প্রেক্ষাপট
এস এম ইমদাদুল হক
প্রকাশ : ১৮ নভেম্বর ২০২৪ ০৮:৪৮ এএম
প্রস্তুর যুগে ব্যক্তিতে ব্যক্তি যোগাযোগের মাধ্যমে গড়ে উঠেছিল ডেরা জীবন। এরপর মানুষ-মানুষ শেকলের মধ্যে যুক্ত হয় জীবনের গল্পমালা। সেখানে সভ্যতার প্রয়োজনে নিয়ে আসা হয় জীবন গল্পের সত্যায়ন (ডকুমেন্টেশন) পর্ব। টুকরো টুকরো ঘটনা ডকুমেন্টেশনের মাধ্যমে বাস্তবতার জন্ম দেয়। আজকে একজন ব্যক্তির জীবনের বাস্তবতা ‘জন্ম থেকে মৃত্যু’ সনদের মধ্যে সত্য রূপ পায়। এর মধ্যে যুক্ত রয়েছে নাগরিক আইডি কিংবা পাসপোর্ট। পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হয় ইনপুট, অ্যানালাইসিস ও আউটপুটের মাধ্যমে। নিবন্ধন বই থেকে সনদে রূপান্তরের পুরো বিষয়টিই অ্যানালগ কম্পিউটিং। কাজটি যখন কম্পিউটার, নেটওয়ার্ক ও সার্ভারের মাধ্যমে ঘটে, তখন আমরা এর ডিজিটাল রূপান্তর দেখি। সেই পথপরিক্রমায় এখন যুক্ত হয়েছে এআই প্রযুক্তি।
বিস্ময়ের বিষয়
হলোÑ মোবাইল ফোন, সিসিটিভি, সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে ডকুমেন্টেশনের কাজটি ‘এআই’ করছে
বলে আমরা অনুমান করতে শুরু করেছি। বিশ্বে প্রতি আটজনের জন্য একটি করে সিসিটিভি ব্যবহৃত
হচ্ছে। সাড়ে ৭০০ কোটি মানুষের হাতে মোবাইল ফোন। সাড়ে ৫০০ কোটি মানুষ সোশ্যাল মিডিয়ায়
সংযুক্ত। ওঠতে-বসতে সবকিছুই এখন আমরা তথ্য-পরামর্শে গুগল থেকে এআই করছি। এআই দিয়ে ভবিষ্যৎ
দেখা ও সত্যায়নের কাজেও মনোযোগী হয়েছি। জীবনের হিসাবও কষছি। কেননা, ফেসিয়াল রিকগনেশনের
মাধ্যমে চোখ পিটি পিট থেকে শুরু করে রাগ-ক্ষোভ, দুঃখ-আনন্দ পড়তে পারে চীনের তৈরি এআই-নির্ভর
সিসি ক্যামেরা। আমরা নিজে থেকেই সোশ্যাল মিডিয়ায় নিজেকে উজাড় করে দেই। সেই তথ্য নিয়ে
গড়ে উঠেছে বিপুল বাণিজ্য। সঙ্গে থাকা মোবাইল ফোনটি শুনছে আমাদের প্রকাশ্য-গোপন সবকিছুই।
কিন্তু সেই কথা কে শুনছে, কোথায় যাচ্ছে, কার কাচ্ছে যাচ্ছেÑ আমাদের সবার জানা নেই।
কোনো প্রাইভেসি আর নেই। প্রতিনিয়ত আমরা আছি সার্ভিল্যান্সে। আমার তথ্য নিয়ে গড়ে উঠেছে
‘সার্ভিল্যান্স ক্যাপিটালিজম’। এর ওপর ভিত্তি করেই চীনে হালে শুরু হয়েছে সোশ্যাল ক্রেডিট।
এই প্রক্রিয়ায় ব্যক্তিগত তথ্য নিয়ে প্রাপ্ত ডেটা পয়েন্ট বা স্কোরিং বিবেচিত হচ্ছে
‘কারেন্সি’ হিসেবে।
সব মিলিয়ে অঘোষিতভাবেই আমরা এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে অতিমানবীয় হিসেবে গণ্য করতে শুরু করেছি। তাকে দিয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করাচ্ছি। চাইলেই এআই দিয়ে সত্য-মিথ্যাকে একাকার করা যাচ্ছে। ফেইক নিউজের জনপ্রিয়তা বাড়ছে। কেননা, এআই যুগে এসে আমরা তথ্য তৈরি এবং তথ্য তৈরির জায়গাটা ‘কম্পিউটার’কে দিচ্ছি। সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে ‘ষড়যন্ত্র তত্ত্বগুলো’ বাস্তবায়িত হচ্ছে। বিভিন্ন সহিংস ইস্যুতে ফেসবুকের অ্যালগরিদম নিয়ে বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে। ইউজার এঙ্গেজমেন্ট থেকে তৈরি ইকো-সিস্টেমে ব্যবহারকারীদের ডোপমিন সিক্রেশন ঘটাচ্ছে। বলতে দ্বিধা নেই ইন্টিলিজেন্স কম্পিউটার এগিয়ে থাকলেও এটি কনসাসনেস বা চেতনায় মানুষের থেকে পিছিয়ে। আত্মমাত্রিকতা, আত্মচেতনা, অনুভূতিশীলতা, পৃথকীকরণ ক্ষমতা এবং নিজের সত্তা ও আশপাশের পরিবেশের মধ্যকার সম্পর্ক অনুধাবনের ক্ষমতা এআইয়ের নেই। কেননা, জীবন দর্শনের উন্নয়ন ঘটে জীবনের ভ্যালু সিস্টেম তথা অভিজ্ঞতা, উপলব্ধি, অনুভূতি থেকে। কম্পিউটারের ঘটে থাকা বিপুল তথ্য এআই প্রকৃত অবস্থাটা বিশ্লেষণ করতে সক্ষম হলেও তা সঠিক নয়। কম্পিউটার কিংবা এআইয়ের নিজের অনুভূতি নেই। কিন্তু সে মানুষের অনুভূতি উস্কে দিতে পারে। এমনকি ব্ল হোয়েল গেমের মতো মানুষকে বিপদগামীও করতে পারে। দুশ্চিন্তার বিষয় হচ্ছেÑ তুমুল জনপ্রিয়তায় থাকা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় নেই নিজে থেকেই সংশোধন করার সুযোগ। স্মরণে রাখতে হবে, সত্য-মিথ্যার উপাত্তে এআই একগুঁয়ে একটি ভার্চুয়াল স্বত্বা। সে কখনই সঠিক পথের দিশা দিতে পারে না।