ব্যাংক খাত
ড. নীলাঞ্জন কুমার সাহা
প্রকাশ : ২৯ অক্টোবর ২০২৪ ০৮:৪৭ এএম
ড. নীলাঞ্জন কুমার সাহা
দেশের ব্যাংক-বীমা-শেয়ারবাজার সব খাতেই আস্থার সংকট প্রবল আকার ধারণ করেছে। বিদায়ি সরকারের আমলে ব্যাংকিং খাত এতটাই দুর্বল হয়ে ওঠে যা স্বাধীনতার পর দেশের ইতিহাসে কখনই ঘটেনি। তারল্যসংকটে জেরবার হয়ে পড়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত থেকে শুরু করে আধাসরকারি ও বেসরকারি অনেক বাণিজ্যিক ব্যাংক। খেলাপি ঋণের হার অসহনীয় মাত্রায় বেড়ে গেছে। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ স্থবির। আমানত সংগ্রহ ও প্রবৃদ্ধির হার কোনো কোনো ব্যাংকে ঋণাত্মক। বাধ্যতামূলক ক্যাশ রিজার্ভ ও তারল্য সঞ্চিতি রাখতে হিমশিম খাচ্ছে বহু ব্যাংক। ব্যাংকের মাধ্যমে আসা বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ কমে গেছে এবং বৈদেশিক বাণিজ্য তথা আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমে দেখা দিচ্ছে আস্থার সংকট। তবে বৈদেশিক মুদ্রার আগমন চিত্র আশাব্যঞ্জক। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর জানিয়েছেন, ‘১০টি ব্যাংক লাইফ সাপোর্টে আছে’। তার মতে এ ব্যাংকগুলো প্রায় দেউলিয়া হয়ে গেছে।
দেশে অন্তত ১০টি ব্যাংক দৈন্য অবস্থায় রয়েছে এ নিয়ে সন্দেহ নেই। কিন্তু ব্যাংকগুলো দেউলিয়া হয়ে যায়নি। দুয়েকটি ব্যাংকের কিছুটা উন্নতি হলেও অধিকাংশেরই তারল্য এখনও প্রায় শূন্যের কোঠায়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিশ্চয়তায় অন্য কয়েকটি ব্যাংক এসব ব্যাংককে তারল্য সহায়তা দিয়েছে। কিন্তু বিগত কদিনের পর্যবেক্ষণে অবস্থার খুব উন্নতি হয়নি এ কথা বলা যায়। কারণ এসব ব্যাংকে আমানত তোলার ক্ষেত্রে কৃত্রিম বাধা তৈরি করা হয়েছে। অনেক ব্যাংকে সামান্য অঙ্কের চেকও ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। যারা সুদমুক্ত ব্যাংকিংয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন বা উচ্চ মুনাফার আশায় ব্যাংকের বাছবিচার করেননি, তারা এখন বড় সংকটে পড়েছেন। পট পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে অন্তর্বর্তী সরকার ব্যাংক খাত সংস্কারে নানা উদ্যোগ নিয়েছে। ব্যাংকিং কমিশন গঠনের উদ্যোগটিও নিঃসন্দেহে আমাদের জন্য আশাব্যঞ্জক। কিন্তু অবস্থা দৃষ্টে প্রতীয়মান হয়, সংশ্লিষ্ট খাতের সংস্কারই পর্যাপ্ত নয়। ব্যাংকের গ্রাহক বা আমানতদারের আস্থা ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যেও কাজ করতে হবে। আস্থার সংকট কাটাতেই হবে। আস্থাই ব্যাংকের অন্যতম মূল পুঁজি।
চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের দুই মাসে প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা
আমানত কমেছে। ব্যাংক খাতে এভাবে আমানত কমে যাওয়ার নজির নিকট অতীতে দেখা যায়নি।
গ্রাহক বা আমানতকারী আস্থা হারিয়ে ফেললে ব্যাংক খাত বিপর্যয়ের মুখে পড়তে বাধ্য।
আমরা জানি, বাণিজ্যিক ব্যাংকের লাখ লাখ কোটি টাকার ঋণদান তহবিলের
প্রধান উৎস আমানতকারীর অর্থ। আর আমানতকারীরা তাদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষার জন্যই অর্থ
ব্যাংকে গচ্ছিত রাখেন। কিন্তু ব্যাংক যখন তাদের আমানত সঠিক সময়ে দিতে ব্যর্থ
হয় তখন নানা সংকট দেখা দিতে শুরু করে। এ নিয়ে সূক্ষ্মভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, সাধারণ
আমানতকারীদের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আমানতই মোট আমানতের সিংহভাগ। গ্রাহকদের
মধ্যে ব্যাংকের প্রতি আস্থা কমতে শুরু করেছে-এই বার্তা কোনোভাবেই সুখকর নয়। আমানতকারী যখন কয়েকটি ব্যাংক থেকে নিজের অর্থ নির্বিঘ্নে তুলতে পারছেন না, তখন তার মধ্যে ভীতির সৃষ্টি হচ্ছে। এ ভয় অন্য আমানতকারীদের মধ্যেও
সঞ্চারিত হয়। এ ক্ষেত্রে যাদের অর্থ তোলা জরুরি নয়, তারাও ব্যাংকের দেউলিয়া হয়ে যাওয়ার দুশ্চিন্তায় টাকা উত্তোলন করতে
চাচ্ছেন। এভাবেই অনেক ব্যাংকে আমানত উত্তোলনের
চাপ সৃষ্টি হয়েছে। এ আস্থার সংকট কাটিয়ে উঠতে আমানতকারীর ভয় দূর করা জরুরি।
কেন্দ্রীয় ব্যাংককে আরও কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে দ্রুত। না হলে এ খাত
ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে।
ক্ষমতাচ্যুত সরকারের আমলে ব্যাংকিং খাতে অনিয়ম-দুঃশাসনের
ছায়া প্রলম্বিত হয়েছে তা অসত্য নয়। এ সময় সরকারেরও ব্যাংকনির্ভরতা
বেড়ে গিয়েছিল। বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ স্থবির হয়ে পড়ে। আমানত সংগ্রহ ও প্রবৃদ্ধির
হার কোনো কোনো ব্যাংকে ঋণাত্মক। বিধিবদ্ধ নগদ জমার হার (সিআরআর) ও বিধিবদ্ধ জমার
হার (এসএলআর) সংরক্ষণ করতে হিমশিম খায় কিছু রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি বাণিজ্যিক
ব্যাংক। এ খাত নাজুক পরিস্থিতিতে নিয়ে নেওয়ার দায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক এড়াতে পারে
না। ব্যাংকিং খাতে নজরদারি, জবাবদিহি নিশ্চিত করতে পারলে এত সমস্যা হতো না। এ খাতে অনেক অপরাধ ও অনিয়ম অতীতে বহুবার চিহ্নিত
হলেও কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। নিয়ন্ত্রক সংস্থার দুর্বল ভূমিকা সংস্কারের
উদ্যোগ নিয়েও কার্যকর ফল পাওয়া যায়নি। তারল্য সংকট মেটাতে
ব্যাংকগুলোকে প্রতি মাসে লাখ লাখ কোটি টাকা ধার দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক; অন্যদিকে কালো টাকার অবাধ দৌরাত্ম্যের কারণে নগদ টাকার চাহিদা ছিল অস্বাভাবিক
বেশি,
যা সামাল দিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ইস্যুকৃত নোট বাড়িয়েছে।
আবার ইস্যুকৃত নোটের মোট মূল্যমানের ৯৫ শতাংশই ব্যাংক খাতের বাইরে চলে গিয়েছিল।
সরকারের পতনের পর ব্যাংক খাতের বাইরে থাকা অর্থের হার ক্রমে কমছে বলে পত্রিকান্তরে
জানা গেছে। পরিস্থিতি এখনও স্বাভাবিকের কাছাকাছি যায়নি।
আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসে ২০০৯ সালে। তখন ব্যাংক খাতে
খেলাপি ঋণ ছিল মাত্র ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা। চলতি বছরের জুন শেষে খেলাপি ঋণ
দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ১১ হাজার ৩৯১ কোটি টাকা, যা বিতরিত ঋণের ১২
দশমিক ৫৬ শতাংশ। শুধু তা-ই নয়, ১৬ বছরের মধ্যে বিতরণ করা ঋণ ও
খেলাপি ঋণের সর্বোচ্চ অনুপাতও এটি। যদিও খাত-বিশ্লেষকরা বলছেন, এটিই
খেলাপি ঋণের পুরো চিত্র নয়। লুকানো খেলাপি ঋণ এর চেয়ে অনেক বেশি। অবলোপন, আদালতের স্থগিতাদেশ, বিশেষ নির্দেশিত হিসাবে থাকা অর্থ ধরলে
ব্যাংক খাতে মোট খেলাপি ঋণ হবে সাড়ে ৬ থেকে ৭ লাখ কোটি টাকার মধ্যে। আমরা জানি,
যে দেশের অর্থনীতি যত সুসংহত সে দেশে
স্থানীয়ভাবে গড়ে ওঠা ব্যাংকের সংখ্যা তত কম। বর্তমানে দেশে তফসিলভুক্ত ব্যাংকের
সংখ্যা ৬২। এর মধ্যে বিদেশি ব্যাংক নয়টি, বৈশ্বিক ব্যাংক দুটি।
তিনটি বিশেষায়িত ব্যাংকসহ দেশে মোট নয়টি রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংক আছে। একটি
ডিজিটাল কমার্শিয়াল ব্যাংক লাইসেন্স পেয়েছে। বাকি ৪৩টি ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত হয়েছে
বেসরকারি উদ্যোগে। দেশের অর্থনীতির আকারের তুলনায় ব্যাংকের সংখ্যা অনেক বেশি। ২০০৯
সালের পর আওয়ামী লীগ সরকার রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী বিবেচনায় প্রতিনিয়ত নতুন নতুন
ব্যাংকের অনুমোদন দিয়ে ব্যাংক খাত ঝুঁকিতে ফেলে। ব্যাংক ও আর্থিক খাতের শীর্ষ
পদগুলোয় রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ দেওয়া হয়। পরিচালনা পর্ষদে সরকারঘনিষ্ঠ
ব্যবসায়ীদের আধিপত্য বেড়ে যায়। ফলে ব্যাংক খাতে অস্থিরতার পাশাপাশি অনাদায়ী ঋণ, খেলাপি ঋণ ও ঋণ পুনঃতফসিলিকরণও বেড়েছে।
ব্যাংক খাতের এ নাজুক পরিস্থিতিতে নতুন করে কোনো বিদেশি
ব্যাংকও দেশে আসেনি। আশির দশকে যেসব বিদেশি ব্যাংক দেশে কার্যক্রম পরিচালনা করত, তারাও নিজেদের অনেকটা গুটিয়ে নেয়। দেশে এখন বিদেশি ব্যাংকগুলো নামেমাত্র
রয়েছে। তাদের শাখাও কম এবং কার্যক্রমও বেশি নয়। দেশে এতগুলো ব্যাংকের কার্যকারিতা যেমন
প্রশ্নবিদ্ধ, তেমন দেশে আন্তর্জাতিক ব্যাংকের কার্যক্রম বাড়ানোর বিষয়েও আমরা আগ্রহ
কম দেখেছি। বিগত সরকারের আমলে ব্যাংক খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা
বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্ষমতা ও নিয়মনীতি কাগজে কলমে সীমাবদ্ধ করে ফেলেন রাজনৈতিক
বিবেচনায় নিয়োগপ্রাপ্ত গভর্নররা। গ্রাহকের স্বার্থকে গুরুত্ব না দিয়ে তারা
রাজনৈতিক স্বার্থে নোট ছাপানো, সরকারকে ঋণ দেওয়াসহ একের পর এক
বিতর্কিত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে থাকেন। ফলে পুরো ব্যাংক খাত নাজুক হয়ে পড়ে।
সন্দেহ নেই, ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফেরানোর পাশাপাশি সুশাসন নিশ্চিতসহ নিয়ন্ত্রণ, পরিবীক্ষণ আরও সুদৃঢ় করতে হবে। অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি এ খাতে জবাবদিহির সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। গ্রাহক বা আমানতকারীদের মধ্যে যে আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে তা ফেরাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। সেই সঙ্গে মন্দ ঋণ আদায়ে আইন ও প্রতিবিধানমূলক ব্যবস্থা শক্তিশালী করার পাশাপাশি ব্যাংকের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা উন্নতকরণ, ন্যূনতম মূলধনের আকার বৃদ্ধি, বেশিসংখ্যক স্বাধীন পরিচালক নিয়োগ ও তাদের কাজের পরিধি বাড়াতে হবে। ব্যাংক খাতের অনেক গভীরে নজর রেখে ঢেলে সাজাতে হবে। ঋণের বিপরীতে জামানত ও সহ-জামানত বৃদ্ধি এবং এগুলোর সংজ্ঞা পরিবর্তন, আমানত ও ঋণ সব ক্ষেত্রে সেবা-পণ্যে বৈচিত্র্য আনতে হবে। বাণিজ্যিক ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকে মানবসম্পদের দক্ষতা ও বহুবিধ উপায়ে প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধির বিষয়টিও ভুললে চলবে না।