বিশেষ লেখা
এম হুমায়ুন কবির
প্রকাশ : ০৫ নভেম্বর ২০২৪ ১৩:০০ পিএম
এম হুমায়ুন কবির
বরাবরের মতো যুক্তরাষ্ট্রের এবারের নির্বাচন নিয়েও সবার মধ্যে রয়েছে তুমুল আগ্রহ। কে জয়ী হবেনÑ রিপাবলিকান ডোনাল্ড ট্রাম্প নাকি ডেমোক্র্যাট কমলা হ্যারিস? হোয়াইট হাউসের চেয়ারে কে বসবেন এবং আমাদের সঙ্গে দেশটির সম্পর্ক কেমন হবেÑ এমন প্রশ্ন ইতোমধ্যে নানা মহলে দেখা দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আমাদের দুই থেকে তিনটি স্তরে সম্পর্ক নির্ভর করছে।
প্রথমেই দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের নিরিখে বিচার করতে হবে। জুলাইয়ে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর দায়িত্ব নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। এ সরকার ইতোমধ্যে অনেক সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এবং কাজও শুরু করেছে। অন্তর্বর্তী সরকার যদি প্রতিশ্রুত সংস্কার কার্যক্রম সম্পন্নের পাশাপাশি স্বচ্ছ, গঠন ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন আয়োজনের মাধ্যমে জনগণের নির্বাচিত রাজনৈতিক শক্তির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করার প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখে; তাহলে গণতান্ত্রিক ভিত্তিতে উভয়দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে বড় পরিবর্তন আসবে না।
অন্তর্বর্তী সরকারকে বাইডেন প্রশাসন যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে তা কমলা হ্যারিস ক্ষমতায় এলে কিছুটা বাড়তে পারে। একইভাবে টেকসই গণতান্ত্রিক কাঠামো গড়ে তুলতে পারলে ট্রাম্প প্রশাসনের কাছ থেকেও সহযোগিতা পাওয়া যাবে। বিশ্বের গণতান্ত্রিক দেশগুলোর প্রতি ঐতিহাসিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা লক্ষ করা যায়। এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দেশ বাংলাদেশ। ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব বিবেচনায় যে প্রশাসনই দায়িত্বে আসুক না কেন, বাংলাদেশের সঙ্গে তারা সহযোগিতাপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখবে।
এবার যদি আমরা প্রেসিডেন্টদের ব্যক্তিগত আদর্শ-প্রতিশ্রুতির ফ্যাক্টর বিবেচনা করি তাহলে কিছুটা পার্থক্য দেখতে পাই। যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসী প্রসঙ্গটি ইতোমধ্যে একটি বড় ডিসাইডিং ফ্যাক্টর। ট্রাম্প যেভাবে তার অভিবাসী নীতিমালা প্রসঙ্গে আলোচনা করেছেন, সেক্ষেত্রে বাংলাদেশের অভিবাসনপ্রত্যাশীদের ওপর চাপ বাড়বে। ধারণা করা যায়, অভিবাসন প্রক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করা ব্যক্তিদের কেউ যদি যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ী হয়, তাহলে পূর্বের মতো তার পরিবারকে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা ট্রাম্প প্রশাসন বন্ধ করে দিতে পারে। এমনটি হলে বাংলাদেশিরা নানাভাবে নেতিবাচকতার সম্মুখীন হতে পারেন। আবার ট্রাম্পের মধ্যে এক ধরনের বর্ণবাদী আচরণও লক্ষ করা যায়।
নির্বাচনের আগে ৩১ অক্টোবর ডোনাল্ড ট্রাম্প বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতনের নিন্দা জানিয়ে সামাজিক মাধ্যম এক্সে (পূর্বের টুইটার) একটি টুইট করেছেন। মূলত এর মাধ্যমে সংখ্যালঘু প্রসঙ্গে বিশ্বের কাছে যে ন্যারেটিভটা তৈরি হয়েছে, তা আমাদের জন্য চিন্তার। আমরা মার্কিন নির্বাচনের রাজনীতির মাঝে ঢুকে গেলাম।
আমাদের দেশ থেকে বিগত এক দশকে ১৩ হাজারেরও বেশি শিক্ষার্থী যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষা নিতে গেছে। ট্রাম্প প্রশাসনের বর্ণবাদী আচরণের কারণে যারা দেশটিতে উচ্চশিক্ষা নিতে যেতে চান, তাদের মধ্যে এক ধরনের অনুৎসাহ দেখা দিতে পারে। বিষয়টি নিঃসন্দেহে তরুণ প্রজন্মের জন্য দুঃসংবাদ। কারণ এখনও উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্র তরুণদের প্রাথমিক লক্ষ্য। তাই ট্রাম্প এলে তার ব্যক্তিগত আদর্শ ও নীতিমালার এ নেতিবাচকতা আমাদের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
সর্বশেষ বহুপক্ষীয় দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যেতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বে বহুমুখী সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রম নিশ্চিত করে থাকে। তাদের এ কর্মসূচির আওতায় দেশে যক্ষ্মা রোগীদের চিকিৎসা, এমনকি রোহিঙ্গাদের ত্রাণ সরবরাহও করা হয়। ইউএসএইডের মাধ্যমে বড় একটি সহায়তা আমরা পেয়ে থাকি। এমনকি জাতিসংঘের সহায়তা কার্যক্রমেরও বড় অংশীদার যুক্তরাষ্ট্র। ট্রাম্প ক্ষমতায় এলে যদি এ সহায়তা কমিয়ে দেন, তাহলে রোহিঙ্গা সংকট আমাদের জন্য আরও বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়াবে। ট্রাম্প ক্ষমতায় এলে আরেকটি সমস্যা দেখা দিতে পারে, তা হলো জলবায়ু ইস্যু। জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচকতার বিষয়টি ট্রাম্প বিশ্বাস করেন না। তাই জলবায়ু বিষয়ক বৈশ্বিক উদ্যোগ থেকে তিনি সরে আসতে পারেন। এমনটিও আমাদের জন্য ভালো ইঙ্গিতবাহী নয়। এক্ষেত্রে জলবায়ু পরিকল্পনায় বিভিন্ন ক্ষেত্রে আমরা যে আর্থিক সহযোগিতা পেতাম তা হয়তো আর আসবে না। কাজেই ট্রাম্প প্রশাসন এলে বাংলাদেশের ওপর দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় চাপ বাড়ার শঙ্কা একেবারেই উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
অন্যদিকে ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী কমলা হ্যারিস মোটাদাগে বর্তমান সরকারের নীতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখবেন বলেই মনে হচ্ছে। যেভাবে বাইডেন প্রশাসন বর্তমান পৃথিবীর সঙ্গে শক্তিশালী সম্পর্ক গড়ে তোলার দিকে নজর রেখেছিলেন, কমলা হ্যারিসও সেই চর্চা অব্যাহত রাখতে সচেষ্ট হবেন। তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যেসব গণতান্ত্রিক চর্চা ও নীতিমালা রয়েছে, সেগুলোও যথাযথভাবে সম্মানের সঙ্গে ধরে রাখতে সচেষ্ট হবেন বলেই ধারণা। আমরা দেখছি, ভূরাজনৈতিক বিষয়গুলোকে ডোনাল্ড ট্রাম্প অতি সরলীকরণের মাধ্যমে সমাধান করতে চান। কিন্তু এসব বিষয়ে যে জটিলতা আছে, তা সমাধানে যুক্তি এবং চিন্তাশীল কার্যক্রমের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে; যা তিনি প্রকারন্তরে অস্বীকারই করেন। ক্ষমতায় থাকার সময় তিনি উত্তর কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট কিম জংয়ের সঙ্গে সাক্ষাতের মাধ্যমে ভেবেছিলেন, কোরিয়া সমস্যার সমাধান হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে তা কোনো সমাধানই বয়ে আনেনি, সেটাও স্পষ্ট।
চীনকে পছন্দ করেন না ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি নির্বাচিত হলে চীনের সব ধরনের পণ্যে অধিক হারে শুল্কারোপ করতে পারেন। চীনের বিষয়ে মার্কিন রাজনীতিতে রিপাবলিকান ও ডেমোক্রেটিকদের মধ্যে রয়েছে ঐকমত্য। সে নীতি অক্ষুণ্ন থাকতে পারে কমলা হ্যারিস বিজয়ী হলে। মধ্যপ্রাচ্য ইস্যুতেও এ দুই নেতার দৃষ্টিভঙ্গিতে পার্থক্য রয়েছে। ধারণা করি, ট্রাম্প বিজয়ী হলে যেকোনো ধরনের সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণের বিষয়ে তিনি ইসরায়েলকে স্বাধীনতা দিতে পারেন। অন্যদিকে কমলা হ্যারিস বিজয়ী হলে তিনি ইসরায়েলের ওপর আরেকটু চাপ বাড়াতে পারেন, যাতে করে ইসরায়েল যুদ্ধবিরতি মেনে নেওয়ার মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যকে স্থিতিশীলতার দিকে নিয়ে যেতে পারে। তবে এই নির্বাচনে যিনিই জিতুন, তার দায়িত্ব নেওয়ার মধ্য দিয়ে বিশ্ব রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানের মৌলিক পরিবর্তন আসার স্পষ্ট ইঙ্গিত রয়েছে।