প্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংস
মো. অহিদুর রহমান
প্রকাশ : ২৮ অক্টোবর ২০২৪ ০৯:০৮ এএম
মো. অহিদুর রহমান
আমরা নিজেদের স্বার্থের জন্য কত প্রাণীর সংসার ও আবাসস্থল ধ্বংস করে চলেছি। প্রাণীর খাদ্যসংকট, দুর্বল আইন, চোরা শিকারি, হাওর-জলাভূমি ও নদীর নাব্য হ্রাস, ভূমিতে অতিরিক্ত বিষপ্রয়োগ, বন্য প্রাণী নিয়ে বাণিজ্য, মানুষের নির্দয় ব্যবহারের কারণে প্রকৃতি ও মানবজাতির জন্য জরুরি এ প্রাণবৈচিত্র্য হারিয়ে যাচ্ছে দিন দিন। কিন্তু সকল প্রাণের অস্তিত্ব যে আমার প্রকৃতি-পরিবেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, মানবজাতির জন্য একান্ত প্রয়োজন তা গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে। সম্প্রতি একটি দৈনিকের সংবাদে জানা যায় মাদারীপুরে বিদ্যুৎ অফিসের পুকুরে ১২টি গুইসাপের মৃত্যুসংবাদ। পুকুরের পানিতে ভাসমান অবস্থায় পাওয়া যায় এসব গুইসাপের লাশ। স্থানীয়দের মতে, মাদারীপুর পৌর শহরের ইটেরপুল এলাকায় বিদ্যুৎ বিক্রয় ও বিতরণ কোম্পানি ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (ওজোপাডিকো) পুকুরে অনেক গুইসাপের সংসার ছিল। এগুলো এখানেই বসবাস করছিল দীর্ঘদিন। কিন্তু কয়েক দিন ধরে সাপগুলো এলাকার মানুষ দেখতে পায়নি। হঠাৎ স্থানীয়রা সাপগুলোর লাশ পুকুরের পানিতে ভাসতে দেখে। কয়েক দিন ধরে ভেসে ওঠা গুইসাপগুলো কীভাবে মারা গেল, তার সঠিক খোঁজ পাওয়া না গেলেও স্থানীয়দের সন্দেহ বিদ্যুৎ অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দিকে। পুকুরটিতে মাছ চাষ করায় বিষ দিয়ে সাপগুলো হত্যা করা হয়েছে বলে এলাকাবাসীর ধারণা।
তবে ওজোপাডিকোর নির্বাহী প্রকৌশলীর দাবি, বিদ্যুতায়িত হয়ে মারা গেছে
গুইসাপগুলো। এতে এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। বৃহস্পতিবার দুপুরে এলাকাবাসী
সাপগুলো হত্যার প্রতিবাদে ওজোপাডিকো অফিসে জড়ো হয়ে প্রতিবাদ জানান। অনেক বছর ধরে বিদ্যুৎ
অফিসের পুকুরে বড় বড় সাইজের ১০ থেকে ১৫টি গুইসাপ বসবাস করে আসছিল। স্থানীয়রা সাপগুলো
দেখে বিরক্তিবোধও করতেন না। ময়লা-আবর্জনা ও বিষাক্ত পোকামাকড় খেয়ে বেঁচে থাকত; কিন্তু
সম্প্রতি পুকুরটিতে ওজোপাডিকোর কর্মকর্তা-কর্মচারীরা মাছ চাষ শুরু করেন। এতে কিছু মাছ
গুইসাপগুলো খেয়ে ফেলে বলে কয়েকবারই সাপগুলো মেরে ফেলার চেষ্টা করেন বলে অভিযোগ। কয়েক
দিন আগে থেকে গুইসাপগুলোর দেখা পাওয়া যাচ্ছিল না। হঠাৎ ১০ থেকে ১২টি গুইসাপ মরে ভেসে
ওঠে। জেলা প্রশাসকের কাছে দোষীদের বিচারের দাবিও করেন এলাকাবাসী।
এ ব্যাপারে পৌর শহরের বাগেরপাড় এলাকার মানুষজন জানান, সাপগুলো দীর্ঘদিন
ধরে পুকুরে বাস করে আসছিল। কিন্তু কিছুদিন আগে পুকুরে মাছ চাষ করেছেন বিদ্যুৎ অফিসের
লোকজন। তাই মাছ যাতে খেতে না পারে সেজন্য পুকুরের পাড়ে বিষ দিয়ে রেখেছিলেন। ফলে সে
বিষ খেয়ে সাপগুলো মরে গেছে। এমন নির্মম হত্যা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। ওজোপাডিকো
কর্তৃপক্ষ পৌরসভার মাধ্যমে গুইসাপগুলো উঠিয়ে মাটিচাপা দিয়ে দেয়। জানাজানি হলে ওজোপাডিকোর
নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মিজানুর রহমান বিষয়টিকে অন্যদিকে মোড় দেন। তিনি দাবি করেন,
‘এটা বড় ধরনের দুর্ঘটনা। বিদ্যুতের খুঁটি পুকুরে পড়ে গিয়ে বিদ্যুতায়িত হয়ে গুইসাপগুলো
মারা গেছে। কেউ বিষ দিয়ে মারেনি। আমাদের কোনো দায়ভারও নেই।’
বাংলাদেশের সর্বত্রই বিশেষ করে বনজঙ্গল, ঝোপঝাড, পুকুর ও কৃষিজমিতে
গুইসাপ দেখা যেত। বর্তমানে গুইসাপের তিনটি প্রজাতি কোনোরকমে টিকে আছে। এগুলো হলো কালো
গুইসাপ, সোনা গুইসাপ ও রামগদি গুইসাপ। সোনা গুইসাপ পানিতেও দেখা যায়। এরা সাঁতার কাটতে
ও গাছে উঠতে পারে। বিষধর সাপ ও ক্ষতিকর পোকামাকড় এদের প্রিয় খাদ্য। অন্যান্য খাদ্যের
মধ্যে রয়েছেÑছোট সাপ, ব্যাঙ, ইঁদুর, মাছ, কেঁচো, শামুক, কাঁকড়া ইত্যাদি। গুইসাপ খুবই
নিরীহ প্রাণী। মানুষ দেখলে পালিয়ে যায়। তারা অতি উপকারী প্রাণী। ক্ষতিকর পোকামাকড় খেয়ে
ফসলের ফলন বৃদ্ধি করে। প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় গুইসাপের ভূমিকা অতুলনীয়। এরা খাদ্যশৃঙ্খলে
বিশেষ ভূমিকা রাখে। এদের সংখ্যা কমে গেলে পোকামাকড় ও বিষাক্ত প্রাণী বেড়ে যাবে; যা
পরিবেশ ও মানুষের জন্য বিপজ্জনক। গুইসাপের চামড়া অনেক মূল্যবান। এ উপকারী প্রাণীটি
আজ বিলুপ্তির পথে। এদের বিলুপ্তির কারণ চোরাচালান, অতিমাত্রার রাসায়নিক ব্যবহার, বনজঙ্গল
ধ্বংস ও হাওর-বিলের পরিবেশ বিনষ্ট করা। এদের অধিকাংশ মারা যায় মানুষের আক্রমণে। খাবারের
সন্ধানে যখন হানা দেয় হাঁস-মুরগির ডিম ও ছানার দিকে, তখন লাঠি দিয়ে পিঠিয়ে মেরে ফেলে।
গুইসাপ সংরক্ষণ করা জরুরি। এদের শিকার ও পাচার রোধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। অতিদ্রুত
তদন্ত করে গুইসাপ হত্যাকারীদের বিচারের দাবি জানাই।
গত পাঁচ দশকে বন্য প্রাণীর সংখ্যা ৬৫ শতাংশ কমেছে। প্রতি বছর কমার
পরিমাণ ২ শতাংশ, এ হারে কমতে থাকলে ২০৩০ সাল নাগাদ বিশ্বের ৮০ শতাংশ বন্য প্রাণী হারিয়ে
যাওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে পরিবেশবাদী সংগঠন ওয়ার্ল্ড জিওলজিক্যাল সোসাইটি অব
লন্ডন এবং ওয়ার্ল্ড ওয়াইল্ডলাইফ ফান্ডের যৌথ গবেষণাপত্রে। এতে বলা হয়, ১৯৭০ সালের পর
থেকে বিশ্বে ৫৮ শতাংশ বন্য প্রাণী হারিয়ে গেছে। এর মধ্যে নদ-নদী, হ্রদ ও জলাভূমিতে
থাকা জীবজন্তুই বেশি পরিমাণে নিশ্চিহ্ন হয়েছে। এজন্য গবেষকরা মানবিক তৎপরতা বৃদ্ধি,
আবাসস্থল ধ্বংস, বন্য প্রাণীর ব্যবসা, দূষণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের মতো কারণগুলোকে দায়ী
করেছেন। প্রতিবেদন অনুযায়ী, পৃথিবীতে কার্বন ডাইঅক্সাইডের পরিমাণ যে হারে বাড়ছে
তার প্রভাবে প্রাণীদের পক্ষে সুস্থভাবে বেঁচে থাকাটা দায় হয়ে উঠেছে।
জলবায়ু পরিবর্তন বন্য প্রাণীর ওপর নতুন বিপত্তি হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে বলে সতর্ক করে দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। বন্য প্রাণী বিশেষজ্ঞরা বলেন, আবাসস্থল ধ্বংস হওয়া বন্য প্রাণীর জন্য সবচেয়ে বড় হুমকিগুলোর একটি। জনসংখ্যার চাপ ও অর্থনৈতিক কারণে বনাঞ্চলে মানুষের মাত্রাতিরিক্ত বৈধ-অবৈধ হস্তক্ষেপের পাশাপাশি ক্রমবর্ধমান প্রাকৃতিক দুর্যোগে কমে যাচ্ছে বন্য প্রাণীর আবাসস্থল। দেশের স্তন্যপায়ী প্রাণীর মধ্যে ১১টি প্রজাতি ইতোমধ্যে চিরতরে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। এ ছাড়া ৪৫টি প্রজাতি বিলুপ্তির পথে। বিপন্ন অবস্থায় রয়েছে বানর, লজ্জাবতী বানর, কুলু বানর, পারাইল্লা, উল্লুক, রামকুত্তা, গেছোবাঘ, মেছোবাঘ, চিতাবাঘ, উদ্বিড়াল, ভাল্লুক, কালো ভাল্লুক, শুশুক, বনছাগল, সম্বর, বনরুই, মুখপোড়া হনুমান, বনবিড়াল, কাঁকড়াভুক বেজি, ভোঁদড়, বাগডাশ, মায়াহরিণ।