পর্যবেক্ষণ
মো. জাকির হাসান
প্রকাশ : ০২ নভেম্বর ২০২৪ ০৮:১২ এএম
মো. জাকির হাসান
কারাগার সংশোধনাগার হিসেবে কাজ করে। বন্দিদের সমাজমুখী, সংশোধন ও মানসিকভাবে পরিশুদ্ধির প্রচেষ্টা কারাগারের একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। মানুষ অপরাধী হয়ে জন্মায় না, পারিপার্শ্বিক নানা অনুঘটক মানুষকে অপরাধে জড়িয়ে পড়তে বাধ্য করে। তবে মানুষের অপরাধপ্রবণতার পেছনে অন্যতম চালিকা হিসেবে কাজ করে দারিদ্র্য। দারিদ্র্যের কশাঘাতে অসহায় মানুষ বাধ্য হয়েই অনেক সময় অন্ধকার জগতের ফাঁদে পড়ে; যা তাকে অপরাধী করে তোলে। একজন অপরাধীর অপরাধ যখন আদালতের মাধ্যমে প্রমাণ হয়, তখন আদালত তার শাস্তি নির্ধারণ করেন। এই শাস্তিই সে ভোগ করে কারাগারে। অপরাধীর অপরাধের মাত্রা অনুসারেই আদালত তার শাস্তি দেন। দাগি আসামি বলে চিহ্নিত যারা, তাদের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সাজাও রয়েছে। তবে কারাগার বলতে প্রচলিত অর্থে আমরা যেন বুঝি, কারাগার মানেই শাস্তির স্থান। প্রকৃতপ্রস্তাবে তা-ও কিন্তু নয়। কারণ কারাগার শুধু বন্দিদের রাখারই স্থান নয়। সমাজের অপরাধী, যারা আদালতের মাধ্যমে সাজা ভোগ করার জন্য কারাগারে আসেন, তাদের সংশোধনাগার হিসেবেও কারাগার পরিচিত।
কারাগার শুধু
বন্দিদের রাখার জায়গা নয়, তারা যেন সাজা ভোগ শেষে সমাজের সাধারণ মানুষের সঙ্গে তাদের
মতো স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারে, যেন সুস্থ-স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারে কারাগার
এ কাজটিও করে। এজন্য কারাগারে যারা সাজাপ্রাপ্ত হয়ে আসেন তাদের সাজাভোগ শেষে সুস্থ
জীবনে ফিরিয়ে দিতে কারাগারে নানা ধরনের প্রশিক্ষণ এবং কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে সমাজসচেতন
করে তোলা হয়। শুধু তাই নয়, তাদের নানা ধরনের পেশাগত দক্ষতামূলক কাজের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে
দক্ষ করে তোলার উদ্যোগ রয়েছে; যা তাদের সুস্থ-স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাওয়ার পর কর্মমুখী
করে তুলতে সহায়ক। সাজার মেয়াদ শেষ হলে তারা যেন মুক্ত পৃথিবীতে যথাযথ কর্মসংস্থান করে
নিতে পারেন এবং দারিদ্র্যের কারণে আবারও অপরাধের পথে না হাঁটেন, এমন ব্যবস্থাই কারাগারের
সংস্কারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
নিকট অতীতে পুরান
ঢাকার কারা কনভেনশন হলে ‘কারাগার সংস্কার : বাস্তবতা ও করণীয়’ শীর্ষক একটি কর্মশালায়
অন্তর্বর্তী সরকারের শিল্প এবং গৃহায়ন ও গণপূর্ত উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান বলেন, কারাগারগুলো
সংস্কারে সংশ্লিষ্ট সবাইকে উদ্যোগী হতে হবে। এ-সংক্রান্ত বিদ্যমান আইন যুগোপযোগী করতে
বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশন সুপারিশ করবে। আমরা জানি, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মাধ্যমে
রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে দেশে নানামুখী সংস্কার বিষয়ে কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
এই কার্যক্রমের অংশ হিসেবেই কারাগারের সংস্কারের বিষয়টি আলোচনায় আসছে। আশার কথা, এ
নিয়ে প্রাথমিক পর্যায়ে আলোচনাও শুরু হয়েছে; একই সঙ্গে রাজনৈতিক বিবেচনায় কারাগারকে
ব্যবহারের বিষয়ও সামনে আসছে। দীর্ঘদিন কারাগারে মহাপরিদর্শক হিসেবে দায়িত্ব পালন করায়
কারাগারের সঙ্গে বিচার বিভাগের সম্পর্ক এবং সংস্কারের বিষয়ে কিছু ভাবনা সংযোজনের তাগিদ
অনুভব করছি।
কারা মহাপরিদর্শক
হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের বন্দিদের ব্যবহারিক জীবনে কাজে লাগে
এ রকম প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা চালু করেছিলাম; যা পরে দেশের অন্যান্য কারাগারেও ছড়িয়ে
দেওয়া হয়। দায়িত্ব পালনের সময় লক্ষ করেছি, স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাওয়ার পর তাদের কর্মমুখী
করে তুলতে যেসব বিষয়ে প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নিয়েছিলাম, তাতে বন্দিদের আগ্রহের ঘাটতি ছিল
না। ব্রিটিশ আমলে কারাগারে চালু হওয়া কিছু নিয়ম এখনও বহাল রয়েছে। তখন দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের
কারাগারে কিছু কাজ দেওয়া হতো, সাধারণ বন্দিদের বেলায় তা করা হতো না। কারাগারে বন্দিদের
যেসব কাজ দেওয়া হতো তার মাঝে বেতের সামগ্রী নির্মাণ, নারকেলের ছোবড়া দিয়ে দড়ি বানানো,
সনাতন পদ্ধতিতে তাঁতের কাপড় বুনন, মোড়া বানানো ছিল উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়া নারীদের জন্য
অতিরিক্ত হিসেবে সূচিকর্মের কিছু কাজ দেওয়া ছিল। আমি দায়িত্ব পালনের সময় লক্ষ করেছি,
একজন দণ্ডপ্রাপ্ত বন্দির একটি বেতের সামগ্রী তৈরি করতে গড়ে তিন থেকে চার দিন লাগত।
বেত দিয়ে যখন একটি মোড়া বানানো হতো, তাতে প্রায় ২০০ টাকার মতো খরচ হতো। তৈরি মোড়া সর্বোচ্চ
৬০০ টাকায় বিক্রি হতো।
এর যে ব্যয় এবং
আয়, তা থেকে যেটুকু টাকা লাভ হতো মাসের হিসাবে একজন বন্দির জন্য তা ছিল খুবই সামান্য;
যা দিয়ে কারাগারের বাইরে থাকা তার পরিবারের ভরণপোষণ অসম্ভবই বলা চলে। এ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন
জরুরি। দায়িত্ব পালনের সময় আমার মনে হয়েছে, সাজাভোগ থেকে বাইরে মুক্তজীবনে ফিরে একজন
বন্দি যেন সচ্ছলতার মুখ দেখেন তিনি যেন স্বাধীন কর্মমুখী পেশা বেছে নিতে পারেন, যার
মাধ্যমে তার পরিবারের ভরণপোষণ করা সম্ভব। সে ধরনের প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছি।
কারণ সাজা শেষে জেলের বাইরে স্বাভাবিক জীবনে ফেরা, তাদের পুনর্বাসন প্রক্রিয়াকে যদি
গুরুত্ব না দেওয়া হয়, তাহলে সমাজে অপরাধপ্রবণতা কমবে না। দরিদ্রতাসহ নানা কারণে যারা
অপরাধী হয়ে আসে, তাদের যদি স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে দিতে দক্ষ করে তোলা না যায়, তবে
অপরাধ কমবে না। একজন অপরাধীকে সংশোধনের মাধ্যমে তার আচরণগত পরিবর্তনের সঙ্গে কর্মমুখী
শিক্ষা দেওয়া সম্ভব হলে কারাগার এবং বন্দি উভয়ের জন্যই সুখের।অবকাঠামোগত উন্নয়নের ছোঁয়ায়
যেভাবে উঁচু উঁচু দালানকোঠায় চারপাশ ছেয়ে যাচ্ছে, তাতে একজন ইলেকট্রিক মিস্ত্রির গুরুত্ব
যেমন বাড়ছে, তেমন বাড়ছে স্যানিটারি মিস্ত্রি, প্লাম্বিং কাজে অভিজ্ঞদের। আবার বৈদ্যুতিক
সরঞ্জাম যেমন টিভি, ফ্রিজ, ওভেন, এসিসহ গৃহস্থালি নানান যন্ত্রের মেরামতের জন্য দক্ষ
কর্মীরও প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে। এসব বিষয় লক্ষ করেই আমি দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলতে দেশের কারাগারগুলোয়
এ ধরনের প্রশিক্ষণ কর্মসূচি শুরু করি।
দেখা গেছে, নারী
বন্দির বড় অংশই তরুণী যাদের বেশিরভাগই গ্রেপ্তার হয়েছে বা হয় বিভিন্ন হোটেলে রেইডের
মাধ্যমে। এ তরুণীরাও অর্থের জন্যই এমন পথে হাঁটতে বাধ্য হয়। তাই স্বাভাবিক জীবনে ফিরে
যাওয়ার পর তাদের অর্থের অভাব মেটানোর দিকে বাড়তি মনোযোগ দেওয়া জরুরি। কারাগারে নারী
বন্দির অনেকেই বিউটি পারলারের কাজ শেখার আগ্রহ পোষণ করেন। কারাগারে তখন এ ধরনের কাজে
প্রশিক্ষণ দেওয়ার সুযোগ ছিল না। আমি বাইরে থেকে প্রশিক্ষক এবং প্রশিক্ষণ সরঞ্জাম কিনে
তাদের প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নিই। নারী বন্দিদের কুটিরশিল্পের বাইরে বিউটি পারলারসহ অন্যান্য
কর্মমুখী কাজেরও প্রশিক্ষণ দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। বর্তমানে আমাদের বৈদেশিক মুদ্রা
অর্জনের বড় খাত তৈরি পোশাকশিল্প। এ শিল্পের জন্যও দক্ষ শ্রমিক তৈরিতে উদ্যোগ গ্রহণ
করি। গার্মেন্টের কাজের প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু হয়। একজন উদ্যোক্তার মাধ্যমে আমরা ৩৫টি
মেশিন স্থাপনের ব্যবস্থা করি। এখন নানা স্থানে বেকারি গড়ে উঠছে। তাৎক্ষণিকভাবে তৈরি
খাবার মানুষ কিনছে। কারা মহাপরিদর্শক থাকাকালে কারাগারে বিস্কুট বা রুটি বানানোর জন্য
বন্দিদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করি। তাদের তৈরি পণ্য জেলখানার সঙ্গে থাকা আউটলেটে বিক্রি
করা হতো।
কারাগার সংস্কারের
ক্ষেত্রে কারাগারে কর্মমুখী প্রশিক্ষণের বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া দরকার। পুরুষের পাশাপাশি
নারীর উপযোগী কারিগরি প্রশিক্ষণের জন্যও আলাদা ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন। কারাগার
নির্মাণের ক্ষেত্রে এসব বিষয় বিবেচনায় আসতে শুরু করেছে। তবে শুধু বিবেচনায় আসাই সব
নয়, বরং কারিগরি প্রশিক্ষণের সুষ্ঠু প্রয়োগের মাধ্যমে কারাগারকে প্রকৃতপক্ষেই সংশোধনাগার
হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা সংস্কার প্রক্রিয়ার মূল লক্ষ্য হওয়া প্রয়োজন। কারাগারকে সংশোধনাগার হিসেবে
রূপান্তরে কারা সংস্কার কর্মসূচির দিকে গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ কারাগারে অপরাধীর আচরণের
সংশোধনের পাশাপাশি আমরা যদি তাদের দক্ষ জনশক্তি হিসেবে রূপান্তর করতে পারি, তাতে উপকৃত
হবে সমাজ ও রাষ্ট্র।
সময়ের পরিক্রমায়
আমরা যেন অসচ্চ্ছল ব্যক্তিকে আর্থিকভাবে সচ্ছল করে তুলতে পারি তেমন সংশোধন প্রক্রিয়ার
দিকেই এগোতে হয়। কারাগারের সংস্কারের ক্ষেত্রে আধুনিকায়ন ধারণাটি মূলত এখানেই। সময়ের
সঙ্গে সঙ্গতি রেখে বন্দিদের নানাভাবে দক্ষতা বাড়ানো প্রয়োজন। দারিদ্র্য যেহেতু আমাদের
একটি বড় সমস্যা, তাই কারিগরি জ্ঞানের মাধ্যমে তাদের যদি দক্ষ করে তোলা যায়, তাহলে মানসিকভাবেও
তারা অনেক আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠবে; যা তাদের অপরাধী প্রবণতা থেকে সরিয়ে রাখবে।দেশের
বিভিন্ন কারাগারে রাজনৈতিক প্রভাব অনেক সময় প্রতিষ্ঠানের নিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতি ব্যাহত
করে, এমন অভিযোগও রয়েছে। এ অভিমতের সঙ্গে সম্পূর্ণ একমত হতে পারছি না। কারাগারে নির্দেশনার
এখতিয়ার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এবং তিনি যেহেতু রাজনৈতিক ব্যক্তি, তাই হয়তো এমন অভিযোগ।
তবে কারাগারে বন্দিদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত জেল কর্তৃপক্ষই চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করে। অন্তত
আমার দায়িত্বকালে কিছু কিছু ক্ষেত্রে সুপারিশ পেলেও নিয়ম অনুসারেই সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
রাজনৈতিক প্রভাব
কারাগারে কতটা ক্ষতি করেছে তা আসলে বলা মুশকিল, যেহেতু গত পনেরো বছর এর সঙ্গে যুক্ত
ছিলাম না। তবে কারাগার পরিচালিত হয় জেলকোড অনুযায়ী, কারাগারে কী হবে তা জেলকোডেই নির্ধারণ
রয়েছে। এ ক্ষেত্রে রাজনীতিকরা নিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতিতে কতটা প্রভাবিত করেছেন তা ব্যাখ্যা
করতে গেলে আগে জানতে হবে তারা কোন কোন ক্ষেত্রে তা করেছেন। এজন্য অনুসন্ধান প্রয়োজন।
তবে জেলকোডের ব্যত্যয় ঘটিয়ে কারা অভ্যন্তরে হস্তক্ষেপ অনেকটাই জটিল। রাজনৈতিক বন্দিদের
অনেকে প্রায়ই জেলে অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি করার চেষ্টা করেন। সে ক্ষেত্রেও জেলকোড
অনুযায়ীই কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। কারা জগৎটি একদমই বাইরের থেকে আলাদা,
তবে বাইরের প্রভাবমুক্ত নয়। কিন্তু রাজনৈতিক প্রভাবের ভিত্তিতে জেল কর্তৃপক্ষের কার্যক্রম
বিঘ্নিত হওয়ার সুযোগ কম।
কারা সংস্কারের ক্ষেত্রে কারাগারে দায়িত্বশীলদের যথাসম্ভব মানবিক আচরণ করতে হবে। জেল কর্তৃপক্ষকে জেলকোড অনুসরণের পাশাপাশি জেলে মানবিকতার স্পর্শ যুক্ত করতে হবে। তা ছাড়া বন্দিদের আধুনিক প্রশিক্ষণের পাশাপাশি মানসিক কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থাও করা প্রয়োজন। একেক বন্দির একেক ধরনের মানসিক গড়ন থাকে। ফলে কাউন্সেলিং জরুরি। কারাগারের সংস্কারের ক্ষেত্রে মূলত কারিগরি প্রশিক্ষণ, মানবিক আচরণ এবং বন্দিদের মানবাধিকার যাতে লঙ্ঘিত না হয় সেদিকে মনোযোগ গভীর করতে হবে। সাজা শেষে সংশোধিত মানুষ হিসেবে তারা যেন সমাজে আলোকবর্তিকা হয়ে ফিরতে পারে এরও ব্যবস্থা করতে হবে। আবার আইনের ব্যত্যয় ঘটিয়ে যারা সমাজে গুরুতর ব্যাধি হয়ে ছিলেন, তাদের কঠোর আইনি শাস্তি বাস্তবায়নের নজির হিসেবেও কারাগার যেন অপরাধীদের কাছে আতঙ্ক হয়ে থাকে, এই ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে।