× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

জনস্বাস্থ্য

সুচিকিৎসার দায়িত্ব-কর্তব্য রাষ্ট্রেরই

আবদুল বায়েস

প্রকাশ : ২৫ অক্টোবর ২০২৪ ১৩:০৪ পিএম

সুচিকিৎসার দায়িত্ব-কর্তব্য রাষ্ট্রেরই

বিধিবাম! কোনো এক পহেলা বৈশাখে আনন্দের দিনটা আমার নিরতিশয় নিষ্প্রভ ও নিরানন্দে কেটেছিল। নতুন বছর বরণ করার পূর্ণ মানসিক প্রস্তুতি ছিল ছোট মেয়ে ও নবজাতক নাতির সঙ্গে বাইরে নৈশভোজ গ্রহণের চিন্তা মাথায় রেখে। কিন্তু ওই যে কথায় বলেÑ ম্যান প্রপোজেস, গড ডিসপোসেজ (মানুষ চায়, বিধাতা দেয়), অবস্থা দাঁড়াল অনেকটা সে রকম। ঘুম থেকে উঠে নাশতা খাওয়া এবং তার পর থেকে অব্যাহত বুক জ্বালাপোড়া। পেটে গ্যাসের চাপ চিন্তা করে কিছুক্ষণ চলল হাতুড়ে চিকিৎসা।

এক পর্যায়ে উপায়ান্তর না দেখে ডাক্তার বন্ধুদের পরামর্শে তখনকার অ্যাপোলো (এখনকার এভারকেয়ার) হসপিটালসের ইমারজেন্সি বিভাগে যাওয়ার পথ বেছে নিতে বাধ্য হলাম। অ্যাপোলো হসপিটালটি আমার বাসা থেকে পায়ে হাঁটার পথ বিধায় বাড়তি সুবিধা ছিল; নয়তো যানজটে পড়ে জানটাই যেত খতম হয়ে। হসপিটালে ঢুকে দেখি ঝকঝক তকতক করছে। চট করে বোঝা যায় না পাঁচ তারকা হোটেল না হসপিটাল। হসপিটাল-মার্কা ওষুধ-ওষুধ গন্ধও নেই। গিন্নির হাত ধরে ইমারজেন্সিতে পা ফেলা মাত্রই পুরু লেন্সধারী শ্মশ্রুমণ্ডিত এক তরুণ ডাক্তার পিলে চমকানো খবর দিলেন, ‘সম্ভবত একটা মাইলড্‌ অ্যাটাক হয়েছে। এনজিওগ্রাম করতে হবে, এক্ষুনি ভর্তি নিশ্চিত করুন।’ যে কথা সে কাজ। হুইলচেয়ারে বসে গেলাম আইসিইউতে। হাতে ক্যানোলা, মনিটরের সঙ্গে শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গের সংযোগ, ইসিজি পরীক্ষা সব মিলিয়ে একটা ভীতিকর পরিবেশ; যেন না-ফেরার দেশে যাচ্ছি।

দুই

আশির দশকে আমার শাশুড়ি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন। ঢাকার ডাক্তাররা সাফ জানিয়ে দিয়েছিলেন, বেঁচে থাকার চান্স খুব কম, যা খেতে চান খেতে দিন, যেথায় যেতে চান যেতে দিন। শ্বশুরমশাই স্ত্রীকে খুব ভালোবাসতেন, নাছোড়বান্দা। শেষ সম্বলটুকু দিয়ে শেষ চেষ্টা করবেনই করবেন এমন প্রত্যয়ী। শাশুড়িকে ভারতে নিয়ে যাওয়া হলো। হৃদরোগের চিকিৎসাজগতে ‘দেবতা’ বলে খ্যাত দেবী শেঠির সুচিকিৎসায় তিনি প্রায় ১৫ বছর বেঁচে ছিলেন। আমার শ্রদ্ধেয় সহকর্মী প্রয়াত সৈয়দ আবদুল হাই ভারত থেকে চিকিৎসা শেষে প্রায় ২০ বছর বেঁচে ছিলেন। দুটি প্রণিধানযোগ্য পর্যবেক্ষণ লক্ষ করা যাক। প্রথমত. সে সময় কালে-ভদ্রে হৃদরোগের কথা শুনেছি। অনেকটা অতিথি পাখির মতো নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে আগমন এবং মাঝেমধ্যে প্রাণঘাতী। অনেকে আবার বলত ‘বড়লোকী রোগ’। অর্থাৎ হৃদরোগ মানে ধনী শ্রেণির রোগ।

তিন

অথচ গেল দুই দশকে হৃদরোগের বিস্তারে বিরাট পরিবর্তন এলো। কয়েক বছর আগে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, বাংলাদেশে হৃদরোগের ফলে মৃত্যুর সংখ্যা ১ লাখের কিছুটা ওপরে, অর্থাৎ বাংলাদেশে মোট মৃত্যুর প্রায় ১৪ ভাগ ঘটে হৃদরোগের কারণে। তার মানে, প্রতি ১ লাখে ১০৮ জন। হৃদরোগজনিত মৃত্যুর ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিশ্বের ১০৪তম। গবেষণা বলছে, বাংলাদেশিরা পশ্চিমাদের তুলনায় কমপক্ষে ১০ বছর আগে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়। কয়েক বছর আগে হৃদরোগীদের গড়পড়তা বয়স ছিল ৫২ বছর এবং ৪০ শতাংশের বয়স ৫০-এর নিচে। খাদ্যাভ্যাস, ধূমপান, মানসিক চাপ ইত্যাদি এ রোগের প্রধান কারণ। দ্বিতীয়ত. তখনকার দিনে এ রোগের চিকিৎসা মানে দেশের বাইরে যাওয়া; দেশের ভেতর ব্যবস্থাপনা ছিল খুবই দুর্বল। হাতেগোনা দুয়েকটি সরকারি হাসপাতালে সীমিত সুযোগসুবিধা নিয়ে হৃদরোগের চিকিৎসা চলত। এমনিতে ব্যক্তি খাতে হাসপাতাল তখনও তেমন গড়ে ওঠেনি আর বিশেষত হৃদরোগের চিকিৎসায় ব্যক্তি খাতের হাসপাতালের ভূমিকা ছিল না বললেই চলে। মোট কথা, হৃদরোগ থেকে বাঁচতে চাইলে ব্যয়বহুল চিকিৎসার জন্য বিদেশ যাওয়া, নচেত দেশি চিকিৎসায় ধুঁকে ধুঁকে মরাÑ এই ছিল নিয়তি! এর বিপরীতে দুই দশক ধরে ব্যক্তি খাতে হৃদরোগ চিকিৎসায় যুগান্তকারী পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয়। অ্যাপোলো, ইউনাইটেড, ল্যাবএইড, স্কয়ার হাসপাতালে স্থাপিত হার্ট সেন্টার বিশেষত উচ্চবিত্তের জন্য ব্যয়বহুল চিকিৎসার ব্যবস্থা রেখেছে। অনুমান করি এর ফলে অন্তত হৃদরোগ চিকিৎসার জন্য ভারত বা অন্যান্য দেশে যাওয়ার প্রবণতা নিম্নগামী হয়েছে।

চার

অ্যাপোলো হসপিটালসের আইসিইউতে শুয়ে ভাবছিলাম, সিদ্ধান্তটা কি ঠিক হলো। তার চেয়ে ব্যাংকক বা সিঙ্গাপুর না হোক, অন্তত ভারতে যেতে পারতাম। দেবী শেঠির কথাও মনে পড়ল। কিন্তু পরক্ষণেই ভাবলাম, সহকর্মী মাহবুব হোসেন থাইল্যান্ড-আমেরিকা করেও জীবন বাঁচাতে পারেননি। মাত্র কদিন আগে সিমীন মাহমুদ আমেরিকায় ডাক্তার দেখাতে না দেখাতেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেন। সুতরাং মৃত্যু নির্ধারিত এবং অবধারিত। বাকি সব অসিলা মাত্র।

প্রসঙ্গত বলার অপেক্ষা রাখে না যে, ব্যক্তি খাতে চিকিৎসার বিস্তৃতি ব্যয়বহুল, যদিও স্বাস্থ্য খাতে বাংলাদেশ রূপান্তরের অন্যতম অনুঘটক। ব্যক্তি খাতের ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলো এমনকি উপজেলা স্তরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। উপজেলায় ক্লিনিকের কমতি নেই। সার্বিক বিবেচনায় হৃদরোগ চিকিৎসার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ যে বেশ অগ্রগতি সাধন করেছে, তা নিয়ে সন্দেহ আছে বলে মনে হয় না। রোগটা যেমন জটিল তেমন ব্যয়বহুল। বাংলাদেশ হার্ট ফাউন্ডেশনসহ বেশ কটি হাসপাতাল ইতোমধ্যে বিদেশি মানের সেবা দিয়ে যাচ্ছে। বসুন্ধরায় স্থাপিত অ্যাপোলো হসপিটালসটি ব্যক্তি খাতে চিকিৎসার জন্য অন্যতম মাইলফলক। এখানে ব্যবহৃত আধুনিক প্রযুক্তি, ব্যবস্থাপনা ও সেবা লক্ষ করবার মতো। রাধা নাগ লিখিত ‘হসপিটাল’ গল্পে দরিদ্র গৃহবধূ স্বামীকে মোটা খরচে চিকিৎসা করাতে নিয়ে আসে। ‘সরকারি হাসপাতালে গেলেন না কেন? খরচ কম হতো’Ñ এ প্রশ্নের জবাবে বধূটি বলল, ‘গিয়েছিলাম তো। তিন মাস ফেলে রাখল। ওষুধ, পায়ের ফটো তোলাÑ এসবে প্রায় পাঁচ হাজার টাকা লাগল। সারল না।’

পাঁচ

আইসিইউতে বাতিগুলো নিভে এলেও জোনাকির আলোর মতো দুয়েকটি জ্বলছে। চারদিকে একটা ভুতুড়ে ভাব। মনে মনে ভাবছি আমার জীবনবাতিও কি ধীরে ধীরে নিভে আসছে? হসপিটালের বেডে শায়িত আমার মাথায় অনেক চিন্তা ভর করছে। মৃত্যুচিন্তা তো আছেই। ‘মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভুবনে’ বলেও কবিগুরু মৃত্যুবরণ করেছেন। মনে পড়ে বিখ্যাত গানটি, ‘ও কারিগর, দয়ার সাগর, ওগো দয়াময়/চান্নি পসর রাইতে যেন আমার মরণ হয়’। মৃত্যুভাবনা ছাড়াও একে একে অনেক কথা মনে পড়তে থাকল। আমাদের কলাবাগান বাসার তিন তলায় এক ইঞ্জিনিয়ার থাকতেন। তার ভগ্নিপতি দারোগা সাহেব বেড়াতে এসে হার্ট অ্যাটাক করেন। এটা নাকি তার তৃতীয় অ্যাটাক। তড়িঘড়ি সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলো। কোনো বেড না পেয়ে মেঝেতে শুইয়ে রাখা হলো। একটি ছেলেকে দেখভাল করার জন্য হাসপাতালে রেখে সবাই বাড়ি ফিরে আসেন। গভীর রাতে সবাই ঘুমিয়ে পড়লে দারোগা সাহেব ছেলেটিকে বললেন, ‘চুপ, কাউকে বলবি না। যা হোটেল থেকে আমার জন্য কয়েক পিস গরুর মাংস নিয়ে আয়, গরম থাকে যেন।’ হ‍ুমায়ূন আহমেদের ‘সুখ অসুখ’ গল্পে প্যারালাইসিসে আক্রান্ত রহমান সাহেব মশারির নিচে গোপনে সিগারেট ফোঁকেনÑ  ‘বালিশের নিচ থেকে তিনি সিগারেটের প্যাকেট বের করলেন। হাত দুটি সচল আছে। সিগারেট ধরাতে কোনো অসুবিধা হয় না। ভাগ্যিস কোমরের নিচ থেকে প্যারালাইসিস হয়েছে।’

কিছু কিছু হার্ট অ্যাটাক আছে ভ্রমণের সময় ঘটে। আমার সহকর্মী প্রয়াত কবির ভাইয়ের হার্ট অ্যাটাক হয়েছিল নিউইয়র্কে প্লেন ভূমি স্পর্শ করার মুহূর্তে। প্রফেসর রেহমান সোবহান স্যার জর্ডানের রাজপরিবারের আত্মীয়। প্লেন ল্যান্ড করার মুহূর্তে তার হার্ট অ্যাটাক হয়। বুঝতে কষ্ট হয় না যে রাজ অতিথির অসুস্থতা দূর করতে জডানের সরকারের কমতি ছিল না।

ছয়

‘আপনার বিপি ও ইসিজি দেখতে হবে’Ñ নার্সের মমতাময়ী কণ্ঠে আমার চিন্তায় ছেদ ঘটে। ষোড়শী নার্সের বাড়ি পটুয়াখালী। সরকারি এক প্রতিষ্ঠান থেকে নার্সিংয়ে ডিপ্লোমা করে অ্যাপোলোয় জয়েন করেছেন। এ হসপিটালসে প্রায় ৫০০ নার্স কর্মরত। তার মধ্যে বিদেশি ৬০ জনের মতো। নার্সদের জন্য আবাসনব্যবস্থা অত্যন্ত ভালো। দেশি নার্সদের প্রারম্ভিক বেতন গড়পড়তা ২৫ হাজার টাকার মতো। প্রসঙ্গত বলে রাখা প্রয়োজন যে, বাংলাদেশে অন্যান্য বিপ্লবের মতো নীরবে একটা নার্সবিপ্লব ঘটে চলেছে তা বোধ হয় সবার জানা নেই। সারা দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে (অবশ্য মোটা দাগে সরকারি) প্রতি বছর শত শত নার্স বেরিয়ে আসছেন। তারা বেশিরভাগ দেশে কাজ করছেন, কিন্তু কিছু বিদেশেও যাচ্ছেন। পৃথিবীর বেশ কটি দেশ নার্স রপ্তানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আয় করছে। আমরাও সে পথে পা বাড়াচ্ছি মনে হয়। তবে এর জন্য চাই সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান, যেখানে মানসম্পন্ন নার্স তৈরি হবে।

কথায় বলেÑ তুমি যাবে বঙ্গে, কপাল যাবে সঙ্গে। ডাক্তারের অভিমত এনজিওগ্রাম করাতে হবে। ভয়ে পিলে চমকে উঠল। দুয়েক দশক আগেও যে প্রযুক্তি ব্যবহার করে এনজিওগ্রাম করা হতো, তার ভয়াবহতা অনুধাবন করে ভীষণ ভয় পেয়ে গেলাম। পাশে থাকা হার্টের রিং পরিহিত অভিজ্ঞ স্ত্রী চোখের ইশারায় জানান দিলেন কোনো ব্যাপারই নয়। আসলেও তাই হলো। সর্বসাকল্যে আধঘণ্টা এনজিওতে দুটি ব্লক চিহ্নিত করে দুটি রিং ঠেসে দেওয়া। ধন্যবাদ অন্তত আমার কাছে বাংলাদেশের ‘দেবী শেঠি’ ডা. শাহাবুদ্দিন তালুকদার ও তার দলকে।

পাদটীকা

মালয়েশিয়ায় বাসরত আমার শ্যালকের শিশুপুত্র ইব্রাহীম আমার অসুখ ও চিকিৎসা শেষে মন্তব্য করেছে, ‘দোয়া করছি ভালই হইছে, ফুফাজি মরে নাই।’ আমি আপনাদের সবার দোয়ায় বাসায় ফিরেছিলাম, মরি নাই, ৭৬ নটআউট! কিন্তু মিলিয়ন ডলার প্রশ্নÑ আমার মতো ভাগ্যবান কজন এ দেশে যারা এমনতর ব্যয়বহুল সুচিকিৎসা নিতে পারেন? গরিব-ধনী জীবন তো একই, তাহলে কেন কেউ সেবা পাবে, কেউ পাবে না? চিন্তাটা একান্তই আমার আর কর্তব্যটা একান্তই রাষ্ট্রের।

  • অর্থনীতিবিদ ও সমাজ-বিশ্লেষক; সাবেক উপাচার্য, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা