প্রজন্মের ভাবনা
রুশাইদ আহমেদ
প্রকাশ : ১১ নভেম্বর ২০২৪ ০৮:৪৪ এএম
মে ও স্মিথ নামের দুজন বিজ্ঞানী ১৮৭৩ সালে বৈদ্যুতিক মাধ্যমে ছবি আদান-প্রদানের একটি পদ্ধতি আবিষ্কার করেন। এরই সূত্র ধরে প্রায় ৪০ বছর পর ১৯২৬ সালে যুক্তরাজ্যের জন লগি বেয়ার্ড প্রথমবারের মতো সাদা আর কালো রঙসংবলিত ছবি বৈদ্যুতিক সংকেতের মাধ্যমে এক স্থান হতে অন্য স্থানে প্রেরণে সক্ষম হন। এ অভাবনীয় উদ্ভাবন বিশ্বের বুকে ‘টেলিভিশন’ নামের এক অদ্ভূত যন্ত্রের অগ্রযাত্রার গোড়াপত্তন করে। এ ঘটনার এক দশক পর রাশিয়ান প্রকৌশলী আইজ্যাক শোয়েনবার্গ ১৯৩৬ সালে পৃথিবীর প্রথম টেলিভিশন চ্যানেল হিসেবে ব্রিটিশ ব্রডকাস্টিং করপোরেশনের (বিবিসি) সম্প্রচারের সূত্রপাত ঘটান। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৪০ সালে বাণিজ্যিকভাবে যাত্রা শুরু করে টেলিভিশন। শুধু তাই নয়, কালক্রমে এটি হয়ে ওঠে একটি অন্যতম প্রধান গণমাধ্যম।
শুরুর দিকে টেলিভিশন
ভারী বাক্সের আকারে হলেও প্রযুক্তির উৎকর্ষ সাধনের সঙ্গে সঙ্গে এটি হালকা এবং সহজে
বহনযোগ্য হয়ে গেছে। যেখানে আজ থেকে তিন কিংবা চার দশক আগেও মানুষকে টেলিভিশন ব্যবহারের
জন্য পৃথক টেবিল বা ওয়ার্ডরোব কিনতে হতো, সেখানে টেলিভিশন এখন ‘স্মার্ট টিভি’ নামাঙ্কিত
হয়ে অত্যাধুনিকভাবে অগণিত বাসাবাড়ির দেয়ালে দেয়ালে ঝুলছে। আর বুঁদ করে রাখছে মানুষকে
রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক টকশো থেকে শুরু করে বিতর্ক, বিনোদন, ক্রীড়া ও গোটা বিশ্বের চলতি
ঘটনাপ্রবাহের বিস্তারিত সংবলিত অনুষ্ঠানমালায়।
নব্বইয়ের দশকে
ইন্টারনেটের আবিষ্কারও টেলিভিশনের আবেদনকে কমতে দেয়নি। কিন্তু গত দেড় যুগ ধরে ইন্টারনেট
ধীরে ধীরে সহজলভ্য হয়ে ওঠায় এবং টেলিভিশন চ্যানেলগুলো মানসম্মত অনুষ্ঠান ও কনটেন্ট
তৈরির বদলে সস্তা ও মানহীন অনুষ্ঠান প্রযোজনা করে স্বল্প পরিশ্রম আর কম অর্থ ব্যয়ে
অধিক টিআরপি লাভের কৌশলের দিকে ঝুঁকে পড়ে। দেশে বর্তমানে বিটিভিসহ সম্প্রচারিত প্রায়
তিন ডজন টিভি চ্যানেলের হাতে গোনা দুয়েকটি অনুষ্ঠান ব্যতীত কোনো অনুষ্ঠানই আর দর্শকদের
সেভাবে বিমোহিত করছে নাÑ এমন অভিযোগও বিস্তর। এর পেছনের কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে বর্তমানে
সবাই যেন স্বল্প ব্যয় এবং পরিশ্রমে অধিক মুনাফার পক্ষপাতী। যার ফলে মানুষ টেলিভিশনের
ওপর ক্রমশ আগ্রহ হারাচ্ছে। অথচ সাম্প্রতিক একটি জরিপের প্রতিবেদন বলছে, দেশের অর্থনীতিতে
২০২০ সাল নাগাদ টেলিভিশন শিল্পের ব্যাপ্তি ছিল প্রায় সাড়ে ৬০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।
যা আগামী দিনে ৯৪০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অপর এক গবেষণা
বলছে, গোটা দেশে বিক্রি হওয়া সকল ইলেকট্রনিকস পণ্যের মধ্যে এখনও সর্বোচ্চ টেলিভিশন
(৩০.০৩%)।
এ থেকে বোঝা যায়, আধুনিক ইন্টারনেটের ক্রমবর্ধমান উন্নয়নের যুগে বাংলাদেশিরা এখনও টেলিভিশন থেকে একেবারে বিমুখ হয়নি। তাই বাংলাদেশের টিভি চ্যানেল তথা মিডিয়াগুলো যদি শুধু টিআরপি কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ওয়াচটাইমমুখী না হয়ে মানসম্মত স্বতন্ত্র অনুষ্ঠান ও কনটেন্ট তৈরিতে উদ্যোগী হয়, তবে গণমানুষ যেভাবে এখনও মিডিয়ামুখী হয়ে রয়েছে তা অব্যাহত থাকবে। রাষ্ট্রীয় ভর্তুকি বা প্রণোদনাও এ খাতের মানোন্নয়নে রাখতে পারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।