কপ-২৯ জলবায়ু সম্মেলন
মুখতার বাবায়েভ
প্রকাশ : ১৫ নভেম্বর ২০২৪ ১৩:০৯ পিএম
জলবায়ু ও পরিবেশের ভয়াবহ বিপর্যয় এড়ানোর জন্য পরিবেশের ওপর বিনিয়োগ বাড়াতেই হবে। কপ-২৯ জলবায়ুবিষয়ক সম্মেলনে আজারবাইজানের তত্ত্বাবধানে এ বিষয়টিকে ব্যাপক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আজারবাইজানের বাকুতে আয়োজিত এই সম্মেলনের গুরুত্ব অপরিসীম। বিশেষত, পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব এড়ানোর জন্য নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া ও বাস্তবায়নের বিষয়টিকে ব্যাপক জোর দেওয়াই এর লক্ষ্য। উন্নয়নশীল বিশ্বকে পরিবেশ দূষণ সামলাতে হয়। এদেশগুলোতেই নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্তের মাধ্যমে দূষণ এড়ানোর জন্য ভাবতে হয়। ২০০৯ সালে পরিবেশ দূষণ রোধকল্পে বার্ষিক ১০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ধার্য করা হয়। এই বিনিয়োগের সুফল ২০২০ সাল নাগাদ কাঙ্ক্ষিত ফল দেওয়ার আশা জুগিয়েছিল। কিন্তু জলবায়ুর যে পরিবর্তন বিশ্বব্যাপী ভিন্ন মোড় নিয়েছে তা দেশ অনুসারে একেক রকম হয়েছে। আর এই সংকট মেটানোর জন্যই পূর্ববর্তী পরিকল্পনা থেকে বেরিয়ে আসতে হয়েছে। ২০০৯ সালে ধার্য পরিকল্পনাটি বর্তমানের নিরিখে যুগোপযোগী নয় বলেই অনেকে সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছেন। বিশেষত, অনেক দেশে দ্রুত জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব এড়ানোর কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
জলবায়ু সম্মেলনে বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা একত্রিত হন। আমরা মূলত অংশগ্রহণকারী পক্ষের সহযোগিতায় বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচকতা প্রতিরোধে কার্যকর নীতির প্রস্তাবনা নির্ধারণ করেছি। সম্মেলনে বিশ্বের ১৯৮টি প্রতিনিধিত্বকারী সংস্থার ব্যক্তি ও রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন। প্রতিটি পক্ষই তাদের তরফে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সংকট মোকাবিলায় কার্যকর ম্যানিফেস্টো উপস্থিত করেছেন। এ ক্ষেত্রে কিছু পক্ষ তাদের দ্বিমতও উপস্থাপন করেছেন। এ ধরনের সম্মেলনে মতপার্থক্য উপস্থিত হওয়াটাই স্বাভাবিক। তবে কোনো বিষয় নিয়ে আলোচনা না হলে এবং এ বিষয়ে আলোচনার পরিসর বাড়াতে না পারলে কোনো সমাধানে পৌঁছা যায় না। কোনো রাষ্ট্র সিঙ্গেল ডিজিট ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়েছে। আবার কোনো রাষ্ট্রের মতে, তা ডাবল ডিজিটে নির্ধারণ করলে ভালো হয়। অনেক পক্ষ তা হাজারো বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ হিসেবে ধার্য করেছে। প্রশ্ন হচ্ছে, এ বিনিয়োগের কতটুকু অংশ কর পরিষেবার মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হবে? বিষয়টির সমাধান এখনও মেলেনি। বিশ্বের অধিকাংশ রাষ্ট্রই নানামুখী সমস্যায় জর্জরিত। ফলে জলবায়ু বিষয়ে বৈশ্বিক ভাবনা এখনও অনিশ্চিত। অনেক দেশ উপযোগী কাঠামোর অভাবেও পিছিয়ে পড়ছে অনেকটা বাধ্য হয়ে। কিন্তু আজ বাধ্য হয়ে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ ফল ঠেকানোর কার্যক্রমে দেরি হলে আগামীতে তা আরও বড় ব্যয়ের কারণ হয়ে উঠতে পারে। আজ কার্যকরী পদক্ষেপ নেওয়ায় বিলম্ব করলে আগামীতে ক্ষতির পরিসর আরও বাড়তে পারে।
মানবজাতি বাস্তুসংস্থান ও অর্থনৈতিক নানা চাপে আজ জর্জরিত। এজন্যই পরিবেশ দূষণ ঘটে এমন যেকোনো কিছুতে সংকোচন ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির ব্যবহার বাড়াতে হবে। এজন্য পরিবেশের সঙ্গে সমন্বয় ঘটায় এমন অবকাঠামোর ওপর বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। এ ক্ষেত্রে সময় অল্প। খরা ও ঘূর্ণিঝড়ের সংখ্যা বাড়তে শুরু করেছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে তাই বিনিয়োগ জরুরি। দুর্যোগের সংখ্যা বাড়লে তার ক্ষয়ক্ষতির পরিসরও বাড়তে শুরু করবে। সহনশীল অবকাঠামোগত বিনিয়োগ ব্যতীত অনেক রাষ্ট্রই বাড়তি ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়বে। দুর্যোগের একটি দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব রয়েছে। দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতির পরিসর বাড়লে একটি রাষ্ট্রের অবকাঠামো পুনর্নির্মাণ ব্যয় অতীতের চেয়ে অনেক বেড়ে যাবে। আর দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে না পারলে এই সংকট মহামারি আকার ধারণ করতে পারে, যা অর্থনীতি তো বটেই মানুষের জীবনের ওপরও বিরূপ প্রভাব ফেলবে।
জলবায়ু সংকট নির্মূলে বিনিয়োগ অনেক গুরুত্বপূর্ণই নয় এটি বাস্তবায়ন করা সম্ভব। এর আগেও আমরা এমন সংকটের মুখোমুখি হয়েছিলাম। মাত্র ৪৮ মাসের ব্যবধানে কোভিড মহামারি বিশ্বব্যাপী সংকট তৈরি করেছিল। ওই সময় ৮ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের মতো সহায়তা পাওয়া গিয়েছিল নাগরিক ও ব্যবসায়ী গোষ্ঠী থেকে। অর্থাৎ নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ নির্ধারণ করে তা আদায় করা সম্ভব হয়েছিল। ওই সময়ের চ্যালেঞ্জ মুখোমুখি হওয়ার বিনিয়োগ অর্জন করা গেলে জলবায়ুর ক্ষেত্রেও তা সম্ভব। তবে জলবায়ুবিষয়ক নীতিমালাকে একই আঙ্গিকে বিচার করতে হবে। গুরুত্ব দিতে হবে কোভিড মহামারির মতোই। কিন্তু এ ধরনের কার্যক্রম বাস্তবায়নে সব খরচ সরকার কিংবা রাষ্ট্রের ওপর চাপিয়ে দিলে হবে না। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। জলবায়ুবিষয়ক যেকোনো সংলাপে দীর্ঘদিন বেসরকারি বিনিয়োগের বিষয়টি বাড়তি গুরুত্ব পাচ্ছে। বেশ কিছু জরিপে দেখা গেছে, জনগণ থেকে ১ মার্কিন ডলারের মতো অনুদান সংগ্রহ করা গেলে বেসরকারি খাত থেকে মাথাপিছু ৫, ৭Ñ এমনকি ১০ মার্কিন ডলার অনুদান সংগ্রহ করা সম্ভব। কিন্তু এর বিপরীতটাই আমাদের চোখে পড়েছে। ২০২২ সালের এক সমীক্ষা অনুযায়ী, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ৯৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার জলবায়ু সহযোগিতায় ব্যয় করা হলেও বেসরকারি খাতের অবদান মাত্র ২১ দশমিক ৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
অর্থাৎ জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় এখনও যে ধারণাটি বৈশ্বিক পর্যায়ে গুরুত্ব পায়নি তার প্রমাণ পাওয়া গেছে। কিন্তু এও মনে রাখতে হবে, গোটা বিশ্বেই আরও অনেক বিষয় নিয়ে আমাদের মাথা ঘামাতে হচ্ছে। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে সহযোগিতা দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত অর্থায়ন তাই মিলছে না। ক্লিন এনার্জি বা দূষণ ঘটায় না এমন শক্তি উৎপাদনের ক্ষেত্রে বেসরকারি খাত তখনই বিনিয়োগ করে যখন তারা শর্তারোপ করতে পারে। ফলে ক্ষয়ক্ষতির প্রাক্কলন এবং তা কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হয়ে যায়। অবশ্যই এ ক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে, বেসরকারি খাতের সহযোগিতা ব্যতীত জলবায়ু সংকট মোকাবিলার কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া কঠিন।
ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সির জরিপে বলা হয়েছে, অধিকাংশ এমার্জিং মার্কেট এবং উন্নয়নশীল রাষ্ট্র ক্লিন এনার্জির জন্য ১৫ শতাংশ বিনিয়োগ অর্জন করতে পারে। এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম বেসরকারি খাত। উন্নয়নশীল বিশ্বের ৮০ শতাংশ গ্রিন প্রজেক্ট বেসরকারি খাতের বিনিয়োগে বাস্তবায়ন করা যায়। তারপরও উন্নয়নশীল অর্থনীতির হিসাবে এই অনুপাত মাত্র ১৪ শতাংশ। সমস্যা হলো, উন্নয়নশীল অর্থনীতি জলবায়ুতে ৬০ শতাংশ দূষণের জন্য দায়ী (কাগজে-কলমে না হলেও এই অনুপাত ৮০ শতাংশ বলেই জানা যায়)। প্রতিটি রাষ্ট্রই অবকাঠামোগত উন্নয়নে মনোযোগ দিচ্ছে। এ ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ ছাড়া অবকাঠামোর সঙ্গে শক্তির চাহিদা ও সরবরাহ ব্যয় বাড়বে। আর এই চাহিদা পূরণ করার জন্য জলবায়ুতে গ্রিন হাউস গ্যাস নিঃসরণও অবধারিতভাবে বাড়বে। ফলে অনাগত ভবিষ্যতে এই অনুপাত আরও বাড়তে পারে।
নবায়নযোগ্য শক্তির একাধিক সুবিধা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে বেসরকারি বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য মনোযোগ বাড়াতে হবে। কিন্তু উন্নয়নশীল দেশগুলো পুঁজি সংগ্রহ করার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হতে গিয়ে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিষয়গুলোর দিকে মনোযোগ বাড়াতে পারে না। বিষয়টি আফ্রিকার দিকে তাকালেই স্পষ্ট হয়। অনুন্নত মহাদেশ বলে পরিচিত আফ্রিকায় পরিবেশ দূষণের মাত্রা ইউরোপ থেকেও ভয়াবহ। সংগত কারণেই বেসরকারি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কেউ আফ্রিকাকে কেন বেছে নিবে? এজন্য আমাদের প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ বাড়াতে হবে। এ ক্ষেত্রে নন-পেমেন্ট এবং চুক্তির বাস্তবায়নের দিকে জোর দিতে হবে। এমনকি ব্যাষ্টিক অর্থনীতির ক্ষেত্রেও ঝুঁকির প্রাক্কলন করে মুদ্রাস্ফীতির দিকে মনোযোগ দেওয়ার অবকাশ রয়েছে। অন্তত বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বৈষম্য দূর করার স্বার্থে হলেও আমাদের এমন দৃষ্টিতে ভাবতে হবে।
সাধারণ মানুষের অর্থায়নের আগ্রহের ভিত্তিতে বেসরকারি খাতের আগ্রহ বাড়ানোর দিকে আমাদের মনোযোগ গভীর করা জরুরি। উন্নয়নশীল রাষ্ট্রে করের অর্থ দিয়ে ক্ষতিপূরণ এবং পুনর্বাসনের কাজটি সম্পন্ন করতে হবে। কপ-২৯ জলবায়ু সম্মেলনে আরও কিছু বিষয় গুরুত্ব পাবে। এ ক্ষেত্রে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষেত্রে বৈশ্বিক অর্থায়ন বাড়ানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ কাঠামো নির্ধারণের আলোচনাও হয়েছে। এই সম্মেলন আমাদের একটি বাস্তবতার সঙ্গে পরিচিত করেছে। জলবায়ু সংকট মোকাবিলা করার জন্য আরও বিনিয়োগ জরুরি। আর এই বিনিয়োগ দ্রুত করতে হবে এবং প্রকল্প বাস্তবায়নেও দ্রুত নীতিনির্ধারণী কার্যক্রমের সদিচ্ছা রাখতে হবে। ইতিহাস আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিয়েছে। সম্পদের গতিশীলতা নিশ্চিত করাই মূল বিষয়। রাজনৈতিক সদিচ্ছার তুলনায় রাষ্ট্রীয় সম্পদের সমবণ্টন নিশ্চিত ও গতিশীলতাই সমস্যা সমাধানের মূল চাবিকাঠি।
প্রেসিডেন্ট, কপ-২৯ সম্মেলন
দ্য গার্ডিয়ান থেকে অনুবাদ : আমিরুল আবেদিন