অন্তর্বর্তী সরকারের একশ দিন
ড. ফরিদুল আলম
প্রকাশ : ১৬ নভেম্বর ২০২৪ ০৮:১৭ এএম
ড. ফরিদুল আলম
অন্তর্বর্তী সরকার তাদের একশ দিন পূর্ণ করলো। এ সময়ে তারা কতোটা কি করতে পারলো এ ব্যাপারে বিশ্লেষণে পর্যালোচনায় উঠে এলো কয়েকটি দিক। ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর থেকে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে জনগণের মধ্যে উদ্বেগের মাত্রা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে, যা সরকারের দায়িত্বশীল জায়গা থেকেও স্বীকার করা হয়েছে। পুলিশের পাশাপাশি সেনাবাহিনী এবং র্যাবের সমন্বয়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের দিকটি গুরুত্ব পেলেও অনেক ক্ষেত্রে মাদক, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি এবং পিটিয়ে মারার মতো ঘটনা ঘটেছে উল্লেখযোগ্য সংখ্যায়। বিষয়টিকে সরকারের ব্যর্থতা হিসেবে ভাবার যেমন সুযোগ নেই, আবার এ নিয়ে উদ্বেগ এড়িয়ে চলারও অবকাশ নেই। মূলত একটি সরকারের স্থলে যখন আরেকটি সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে, তখন প্রশাসন এবং জননিরাপত্তার দিকগুলোকে সরকারের ভাবনার ক্ষেত্রকে পরিবর্তন করে, এটা একটা দিক। আবার এও সত্য, একটি নির্দিষ্ট দলের সরকারের দায়িত্ব পালনের পর যখন আরেকটি সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে, স্বাভাবিকভাবেই একসময়ের সরকারবিরোধীরা পরিবর্তনের সুযোগ নিজেদের পক্ষে নিতে গিয়ে এমন কিছু কর্ম করে বসে, যা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনমনের ক্ষেত্রে ভূমিকা পালন করে। তবে এর বাইরেও অপরাধমূলক আরও কিছু বিষয় রয়েছে, যা দলমতনির্বিশেষে সবার জন্য উদ্বেগের। সত্যি কথা বলতে গেলে অপরাধকে রাজনৈতিক মোড়কে দেখার সুযোগ নেই। অনেক ক্ষেত্রে রাজনীতির সংশ্লেষ থাকলেও দিনশেষে সরকারের দায় হয়ে পড়ে এর মূলোৎপাটনের কাজটি করার।

বর্তমানে অর্থাৎ ৫ আগস্টের পর সবচেয়ে স্বস্তির বিষয়টি হচ্ছে
দেশে কোনো রাজনৈতিক সরকার না থাকার ফলে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডকে রাজনৈতিকভাবে
আশ্রয়প্রশ্রয় দেওয়ার সুযোগ নেই। তার পরও আমরা চাঁদাবাজমুক্ত সমাজ, হকারমুক্ত ফুটপাত,
বিভিন্ন জায়গায় অবৈধ দখলবাজি, ছিনতাই এবং খুনের মতো ঘটনা মোকাবিলায় পদক্ষেপগুলোকে
কার্যকরভাবে কাজ করতে দেখছি না। ৬ নভেম্বর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আইনশৃঙ্খলাসংক্রান্ত
সভায় উপদেষ্টা বলেছেন, ‘দেশে চাঁদাবাজি বেড়ে গেছে। এটা কঠোরভাবে দমন করা হবে।
চাঁদাবাজি বন্ধে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। অপরাধী যে-ই হোক কেউ ছাড় পাবে না।’
উপদেষ্টার এ বক্তব্যের সঙ্গে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা অনুযায়ী যৌথবাহিনী এ লক্ষ্যে কাজ
করে গেলেও জনজীবনে স্বস্তি দেওয়ার মতো অবস্থা লক্ষণীয় নয়।
চাঁদাবাজির সঙ্গে দিনদুপুরে
ছিনতাইয়ের মতো ঘটনা এখন নিত্যনৈমিত্তিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে। রাজধানীতে তা প্রকট
আকার ধারণ করছে। ছিনতাইয়ের সঙ্গে মাদকের একটি যোগসূত্র রয়েছে। অতীতের বিভিন্ন
অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, যখনই ছিনতাইয়ের মাত্রা বৃদ্ধি পায়, তখনই সমাজে মাদকের মতো
অপরাধও বাড়ে। সবচেয়ে ভয়ের বিষয় হচ্ছে প্রতিনিয়ত এসব অপরাধের মাত্রা বেড়ে চললেও
মূলহোতারা রয়ে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। এর পেছনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোনো
শৈথিল্য রয়েছে কি না যাচাই করে দেখা খুবই জরুরি।
দেশে এখন যৌথ বাহিনী কাজ করছে।
তবে সমাজের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রে আইন প্রয়োগকারী বাহিনী হিসেবে পুলিশের
দক্ষতাই প্রধান বিবেচ্য বিষয়। বলা চলে মূলত পুলিশের সহায়ক শক্তি হিসেবে বিভিন্ন
বাহিনী যৌথভাবে আইন এবং শৃঙ্খলা বিরোধী কর্মকাণ্ডের লাগাম টানতে কাজ করছে। এ ক্ষেত্রে
প্রাথমিক দায়িত্ব বর্তায় পুলিশ বাহিনীর ওপর। অপরাধ নিয়ন্ত্রণের রোডম্যাপ প্রণয়ন
করে তারাই। অতীতের বিভিন্ন সময়ে আমরা এ ধরনের যৌথ বাহিনীর অপারেশন দেখেছি। প্রতিটি
ক্ষেত্রেই এ ধরনের অপারেশনের সময় অপরাধীদের মধ্যে অপরাধ করার ক্ষেত্রে যে ভয় বা
সতর্কতা থাকত, সেটা অনেকটাই কম। এর পেছনের কারণগুলো অন্বেষণ করা খুবই জরুরি। তবে
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে জনসচেতনতা। বিগত সরকার পতনের পর পরই দেশের বিভিন্ন
স্থানে ডাকাতের উপদ্রব বৃদ্ধির একটা প্রবণতা লক্ষ করা গিয়েছিল। পাড়ায় পাড়ায় রাত
জেগে পাহারা দিয়ে এর অনেকটা লাগাম টানা সম্ভব হয়েছিল, যদিও তা পুরোপুরি কমেনি। পরিস্থিতির উন্নতিতে টোটকা দাওয়াইয়ে কাজ হবে না। এর জন্য
দরকার লাগাতার সাঁড়াশি অভিযান।
সরকার পরিবর্তনের পর দেশের আইনশৃঙ্খলা
রক্ষায় পুলিশ বাহিনীর কাজে এখনও পুরোপুরি গতি ফিরে না আসা একটা উল্লেখযোগ্য দিক।
বাস্তব অর্থে যৌথ বাহিনীর অপারেশনের এও একটা কারণ। যে সংখ্যায় এবং প্রক্রিয়ায় যৌথ
বাহিনী তাদের কর্মতৎপরতা পরিচালনা করছে, এর মধ্য দিয়ে সমাজের সব ধরনের অপরাধের
বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ কঠিন বিষয়। রাজধানীসহ দেশের বড় শহরগুলোয় তাদের
টহল পরিচালিত হলেও এক ঢাকাতেই অপরাধের এ রকম ১৫০টির বেশি এলাকা রয়েছে, যেগুলোকে
অপরাধের হটস্পট বলা হয়। এসব জায়গায় সার্বক্ষণিকভাবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী
বা যৌথ বাহিনী দিয়ে টহলদারি যেমন কঠিন বিষয়, আবার এ রকমটা করা হলে অপরাধীরা
অন্যত্র তাদের অপরাধের বিস্তার ঘটাতে পারে, এও একটা আশঙ্কার বিষয়। পুলিশ, বিভিন্ন
হাসপাতাল এবং গণমাধ্যমের সূত্র অনুযায়ী, আগস্টের প্রথমার্ধ থেকে নভেম্বরের ২ তারিখ
পর্যন্ত কেবল ঢাকা শহরেই ৪২৮টি ছিনতাই ঘটেছে, যার মধ্যে আগস্টে ৩৮, সেপ্টেম্বরে ১৫
ও অক্টোবরে ৩২টি মামলা হয়েছে (সূত্র প্রতিদিনের বাংলাদেশ, ৬ নভেম্বর, ২০২৪)। এসব
ঘটনায় বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ভুক্তভোগীদেরই শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়ে চিকিৎসা
নিতে হাসপাতালে যেতে হয়। তবে যতগুলো এ ধরনের ঘটনা ঘটে, মামলার হার তার চেয়ে অনেক
কম। মামলা করতে ভুক্তভোগীদের অনীহার কারণ হিসেবে বলা যায় আস্থার অভাব। পুলিশের
প্রতি অনেক আগেই মানুষের নিরাপত্তাজনিত আস্থার মাত্রা কমে গেছে, যা সর্বশেষ দেশের
রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর বৃদ্ধি পায়নি, কারণ পুলিশ এখনও তাদের কর্মে সঠিকভাবে মনোযোগ
দিতে পারেনি বলে অনেকেই মনে করছেন।
অনেকের মতে রাজধানীর
মোহাম্মদপুরে অপরাধের মাত্রা সাম্প্রতিক সময়ে বৃদ্ধি পেলেও কেউ কেউ আবার ভাবছেন
উত্তরায় এর হার অনেক বেশি। সন্ধ্যার পর থেকেই এ দুটি এলাকার মানুষের মধ্যে এক ধরনের
আতঙ্ক কাজ করছে। আলো-আঁধারি পরিবেশের মধ্যে সক্রিয় হয়ে ওঠে বিভিন্ন অপরাধী চক্র।
সাধারণ মানুষ আগের মতো চলাচলে স্বচ্ছন্দ বোধ করে না। এখানে রাজধানীর অপরাধের
বিষয়টি বিশেষভাবে উঠে এলেও রাজধানীর বাইরের মানুষও একইরকম আতঙ্কে ভুগছে। সরকার
পরিবর্তনের পর দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মূল নজর এখন বিগত সরকারের
অনুসারীদের ধরপাকড় করায়। এ প্রবণতা রাজধানীর বাইরে অনেক বেশি, স্থানীয় পর্যায়ে এমন
অনেক মামলা রয়েছে যা রাজনৈতিকভাবে হয়রানি করার জন্য করা হয়েছে বলে অনেকে মনে করেন।
নানানরকম চাপের মুখে পুলিশ বাহিনীকে এসব মামলার অপরাধীদের ধরপাকড়ের দিকে বেশি মনোযোগ
দেওয়ার কারণ অপরাধীদের মধ্যে পুলিশের আতঙ্ক কমেছে, ফলত নানাবিধ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের
বিস্তৃতি ঘটেছে এবং নিয়ন্ত্রণহীন অবস্থা বিরাজ করছে।
একটি দেশের রাজনৈতিক পরিবর্তন
যখন ঘটে, তখন এ পরিবর্তনকে দেশের বেশিরভাগ মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন হিসেবে
দেখা হয়। সাধারণত একটি রাজনৈতিক সরকারের স্থলে যখন আরেকটি রাজনৈতিক সরকার দায়িত্ব
গ্রহণ করে, সাময়িকভাবে পরিস্থিতির অবনমন ঘটলেও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে
রাজনৈতিক উদ্দেশ্যেই পরিস্থিতির উন্নয়নে তাদের মধ্যে কৌশল প্রণয়নে দৃঢ়তা এবং বাস্তবায়নে
সফলতার হার অনেক বেশি।
কিন্তু আমরা দেখছি, দীর্ঘ সময়
ধরে সামরিক সরকার ছাড়া বেসামরিক মোড়কে অরাজনৈতিক সরকার দায়িত্ব পালনের ইতিহাস
বর্তমান সময়ের আগে ২০০৭ সালের জানুয়ারি থেকে ২০০৮ সালের শেষ সময় পর্যন্ত দেখা
গিয়েছিল। সে সময়ের সরকার সেনা মদদপুষ্ট হিসেবে সর্বস্তরে পরিচিত ছিল। সে ক্ষেত্রে
সেনাবাহিনীর দৃঢ়তা বেসামরিক প্রশাসনের সর্বস্তরের কর্মকাণ্ডে বিশেষ গতি সঞ্চার করেছিল।
এ ছাড়া অন্য সময়ের বেসামরিক সরকারগুলো ছিল মূলত স্বল্পমেয়াদি, সংবিধানের বিধান
মোতাবেক এবং কেবল নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত। এ স্বল্পসময়ের সরকার
পরিচালনার বিষয়টি এক ধরনের আইনসিদ্ধ ছিল বিধায় দেশের আইনশৃঙ্খলা নিয়ে দুশ্চিন্তার
মাত্রা খুব একটা বেশি ছিল না। বর্তমানেও দেশে বেসামরিক সরকারব্যবস্থা চালু রয়েছে,
তবে তা এক বিশেষ অবস্থার ফলে উদ্ভূত। বলা যায় হঠাৎ এমন পরিস্থিতির উদ্ভব হয়ে এমন
একটি সরকারকে দেশের দায়িত্ব নিতে হবে, তা-ও আবার অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য, এ ধরনের
পূর্বপ্রস্তুতিবিহীন অবস্থা আইনশৃঙ্খলার ব্যত্যয়ে কাজ করছে। এও সার্বিক
জননিরাপত্তা শঙ্কার একটি কারণ। এর পাশাপাশি নিত্যপণ্যের দামের উর্ধ্বগতি জনজীবনে
নাভিশ্বাস তুলেছে। অন্তর্বর্তী সরকার জনগুরুত্বপূর্ণ এ দুটি ব্যাপারে কাঙ্ক্ষিত
মাত্রায় তাদরে সাফল্য দৃশ্যমান করতে পারেনি এ সত্য এড়ানো সহজ নয়। বাজারের অশুভ
শক্তি দাপিয়ে এবং তাতে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠেছে। বহুমাত্রিক চেষ্টা ও
পদক্ষেপেও সরকার বাজারকে বাগে আনতে পারছে না। এই না পারার পেছনের কারণ খুঁজে
প্রতিবিধান নিশ্চিত করা জরুরি।
একটি বিষয় সরকারের দিক থেকে গভীরভাবে মনোযোগ দিয়ে উপলব্ধি করা প্রয়োজন, জননিরাপত্তার সার্বিক দায় কিন্তু সরকারের এবং এ ক্ষেত্রে ব্যর্থতা সরকারের সার্বিক কর্মকাণ্ডে প্রতিফলিত হবে। রাজনৈতিক সরকারগুলোর ক্ষেত্রে এ ক্ষেত্রে কাজ করার অনেক জটিলতা থাকলেও অরাজনৈতিক সরকারের এ ক্ষেত্রে কোনো ধরনের দায়বদ্ধতা থাকার কথা নয়। নিত্যপণ্যের বাজারে যে চিত্র পরিলক্ষিত হচ্ছে এক্ষেত্রে বক্তব্য একই। রাষ্ট্র সংস্কারের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনের কথা বলছে এ সরকার। এ কাজে সরকারের বিশেষ উদ্যোগ রাষ্ট্র সংস্কারের সার্বিক কাজকে অনেক বেশি গতিশীল করবে।