ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান
শেখ সালাহউদ্দিন আহমেদ
প্রকাশ : ১১ নভেম্বর ২০২৪ ০৮:৪৭ এএম
নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণার জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে দাবি জানানো হচ্ছে প্রায় প্রতিদিনই। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ মাঠে সক্রিয় এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ রাজনৈতিক দলগুলো মনে করছে সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ হলে এ-সংক্রান্ত সংশয়ের অবসান ঘটবে। দীর্ঘ পৌনে ১৮ বছর ধরে গণতন্ত্রপন্থি রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাকর্মীরা ওয়ান-ইলেভেন ও পরে আওয়ামী লীগ আমলে নিগৃহীত হয়েছেন। ভুগেছেন মামলা-হামলা, জেলজুলুমসহ নানা সংকটে। নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষিত হলে কর্মীরা উজ্জীবিত এবং সাংগঠনিক কার্যক্রম গুছিয়ে নিতে উদ্বুদ্ধ হবেন। বিএনপির পক্ষ থেকে ইতোমধ্যে বলা হয়েছে, নির্বাচন তাদের এক নম্বর প্রায়োরিটি। অন্তর্বর্তী সরকার অতিদ্রুত নির্বাচন ও সংস্কারের রোডম্যাপ দেবে এমনটিই তারা আশা করছে। জামায়াতের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তারা অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সংলাপে যে দুটি রোডম্যাপ দিয়েছেন তার একটি সংস্কারের, অন্যটি নির্বাচনের। তাদের বিশ্বাস, অন্তর্বর্তী সরকার দেশকে একটি ভালো জায়গায় নিয়ে গিয়ে সুষ্ঠু নির্বাচন দিতে সক্ষম হবে। অন্য দলগুলোও চায় সংস্কার শুরু করে নির্বাচন কমিশন গঠনের দ্রুত উদ্যোগ নেওয়া উচিত। যাতে দেশে এক-দেড় বছরের মধ্যে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্পন্ন করা সম্ভব হয়।

শীর্ষ
রাজনৈতিক দলগুলো সুষ্ঠু নির্বাচন সম্পর্কে অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর আস্থাশীল। তবে তাদের
শঙ্কা, নির্বাচনী রোডম্যাপ দিতে দেরি হলে পতিত স্বৈরাচারের দোসররা অপপ্রচারের সুযোগ
পাবে। নির্বাচনী রোডম্যাপ ঘোষিত হলে তা জুলাই গণঅভ্যুত্থানবিরোধী অপশক্তির অপপ্রচারের
সমুচিত জবাব বলে বিবেচিত হবে। নির্বাচনী রোডম্যাপ সরকারের পেছনে রাজনৈতিক দলগুলোর সমর্থন
জোরদারে অবদান রাখবে। সংস্কার যেহেতু একটি চলমান প্রক্রিয়া, সেহেতু নির্বাচনের পরও
যাতে তা অব্যাহত থাকে সে বিষয়ে জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠাও সহজতর হবে। দেশের প্রধান রাজনৈতিক
দলগুলোর বিশ্বাস, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে কর্তৃত্ববাদী সরকারের পতন ঘটলেও তাদের সাজানো
প্রশাসন সক্রিয়। দীর্ঘ দেড় দশকের লুটেরাদের অস্তিত্বও বিরাজমান। তাদের ঠেকাতেই নির্বাচনী
রোডম্যাপ দ্রুত ঘোষণার ব্যাপারে ভাবতে হবে।
এদিকে
গার্মেন্ট শিল্পের অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে বিদেশি ক্রেতারা বাংলাদেশের দিক থেকে মুখ
ফেরাচ্ছেন। তারা পোশাকের অর্ডার নিয়ে যাচ্ছেন বাংলাদেশের প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোয়।
বাংলাদেশের গার্মেন্টে পোশাক তৈরির অর্ডার দিলে তা সময়মতো পাওয়া যাবে কি না এ সংশয়ে
ক্রেতারা ভরসা রাখতে পারছেন না। যা দেশের পোশাকশিল্পের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশের
পোশাকের সবচেয়ে বড় বাজার ইউরোপ-আমেরিকা। পশ্চিমের শীতপ্রধান এ দেশগুলোয় বড়দিন উপলক্ষে
বিভিন্ন ব্র্যান্ডের দোকানে ব্যাপক বিক্রি হয়। নতুন নতুন পোশাক নিতে ক্রেতারাও হুমড়ি
খেয়ে পড়েন। আর এ বিক্রি কেন্দ্র করে পোশাক ক্রেতাদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ আসেন বাংলাদেশে।
তৈরি পোশাক খাতের উদ্যোক্তারাও বড়দিনের ডিসেম্বরকেন্দ্রিক এ অর্ডার নিতে সারা বছর আশায়
থাকেন। কিন্তু এ বছর পোশাকশিল্পে ভিন্ন চিত্র দেখা যাচ্ছে।
বিকেএমইএর
মতে, প্রায় ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের ক্রয়াদেশ অন্য দেশে চলে গেছে। বড়দিন উপলক্ষে ক্রেতারা
জুন-জুলাইয়ে অর্ডার দেওয়া শুরু করেন। এ অর্ডারের বিপরীতে পরবর্তী ছয় মাস দেশের কারখানাগুলো
সচল থাকে। সে কারণে জুলাই-ডিসেম্বরের বাণিজ্য সারা বছরের রপ্তানি খাতকে প্রভাবিত করে।
এবার বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাকে ডিসেম্বর অর্ডার নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সময় কারফিউ জারির কারণে মালিকরা কারখানা বন্ধ রাখতে বাধ্য
হন। অভ্যুত্থানের পর আবার শ্রম আন্দোলনের কারণেও অনেক কারখানা বন্ধ ছিল। জুলাই-আগস্ট
গণঅভ্যুত্থান বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি পুনর্গঠনের সুযোগ সৃষ্টি করেছে। কিন্তু
শ্রমিক আন্দোলনের কারণে নিজেদের ব্যবসায়িক স্বার্থেই ক্রেতারা বাংলাদেশের দিক থেকে
মুখ ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হচ্ছেন। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এখনও পুরোপুরি স্বাভাবিক না হওয়ায়
সৃষ্টি হয়েছে অনিশ্চয়তা। এ অবস্থা চলতে থাকলে তা দেশের অর্থনীতির জন্য বিপর্যয় ডেকে
আনবে। কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও ডেকে আনবে বিড়ম্বনা। বিষয়টি বিবেচনায় এনে আইনশৃঙ্খলা
সুরক্ষায় যত্নবান হতে হবে। পোশাকশিল্পে অস্থিরতার পেছনে কোনো দেশিবিদেশি ষড়যন্ত্র জড়িত
কি না সে বিষয়েও নজর রাখা প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সামনে এখন অজস্র
চ্যালেঞ্জ। সামনে এগিয়ে যেতে সেসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকারকে সক্রিয় হতে হবে। আইনশৃঙ্খলা
প্রতিষ্ঠা এখন সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার। রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় শৃঙ্খলা ফেরানো সরকারের অবশ্যপালনীয়
কর্তব্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। ব্যবসাবাণিজ্যে গতি ফেরানোও এক বড় চ্যালেঞ্জ। শিক্ষা খাত ঢেলে
সাজাতে সংকল্পবদ্ধ হতে হবে সরকারকে। কড়া হাতে সামাল দিতে হবে স্বাস্থ্য খাতের নৈরাজ্য।
নতুন
সরকার এমন সময়ে দায়িত্ব নিয়েছে যখন ভেঙে পড়েছে আইনশৃঙ্খলা। প্রশাসন এবং অন্যান্য সেক্টরেও
চলছে অস্থিরতা। অর্থনৈতিক টানাপোড়েন সরকারের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর সঙ্গে
আছে রাষ্ট্র সংস্কারের প্রত্যাশা। গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম লক্ষ্যও সেটি। আওয়ামী লীগ
সরকারের পতনের পর দেশের প্রায় সব থানা থেকে সরে যান পুলিশ সদস্যরা। বিভিন্ন স্থানে
থানায় থানায় হয় হামলা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গুলিতে হতাহতের ঘটনা, গ্রেপ্তার
এবং নির্যাতনের অভিযোগে মানুষের ক্ষোভের শিকার হয়ে পড়েন পুলিশ সদস্যরা। সব মিলিয়ে আইনশৃঙ্খলা
রক্ষাকারী বাহিনী এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে আস্থার সংকট এখনও প্রকট। বিভিন্ন স্থানে
ঘটেছে ডাকাতি, লুটপাট, ভাঙচুর।
আইনশৃঙ্খলা ও ব্যবসাবাণিজ্যে সুস্থ ধারা ফিরে না এলে অর্থনৈতিক বিপর্যয় অনিবার্য হয়ে উঠবে। জুলাইয়ের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান ছিল রাষ্ট্র ও সমাজের প্রতিটি স্তরে দুর্নীতি, অনিয়ম ও কর্তৃত্ববাদের থাবা বিস্তারের বিরুদ্ধে। কর্তৃত্ববাদ যাতে আর কোনো দিন ফিরে না আসে তা অন্তর্বর্তী সরকারকেই নিশ্চিত করতে হবে। সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো সক্রিয় করে সব ক্ষেত্রে জবাবদিহি নিশ্চিত করাও বড় চ্যালেঞ্জ। যে চ্যালেঞ্জে জিততে জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠাও জরুরি। জুলাই-আগস্টে সংঘটিত ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক অভ্যুত্থান ব্যর্থ হতে দেওয়া যাবে না। এখনও নানা ষড়যন্ত্র, চক্রান্ত চলছে। ছাত্র-জনতা যে নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছে তার বাস্তবায়নের জন্য রাষ্ট্রের সংবিধান এবং ক্ষমতা কাঠামোর সংস্কার নিশ্চিত করতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের কাঙ্ক্ষিত সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করার জন্য রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক রূপান্তর ঘটাতে হবে। ধ্বংসপ্রাপ্ত রাষ্ট্র পুনরুদ্ধার করার জন্য সংগ্রাম চলছে। সে সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে।