সংস্কার
এলিনা খান
প্রকাশ : ১০ নভেম্বর ২০২৪ ০৮:২৪ এএম
এলিনা খান
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর সমাজে প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্য নিরসনে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কারের আলোচনা উঠেছে। সম্প্রতি আইন সংস্কারের জন্যও সমাজের বিভিন্ন স্তর থেকে দাবি উঠে আসতে শুরু করেছে। আমাদের আইনব্যবস্থার ক্ষেত্রে কারাগার সংস্কারের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। ৯ নভেম্বর প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কারাবিধির কোথাও কনডেম সেলের কথা না থাকলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় নির্জন কক্ষে বছরের পর বছর কাটে অনেকের। হাইকোর্টে বিচারকস্বল্পতা থাকায় ডেথ রেফারেন্স বেঞ্চ কম। ফাঁসির আসামির মামলা যায় ক্রম অনুযায়ী। ফলে একজন বিচারপ্রার্থীকে যেমন অপেক্ষা করতে হয় ন্যায়বিচারের জন্য, তেমন একজন অপরাধীকেও নির্জন সেলে অমানবিক জীবন পার করতে হয়। দুটি বিষয়ই ন্যায়বিচার নিশ্চিতের পথে স্বস্তির নয়। আমরা দেখছি, সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন স্থানে অপরাধ সংঘটনের সংখ্যা বেড়েছে। ৫ আগস্টের পর প্রশাসনিক শিথিলতার সুযোগ নিয়ে যেমন অনেক ক্ষেত্রে অপরাধীরা সক্রিয় হয়েছিল, তেমন বর্তমানেও পুলিশ প্রশাসন পূর্ণমাত্রায় তাদের দায়িত্বে পালন করতে না পারায় অনেক স্থানেই অপরাধের সংখ্যা বাড়ছে। পুলিশ বাহিনীর পক্ষেও অনেক ক্ষেত্রে বিভিন্ন এলাকায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ছে। আবার প্রচলিত আইনে কঠোর শাস্তি থাকার পরও নারী নির্যাতন-নিপীড়ন-ধর্ষণের মতো সামাজিক ব্যাধিও দূর হচ্ছে না।

সব মিলিয়ে যে
পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা থেকে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান, সেই পরিবর্তনের জনআকাঙ্ক্ষা থেকেই
সংস্কারের দাবি। এ ক্ষেত্রে আইন কাঠামোর সংস্কারের বিষয়টিও জোরেশোরেই আলোচিত হচ্ছে।
আমরা জানি, সংবিধান সংস্কারের জন্য ইতোমধ্যে একটি কমিশন গঠন করা হয়েছে। তবে এ কমিশন
রিপোর্ট আকারে যে সুপারিশমালা উপস্থাপন করবে তা আইনসভা অর্থাৎ সংসদের অনুমোদন ছাড়া
বাস্তবায়ন সম্ভব হবে না। ফলে কিছু প্রস্তাব হিসেবেই বর্তমানে সেগুলো থাকবে। শুধু সংবিধান
নয়, আরও অনেক প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের বিষয়েও ইতোমধ্যে কমিশন হয়েছে। সে ধারাবাহিকতায়ই
দেশে প্রচলিত আইন প্রয়োজনীয় সংস্কারের মাধ্যমে আরও পরিশীলিত করার বিষয়ে ভাবার সময়
এসেছে। আইন বাস্তবায়নের পর্যাপ্ত অবকাঠামোগত সুযোগসুবিধা নিশ্চিত করার দিকটিও এ ক্ষেত্রে
গুরুত্বপূর্ণ। আদালতের অবকাঠামোগত সুযোগসুবিধা নিশ্চিতের বিষয়ে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা
ও প্রস্তাব না থাকলে আইন বাস্তবায়ন করা কঠিন।
সংবিধান ও
আইনের সংস্কার করলেই আমরা কাঙ্ক্ষিত সুশাসন নিশ্চিত করতে পারব এমন ভাবনা পুরোপুরি সঠিক
নয়। এর সঙ্গে
আবশ্যিকভাবে আদালতের অবকাঠামোগত সক্ষমতা ও কার্যকর গতিশীলতাও নিশ্চিত করতে হবে। বিচারসংশ্লিষ্ট
বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও দায়িত্বশীলের কাজের সমন্বয়ও এ ক্ষেত্রে জরুরি। দেশের আদালতগুলোয়
প্রতিনিয়ত নানা বিষয়ে মামলা হয়। মামলাগুলোর বিভিন্ন ভাগ ও পর্যায় রয়েছে। মামলার ধরন
অনুযায়ী ভিন্ন ভিন্ন আদালতও রয়েছেন। পারিবারিক ও গৃহনির্যাতন মামলা পরিচালনার জন্য
রয়েছেন পারিবারিক আদালত। ফৌজদারি অপরাধের জন্য রয়েছেন দায়রা ও জজ আদালত। বিচারকাজ পরিচালনার
জন্য প্রতিটি আদালতের জন্য প্রয়োজন প্রয়োজনীয় অবকাঠামো। বিচারিক দায়িত্ব পালনে এবং
অপরাধীর দণ্ড নিশ্চিত করতে আদালতকে পর্যাপ্ত শক্তি দেওয়ার জন্য আইন রয়েছে। কিন্তু প্রায়ই
দেখা যায় মামলা করার পর থেকে বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ হয়ে অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত পর্যন্ত
রয়েছে দীর্ঘসূত্রতা, যা ন্যায়বিচারের পথে একটি বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে চিহ্নিত। অভিজ্ঞতা
থেকে দেখা যায়, দেশে পারিবারিক আদালতেই সবচেয়ে বেশি মামলা হয়।
এ ক্ষেত্রে ঢাকা
কোর্টে মামলার সংখ্যা বেশি। দেশের অন্যান্য পারিবারিক আদালতেও পারিবারিক নানা সমস্যাসংক্রান্ত
মামলার সংখ্যা অনেক। মামলার তুলনায় দেশের পারিবারিক আদালতগুলোর অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা
যেমন রয়েছে, তেমন রয়েছে বিচারক সংকটও। আদালতে ন্যায়বিচারের জন্য এসে অনেক সময়ই তাদের
নানামুখী ভোগান্তির শিকার হতে হয়। এর মাঝে অবকাঠামোগত ভোগান্তিও রয়েছে। আমরা যদি দেশের
পারিবারিক আদালতগুলোর বিচারকক্ষের দিকে তাকাই তা হলেই বিষয়টি স্পষ্ট হবে। অসংখ্য মামলার
বিচারকার্য সম্পন্নের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয় ছোট একটি কক্ষ। এসব আদালতে স্থানের অপ্রতুলতার
কারণে এজলাসে বিচারক অনেক কষ্টে অবস্থান করেন। এজলাসে উভয় পক্ষের আইনজীবীদের চাপ থাকে।
বিচারপ্রার্থীর জন্যও এজলাসে যথাযথ পরিবেশের সংকট রয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাদের বসার
আলাদা স্থান নেই এবং অনেক সময় কীভাবে বিচারকার্য সম্পন্ন করতে হয় তা-ও তাদের জানার
সুযোগ থাকে না।
পারিবারিক আদালতে
শিশুদেরও আনা হয়। অথচ আদালতে আসা এ শিশুদের জন্য গোটা পরিবেশটাই এক আতঙ্কের কারণ হয়ে
দাঁড়ায়। তারা আসলে কোথায় থাকবে এবং তাদের ওপর কীভাবে নজর রাখা হবে; সে ব্যবস্থাও নেই।
সাক্ষীরাও এ ক্ষেত্রে ভোগান্তির শিকার হন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে সবাইকে বারান্দায় অবস্থান
করতে হয়। এত সংকীর্ণ কক্ষে সাক্ষী, বিচারক, বিচারপ্রার্থী, আইনজীবী, পেশকার সবাই একসঙ্গে
অবস্থান করলে বিচারকার্য সম্পন্ন করা কঠিনই বইকি। পারিবারিক আদালতের অপ্রশস্ত স্থানে
অনেক সময় মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়েন। এমনকি যারা অন্যায়ভাবে আইনি হেনস্থার শিকার তাদেরও
বাধ্য হয়েই দিনের পর দিন এ ধরনের পরিবেশে হাজিরা দিতে হয়। ফলে আমাদের আইনব্যবস্থা,
অবকাঠামো অনেকের কাছেই বড় আতঙ্কের কারণ। এজন্যই শুধু আইন সংস্কার করলেই ন্যায়বিচার
ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা হবে এমনটি ভাবা ঠিক হবে না। বরং আদালতের অবকাঠামোগত সংস্কারেও মনোযোগ
বাড়াতে হবে।
দেশের প্রতিটি
আদালতের এজলাস বড় করা দরকার। আদালত ভবনে কক্ষগুলো এজলাসের মাপের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ
করে তৈরি করতে হবে। এজলাসে বিচারকদের সুষ্ঠুভাবে বিচারকার্য সম্পাদনের আলাদা জায়গা
থাকবে। বিচারককে সহযোগিতার জন্য নিয়োজিত কর্মচারীদের আলাদা জায়গা থাকবে। এ ছাড়া আইনজীবীদের
জন্যও প্রয়োজন আলাদা স্থান। শুধু তাই নয়, বিচারপ্রার্থী, বাদী, সাক্ষী এবং শিশুদের
জন্য আলাদা স্থান রাখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বিচারকের পক্ষে মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়ে
পড়ে এবং অভিযোগ রয়েছে আইনজীবীরাও অনেক সময় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দ্বারা নির্যাতিত হন।
পারিবারিক আদালতে এ সমস্যাটি বহুদিনের। তাই আইনের সংস্কারের আলাপ এলে পারিবারিক আদালতের
দিকে বিশেষ মনোযোগ দেওয়া বাঞ্ছনীয়। এজলাসের পাশাপাশি আদালতে বিচারকের সংখ্যাও বাড়াতে
হবে। কারণ দেশে পারিবারিক আদালতে যত মামলা হয় এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে একজন বিচারপতিই
এসবের মীমাংসা করেন। একজন বিচারপতি যখন একসঙ্গে অনেক মামলার তদারকিতে থাকবেন তখন তার
পক্ষে মীমাংসা করা অনেক কঠিন। এমনকি বিচারকের ওপর মানসিক অবসাদও বিচার প্রক্রিয়ায় প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ
প্রভাব ফেলতে পারে। তাই ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার স্বার্থে এসব সংকট দূর করা জরুরি।
আদালতকে যান্ত্রিক
কায়দায় পরিচালিত না করে বরং মানবিক কায়দায় পরিচালনার পরিবেশ নিশ্চিতের পাশাপাশি অবকাঠামোগত
সুযোগসুবিধা বাড়াতে হবে। যদি আদালতসংশ্লিষ্ট সব কাজের মধ্যেই সমন্বয়ের মাধ্যমে এগোনো
যায় তাহলে প্রত্যাশা করা যায় আমরা ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার দিকে অনেকটাই এগোতে পারব।
আর তা সম্ভব না হলে আদালতে ভোগান্তি এবং অভিযোগ বাড়তেই থাকবে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জটিলতা
বাড়বে এবং বিচারের দীর্ঘসূত্রতা আদালতের ওপরও বিষফোড়া হয়ে থাকবে। পারিবারিক আদালতে
বাড়তি মনোযোগ দেওয়ার বিষয়ে জোর দেওয়ার পেছনে কারণ একটিইÑ সমাজে স্থিতিশীলতা আনা। আমরা
দেখি, অধিকাংশ পারিবারিক মামলায় নারী ও শিশুর অধিকার একটি বড় অংশ হিসেবে থাকে। আমরা
সমাজে নারীর উন্নয়ন ও শিশুর নিরাপত্তার কথা বলি। কিন্তু আইনি প্রতিবন্ধকতা নারীর স্বাবলম্বী
হওয়ার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এমনকি দেশের ভবিষ্যৎ শিশুরাও অনেক সময় এখানকার অভিজ্ঞতা
সারা জীবন বহন করে, যা তাদের মানসিক বিকাশের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এসব বিবেচনা করেই
মূলত আমাদের সাজাতে হবে আইন অবকাঠামোর সংস্কার। প্রধান বিচারপতি দেশের বিভিন্ন প্রান্তের
আদালত প্রত্যক্ষভাবে সশরীরে দেখার জন্য যান। আইন মন্ত্রণালয় থেকেও দেখা হয়। তবে সে
ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়ের কারা তা করেন এ বিষয়ে জানা নেই। কিন্তু সংশ্লিষ্ট সবাই যদি আদালত
অবকাঠামো পর্যবেক্ষণ করে এর একটি সঠিক রিপোর্ট সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে দেন, তাহলে সংস্কারের
কাজটি আরও সহজ হয়।
মানুষ অনেক কষ্ট করে ন্যায়বিচারের জন্য আদালতে যাবে, এমনটি অমানবিক। আদালতকে মানুষের ভোগান্তির স্থান নয়, বরং তাদের আস্থার জায়গা হিসেবে গড়ে তোলার তাগিদেই অবকাঠামোর সংস্কার, পর্যাপ্ত বিচারিক সুযোগসুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। অভিযোগ রয়েছে, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও অন্য দায়িত্বশীলরা এ বিষয়ে দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নেন না। আদালতের বিচারের একটি বড় অংশ পারিবারিক আদালত। আর সঙ্গত কারণেই পারিবারিক আদালতের এজলাসের প্রতিবন্ধকতা তাদের না জানার কথা নয়। তাই আদালতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। এজন্য বিচারপতিদের ঘন ঘন আদালতে পর্যবেক্ষণ ভ্রমণ বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে আইন মন্ত্রণালয় থেকে সুষ্ঠু ব্যবস্থা নিতে হবে। যদি তা করা না যায় তাহলে আমাদের বিচারব্যবস্থায় শক্ত আইন প্রণয়ন করেও দৃশ্যমান ফল পাওয়া সম্ভব হবে না।