সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ১৬ নভেম্বর ২০২৪ ০৮:১৯ এএম
এ স্তম্ভেই আমরা কিছুদিন আগে প্রশ্ন রেখেছিলাম, পাহাড়ে এত আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলাবারুদ আসে কোথা থেকে। ১৪ নভেম্বর বান্দরবানের রুমা উপজেলায় একে-৪৭ রাইফেলসহ বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধারের ঘটনাটি সেই প্রশ্নটিই ফের সামনে নিয়ে এসেছে। ১৫ নভেম্বর প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রুমা উপজেলায় পাহাড়ের সশস্ত্র সংগঠন কুকি চিন ন্যাশনাল ফ্রন্টের (কেএনএফ) আস্তানা ধ্বংস করেছে সেনাবাহিনী। জানা গেছে, রুমা উপজেলার মুনলাইপাড়া এলাকায় রুমা খালের পার্শ্ববর্তী লাইচেংয়াই নামক আমবাগানে পাহাড়ের গহিন অরণ্যে কেএনএফ-এর অস্ত্রধারীদের আস্তানায় অভিযান চালায় সেনাবাহিনীর রুমা জোনের সদস্যদের কয়েকটি টহলদল। তাদের অভিযানের বিষয়টি টের পেয়ে কেএনএফ সন্ত্রাসীরা এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়তে ছুড়তে আস্তানা ছেড়ে পালিয়ে যায় এবং সেনাবাহিনী উদ্ধার করে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদ।
প্রতিদিনের বাংলাদেশসহ
সহযোগী সংবাদমাধ্যমগুলোতে এর আগেও পাহাড়ে উগ্রবাদী সংগঠনগুলোর অপতৎপরতার বার্তা উঠে
এসেছে। এই সংবাদগুলোর মধ্যে ভালো-মন্দ দুটো দিকই নিহিত রয়েছে। ভালো দিক এই, সেনাবাহিনীসহ
অন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সতর্ক আছে এবং সশস্ত্র অস্ত্রধারী সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে অভিযান
চালিয়ে যাচ্ছে। আর মন্দ খবর হলো, পাহাড়ের বিভিন্ন জনপদে অভিযান অব্যাহত থাকা সত্ত্বেও
আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলাবারুদ সরবরাহ থেমে নেই। ইতঃপূর্বে র্যাব পার্বত্য চট্টগ্রামে অভিযান
চালিয়ে সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের কয়েকজনকে অস্ত্রসহ গোলাবারুদ উদ্ধারের ঘটনাটি উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার
জন্ম দেয়। একের পর এক অভিযানে সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের আটকসহ অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধারের
ঘটনাগুলোয় প্রতীয়মান হয়, পাহাড়ের আড়ালে সন্ত্রাসীরা সক্রিয়। তাদের হাতে দেশি-বিদেশি
এত অস্ত্র, গোলাবারুদ ও বিস্ফোরক দ্রব্য কোথা থেকে আসে এর উৎসে নজর দেওয়ার তাগিদ আমরা
আবারও দেই। এর অনুসন্ধান জরুরি। এসব কেনার জন্য যে বিপুল অর্থের প্রয়োজন হয় তা-ই বা
কোথা থেকে আসছে? তাদের অস্ত্র ও গোলাবারুদ কোথা থেকে আসছে এর উৎস জানা না গেলেও বিদ্যমান
পরিস্থিতিতে এও প্রতীয়মান হয়, এসব আসার যে চ্যানেল তা বন্ধ করা যাচ্ছে না।
অভিযোগ আছে, কক্সবাজার-টেকনাফের
রোহিঙ্গা শিবিরগুলোর সন্ত্রাসীগোষ্ঠী ও পার্বত্য চট্টগ্রামের বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র
সংগঠনের সঙ্গে দেশের অভ্যন্তরীণ ধর্মীয় জঙ্গিগোষ্ঠীর যোগাযোগ রয়েছে। সুতরাং, ত্রিধারার
এই সশস্ত্র সংগঠনগুলোর অভিন্ন স্বার্থের বিবেচনায় রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীরা যদি পার্বত্য
চট্টগ্রামে আশ্রয়-প্রশ্রয়ের সুযোগ পায়, তাহলে তা আমাদের জন্য বড় নিরাপত্তা সংকট সৃষ্টি
করার আশঙ্কা রয়েছে। আমরা মনে করি, এই প্রেক্ষাপটে গোয়েন্দা নজরদারি গভীর করার পাশাপাশি
পার্বত্য চট্টগ্রামে আরও পরিকল্পিত সাঁড়াশি অভিযান চালানো প্রয়োজন। তবে আইনশৃঙ্খলা
রক্ষা বাহিনীর সদা সতর্কতা থাকলে ও অভিযান অব্যাহত রাখলে আশা করা যায়, পাহাড়ের সশস্ত্র
অস্ত্রধারীরা যূথবদ্ধ হওয়ার অবকাশ পাবে না। আমরা এও মনে করি, এই ত্রিধারার যোগাযোগ
যাতে বিচ্ছিন্ন করা যায়, সেই লক্ষ্যেই কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা বাঞ্ছনীয়।
ইতঃপূর্বে প্রতিদিনের
বাংলাদেশ-এর প্রতিবেদনেই উঠে এসেছিল, র্যাবের অভিযানে যারা গ্রেপ্তার হয়েছিল তারা
দেশের বিভিন্ন স্থান এবং কলেজ-মাদ্রাসায় পড়ালেখা ত্যাগ করে জঙ্গিদলের সদস্য তালিকাভুক্ত
হয় এবং পাহাড়ে কুকি চিনের প্রশিক্ষণ ছাউনিতে সামরিক প্রশিক্ষণ নিতে যায়। আমরা জানি,
পাহাড়ি দুর্গম এলাকায় জঙ্গি আস্তানা ও প্রশিক্ষণের ঘটনা বিচ্ছিন্ন কিছু নয়। একটি ঘটনার
সঙ্গে অন্যটির সম্পর্ক রয়েছে এবং আগের ধারাবাহিকতায় তারা প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও সংঘবদ্ধ
হতে সক্রিয়। তাদের শিকড় উপড়ে ফেলতেই হবে। ইতঃপূর্বে টেকনাফের পাহাড়ে অস্ত্র তৈরির কারখানার
সন্ধানের খবর পাওয়ার পর অভিযান চালিয়ে অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনা ইতিবাচক হলেও তা যে চাঞ্চল্যকর
এ আর বলার অপেক্ষা রাখে না। আমরা ইতিবাচক বলছি এই অর্থে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর
সতর্ক অনুসন্ধানী নজর যদি না থাকত তাহলে দুর্গম পাহাড়ের আড়ালে অবৈধ অস্ত্রের সন্ধান
মিলত না। আর চাঞ্চল্যকর বলছি এ কারণে, সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী
বাহিনীগুলোর কঠোর নজরদারির বিষয়টি অজ্ঞাত না হওয়া সত্ত্বেও তারা তাদের গোপন তৎপরতা
অব্যাহত রেখেছে। এর পরও আমরা প্রত্যাশা করি, তাদের সব অপতৎপরতাই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী
বাহিনীর সদস্যরা ঠেকিয়ে দিতে বরাবরের মতোই সাফল্য দৃশ্যমান করতে সক্ষম হবেন। প্রতিবেশী
মিয়ানমার এবং ভারতের জঙ্গি সংগঠনগুলোর সদস্যদের নজরও রয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ের
ভাঁজে ভাঁজে। ইতঃপূর্বে সংবাদমাধ্যমেই জানা গিয়েছিল, কক্সবাজার-টেকনাফ অঞ্চলসহ পার্বত্য
চট্টগ্রামের যে অপরাধী চক্র গড়ে উঠেছে তাদের অনেকেই অস্ত্র ও মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত।
জঙ্গি কিংবা সশস্ত্র
উগ্রবাদীদের দমনে আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের দৃশ্যমান সাফল্য কম
নয় বটে, কিন্তু সমতলের সন্ত্রাসীদের পাহাড়ের বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে যোগসূত্রের
অভিযোগ আমলে নিয়ে তা খতিয়ে দেখে বহুমাত্রিক পরিকল্পনা নেওয়া জরুরি বলেও আমরা মনে করি।
যেসব সশস্ত্র সন্ত্রাসী গ্রেপ্তার করা হচ্ছে, তাদের নেপথ্যে কারা কলকাঠি নাড়ছে এর অনুসন্ধানও
জরুরি। পাহাড়ে কিংবা সমতলে জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সমভাবেই গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
আমরা গোয়েন্দা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সফলতার জন্য তাদের সাধুবাদ
জানাই, তবে একই সঙ্গে একথাও স্মরণ করিয়ে দিতে চাইÑ এসব ব্যাপারে আত্মতুষ্টির কোনো অবকাশ
নেই। আমরা আরও স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, দেশের পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি
নিয়ন্ত্রণে রাখা কিংবা জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন চ্যালেঞ্জের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিদ্যমান পরিস্থিতিতে সমাজবিরোধী চক্র কিংবা সমতলের সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো পাহাড়ি সশস্ত্র
সংগঠনগুলোর সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনের সুযোগ খুঁজতে পারে। কোনো আশঙ্কাই তুড়ি
মেরে উড়িয়ে না দিয়ে তা আমলে নিয়ে পর্যবেক্ষণ ও প্রতিবিধানের বিষয়টিও আমরা স্মরণ করিয়ে
দিতে চাই। সমাজবিরোধী কিংবা সশস্ত্র কর্মকাণ্ডের নতুন ক্ষেত্রের পরিসর যেহেতু পাহাড়ি
অঞ্চলেই তুলনামূলক বেশি সেহেতু তারা পাহোড়ে পরিসর আরও বিস্তৃত করার সুযোগ সন্ত্রাসীরা
খুঁজছে। এই প্রেক্ষাপটে ওইসব এলাকায় অনুসন্ধান অব্যাহত রাখা জরুরি।
পাহাড়ে কিংবা
সমতলে সন্ত্রাসীদের মূলোৎপাটন করতে হলে সর্বাগ্রে অর্থের উৎস প্রবাহ সূত্রের অনুসন্ধানের
পাশাপাশি তাদের পৃষ্ঠপোষকদের চিহ্নিত করাও জরুরি। কঠোর দমন-অভিযান, গ্রেপ্তার-বিচার
ও অপরাধীদের শাস্তি প্রদান অবশ্যই দ্রুত নিশ্চিত করতে হবে কিন্তু এর পাশাপাশি সামাজিক
প্রতিরোধ শক্তিশালী করার ব্যাপারেও জোরদার পদক্ষেপ নিতে হবে। তবে পাহাড়ের প্রেক্ষাপট
ও পরিস্থিতি যেহেতু তুলনামূলক ভিন্ন মাত্রার সেহেতু সেসব ক্ষেত্রের জন্য অনুসন্ধানী
পরিকল্পনা ও পর্যবেক্ষণ ভিন্ন আঙ্গিকে করা জরুরি বলেও আমরা মনে করি। আমরা এও মনে করি,
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সামাজিক শক্তির যূথবদ্ধ প্রয়াসে স্বস্তি ও নিরাপত্তার
আবহ সৃষ্টি করা দুরূহ কোনো বিষয় নয়।