শিক্ষা খাত
ড. মাহরুফ চৌধুরী
প্রকাশ : ১৪ নভেম্বর ২০২৪ ০৯:৫৪ এএম
ড. মাহরুফ চৌধুরী
শিক্ষা খাত একটি দেশের রাষ্ট্রব্যবস্থার সম্পূরক তথা শিক্ষা যেমন হবে সে অনুসারেই রাষ্ট্রের ব্যবস্থা ও নাগরিকদের চরিত্র গড়ে উঠবে। অপরদিকে শিক্ষা ও রাষ্ট্র একে অন্যের পরিপূরক হিসেবে কাজ করে। কারণ শিক্ষা দেশের শাসক ও নাগরিক তৈরির পাশাপাশি অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উন্নয়নের প্রধান চালিকা শক্তি। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা বিগত কয়েক দশকে ক্রমান্বয়ে অবনতির চরমে পৌঁছে গেছে। এর পেছনে অনেক কারণ থাকলেও অন্যতম কারণ হলো শিক্ষার রাজনীতিকীকরণ। দলীয় রাজনীতির নেতিবাচক প্রভাবে বাংলাদেশের শিক্ষা খাত আজ তাই গভীর সংকটের মুখোমুখি। শিক্ষার প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত জ্ঞান, দক্ষতা ও সৃজনশীলতা বিকাশের সুযোগকে সবার জন্যে অবারিত করে জাতি গঠনে অনন্য ভূমিকা রাখা। অথচ শাসকশ্রেণির অদূরদর্শিতা ও শ্রেণিস্বার্থে দলীয় রাজনীতির ছত্রছায়ায় দলীয়করণ ও ব্যাপক দুর্নীতির মাধ্যমে শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ বিঘ্নিত করে শিক্ষার মানের ক্রমাগত অবনতি ঘটানো হয়েছে। রাজনৈতিক স্বার্থে ক্ষমতাসীনদের হস্তক্ষেপের কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবস্থাপনায় দেখা দিয়েছে অনিয়ম ও সুশাসনের অভাব এবং বিঘ্নিত হয়েছে সুষ্ঠু একাডেমিক পরিবেশ।

দেশের শিক্ষা খাতে রাজনীতিকীকরণের
ইতিহাস নতুন কিছু নয়। স্বাধীনতা-উত্তরকালে
শিক্ষাঙ্গনে এবং শিক্ষার সরকারি প্রশাসন ও ব্যবস্থাপনায় রাজনীতিকীকরণের মাত্রা
ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শাসকশ্রেণির
স্বৈরাচারী মনোবৃত্তি ও দুর্বৃত্তায়নের কারণে দলীয়
রাজনীতির প্রভাব তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে ওঠে। বিশেষ করে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে, যেখানে
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো তথা সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দলীয় রাজনীতির প্রভাব ও
সবকিছু দলীয়করণের মাধ্যমে সেগুলো পরিণত হয়েছে সরকারি দলের লাঠিয়াল বাহিনীর কলোনিতে।
দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি যে, শিক্ষক ও প্রশাসন থেকে শুরু করে শিক্ষার্থীরা পর্যন্ত
রাজনীতির দিকনির্দেশনায় পরিচালিত হয়েছে, যার ফলে শিক্ষার আসল
উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য ব্যাহত হয়েছে।
শিক্ষা খাতের এ ধরনের রাজনীতিকীকরণ দেশের শিক্ষাব্যবস্থার ভিত্তিকে দুর্বল ও জঞ্জালপূর্ণ করে তুলেছে। শিক্ষাব্যবস্থা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের রাজনীতিকীকরণের প্রতিকার এবং প্রতিরোধে আমাদেরকে সবার আগে শিক্ষা
খাতকে দলীয়করণ করার প্রেক্ষাপট ও তার প্রত্যক্ষ প্রভাব নিয়ে আলোচনা করতে হবে। ঐতিহাসিকভাবে পাকিস্তান আমল থেকেই প্রত্যক্ষভাবে এদেশের
শিক্ষাব্যবস্থায় রাজনীতিকীকরণের প্রক্রিয়ার শুরু। তারই ধারাবাহিকতায় বিশেষ করে
বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ছাত্র ও শিক্ষকদের দলীয় রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হওয়ার পাশাপাশি সক্রিয়
ভূমিকা পালন শিক্ষা খাতের জন্যে একটি জটিল সমস্যা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
১. নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ক্ষমতা কুক্ষিগত করা বা
ক্ষমতায় যাওয়াই শিক্ষা খাতে দলীয়করণের প্রধান উদ্দেশ্য। সাম্প্রতিক
সময়ে দলীয়করণের মাধ্যমে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনায় ব্যাপকভাবে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা
করা হয়েছে। তাই আমরা দেখতে পাই যে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর
প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে নানাভাবে রাজনৈতিক
প্রভাব খাটানো হয়েছে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, কলেজের অধ্যক্ষ, স্কুলের প্রধান শিক্ষকসহ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর
উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক
প্রভাব খাটানো হয়েছে। ফলে জনবল নিয়োগে অনেক
যোগ্য ব্যক্তি বাদ পড়ছেন, নিয়োগ পেয়েছেন দলীয় লোকজন যাদের অনেকে নিয়োগ
করা পদের জন্যে বা যে কাজের জন্যে তাদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল সে কাজের জন্যে অযোগ্য ছিলেন। ফলে তারা প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় কিংবা তাদের কাজের
আনজাম দিতে অদক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। আরও লক্ষণীয় যে, রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের লক্ষ্যে
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে, ফলে উপেক্ষিত হয়েছে শিক্ষাব্যবস্থার প্রাণশক্তি শিক্ষকেরা ও যাদের জন্যে শিক্ষার সব আয়োজন সেই শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার প্রকৃত মান বজায় রাখা বা উন্নত
করার প্রচেষ্টার পরিবর্তে শিক্ষার নামে দলীয় আদর্শ প্রচার ও দলীয় স্বার্থে ইতিহাস,
ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে বিকৃত করার প্রচেষ্টা পরিলক্ষিত সরকার
পরিচালনাকারী দলের সরাসরি হস্তক্ষেপ
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ ও গুণগত মানকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। অনেক
ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক কারণে অযোগ্য ব্যক্তিদের উচ্চপদে বসানো হচ্ছে, যা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রশাসন ও শিক্ষাদানের পরিবেশকে দুর্বল করে তুলেছে।
২. দলীয় লেজুড়বৃত্তির ছাত্ররাজনীতির নেতিবাচক প্রভাব আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার সবত্রই দৃষ্টিগ্রাহ্য হয়ে
উঠেছে। বাংলাদেশের প্রায় সব উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বিশেষত বিশ্ববিদ্যালয়ে
ছাত্ররাজনীতির ইতিহাস রয়েছে, যা আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রামে
ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। আমাদের দেশের শিক্ষার্থীরা যদি
অধিকার আদায়ে রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় না হতো তাহলে ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশরা উপমহাদেশ ছাড়তে
না ও দেশভাগ হতো না, ’৫২ সালে ভাষা আন্দোলন হতো না, কিংবা ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ হতো
না, আর ২০২৪ সালে এসে জুলাই-আগস্ট বিপ্লব হতো না। বিশ্ববিদ্যালয়ে যদি রাজনীতি না হয়,
তাহলে আর কোথাও প্রকৃত অর্থে রাজনীতি হবে না। আমাদেরকে মনে রাখতে হবে যে, শিক্ষাঙ্গন হলো রাজনীতি চর্চা ও শেখার জায়গা।
পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রসংস্কারের অংশ হিসেবে আমাদের প্রয়োজন ন্যায়ভিত্তিক
শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মুক্তমন তৈরি ও মুক্তবুদ্ধির চর্চার জন্যে গণতান্ত্রিক পরিবেশ তৈরি করা। সেখানে শিক্ষক ও
শিক্ষার্থীদের মানবিক, গণতান্ত্রিক ও ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে।
৩. শিক্ষকদেরকে নানাভাবে জাতীয়
রাজনীতিতে সম্পৃক্ততা শিক্ষাব্যবস্থাপনা ও
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য এক অভিশাপ হিসেবে দেখা দিয়েছে। দলীয় রাজনীতিতে
অংশগ্রহণ করায় শিক্ষকেরা
পড়ানো ও গবেষণার পরিবর্তে নিজ নিজ দলের তাবেদারিতে অধিক সময় ব্যয় করেছে। বিগত কয়েক দশকে শিক্ষকদের সক্রিয়ভাবে রাজনীতিতে অংশগ্রহণের ফলে তাদের পেশাগত উন্নয়ন ব্যাহত হচ্ছে এবং সামগ্রিকভাবে
তা শিক্ষার পরিবেশের জন্য অত্যন্ত
ক্ষতিকর প্রমাণিত হয়েছে। রাজনৈতিক বিবেচনায় দলীয় ব্যক্তিদের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ, পদোন্নতি
এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনার সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততা
শিক্ষার মানকেই কেবল ক্ষতিগ্রস্ত
করেনি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকেও করে তুলেছে অকার্যকর ও দুর্নীতির আখড়া। শিক্ষকরা
যখন কোনো রাজনৈতিক দলের স্বার্থের প্রতি অনুগত হয়ে কাজ করেন, তখন তারা শিক্ষার্থীদের প্রকৃত কল্যাণে কাজ করার চেয়ে ব্যক্তিগত ও দলীয় স্বার্থে কাজ করাকে প্রাধান্য দেন। ফলে একাডেমিক বা পেশাগত জীবনে যেমন তাদের কোনো উন্নতি হয়নি, তেমনি সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে তারা কোনো অবদান
রাখতে সক্ষম হয়নি।
৪. শিক্ষাব্যবস্থায় দলীয়করণের ফলে শিক্ষা খাতে নীতিনির্ধারণে রাজনৈতিক স্বার্থের প্রভাব অনিবার্য
হয়ে উঠেছে। শিক্ষার
নীতিমালা প্রণয়ন ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনায় দল বা গোষ্ঠীর রাজনৈতিক স্বার্থ ওতপ্রোতভাবে জড়িত হয়ে পড়েছে। তাই দেখা
গেছে সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে কোনো বিচারবিবেচনা
ছাড়াই শিক্ষা খাতে
নীতিমালা পরিবর্তন হচ্ছে, যার ফলে শিক্ষার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হতে পারছে না। ব্যাহত হয়েছে শিক্ষার অব্যাহত উন্নয়নের ধারাবাহিতা রক্ষা করা। মনে রাখতে হবে, হঠাৎ কিছু হয় না। সবকিছুরই ধারাবাহিকতা থাকে এবং সেটাকে অক্ষুণ্ন
রেখেই ইতিহাস ও উন্নয়নের ধারাকে অব্যাহত রাখতে হবে। শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নের
জন্য কার্যকরী ও স্থায়ী নীতিমালা গড়ে
তোলা জরুরি হলেও রাজনৈতিক চাপে তা বাস্তবায়িত হচ্ছে না। শিক্ষার উন্নয়নে আয়োজিত
কর্মকাণ্ডের ধারাবাহিকতা রক্ষা না করার ফলে শিক্ষার মৌলিক প্রশাসনিক কাঠামো ও ব্যবস্থাপনা দুর্বল হয়ে পড়ছে এবং শিক্ষার্থীরা আত্মবিশ্বাসের মাধ্যমে আত্মবিকাশ ও জাতিকে
সেবা করার জন্যে সঠিকভাবে শিক্ষালাভ করতে পারছে না। শিক্ষায় ব্যাপক রাজনীতিকীকরণের
কারণে সামগ্রিকভাবে শিক্ষার গুণগত মানের অবনতির ফলে শিক্ষার্থীদের মানসিক ও পেশাগত উন্নয়নে নানা ধরনের
বাধা তৈরি হয়েছে। শিক্ষার মানের অবনতি শিক্ষার্থীদের শুধু একাডেমিক কৃতিত্বকেই প্রভাবিত করছে না, বরং তাদের ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনে কাঙ্ক্ষিত
অগ্রগতিতেও বাধা সৃষ্টি করছে। নিয়োগ-বাণিজ্য,
ভর্তি-বাণিজ্য, প্রশ্নপত্র ফাঁসের বাণিজ্য। আর সেই একই কারণে আমরা এটাও দেখেছি যে
শিক্ষার গুণমান উন্নয়নের জন্যে প্রকল্প গ্রহণ না করে, সংখ্যাগত ও অবকাঠামোগত
উন্নয়নেই বেশি পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ করতে। যার ফলে টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজিতে দলীয়
নেতা কর্মীদের সঙ্গে প্রশাসনিক কর্মকর্তারাও প্রকল্পের মাধ্যমে সরকারি অর্থের ভাগবাটোয়ার
কিংবা তছরুপে অংশ নিয়েছে। দলীয় রাজনীতির ছত্রছায়ায় উন্নয়নের নামে দুর্বৃত্তায়নে মেতে
উঠেছে শাসক দলের নেতাকর্মীরা।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান-উত্তর রাষ্ট্রসংস্কারের প্রত্যাশাকে যদি আমরা বাস্তব করে তুলতে চাই, তবে শিক্ষাসংস্কারকে অগ্রাধিকার যেমন দিতে হবে, তেমনি শিক্ষাব্যবস্থা গণমুখী কল্যাণকর রাষ্ট্রব্যবস্থার পরিপূরক হিসেবে ‘বৈষম্যহীন ও স্বৈরাচারমুক্ত’ করতে প্রথম যে কাজটি করতে হবে, সেটা হলো শিক্ষা খাতকে দলীয় রাজনীতির প্রভাবমুক্ত করা। আমরা রাষ্ট্রীয় অবকাঠামো ও প্রশাসনযন্ত্রের সংস্কারে যে কথা বলছি, সেটা করতে হলে আমাদেরকে প্রথমেই সুস্পষ্ট করে রাষ্ট্র, সরকার, জনপ্রশাসন, রাজনৈতিক দল, দলের নেতা ও তার পরিবারÑ এসবের সীমা-পরিসীমা এঁকে দিতে হবে। যারাই সেই সীমা-পরিসীমা লঙ্ঘন করবেন বা করার চেষ্টা করবেন তাদের জন্যে আইন করে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।