যুক্তরাষ্ট্র
নিদাই আদেইলাহ
প্রকাশ : ১২ নভেম্বর ২০২৪ ০৮:১৩ এএম
নিদাই আদেইলাহ
ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজকীয় প্রত্যাবর্তন ইতোমধ্যে দেশটির নির্বাচনের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়েছে। বিশেষত যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে দলীয় সমর্থকদের সীমানাকেও ছাড়িয়ে ট্রাম্পের এই জয় দেশটির সামাজিক ও রাজনৈতিক পালাবদলের আভাস দিয়েছে। নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের শোচনীয় পরাজয় এবং বিশ্বব্যাপী ট্রাম্পের ক্ষমতারোহনের পর গুঞ্জন এখনও নানা শঙ্কা বাড়িয়ে তুলেছে। গত আট বছর ধরে ডেমোক্র্যাটরা আদালত, সংবাদমাধ্যম থেকে শুরু করে নানা পর্যায়ে লড়াই চালিয়ে গেছে। তারা ট্রাম্পকে ক্ষমতারোহন থেকে হঠানোর সব চেষ্টাই করেছে। এমনকি তারা রিপাবলিকান পার্টির অন্যতম পদপ্রার্থী হ্যালিকে সমর্থন দিয়েছে। তার বিনিময়ে হ্যালির সমর্থকরাও ট্রাম্পকে সমর্থন জুগিয়েছে। ট্রাম্পের প্রতিদ্বন্দ্বী শুধু কমলা হ্যারিস ছিলেন না, বরং ওবামা ও হিলারির সঙ্গেও তাকে লড়াই করতে হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্রেটিক পার্টির সবচেয়ে শক্তিশালী স্বর যখন কমলার পক্ষে প্রচার করে, তখন সংগত কারণেই প্রতিযোগিতা বাড়তে শুরু করে। এত কিছুর পরও ট্রাম্প কীভাবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হলেনÑ এ প্রশ্ন সংগতই আমাদের মনে জাগে।

যুক্তরাষ্ট্রের
মানুষদের মনে দীর্ঘদিন ধরেই একধরনের শঙ্কা ছিল। সম্ভবত ট্রাম্পের সমর্থকদের আগ্রাসী
মনোভাগ গোটা দেশকে একটি গৃহযুদ্ধে নিয়ে যেতে পারেÑ এমন একটি ধারণা চারপাশে পাওয়া যাচ্ছিল।
আর এমনটি যদি হয় তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের জাতিগত একতা ভেঙে পড়বেÑ এমন আশঙ্কাও ছিল। ফলে
যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্র একটি নির্দিষ্ট কাঠামোর ভিত্তিতে বিবেচিত হতে শুরু করে। আমরা
এ ধরনের গণতন্ত্রের মধ্যে কোনো সারবস্তু খুঁজে পাইনি। ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের মিলিটারি
ইন্ডাস্ট্রিয়াল কমপ্লেক্সের মনোনীত প্রার্থী। সিলিকন ভ্যালির অন্যতম বড় কোম্পানির মালিক
ইলন মাস্ক থেকে শুরু করে অধিকাংশ প্রযুক্তি খাতনির্ভর প্রতিষ্ঠান ট্রাম্পকে সমর্থন
জুগিয়েছে। এমনকি ডিপ স্টেটগুলোতে প্রভাব রাখা স্টক মার্কেটের ব্যবসায়ীরাও তার ওপর বাজি
ধরেছেন। তার জয়ের পেছনে একটি বড় প্রভাবক ওয়াল স্ট্রিট। কারণ এখানে একধরনের জটিল ও বৃহদাকৃতির
অর্থনৈতিক চক্র সক্রিয় রয়েছে। এই চক্রটি বাইডেনের সময় বন্ধ হয়ে গেলেও ট্রাম্পের জয়ের
পর আবার নতুন করে জেগে ওঠার চেষ্টা করছে। বাইডেনের সময় তারা সমন্বয়ের মাধ্যমে আলাদা
হয়ে গেলেও ট্রাম্পের যুগে আবার নতুন করে শক্তি সঞ্চয়ের চেষ্টা করছে। ট্রাম্পের সঙ্গে
সমন্বয়ের মাধ্যমে এবং তার অংশীজন হিসেবে তারা কার্যক্রম পরিচালনা করবে। এমনটিকে যুক্তরাষ্ট্রের
অর্থনীতিবিদরা স্মার্ট মানি মেকানিজম বলে অভিহিত করেন।
বিদ্যমান অর্থনৈতিক
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে ট্রাম্প ভিন্ন নীতিমালা নেবেন, এ বিষয়ে সন্দেহ নেই।
ট্রাম্প নিজে একজন ব্যবসায়ী এবং তিনি দেনদরবার করতে ভালোই জানেন। কিন্তু এবার তাকে
দেনদরবার করতে হবে ভিন্ন পন্থায়। যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক ব্যবস্থা এমনকি
বিরোধী দলের রাজনীতিকদের সঙ্গেও সম্পর্কোন্নয়নে তিনি বাধ্য হবেন। অন্তত যুক্তরাষ্ট্রকে
আবার একচ্ছত্র শক্তি ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য হলেও তাকে এই দর-কষাকষিতে যেতে হবে। তার এই
নীতিমালার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রই লাভবান হবে। এক্ষেত্রে তার হয়তো ভিন্নমাত্রিক কোনো
কৌশলও ইতোমধ্যে নির্ধারণ করা হয়ে গেছে।
ঐতিহাসিকভাবে
রিপাবলিকান পার্টি রক্ষণশীল। তারা যুক্তরাষ্ট্রের প্রথাগত জীবনব্যবস্থায় আস্থা রাখে
এবং সামাজিকব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখার বিষয়ে সব সময় সজাগ থাকে। ট্রাম্প মূলত এই ভাবনাটিকেই
পুঁজি করেছেন। আর এজন্য তার কৌশলও চমৎকার ছিল। এজন্যই আরব ও ইসলাম ধর্মাবলম্বী ভোটারদের
সমর্থন তিনি আদায় করেছেন। উল্লেখ্য, এই ভোটারদের ভোটই যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনী ফল
ঘুরিয়ে দিতে ব্যাপক প্রভাব রেখেছে। এবারের নির্বাচনে যুক্তরাষ্ট্রের ভোটারদের মানসিক
পরিবর্তন লক্ষ করা গেছে। অর্থনৈতিক দুরবস্থা, অভিবাসন সংকট এমনকি সামাজিক নিরাপত্তাই
এবারের নির্বাচনে ভোটারদের সমর্থন আদায়ের মূল চাবিকাঠি হয়ে উঠেছিল। এসব মূল অনুষঙ্গ
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের সঙ্গেও প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত ছিল। অন্তত
এমন একসময়ে এই সমস্যা দেখা দিয়েছে যখন নির্বাচনের আমেজের সঙ্গে বৈশ্বিক সংঘাতও জড়িয়ে
পড়ে।
ট্রাম্প তার নির্বাচনী
কৌশলের মাধ্যমে বিভিন্ন অংশের জনগোষ্ঠীর সমর্থন আদায় করেছেন। তিনি জাতীয়তাবাদী ধারণার
বিভক্তিকৃত অবস্থার ক্ষেত্রেও সুবিধা পেয়েছেন। তা ছাড়া তরুণ সমাজকে আশ্বস্ত করতে পারায়
নিজের সমর্থক গোষ্ঠী বাড়ানোর কাজটি তার জন্য সহজ হয়েছে। কিন্তু দ্বিতীয় মেয়াদে ট্রাম্পের
সামনে অনেকগুলো চ্যালেঞ্জ রয়েছে। প্রথম মেয়াদে যতটা সহজে তিনি পার পেয়ে গেছেন দ্বিতীয়
মেয়াদে তা পারবেন না। এক্ষেত্রে তার সামনে অনেকগুলো সংকট রয়েছে। আর প্রতিটি সংকটই আগামী
বছরে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।
প্রথমত, ট্রাম্পকে
ভাবতে হবে চীন, উত্তর কোরিয়া ও ইরানের সঙ্গে তিনি কীভাবে সংযোগ স্থাপন করবেন। তাদের
তৈরি করা নিউ ওয়ার্ল্ড অর্ডারকে কীভাবে মোকাবিলা করা যায়? এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মধ্যপ্রাচ্য
ও ইউক্রেন যুদ্ধের সংকটও। বিশ্ব ইতিহাসের অস্বস্তিকর একসময়ে ট্রাম্পের মেয়াদকাল। মধ্যপ্রাচ্যে
ইতোমধ্যে যুদ্ধ বন্ধের ক্ষেত্রে কতটা কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হবে সেটিও ভাবা জরুরি।
কারণ নিজের প্রথম মেয়াদে ট্রাম্প আব্রাহাম অ্যাকর্ড ভেঙে ইসরায়েলকে সমর্থন দেন। তার
এই নীতিমালার কারণে পরোক্ষভাবে হলেও ইসরায়েল গণহত্যায় উৎসাহ পেয়েছে। স্মরণ করা যেতে
পারে, ফিলিস্তিন অথরিটিকে তিনি নানাভাবে চুপ করে দিয়েছিলেন। ওয়াশিংটনে তাদের স্বীকৃত
দূতাবাস বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। এমনকি ফিলিস্তিনকে প্রতিশ্রুত বিনিয়োগও বন্ধ করে দেওয়া
হয়। ফিলিস্তিনের গাজায় ইসরায়েল এখনও গণহত্যা পরিচালনা করছে। এক্ষেত্রে অস্ত্র বা অন্যান্য
নিরাপত্তা সহযোগিতার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র তাদের সহযোগিতা করছে। বিগত এক যুগ ধরেই ফিলিস্তিনের
অবস্থা নাজুক হওয়ার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিমালায় বড় পরিবর্তন আসেনি এবং এবারও
আসবে এমনটি ভাবার যুক্তিসংগত কারণ নেই।
চলতি বছরের এপ্রিলে ট্রাম্প ইসরায়েলকে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান জানান। এক্ষেত্রে তার কথাগুলো ছিল এমনÑ ‘দ্রুত যুদ্ধ শেষ করা হোক। করলে দ্রুত শেষ করে ফেলা জরুরি।’ অর্থাৎ তিনি যে যুদ্ধবিরতির কথা বলেছিলেন বিষয়টি এমন নয়। তিনি তার এক সাক্ষাৎকারেও ইঙ্গিত দিয়েছিলেন ফিলিস্তিনিদের এড়িয়েই শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ বন্ধের জন্য ফিলিস্তিন অথরিটির প্রেসিডেন্টকে দেওয়া তার আশ্বাসকে আমরা অনেকেই ভুলভাবে বিশ্লেষণ করে চলেছি। বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে ভাবার সুযোগ কম। কিন্তু এখনও নতুন করে অনেক কিছু পর্যবেক্ষণের সুযোগ আছে। নতুন মেরুকরণ ঘটে চলেছে। এই মেরুকরণে তুরস্ক ও রাশিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কোন্নয়নের সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। আবার পরিস্থিতির অবনতি ঘটারও শঙ্কা থেকে যাচ্ছে। অর্থাৎ নতুন মেরুকরণের সব সমীকরণ এখনই কষা যাবে না। তাই এখন পরিস্থিতি যাচাই করা ছাড়া কিছুই করার নেই।
মিডল ইস্ট মনিটর
থেকে অনুবাদ : আমিরুল আবেদিন