কৃষি খাত
ড. মোহাম্মাদ কামরুজ্জামান মিলন
প্রকাশ : ০৬ নভেম্বর ২০২৪ ০৯:১৫ এএম
বাংলাদেশের কৃষি খাত এখন একটি নতুন যুগে প্রবেশ করতে যাচ্ছে, যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ব্যবহার কৃষি উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, খরচ কমানো, এবং ফসলের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। ছোট কৃষকের জন্য এআই প্রযুক্তির ব্যবহার দেশে কৃষির সুযোগ বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে। কৃষি ক্ষেত্রে উন্নত প্রযুক্তির অভাব এবং জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এআই বাংলাদেশে একটি বড় পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে। প্রায় ১০০ বছর আগে কৃষক যদি তাদের জমির মাটির ধরন, ফসলের বৈচিত্র্য এবং স্থানীয় আবহাওয়া সম্পর্কে বিশাল পরিমাণ তথ্য পেত, তাহলে হয়তো ১৯২০-এর দশকের আমেরিকান মিডওয়েস্টের ডাস্ট বোলের মতো বিপর্যয় এড়ানো যেত। কিন্তু এমন তথ্য তখন কল্পনাতীত ছিল। বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার করে বিশ্বব্যাপী কৃষক সেই বিপর্যয়ের ঝুঁকি হ্রাস করতে সক্ষম হচ্ছে।
সিজিআইএআর প্ল্যাটফর্ম ফর বিগ ডেটা ইন অ্যাগ্রিকালচার বিশ্বের বিভিন্ন খামারের তথ্য বিশ্লেষণ করে এমন এআই সিস্টেম তৈরি করছে, যা ফসল উৎপাদন ও আবহাওয়া সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ পূর্বাভাস প্রদান করতে
সক্ষম। এর ফলে ছোট কৃষক সঠিক সময়ে ফসল চাষ, পানি
ব্যবস্থাপনা এবং ফসলের ঝুঁকি হ্রাস করার উপায় সম্পর্কে তথ্য পেতে পারে। এর একটি
উদাহরণ হলো কলম্বিয়ার ধান চাষিরা, যারা এআই সিস্টেম ব্যবহার করে
তাদের চাষের সময় নির্ধারণ করতে এবং বৃষ্টিপাতের সময় ঝুঁকি থেকে বাঁচতে সক্ষম
হয়েছে। জাপান ও ইসরায়েলে প্রিসিশন অ্যাগ্রিকালচার প্রযুক্তি ব্যবহার করে মাটির
স্বাস্থ্য বিশ্লেষণ, পানি ব্যবস্থাপনা এবং সঠিক সময়ে সেচ
দেওয়ার মাধ্যমে ফসল উৎপাদন বাড়ানো হচ্ছে। স্যাটেলাইট চিত্র এবং ড্রোনের সাহায্যে
জমির প্রতিটি অংশের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হচ্ছে, যা
কৃষককে আরও কার্যকরভাবে পরিচালনা করতে সহায়ক। ইউরোপের দেশগুলোয় এআইনির্ভর ডিজিটাল
ফার্মিং সিস্টেম ব্যবহার করা হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, জার্মানির
ক্লিমেট কর্প নামে একটি কোম্পানি উন্নত ডেটা ব্যবহার করে কৃষককে সঠিক ফসল উৎপাদনের
পূর্বাভাস এবং কৌশল প্রদান করে, যা উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করছে। সিঙ্গাপুর
এবং জাপানে ইনডোর ফার্মিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে অভ্যন্তরীণ পরিবেশে ফসল উৎপাদন
করা হচ্ছে। কৃত্রিম আলো এবং তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তনের
ঝুঁকি এড়িয়ে উন্নতমানের ফসল উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে।
বাংলাদেশের কৃষিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সম্ভাবনা ব্যাপক।
দেশের অধিকাংশ কৃষকই ছোট জমির মালিক এবং
তারা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব থেকে বাঁচতে বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হন। এআই প্রযুক্তি তাদের জন্য একটি নতুন
দিগন্ত খুলে দিতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, প্রিসিশন অ্যাগ্রিকালচারের
মাধ্যমে মাটির পুষ্টি ও আর্দ্রতার সঠিক বিশ্লেষণ করে সঠিক পরিমাণে সেচ প্রদান করা
সম্ভব। এ ছাড়া
আবহাওয়ার পূর্বাভাস ও ফসলের রোগ নির্ণয়ের জন্য এআইভিত্তিক
প্রযুক্তি ব্যবহার করা হলে কৃষকের ঝুঁকি কমানো এবং উৎপাদন
বাড়ানো সম্ভব হবে। কৃষি ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার
নিশ্চিত করতে গবেষণা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অপরিহার্য। উন্নত প্রযুক্তির
প্রয়োগ এবং বাস্তবায়ন করতে হলে বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং
প্রযুক্তি সংস্থার মধ্যে কার্যকর অংশীদারি গড়ে তুলতে হবে। বিশেষত ছোট কৃষকের জন্য উপযোগী এআই প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও তাদের মধ্যে এ প্রযুক্তির
প্রসারের জন্য বৈজ্ঞানিক গবেষণা অপরিহার্য। বাংলাদেশে এ ধরনের প্রযুক্তির ব্যবহার
ত্বরান্বিত করার জন্য সরকারকে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক গবেষণা
সংস্থাগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে হবে।
কৃষিপ্রধান এ
উপমহাদেশে আমাদের জীবন পরিবেশের সঙ্গে ওতপ্রোত জড়িত। তবে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন, জলবায়ু পরিবর্তন,
নির্বিচার বন নিধন ও অদক্ষ বা অপরিকল্পিত চাষাবাদের কারণে ধীরে ধীরে আমাদের আবহাওয়া
বৈরী রূপ ধারণ করছে। দৈনন্দিন জীবনের পাশাপাশি এগুলো সরাসরি প্রভাবিত করছে কৃষি খাতকে।
গত দুই থেকে তিন বছরে ডিজিটাল কনটেন্ট ক্রিয়েশন, ভিজ্যুয়াল এডিটিং, ডেটা প্রসেসিং ও
যোগাযোগমাধ্যমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের ফলে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। স্বস্তির
কথা হলো, সেই ধারাবাহিকতায় এখন পরিবেশ সংরক্ষণ ও কৃষি খাতে উন্নয়নের কাজেও শুরু হয়েছে
এর ব্যবহার। মার্কেটস অ্যান্ড মার্কেটসের এক জরিপ অনুযায়ী, কৃষিতে এআই প্রযুক্তি খাত
২০২৫ সাল নাগাদ প্রায় ১ হাজার ১০০ কোটি মার্কিন ডলারের শিল্পে রূপ নেবে। প্রযুক্তির
এ যোগসূত্রে এত বড় বাজার সৃষ্টি হওয়ার পেছনে যথেষ্ট কারণও রয়েছে। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক
ফোরামের রিপোর্ট অনুযায়ী, কৃষিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহারে সেচের জন্য পানির ব্যবহার
অর্ধেকে কমিয়ে নিয়ে আসা সম্ভব। কীটনাশক ব্যবহার কমানো সম্ভব ৬০ শতাংশ। ফলে প্রথমত.
কৃষিকাজে কমবে খরচ, অপচয় কমবে মূল্যবান ভূগর্ভস্থ পানির এবং কীটনাশকের মতো ক্ষতিকর
রাসায়নিক ব্যবহার কমায় কমবে স্বাস্থ্যঝুঁকি।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কৃষি ক্ষেত্রে এআই ব্যবহারে ব্যাপক সাফল্য এসেছে। জাপান, ইসরায়েল, সিঙ্গাপুরের মতো দেশগুলো গবেষণা ও প্রযুক্তির যৌথ প্রচেষ্টার মাধ্যমে তাদের কৃষি ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধন করেছে। এ উন্নয়নের পেছনে সরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং বেসরকারি প্রযুক্তি সংস্থার মেলবন্ধন অত্যন্ত কার্যকর হয়েছে। বাংলাদেশের কৃষি ক্ষেত্রেও একই ধরনের গবেষণা ও সহযোগিতার মডেল অনুসরণ করা উচিত। আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে যেমন সিজিআইএআর প্ল্যাটফর্ম ফর বিগ ডেটা ইন অ্যাগ্রিকালচার, এফএও এবং অন্যান্য প্রযুক্তি সংস্থার সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে কাজ করার মাধ্যমে বাংলাদেশের কৃষি গবেষণা এবং এআই প্রযুক্তির প্রয়োগ আরও শক্তিশালী করা যাবে। এ গবেষণা ও সহযোগিতার মাধ্যমে স্থানীয় সমস্যাগুলোর সমাধান উদ্ভাবন করা যাবে, যা বাংলাদেশের কৃষকের জন্য কার্যকর হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, দেশের প্রেক্ষাপটে স্থানীয় আবহাওয়া, মাটির গঠন এবং ফসলের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সঠিক মডেল তৈরি করা হবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মডেল ও উদ্ভাবনগুলো স্থানীয় পর্যায়ে অভিযোজিত করা এবং তা বাস্তবায়ন করতে পারলে দেশের কৃষি ক্ষেত্র একটি টেকসই ও আধুনিক স্তরে পৌঁছাতে সক্ষম হবে।