× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

সম্পাদকীয়

নদ-নদী দূষণমু্ক্ত রাখুন, আপন গতিতে চলতে দিন

সম্পাদকীয়

প্রকাশ : ০৩ নভেম্বর ২০২৪ ০৮:৩৪ এএম

নদ-নদী দূষণমু্ক্ত রাখুন, আপন গতিতে চলতে দিন

‘ওগো নদী আপন বেগে পাগলপারা/আমি স্তব্ধ চাঁপার তরু গন্ধভরে তন্দ্রহারা…’Ñ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গানের এই কাব্যগীতির মধ্য দিয়ে নদীর প্রতি তার ভালোবাসারই শুধু বহিঃপ্রকাশ ঘটেনি, আমাদের অস্তিত্ব জুড়ে নদীর বহুমাত্রিক ভূমিকার বিষয়টিও যেন পরিস্ফুটিত হয়ে ওঠে। রূপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ দাশ তার ‘নদী’ কবিতার সূচনা-পঙ্‌ক্তিতে যে জিজ্ঞাসা রেখেছিলেন, তাও যেন নদীমাতৃক বাংলাদেশেরই অখণ্ড অংশ। তিনি লিখেছেন, ‘রাইসর্ষের খেত সকালে উজ্জ্বল হলোÑ দুপুরে বিবর্ণ হয়ে গেলো/নদী, তুমি কোন্‌ কথা কও?/অশ্বত্থের ডালপালা তোমার বুকের ’পরে পড়েছে যে,/জামের ছায়ায় তুমি নীল হলে/আরও দূরে চলে যাই/সেই শব্দ সেই শব্দ পিছে-পিছে আসে;/নদী নাকি?’ যে নদী আমাদের ভৌগোলিক সত্তার দিক থেকেই শুধু নয়, রূপসী বাংলার প্রকৃতিরও প্রধান অনুষঙ্গ; সেই নদী আজ চরম বিপন্ন-বিপর্যস্ত, পাশাপাশি অস্তিত্ব সংকটে দেশের অনেক নদ-নদীর প্রাণও ওষ্ঠাগত। এরই ফের সাক্ষ্য মিলেছে ২ নভেম্বর প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর একটি প্রতিবেদনে। গত দুই দশকে দেশের নদ-নদীগুলোতে ভারী ধাতুর কারণে দূষণের মাত্রা আশঙ্কাজনক পর্যায়ে গিয়ে ঠেকেছে বলে এক গবেষণায় দেখা গেছে।

দূষণ নিয়ন্ত্রণ ও ক্ষতিপূরণের জন্য অবিলম্বে পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে ‘এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড পলিউশন রিসার্চ’-এর গবেষণা প্রতিবেদনে। তাদের গবেষণায় জানা গেছে, ২০০১-২০১০ সালে নদীতে যে পরিমাণ দূষণ হয়েছিল, সেই তুলনায় ২০১১-২০২০ পর্যন্ত দূষণের মাত্রা অনেক বেশি। ঢাকার বুক চিরে বয়ে চলা বুড়িগঙ্গা সবচেয়ে বেশি দূষিত নদী হিসেবে চিহ্নিত হয়। তাদের গবেষণা প্রতিবেদনে আরও জানা যায়Ñ ঢাকা, রাজশাহী ও চট্টগ্রামের নদ-নদীগুলোর বেশিরভাগে ভারী ধাতুর উপস্থিতি অনেক বেশি। আর্সেনিক, সিসা, ক্যাডমিয়াম, ক্রোমিয়াম, লোহা ও ম্যাঙ্গানিজের গড় ঘনত্ব তিনটি ঋতুতে গ্রহণযোগ্য সীমা ছাড়িয়ে যায় এবং গ্রীষ্মের মাসগুলোতে সর্বাধিক দূষণ হয়। ট্যানারি, টেক্সটাইল ও ইলেক্ট্রোপ্লেটিং কারখানাসহ শিল্পকারখানার মাধ্যমে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বুড়িগঙ্গা। আর অন্যান্য জেলায় দখলের মতো অপরিণামদর্শী কর্মকাণ্ড এবং রাসায়নিক সার ও কীটনাশকসহ শিল্পবর্জ্যে নদ-নদীর দূষণমাত্রা ক্রমেই সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। আমরা জানি, দেশের নদ-নদীগুলোর অস্তিত্ব সংকট কিংবা প্রাণোচ্ছ্লতা হারিয়ে যাওয়ার পেছনে শুধু বলবান চক্রের আগ্রাসী থাবা এবং দূষণের ছোবলই অস্তিত্ব সংকটের একমাত্র কারণ নয়; এর পাশাপাশি রয়েছে নদী শাসন ও ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল পক্ষগুলোর ব্যর্থতাও।

উচ্চ আদালত দেশের নদ-নদীকে জীবন্তসত্তা হিসেবে ঘোষণা দেন। কিন্তু এরপরও নদ-নদীর অস্তিত্ব সংকট কাটাতে কিংবা এর সুরক্ষায় যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ফসলের জমি, যে মাটি থেকে আমাদের জোগান আসে প্রধান খাদ্যপণ্য ধান এবং অন্যান্য কৃষিজ পণ্য; সেই জমিতে অনেক ক্ষেত্রেই উৎপাদনব্যবস্থায়ও অভিঘাত লেগেছে নদ-নদীর বিপর্যস্ততার কারণে। স্মরণ করি, বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের সেই অমর গীতকাব্য পঙ্‌ক্তি, ‘এ-কূল ভাঙে ও-কূল গড়ে এই তো নদীর খেলা/সকালবেলার আমির রে ভাই (ও ভাই) ফকির সন্ধ্যাবেলা/সেই নদীর ধারে কোন্ ভরসায়/বাঁধলি বাসা, ওরে বেভুল, বাঁধলি বাসা, কিসের আশায়…’ এ-ও যেন এখন সামনে আসে ভিন্ন প্রেক্ষাপটে। আমরা দেখছি, আমাদের নদ-নদীর একূল ভাঙছে বটে কিন্তু ওকূল আর গড়ছে না। দূষণের পাশাপাশি ভাঙনের যে তাণ্ডব এর দায়ও সংশ্লিষ্ট কোনো পক্ষই এড়াতে পারে না। তাদের নজরদারি-তদারকির পাশাপাশি দখল-দূষণ ঠেকাতে যথাযথ আইনানুগ ব্যবস্থার ঘাটতির বিরূপ ফল আজকের এই দুরবস্থা। পানিসম্পদ এবং পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান ১ নভেম্বর রাজধানীর রামপুরা-জিরানি খাল পরিচ্ছন্নতাকরণ অভিযান অনুষ্ঠানে যথার্থই বলেছেন, ‘পরিস্কার নদী দেখেনি বর্তমান প্রজন্ম।’ দেশের নদ-নদীগুলোর সিংহভাগ যেভাবে বিষের আধার হয়ে উঠেছে তাতে শুভবোধসম্পন্ন যে কারও উদ্বিগ্ন না হয়ে উপায় থাকে না। প্রকৃতির ওপর তো বটেই, খণ্ডিতভাবে দেশের নদ-নদীর স্বাভাবিক বয়ে চলার ক্ষেত্রে যেসব প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি হয়েছে, এর বহুমাত্রিক বিরূপ মাশুল আমাদের দিতে হচ্ছে এবং দ্রুত এর প্রতিবিধান নিশ্চিত না করলে ভবিষ্যতে বহুমাত্রিক শঙ্কা কিংবা বিপদের ছায়া আরও কতটা প্রলম্বিত হবে, এর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ নিষ্প্রয়োজন।

প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর সপ্তাহজুড়ে ফিচার পাতার নামকরণের মধ্য দিয়ে দেশের নদ-নদীর প্রতি আমাদের সুস্পষ্ট অঙ্গীকার, যা মোটেও আবেগমথিত নয়; বরং স্পষ্ট দায়বদ্ধতার জানান দেওয়া। প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় নদ-নদীর নাব্য বজায় রাখা অপরিহার্য তো বটেই, পাশাপাশি নদীর গতিপথ স্বাভাবিক রাখা, দখল-দূষণ মুক্ত করা ইত্যাদি কর্মসূচি ইতোমধ্যে কম গৃহীত হয়নি; কিন্তু কার্যত সুফল মেলেনি। আমরা দেখেছি, দফায় দফায় এজন্য বহু প্রকল্প হাতে নেওয়া হলেও এবং পর্যাপ্ত বরাদ্দ দেওয়া সত্ত্বেও বছরের পর বছর কেটে গেলেও প্রকল্প বাস্তবায়ন তো হয়ইনি, উপরন্তু অনিয়ম-অব্যবস্থাপনাই যেন নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছিল। দূষণের উৎস জানার পরও সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল পক্ষগুলো যথাযথ প্রতিবিধান নিশ্চিত করতে পারেনি বরং যারা দূষণের হোতা তাদের সঙ্গে তারা যেন প্রতিকারের নামে ‘সাপলুডু’ খেলেছে। আমরা আশা করব, দেশের পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার এ ব্যাপারে যথাযথ কার্যকর পদক্ষেপ নেবে এবং দূষণ তো বটেই দখলসহ আরও যেসব কারণে বেশিরভাগ নদ-নদীর মৃতপ্রায় দশা, এর প্রতিবিধান নিশ্চিত করতে বিলম্বে হলেও কার্যকর পদক্ষেপ নেবে। ইতোমধ্যে ক্ষতি যা হওয়ার হয়ে গেছে, কিন্তু এখন লক্ষ্য থাকুক ক্ষতির পরিসর যেন আর না বিস্তৃত হয় এবং যে ক্ষতি হয়েছে তা কাটিয়ে কীভাবে নদ-নদীর প্রাণোচ্ছলতা ফিরিয়ে আনা যায়। দেশের শাখা নদীগুলোর অবস্থা আরও বিপজ্জনক। আমরা আশা করব, নদ-নদীর সুরক্ষায় বিগত সরকারগুলোর আমলে যে উচ্চারণসর্বস্ব অঙ্গীকার-প্রতিশ্রুতি শুনেছি, বর্তমান সরকারের সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলরা সেই বৃত্ত থেকে বের হয়ে এসে আমাদের জীবন্ত সত্তার ঔজ্জ্বল্য ফিরিয়ে দিতে যথাযথ ব্যবস্থা নেবেন।

নদী-জলাশয় ও জলাভূমি বাঁচাতে হবে, ঠেকাতে হবে দখল-দূষণ, এই দাবি সব সময়ের। আমরা নদী, জলাভূমি, জলাশয়গুলোর সুরক্ষার পাশাপাশি প্রতিটি এলাকায় জলসম্পদের তালিকা তৈরির তাগিদ দিই। দূষণের কারণগুলো অচিহ্নিত নয়। যেহেতু কারণ জানা আছে, সেহেতু এর প্রতিবিধানে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়সহ সব পক্ষ যূথবদ্ধ প্রয়াস চালাবে কঠিন প্রত্যয়ে, এটাই প্রত্যাশা। জীবনের অধিকার সুপেয় পানিপ্রাপ্তির অধিকারের। বিশুদ্ধ পানি ও বাতাসের অধিকার না থাকলে জীবন বিপন্ন হতে বাধ্য। নদ-নদী ও জলাশয়ের ভৌগোলিক অবস্থান নির্ণয়ক্রমে দূষণ সংকট দূর করতেই হবে। সুপেয় পানি ও প্রতিবেশ ব্যবস্থার ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলে এমন সবকিছু বন্ধে নিতে হবে কঠোর অবস্থান। আমরা দূষণমুক্ত পরিষ্কার নদ-নদী দেখতে চাই এবং দূষণের জন্য যারা দায়ী তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাই। 

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা