সংস্কার
ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী
প্রকাশ : ২৬ অক্টোবর ২০২৪ ০৯:২৭ এএম
ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী
যেকোনো জাতিরাষ্ট্রের রাজনৈতিক সংস্কৃতির অন্যতম উপাদান দেশের কল্যাণে রাজনৈতিক শক্তিসমূহের পারস্পরিক সমঝোতার বন্ধন। সব ধরনের মতানৈক্য-মতবিরোধ পরিহার করাই একান্ত বাঞ্ছনীয়। পরমতসহিষ্ণুতার আবরণে সৌহার্দ্য-সম্প্রীতি-বন্ধুত্বের ভিত্তিতে দলীয় আদর্শের প্রচার-প্রসার রাজনৈতিক সংস্কৃতি সমৃদ্ধ করে। ধর্মবর্ণদলমতনির্বিশেষে দলের উদ্দিষ্ট জনগোষ্ঠী হচ্ছে সমগ্র দেশবাসী। সংবিধানসম্মত আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সবার সন্তুষ্টি অর্জনই মুখ্য। বিরোধ-বিচ্ছেদ-সন্ত্রাসসহ অগ্রহণযোগ্য অপকর্ম নস্যাৎ করে জনসাধারণের ঐক্যবদ্ধতা যেকোনো সংকট উত্তরণে অন্যতম নিয়ামক। বিভাজনের কদর্য বেড়াজাল থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীনভাবে বাকস্বাধীনতা-নাগরিক অধিকার প্রয়োগের ক্ষেত্র তৈরি রাষ্ট্রের প্রণিধানযোগ্য উদ্দেশ্য হওয়া উচিত। দেশপ্রেমের নিখাঁদ মানদণ্ডে গণতান্ত্রিক-অসাম্প্রদায়িক-মানবিক সমাজ বিনির্মাণে সম্মিলিত প্রচেষ্টাই স্বাধীন রাষ্ট্রের উপজীব্য। জগৎখ্যাত গ্রিক দার্শনিক প্লেটোর মতানুসারে, ‘মানুষ যেমন হবে রাষ্ট্রও তেমনই হবে। মানুষের চরিত্র দ্বারাই রাষ্ট্র গড়ে ওঠে।’
এটি সর্বজনবিদিত, গণতন্ত্রের প্রাথমিক মূল্যবোধ হচ্ছে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের প্রতি
শ্রদ্ধাবোধ অর্থাৎ ব্যক্তির মৌলিক স্বাধীনতা তথা চিন্তার স্বাধীনতা, বাকস্বাধীনতা,
সংগঠনের স্বাধীনতা, ভোটদান, দলগঠন এবং অংশগ্রহণ, প্রার্থী হওয়ার স্বাধীনতা, নির্বাচনে
অংশগ্রহণের স্বাধীনতা, ভোট দেওয়ার স্বাধীনতা ও অভিযোগ স্থাপনের স্বাধীনতা অর্থাৎ সার্বিকভাবে
জীবনধারণের অধিকার, পরিবার গঠনের অধিকার, নিরাপত্তার অধিকার, আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার,
স্বাধীন মতামত প্রকাশের অধিকার, নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার অধিকার, বিরোধিতার
অধিকার সবকিছুই অন্তর্ভুক্ত করে। গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় ব্যক্তিত্ব বিকাশের সঙ্গে
অন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মূল্যবোধ হচ্ছে অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ। সংখ্যাগরিষ্ঠ
মতামত সাদরে গ্রহণ করার মানসিকতা তৈরি জাতীয় আদর্শের অনুষঙ্গ। যেকোনো সামাজিক প্রক্রিয়াই
ব্যক্তির স্বাভাবিক ব্যক্তিত্ব ও সৃজনশীল প্রতিভার বিকাশই একমাত্র গণতান্ত্রিক পরিবেশ
নিশ্চিত করে। এজন্যই বিশ্বের সব সভ্য দেশ, বিবেকবান, মানবতাবাদী মানুষ, গণতন্ত্রে বিশ্বাসী
ও প্রত্যাশী। গণতান্ত্রিক শিক্ষাই হচ্ছে নিজের ইচ্ছার সঙ্গে অন্যের ইচ্ছার সমন্বয় ঘটানো
বা অধিকাংশের ইচ্ছা বা আগ্রহকে যৌক্তিকভাবে নিজের বা ব্যক্তির অধিকারে সন্নিবেশন। বিখ্যাত
ফরাসি দার্শনিক ভলতেয়ার বলেছেন, ‘তোমার মতের সঙ্গে আমি একমত না-ও হতে পারি, কিন্তু
তোমার মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষার জন্য প্রয়োজন হলে প্রাণ দেব।’
আমাদের জানা, জুলাই ২০২৪ ছাত্র-জনতার বৈষম্যবিরোধী যুগান্তকারী আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে
বিগত রাজনৈতিক সরকারের পতন ঘটে। ঘোষিত হয়েছে নতুন বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়। অনেক প্রাণ
বিসর্জন ও আহতদের আর্তনাদে দেশ শোকে এখনও মুহ্যমান। শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ জনজীবনে দুঃসহ
ট্রমার প্রভাব গভীর অনুভূত। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা শান্তিতে নোবেলজয়ী
বিশ্বনন্দিত ব্যক্তিত্ব ড. মুহাম্মদ ইউনূস ইতোমধ্যে আদর্শিক দেশ রূপান্তরে তার অভিব্যক্তি
প্রকাশ করেছেন। নতুন প্রজন্মের নতুন এক বাংলাদেশ গড়ার উচ্চ আকাঙ্ক্ষা বাস্তবে রূপ
দেওয়ার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন। তিনি দেশের বয়স-পেশা-দল-মত-ধর্ম নির্বিশেষে সবাইকে
বিনা দ্বিধায় এ সংগ্রামে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানান। ছাত্র-জনতার প্রত্যাশিত বৈষম্য-শোষণহীন,
কল্যাণময় এবং মুক্ত বাতাসের রাষ্ট্রের স্বপ্নপূরণে তিনি অঙ্গীকারবদ্ধ। আমরা
আশা করি সংস্কারের লক্ষ্য বাস্তবায়িত হবে এবং এর সুফল ভবিষ্যতের জন্য হবে কল্যাণকর।
ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় রাষ্ট্র মেরামতের
প্রয়োজনীয় সংস্কারসমূহ সম্পন্ন করার মধ্যেই তার পরিকল্পিত কর্মযজ্ঞ নিবদ্ধ।
নানামুখী সংস্কার কার্যক্রম, কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যপূরণে সহায়ক সব বিষয় সংস্কারের অন্তর্ভুক্ত
হয়েছে। শিক্ষা-স্বাস্থ্য-বিচারব্যবস্থা-ব্যাংক খাত-বাণিজ্য-জ্বালানি-ভৌত অবকাঠামোসহ
প্রতিটি ক্ষেত্রে অসহনীয় পর্যায় সংহার করে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানসমূহ ঢেলে সাজানোর পদক্ষেপ
ইতোমধ্যে দেশবিদেশে বিপুল সমাদৃত। আশু সংস্কারের জন্য চিহ্নিত ক্ষেত্রসমূহ পর্যাপ্ত
প্রাসঙ্গিক। অন্তর্বর্তী সরকারের গৃহীত সব পদক্ষেপ বিদেশি সরকার-সহযোগী দাতা সংস্থাসহ
সবার কাছে প্রশংসিত। সরকার পরিচালনার শুরুতে বিচার বিভাগের সংস্কার বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।
প্রধান বিচারপতি, আপিল বিভাগের বিচারপতি, অ্যাটর্নি জেনারেলসহ বিচার বিভাগের অন্য গুরুত্বপূর্ণ
নিয়োগ সুসম্পন্ন হওয়ায় ন্যায়বিচার প্রাপ্তিতে দেশের জনগণের মাঝে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে।
সরকারের পক্ষ থেকে সাইবার নিরাপত্তা আইনসহ দেশে বিদ্যমান সব কালো আইনের তালিকা প্রণয়ন
করে দ্রুত এসব বাতিল বা প্রযোজ্য ক্ষেত্রে সংশোধনের আশ্বাস প্রদান আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায়
যথেষ্ট সহায়ক হবে। পাশাপাশি নিশ্চিত করা হয়েছে সংবাদমাধ্যম ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা।
সাম্প্রতিককালে জাতিসংঘের গুম ও নির্যাতনবিরোধী আন্তর্জাতিক কনভেনশনে স্বাক্ষর করেছে
বাংলাদেশ; যা জাতিসংঘসহ দেশি ও আন্তর্জাতিক মহলে বিপুল প্রশংসিত। এতে গুম-খুনের বিরুদ্ধে
অন্তর্বর্তী সরকারের দৃঢ় অবস্থান সুস্পষ্ট হয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের এক মাস পূর্তি ১১ সেপ্টেম্বর উপলক্ষে জাতির উদ্দেশে দেওয়া
ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা রাষ্ট্র সংস্কারে সুনির্দিষ্ট ছয়টি কমিশন গঠনের ঘোষণা দেন। রাষ্ট্র
সংস্কার প্রসঙ্গে জানান, অন্তর্বর্তী সরকার জনগণের ভোটাধিকার ও জনগণের মালিকানায় বিশ্বাসী।
তাই নির্বাচনব্যবস্থার উন্নয়ন সরকারের সংস্কার ভাবনায় গুরুত্ব পেয়েছে। তার মতে, ‘নির্বাচনের
নামে সংখ্যাগরিষ্ঠতার একাধিপত্য ও দুঃশাসন মানুষের ওপর চাপিয়ে দেওয়া বা এর মাধ্যমে
এক ব্যক্তি বা পরিবার বা কোনো গোষ্ঠীর কাছে সব ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখা কোনোক্রমেই
গ্রহণযোগ্য নয়। এসব আকাঙ্ক্ষা রোধ করার জন্য নির্বাচনের সঙ্গে সম্পর্কিত কমিশনসহ অন্য
প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কারের কথা আমরা ভাবছি। নির্বাচনব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত প্রতিষ্ঠান
হিসেবে পুলিশ প্রশাসন, জনপ্রশাসন, বিচার প্রশাসন, দুর্নীতি দমন কমিশন এ চারটি প্রতিষ্ঠানের
সংস্কার সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচনের জন্য অপরিহার্য। এসব প্রতিষ্ঠানের সংস্কার জনমালিকানাভিত্তিক,
জবাবদিহিমূলক ও কল্যাণমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায়ও অবদান রাখবে বলে আমি বিশ্বাস
করি।’
সংস্কারের ধারাবাহিক কর্মকাণ্ড আরও গতিশীল করতে ১৭ অক্টোবর নতুন করে চারটি কমিশন
গঠন করে কমিশনের প্রধান নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। সেগুলো হলো স্বাস্থ্য কমিশন, গণমাধ্যম কমিশন,
শ্রমিক অধিকার কমিশন এবং নারীবিষয়ক কমিশন। তাদের কর্মপদ্ধতি সম্পর্কে বলা হয়, উল্লিখিত
কমিশনগুলোও স্ব স্ব ক্ষেত্রে সংস্কারের সুপারিশ করবে। প্রতিটি কমিশনের মেয়াদ হবে গেজেট
প্রকাশের দিন থেকে ছয় মাস। কমিশনপ্রধান ও এর সদস্যরা পূর্ণকালীন হিসেবে কমিশনে কাজ
করবেন এবং এ সময়ে তারা অন্য কাজ থেকে বিরত থাকবেন। তাদের কাজের জন্য অফিস ও সাচিবিক
সহায়তা দেওয়া হবে। কাজ সম্পন্ন করে তারা প্রধান উপদেষ্টাকে প্রতিবেদন দাখিল করবেন।
গেজেট প্রকাশ হওয়ার পর শুরু হবে কমিশনগুলোর কাজ। পক্ষান্তরে গেজেট প্রকাশের পর পরই
কাজ আরম্ভ করেছে আগের গঠিত ছয়টি কমিশন। গণমাধ্যমে প্রকাশিত সূত্রমতে, প্রতিটি কমিশনই
তাদের নিজেদের মধ্যে বৈঠক এবং আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে কাজ এগিয়ে নিচ্ছে। তারা তাদের কাজের
জন্য নিচ্ছে কমিশনের সদস্যদের বাইরের বিশেষজ্ঞদের পরামর্শও। এর বাইরে তারা সংশ্লিষ্টদের
সঙ্গে মতবিনিময়ও করবে। কয়েকটি কমিশন ওয়েবসাইটও চালু করছে। ওই সাইটের মাধ্যমে তারা দেশের
সাধারণ মানুষকেও মতামত দেওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছে।
প্রাসঙ্গিকতায় নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য অধ্যাপক ড. জাহেদ উর রহমান
গণমাধ্যমে বলেন, ‘আমরা ফুলটাইম কাজ করছি। প্রতিদিনই আমাদের বৈঠক হচ্ছে। আমরা প্রয়োজনীয়
ডকুমেন্ট সংগ্রহ করছি। প্রচলিত আইন-বিধি দেখছি। আমাদের মধ্যে ভিন্নমত আছে। আমরা নিজেদের
মধ্যেও বিতর্ক করছি। এর মধ্য দিয়ে আমরা একটা প্রাথমিক সুপারিশ তৈরি করে তারপর আরও কাজ
করব। তার ওপর ভিত্তি করে আমাদের সুপারিশ পেশ করব।’ তিনি আরও বলেন, ‘এটা শুধু নির্বাচন
কমিশন সংস্কার নয়। আমাদের কাজ হলো নির্বাচনব্যবস্থার সংস্কারের সুপারিশ করা। অনেকে
মনে করেন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। আসলে পুরো কাজ করতে হলে
সংবিধান, আইনের পরিবর্তন করতে হবে। আমরা এ সবকিছু নিয়েই কাজ করছি। আমাদের লক্ষ্য হলো
স্বাধীন ও নিরপেক্ষ নির্বাচনব্যবস্থা।’
জনশ্রুতিমতে, দেশের অভিজ্ঞ মহল শিক্ষা সংস্কারের বিষয়েও গভীর আগ্রহী। মেধাবী-দক্ষ-যোগ্য-সৎ ও দেশপ্রেমিক শিক্ষাবিদদের সমন্বয়ে শিক্ষা সংস্কার কমিশন গঠনও অপরিহার্য। চলমান শিক্ষা পদ্ধতির যাবতীয় ত্রুটিবিচ্যুতি যথার্থ চিহ্নিত হওয়া খুবই জরুরি। প্রতিটি পর্যায়ে শিক্ষার্থী ভর্তি-শিক্ষক নিয়োগ-শিক্ষাকার্যক্রম নির্ধারণে আধুনিক যুগোপযোগী এবং নীতি-নৈতিকতার প্রাধান্যই কাম্য। পতিত সরকারের নানামুখী অসঙ্গতি পরিহার করে পর্যাপ্ত বিশ্লেষণ-পরীক্ষানিরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষা সংস্কার গণমানুষের প্রত্যাশাপূরণে সহায়ক হোক। প্রত্যাশিত যে, অন্তর্বর্তী সরকার উল্লেখ্য বিষয় যথার্থ মূল্যায়নে শিক্ষাব্যবস্থা পরিশুদ্ধ করবে।