়ার যে অপসংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, তা নির্মূল করতে হবে। পেশাদারত্বের সঙ্গে আর্থিক খাত পরিচালনায় সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল সব পক্ষকে মনোযোগ বাড়াতে হবে। 

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা