ট্রাম্পের বিজয় বিশ্লেষণ
ড. ইমতিয়াজ আহমেদ
প্রকাশ : ০৭ নভেম্বর ২০২৪ ০৯:২৩ এএম
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প ভোটারদের বড় ম্যান্ডেট পেয়েছেন। শুধু ইলেকটোরাল ভোটই নয়, বড় ব্যবধানে এগিয়েছেন পপুলার ভোটেও। দীর্ঘদিন পর এমনটিকে ব্যতিক্রমই বলতে হয়। অন্তত ইলেকটোরাল ভোটের ক্ষেত্রে এমনটি সচরাচর হয় না। সিনেট ও হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভসও রিপাবলিকানদের কাছে যাচ্ছে। তাই রিপাবলিকানরা এবার বিপুল ম্যান্ডেট পেয়েছে এবং তা কীভাবে কাজে লাগাবে সেটা পর্যবেক্ষণের বিষয়।
স্বাভাবিকভাবেই ধারণা করা যায়, জয়ের পর ইউক্রেনের প্রতি ট্রাম্পের মনোযোগ থাকবে। কারণ ট্রাম্প ইতোমধ্যে জানিয়েছেন, তিনি ক্ষমতায় থাকলে এ যুদ্ধই হতো না। এমনকি তিনি ঘোষণাও দিয়েছিলেন, শপথ নেওয়ার আগেই ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধ করবেন। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির পক্ষে ইতিবাচক অবস্থান তার কখনও ছিল এমনটি দেখা যায়নি। এ ক্ষেত্রে একটি বড় পরিবর্তন আমরা হয়তো দেখতে পাব। আরেকটি বিষয় আমাদের দেখতে হবে, তা হলো, কতগুলো স্টেট কদিন আগেও ডেমোক্র্যাটদের ঘাঁটি বলে বিবেচিত হলেও তা এবারে রিপাবলিকানদের কাছে গেছে। এখানে তরুণ ভোটার, আরব-আমেরিকান ভোটারদেরও একটি সংখ্যা দেখা গেছে। অর্থাৎ গাজায় গণহত্যা যুক্তরাষ্ট্রের ভোটাররা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের ইহুদি নাগরিকরাও বিক্ষোভ করেছেন। অবশ্য ব্লিঙ্কেন, বাইডেন ও কমলা হ্যারিসও যুদ্ধ বন্ধের জন্য কাজ করছিলেন।
তবে নির্বাচনী প্রচারের জন্য তারা এ ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেননি। কিন্তু এখন বড় পরিবর্তন আসবে কি না সেটিও পর্যবেক্ষণ করতে হবে। এই নির্বাচনে যেটা স্পষ্ট তা হলো, এবারে ভোটারদের ম্যান্ডেট ট্রাম্পের ওপর যুদ্ধ বন্ধের দায় চাপিয়েছে। তাই তাকে এ যুদ্ধ বন্ধ করতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। এও স্পষ্ট, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ-সহিংসতা থামানোর সক্ষমতা শুধু রিপাবলিকান দলেরই এখন রয়েছে। ডেমোক্র্যাটরা যে পারবে না তা এখন একেবারে স্পষ্ট। ইতিহাসও এর সাক্ষ্য দেয়। ভিয়েতনাম যুদ্ধও কিন্তু রিপাবলিকানরাই থামিয়েছিল। কারণ একটি রক্ষণশীল পার্টি যখন ক্ষমতা পায় তখন তাদের জন্য নীতিনির্ধারণ করা অনেক সহজ হয়ে যায়। মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের সঙ্গে নতুন করে আলোচনা ও চুক্তি শুরু হয়েছিল। তা রিপাবলিকানরা বিবেচনায় নেবে কি না সেটিও এখন বিবেচনা করতে হবে।
নির্বাচনের পর দক্ষিণ এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চল নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে। নির্বাচনের আগেও আমরা দেখেছি, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভালো সম্পর্ক রয়েছে। তা ছাড়া ট্রাম্পের জয় আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষিত না হলেও নরেন্দ্র মোদি তাকে বেশ বড় আকারেই শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। ডেমোক্র্যাটরা ক্ষমতায় থাকার সময় ইউক্রেন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে ভারত অনেকটা রাশিয়ার দিকে ঝুঁকে যায়। সেখানে ভারত, রাশিয়া ও চীন একটা নিউ ওয়ার্ল্ড অর্ডার তৈরি করে। এ বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অস্বস্তিকর ছিল। তাই ক্ষমতায় আসার পর নিজের সহযোগী শক্তি হিসেবে ট্রাম্প নরেন্দ্র মোদিকে কাছে টানার চেষ্টা করবেন। যদি তা হয় তাহলে আমাদের ওপর এর প্রভাব কেমন হবে তা বোঝা মুশকিল। যদিও ট্রাম্প টুইটে বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের বিষয়ে কথা বলেছেন। কিন্তু মনে রাখতে হবে, এর আগে কংগ্রেসে প্রিয়া সাহা যখন বক্তব্য রেখেছিল তখনও ট্রাম্প তার পক্ষেই কথা বলেছিলেন। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার অবশ্য বিষয়টিকে বিএনপির লবিং বলে অভিহিত করেছিল। তাই বাংলাদেশে যেন সুষ্ঠু নির্বাচন সম্পন্ন হয় এবং সংখ্যালঘুদের অধিকার সংরক্ষিত হয়Ñ এ বিষয়ে তিনি যথেষ্ট মনোযোগ রাখবেন।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে ডেমোক্র্যাটদের ব্যক্তিগতভাবে ভালো সম্পর্ক রয়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে তেমন সম্পর্ক যেহেতু নেই তাই ডোনাল্ড ট্রাম্প এমনকি রিপাবলিকান পার্টিও আমাদের এখানে নির্বাচনের মাধ্যমে রাজনৈতিক শক্তির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করার বিষয়টিতে জোর দেবে। তবে বড় আকারে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আমাদের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের পরিবর্তনের শঙ্কা নেই। রোহিঙ্গাদের ক্ষেত্রেও সম্ভবত সহায়তা কমবে। কিন্তু ডেমোক্র্যাটরা মিয়ানমারে রোহিঙ্গা গণহত্যার বিষয়ে যেভাবে উৎসাহ দেখিয়েছিল তা সম্ভবত রিপাবলিকানরা দেখাবে না। ভারতের সঙ্গে দেশটির নতুন সম্পর্কের প্রভাব কেমন হবে তা এখনই বলা মুশকিল। কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্প ভারতের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কোন্নয়নের ক্ষেত্রে বাড়তি চেষ্টা অব্যাহত রাখবেন এটুকু বলাই যায়।