সরকারের ১০০ দিন
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
প্রকাশ : ১৬ নভেম্বর ২০২৪ ০৮:৩৯ এএম
আপডেট : ১৬ নভেম্বর ২০২৪ ১৩:১০ পিএম
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
রাষ্ট্র ও সরকার এক নয়। রাষ্ট্র সহজে বদলায় না, কিন্তু সরকার বদলানো অসম্ভব নয়। যেমনটি আমরা দেখলাম গত জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে। ৫৩ বছরে রক্তস্নাত এই বাংলাদেশে চড়াই-উতরাইয়ে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটেছে, কিন্তু ইতিহাস থেকে কেউ শিক্ষা নেননি। এবার কি ইতিহাসের সেই ধারা থেকে সরে আসতে পারবে এদেশÑ এই প্রশ্ন উঠেছিল অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে। আরও প্রশ্ন উঠেছিলÑ রাষ্ট্র কি সেই ঔপনিবেশিক চরিত্র ও বৈষম্যের কাঠামো থেকে বের হয়ে এসে জনগণের রাষ্ট্রে রূপান্তরিত হতে পারবে? নাকি সাম্রাজ্যবাদের কবলে পড়ে ধর্মান্ধদের রাহুগ্রাসে পরিণত হবে?
যে বিশেষ প্রেক্ষাপটে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়েছিল তাদের মেয়াদ ১০০ দিন পূর্ণ হলো। গত ১০০ দিনে ইতিবাচক-নেতিবাচক অনেক চিত্রই দেখা গেছে। বাজার পরিস্থিতি নিয়ে সাধারণ মানুষের কষ্টের শেষ নেই। এ সরকারের দায়িত্বশীল কেউ কেউ বলেছেন, বাজারে বিশৃঙ্খলা বিরাজ করছে; তাই পণ্য আমদানিতে শুল্ক হ্রাস করেও ভোক্তাদের কোনো স্বস্তি দেওয়া যাচ্ছে না। ক্ষমতাচ্যুত সরকারের যে অসাধু চক্র সিন্ডিকেট গড়ে বাজারের লাটাই ঘোরাত তারাই কি এখনও সক্রিয়? বিষয়টি অনুসন্ধানের এবং নিশ্চয়ই যথাযথ প্রতিবিধানের দাবি রাখে। জননিরাপত্তার বিষয়টিও প্রশ্নবিদ্ধ এবং দেশে যৌথ বাহিনীর অভিযান চলা সত্ত্বেও অপরাধীদের দাপটে সমাজ কাঁপছে থর থর করে। খুন, ডাকাতি, ছিনতাইসহ বহুবিধ অপরাধের ছায়া অনেক বিস্তৃত। জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায় সরকারের এবং নিশ্চয়ই এক্ষেত্রে অজুহাত দাঁড় করানোর কোনো অবকাশ নেই।
এ সরকারের দায়িত্ব নির্বাচন করে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করা। আমরা দেখব, কতটা দ্রুততম সময়ের মধ্যে তারা কাজটি করতে পারেন। নানা ক্ষেত্রে সংস্কারের যে দাবি উঠেছে, তা মোটেও অপ্রাসঙ্গিক নয়, কিন্তু কাজটি দ্রুততার সঙ্গে সম্পন্ন করে একটি স্বচ্ছ নির্বাচন প্রক্রিয়া-ব্যবস্থা গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি। আমাদের বিরাট একটি ধাক্কা লেগেছে। জুলাইয়ে কোটা সংস্কার আন্দোলন যখন শুরু হলো তখন কেউ-ই ভাবেননি ওই আন্দোলন এমন পর্যায়ে পৌঁছবে, যা সরকার পতনের কারণ হয়ে দাঁড়াবে। ড. মুহাম্মদ ইউনূস বিপ্লবোত্তর দেশে ফ্রান্স থেকে এসে দায়িত্ব নিয়েছিলেন, যেমনটা ১৯৭২ সালে নিয়েছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তান থেকে ফিরে। ফ্রান্স থেকে এসে ইরানের ক্ষমতা নিয়েছিলেন খোমেনি। জুলাই-আগস্টে যে ঘটনাটি আমাদের দেশে ঘটেছে এটা বিপ্লবও নয়, নয় দ্বিতীয় স্বাধীনতাও।
জাতীয় মীমাংসিত গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের হস্তক্ষেপ সঠিক হবে বলে মনে করি না। সংবিধানে সংশোধন আসতে পারে, তবে পুনর্লিখন মোটেও কাম্য নয়। এ সরকার গঠিত হয়েছে সংবিধানের ওপর ভিত্তি করেই। কাজেই এই সংবিধান বাতিলের কোনো অবকাশ এ সরকারের নেই। এ সরকার গণআকাঙ্ক্ষা পূরণের সরকারও নয়, এটাও আমাদের মনে রাখতে হবে। গণআকাঙ্ক্ষা পূরণ করবে নির্বাচিত সরকার।
চাকরিতে কোটার প্রশ্নে শুরু হয়েছিল যে নিরীহ আন্দোলন তা ক্রমেই স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে রূপ নিল। ব্যাপক রক্তপাত ঘটল, প্রাণহানি হলো। শেখ হাসিনা দেশ ছাড়লেন। এসব প্রেক্ষাপটে আরও প্রশ্ন দাঁড়ায়Ñ ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের লক্ষ্য এ পর্যন্ত কতটা অর্জিত হলো? এর উত্তর সহজ নয়। কারণ, প্রত্যাশা অনেক ব্যপ্ত। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রের শুধু পোশাক পরিবর্তন হয়েছে আর কোনো পরিবর্তন হয়নি। চরিত্রগতভাবে রাষ্ট্রের পরিবর্তন ঘটাতে হবেÑ এটাই হলো মূল কথা। মনে রাখা উচিত, তরুণরাই অতীতে বড় দুটি ঘটনা এই ভূখণ্ডে ঘটিয়েছেন। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান ছাত্ররা অগ্রভাগে না থাকলে হতো না। মুক্তিযুদ্ধেও তারা ছিলেন অন্যতম শক্তি। স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী আন্দোলন ও শেখ হাসিনার পতনও তরুণদের দিয়ে শুরু করা আন্দোলনের মধ্য দিয়েই। অতএব অন্তর্বর্তী সরকারকে পুরো অধ্যায়টি আমলে রেখে কাজ চালাতে হবে।
যে কারণে এ সরকার গঠনের প্রেক্ষাপট রচিত হয়েছিল, তাও তাদের মনে রাখা বাঞ্ছনীয়। আমাদের দুর্ভাগ্য, কোনো সরকারই জনগণের পক্ষে ছিল না। অন্তর্বর্তী সরকার কতটা জনগণের পক্ষে, জনকল্যাণেই-বা তারা কতটা কী করল, এসব ব্যাপারে চূড়ান্ত কথা বলার সময় এখনও আসেনি। তবে প্রশ্ন হচ্ছেÑ ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের পরও কি আমাদের মুক্তি ঘটেছে? না, ঘটেনি। যেমনটি আমরা দেখেছি, ৭১-এ স্বাধীনতা অর্জন করেও মুক্তি ঘটেনি আর স্বৈরাচার এরশাদের পতন ঘটিয়েও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ বিনির্মাণ সম্ভব হয়নি। এই প্রেক্ষাপটে ফ্যাসিস্ট সরকারের পতন ঘটিয়ে গঠিত এই অন্তর্বর্তী সরকার কতটা সফল হলো, এই প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর এখনই দেওয়া যাবে না।