আন্তর্জাতিক
ড. আব্দুল্লাহ খালিফা আল শায়জি
প্রকাশ : ২৭ অক্টোবর ২০২৪ ০৮:৩৭ এএম
ড. আব্দুল্লাহ খালিফা আল শায়জি
ইতিহাস আমাদের শেখায়, কাউকে হত্যা করলে কিংবা কেউ মারা গেলেই তার মতাদর্শিক শিক্ষার অবলোপন ঘটে না। কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে হত্যার মাধ্যমে তাদের আদর্শকে বিলুপ্ত করার বদলে নতুনভাবে আবিষ্কারের সুযোগ গড়ে দেয়। বরং ওই সংগঠকের সংশ্লিষ্ট সংগঠন ওই মতাদর্শ ঘিরে বুদ্ধিবৃত্তিক, মতাদর্শিক দিক থেকে নিজেদের নতুনভাবে আবিষ্কার করে। তাদের সংগঠনে আরও নতুন ব্যক্তি যুক্ত হয় এবং অনেক সময় তা তাদের সক্ষমতাও বাড়িয়ে তোলে। অন্তত মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক বাস্তবতায় এমনটিই সত্য বলে বিবেচিত হবে। আল আকসা ফ্লাড অপারেশনের অন্যতম কারিগর ইয়াহিয়া সিনওয়ার ২০২২ সাল থেকেই ইরান ও হিজবুল্লাহকে বহুপাক্ষিক সংঘর্ষের আহ্বান জানিয়ে আসছিল। অন্তত নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন তা-ই বলে। এজন্যই আল আকসা ফ্লাড আন্দোলন হামাসের রাজনৈতিক ব্যুরো পেছাতে বাধ্য হয়েছে। একমাত্র সিনওয়ারেরই সমরবিদ হিসেবে স্বীকৃতি রয়েছে। তিনিই একমাত্র হামাস প্রধান যিনি একই সঙ্গে রাজনীতি এবং সমরকৌশল দুটো ক্ষেত্রই সামলাতে পারতেন। ইসমায়েল হানিয়ার মৃত্যুর পর তিনি রাজনৈতিক ব্যুরোর দায়িত্বও নেন। হামাসের প্রধান নেতা ইসমায়েল হানিয়া এবং হিজবুল্লাহ প্রধান হাসান নাসরুল্লাহ ইসরায়েলি হামলায় নিহতের ঘটনায় ইরান দেশটিকে লক্ষ্য করে মিসাইল ছুড়েছিল। ইসরায়েলও ইরানের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ার চেষ্টা করছিল। এরপর অনেকটা ইচ্ছা না থাকলেও তারা ইয়াহিয়া সিনওয়ারকে হত্যা করে।
ইয়াহিয়া সিনওয়ারের মৃত্যুর পর একটি ড্রোন ফুটেজ লিক হয়। সেখানে দেখা
যায়, সিনওয়ারকে রাফায় নিয়মিত সামরিক টহলের অংশ হিসেবে একদল মিলিশিয়া সদস্য মৃত আবিষ্কার
করে। তাদের এই ফুটেজ বের হওয়ার পর ইসরায়েলিদের বোকামো স্পষ্ট ধরা পড়ে। এতদিন তারা দাবি
করছিল, ফিলিস্তিনিদের আড়ালে হামাসের রাজনৈতিক নেতারা আশ্রয় নিয়ে থাকেন। এমন দাবি অযৌক্তিকতা
এবার প্রমাণিত হয়ে গেল। ওই ভিডিওতেই দেখা যায়, সিনওয়ার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে
যাচ্ছিল। সম্পূর্ণ একা এবং একদম শেষ সময় পর্যন্ত। অন্যদিকে হিজবুল্লাহ সফলভাবে ইসরায়েলের
প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বাড়িতে হামলা চালায়। হাইফাতে প্রধানমন্ত্রীর সুরক্ষিত
এবং বিলাসবহুল বাড়িতে তাদের ড্রোন হামলা একটি বড় সাফল্যই বলা চলে। তারা ইসরায়েলের অত্যাধুনিক
প্রতিরক্ষা লক্ষ্য করেই হামলা করেছে। হাইফা এবং হাইফা বন্দরে হামলার পাশাপাশি হিজবুল্লাহ
ইসরায়েলের উত্তরাঞ্চলে অবস্থিতি গ্যালিলি এবং গোলান উপত্যকায় অসংখ্য রকেট ছুড়ে মারে।
অর্থাৎ হিজবুল্লাহর ডেপুটি সেক্রেটারি জেনারেল নাইম কাসিম শূন্যের ওপর তাদের হুমকি
দিচ্ছিল না। তিনি নিজেই জানিয়েছিলেন, যুদ্ধ এখনও চলছে। আগামী দিনে এই হামলা আরও বাড়বে।
বাস্তুচ্যুত ইসরায়েলিরা তো আর ফিরবে না বরং তাদের আরও উত্তরে পাঠানো হবে।
ইয়াহিয়া সিনওয়ারের হত্যার ঘটনা অন্তত হলোকাস্টের পর ইসরায়েলি বাহিনীর
অন্যতম প্রধান মিলিটারি ও গোয়েন্দা তদারকি ব্যর্থতা বলে বিবেচিত হবে। কারণ নেতানিয়াহু
নিজেও স্বীকার করেছেন তারা অন্তত ১২০০ সেনা সদস্য এবং বেসামরিক নাগরিককে ‘ভুলবশত’ হত্যা
করেছে (যদিও সঠিক সংখ্যা আমরা জানতে পারব না)। শুধু নিজেদের দম্ভের পরিচয় দেওয়ার জন্যই
ইসরায়েল ইয়াহিয়া সিনওয়ারের মৃত্যুর ফুটেজ ফাঁস করেছে। একদম সুরক্ষিত একটি বাড়িতে তাকে
পাওয়া যায় এবং বাড়িটি ট্যাংক দিয়ে চারপাশে ঘেরাও করে রাখা হয়েছিল। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত
সিনওয়ার লড়াই চালিয়ে যান। মৃত্যুর আগে তার লড়াইয়ের শেষ দৃশ্যটুকু ছিল, হাতে আঘাত পাওয়ার
পর একটি লাঠি ছুড়ে মারা। এমন দৃশ্য পরবর্তী প্রজন্মকে নিঃসন্দেহে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের গণমাধ্যমও সিনওয়ারের এই বীরত্বের প্রশংসা করেছে। গোটা আরববিশ্ব যেখানে
নিশ্চুপ সেখানে একমাত্র সিনওয়ারই হয়ে উঠেছে সাহসিকতা ও আত্মত্যাগের মূর্ত প্রতীক।
অনেকেই মনে করছেন, সিনওয়ারের মৃত্যুর পর হামাস দুর্বল হয়ে পড়বে। তাদের
আন্দোলনও এখন দুর্বল হতে বাধ্য। কারণ সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা সদস্যরা নিহত হওয়ার পর যে
স্বপ্ন দেখছিলেন তা বাস্তবায়ন করার কেউ নেই। যারা এমনটি ভাবছেন তারা ভ্রমই দেখছেন।
এবারই প্রথম ইসরায়েল হামাসের মিলিটারি ও পলিটিক্যাল ব্যুরোর প্রধান
নেতাকে হত্যা করেছে এমন নয়। হামাসের প্রাথমিক সদস্য শেখ আহমেদ ইয়াসিন, আবদেল আজিজ আল
রান্তিসি, নিজার রায়ান, সাইদ সিয়াম এবং সালেহ আল আরুরিকে আগে হত্যা করা হয়। সম্প্রতি
তেহরানে হামাসের অন্যতম প্রধান নেতা ইসমায়েল হানিয়া এবং রাফায় ইয়াহিয়া সিনওয়ারকে হত্যা
করার পর ইসরায়েল আম্মানে খালেদ মেশালের ওপর ব্যর্থ হত্যা অভিযান চালায়। ইসরায়েলের অভিযানের
সংখ্যাও কম নয়। বিভিন্ন অভিযানে সংগঠনটির মিলিটারি ব্যুরোর নেতা অর্থাৎ কাশেম ব্রিগেডের
ইয়াহিয়া আয়াস, সালেহ শাহেদাহ, আহমেদ আল জাবারি এবং আরও অনেককে হত্যা করে। কিন্তু এসব
অভিযানের মাধ্যমে হামাস আদৌ দুর্বল হয়েছে কি না এ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। হামাস আন্দোলনের
পলিটিক্যাল ব্যুরোর ডেপুটি প্রধান সম্প্রতি এক বিবৃতিতে সিনওয়ারের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত
করেন। কিন্তু তারা বিবৃতিতে এও স্পষ্ট জানিয়ে দেন, হামলা ও আন্দোলন চলতে থাকবে। হামাসের
স্বাধিকারের সংগ্রাম চলতেই থাকবে বলে জানান তিনি।
২০১১ সালে আল-কায়েদার প্রধান নেতা ওসামা বিন লাদেনকে প্রেসিডেন্ট
ওবামা হত্যা করেন। লাদেন ২০০১ সালে ভয়াবহ হামলার অভিযোগ স্বীকার করে নেন। প্রেসিডেন্ট
বাইডেন লাদেনের উত্তরসূরি আয়মান আল জাওয়াহিরিকে ২০২২ সালে হত্যা করেন আফগানিস্তানে।
২০১৯ সালে উত্তর সিরিয়ার সংগঠন দায়েশের প্রধানকে হত্যা করেন ট্রাম্প। আল-আকসায় অক্টোবর
২০২৩-এ অপারেশন ফ্লাড পরিচালনার পর থেকে ইসরায়েল মোহাম্মদ দেইফ, সিনওয়ার এবং ইসমায়েল
হানিয়াকে হত্যা করেছে। অন্যদিকে লেবাননের সশস্ত্র সংগঠন হিজবুল্লাহর সেক্রেটারি জেনারেল
হাসান নাসরুল্লাহকে হত্যার পর বেইরুতে ওই সপ্তাহেই তার সম্ভাব্য উত্তরসূরির ওপর হামলা
চালায়। শুধু তাই নয়, সশস্ত্র সংস্থাটির এলিট ফোর্স রাদওয়ান ডিভিশনের প্রধানকেও হত্যা
করে। এসব হত্যায় সংগঠনগুলোর বড় ক্ষতি হয়েছে এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু বাস্তবে
তাদের সক্ষমতার ওপর এসব হত্যা বড় চোট দিতে পারেনি। বরং তাদের সক্ষমতা আগের মতোই রয়েছে
বলে প্রতীয়মান হয়। হাসান নাসরুল্লাহকে হত্যার কদিন পরই ইসরায়েলের তেল আবিব, হাইফা,
একর এবং গ্যালিলিতে হিজবুল্লাহ বোমা হামলা চালায়। হামাসও গাজায় নিজেদের আন্দোলন চালিয়ে
গেছে। বিভিন্ন সময় ইসরায়েলি সেনাদের ওপর হামলা চালিয়েছে, স্নাইপিং এমনকি ফাঁদ পেতে
নানাভাবে গাজায় ইসরায়েলি ট্যাংক ও সেনা অভিযান বাধাগ্রস্ত করেছে। তারা দখলকৃত গাজার
পাশাপাশি তেল আবিবেও বোমা হামলা চালিয়েছে। আমেরিকান সেনারা আফগানিস্তান থেকে নিজেদের
সরিয়ে নেওয়ার পর তালিবানরাই একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী হয়ে উঠেছিল। অর্থাৎ ইতিহাস থেকে
অনেক কিছুই শিক্ষা নেওয়ার রসদ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
ইসরায়েল হামাসের সঙ্গে যুদ্ধের আগে কিছু নির্ধারিত লক্ষ্যের কথা জানিয়েছিল।
তারা হামাসকে পুরোপুরি নির্মূল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। হামাসের কার্যকারিতা বন্ধ করতে
চেয়েছিল। চেয়েছিল সশস্ত্র সংগঠনটির কাছে বন্দি থাকা ইসরায়েলি জিম্মিদের মুক্তি নিশ্চিত
করে গাজাকে যুদ্ধমুক্ত করতে। অন্তত ইসরায়েলের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা শঙ্কা এড়ানোর বিষয়টিকেই
সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। অবশ্য তারা স্পষ্ট জানায়নি, ভবিষ্যতে কারা গাজার পরিচালনার
দায়িত্ব পালন করবে। এমনকি লেবাননে সংস্থাটির শাখার বিষয়ে কী করা হবে তা নিয়েও যথোপযুক্ত
উত্তর দিতে পারেনি। তাই যুদ্ধে তাদের কৌশলগত নানা ত্রুটি দেখা গেছে এবং এগুলোই এখন
পর্যন্ত তাদের জন্য ক্ষতিকর হয়ে পড়েছে। বিশেষত, ইসরায়েল আপাতত বিশাল সেনাবহর লেবাননে
নিযুক্ত করেছে। তাদের তাৎক্ষণিক বিজয় হলেও তা সামগ্রিকভাবে বড় কোনো বিজয় এনে দিচ্ছে
না। আর এগুলোই মূলত কৌশলগত ক্ষতি। তাৎক্ষণিক বিজয়ের আনন্দ তাদের কৌশলের দুর্বলতা লুকোতে
পারে না। এই মুহূর্তে মধ্যপ্রাচ্যে একটি স্থিতিশীল পরিবেশ প্রয়োজন। সর্বাত্মক যুদ্ধ
বন্ধের লক্ষ্যে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধবিরতি এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার রাজনৈতিক সমাধান খুঁজতে
হবে।
মধ্যপ্রাচ্যে এখনও ইরান সক্রিয় রয়েছে। তাদের সক্রিয়তা সম্পর্কে এখনও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাচ্ছে না। তবে মধ্যপ্রাচ্যে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাই এখন একমাত্র সমাধান। আর নেতানিয়াহু ও তার রক্ষণশীল মন্ত্রীরা যে এ বিষয়ে একমত নয় তা স্পষ্টই বোঝা যায়। তারা যেন ওঁৎ পেতেই আছে কোনোভাবে সহিংসতা, যুদ্ধ এবং হত্যা চালিয়ে যাওয়ার। তাদের লক্ষ্যও অস্পষ্ট। অস্পষ্ট মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ।
মিডল ইস্ট মনিটর থেকে অনুবাদ : আমিরুল আবেদিন