তরুণ প্রজন্ম
ড. নাসির উদ্দিন আহাম্মেদ
প্রকাশ : ২২ অক্টোবর ২০২৪ ০৮:২৬ এএম
ড. নাসির উদ্দিন আহাম্মেদ
সার্বিকভাবে বিশ্বজুড়ে এবং সুনির্দিষ্টভাবে সাম্প্রতিক
বিপ্লবের পর বাংলাদেশে একটি বহুল আলোচিত শব্দ জেনারেশন জেডÑ যা
সংক্ষেপে জেন জি নামে বেশি পরিচিত ও জনপ্রিয়। তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ১৯৯৬ থেকে
(মতান্তরে ১৯৯৫ বা ১৯৯৭ থেকে) ২০১০ সালের মধ্যে জন্ম নেওয়াদের আক্ষরিক অর্থে জেন
জি নামে আখ্যায়িত করা হয়। এই হিসেবে যাদের বয়স বর্তমানে মোটামুটি ১৪ থেকে ২৮, তারাই
হালের আলোচিত জেন জির ধারক ও বাহক। বিশ্বব্যাপী আজ এ কথা স্বীকৃত যে, আগামী
৪০-৫০ বছর নানা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা, নিত্যনতুন উদ্ভাবন, এক
কথায় দেশ ও মহাদেশ পেরিয়ে সমগ্র বিশ্বের নীতিনির্ধারক ও মূল কর্মশক্তি রূপে
আবির্ভূত হবে এবং টিকে থাকবে জেন জি। তাই তাদের কর্মক্ষেত্রের বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া
এখন সময়ের দাবি।
২০১৯ সালে সারা বিশ্বে কাঁপন ধরিয়ে দেয় করোনা মহামারি বা
কোভিড ১৯। ঠিক এই সময়টাতেই জেন জির একটি বড় অংশ কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের মানসিকতা
ও বয়সে পৌঁছে। অনেকে শিক্ষাজীবনের শেষ ধাপে এসে করোনার কারণে হোঁচট খায়। তখন
অর্থনৈতিক মন্দার সাথে ব্যাপক মাত্রায় আলোচিত হয় জেন জি-কে কাজ করার সুযোগ করে
দেওয়ার বিষয়টি। কারণ সবাই উপলব্ধি করতেন, কাজ করার সুযোগ না পেলে কেবল
জেন জি বা তাদের পরিবারই নয়, বৃহত্তর পরিসরে রাষ্ট্র ও বৈশ্বিক উন্নয়নও
পিছিয়ে পড়বে বা থমকে যাবে। তখনই সবার নজরে আসে যে, নানা বাস্তবতায় জেন জি
নিজেদের মাঝে বিশেষ কিছু বৈশিষ্ট্য লালন করে। তারা ডিজিটাল জগতের বাসিন্দা এবং
গণ্ডিবদ্ধ ধারণার বাইরে এসে কাজ করতে পছন্দ করে। নীতিবোধ ও ভারসাম্য বজায় রাখা
তাদের অন্যতম গুণ। কেবল চাকরি নয়, তাদের বিরাট অংশ উদ্যোক্তা হতে
চায় এবং বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়তে চায়। টাকা খরচ, সামাজিক দায়বদ্ধতা, ব্যক্তি
স্বাধীনতা ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তার বিষয়ে তারা স্পর্শকাতর। এসব বিষয় মাথায় রেখেই
পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান,
কর্মক্ষেত্র, রাষ্ট্রীয় জীবন এমনকি
আন্তর্জাতিক আঙ্গিনায় তাদের কথা বলার, বেড়ে ওঠার ও কাজ করার সুযোগ
সৃষ্টির কোনো বিকল্প নেই।
অতি সম্প্রতি আমেরিকার বাণিজ্যবিষয়ক সাময়িকী ফোর্বসসহ বেশ
কিছু গণমাধ্যম কর্মক্ষেত্র থেকে জেন জিদের
সরিয়ে দেওয়ার কারণসহ তাদের নিয়ে সৃষ্ট মিশ্র পরিস্থিতির বাস্তব চিত্র তুলে
ধরেছে। ফোর্বসের দৃষ্টিতে মূলত তিনটি কারণে কর্মক্ষেত্রে সুবিধা করতে পারছে না
জেন জি। প্রথমত, জেন জি মানসিকভাবে সব কাজে উদ্বুদ্ধ হতে পারে না, যা
তাদের দোষ নয়। তাদের আগের প্রজন্মের নাম মিলিনিয়াল, যাদের
জন্ম ১৯৮১ থেকে ১৯৯৬ সালের মধ্যে। তারও আগে জন্মেছিলেন বুমার্স (জন্ম ১৯৪৫ থেকে
১৯৬৫ সালে) এবং জেনারেশন এক্স (জন্ম ১৯৬৫ থেকে ১৯৮১ সাল)। কর্মক্ষেত্রে দেখা যায়,
বুমার্স থেকে মিলিনিয়াল,
অনেকেই বলতে পছন্দ করেন যে, জেন জি একটি নির্দিষ্ট
লক্ষ্য অর্জনের জন্য কঠোর পরিশ্রম করতে পছন্দ করে না। তবে দুঃখজনক হলো কোনো কোনো
ক্ষেত্রে বিষয়টি সত্য হলেও এর নেপথ্য কারণ খুঁজতে চান না নিয়োগকারী বা ঊর্ধ্বতনরা। এটা অস্বীকার করার উপায় নেই, বাস্তবে
২০০৮ সালের অর্থনৈতিক মন্দা থেকে শুরু করে ২০১৯ সালের কোভিড কিংবা তারও পরে
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ পরিস্থিতিতে সৃষ্ট আর্থিক সংকটকালে এক বিরূপ পরিস্থিতি
সৃষ্টি হয়। তখন কর্মক্ষেত্রে অন্ধ অনুগতদের ব্যাপক কদর, সংকটে
পড়লেই গণছাঁটাই,
বেতন কর্তন, চাকরির স্থায়িত্ব বা
নিরাপত্তার অভাব প্রভৃতি খুব কাছ থেকে প্রত্যক্ষ করেছে জেন জি, যার
প্রভাব একদিকে পড়েছে তাদের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনে, আবার
অন্যদিকে এমন করুণ পরিস্থিতি তাদের মনোজগতেও প্রভাব
ফেলেছে। বিশেষত, নিজের মেধা ও শ্রমের মূল্যায়ন না হওয়ায় অনেকেই হতাশ হয়Ñ যাদের
তখন টেনে তোলা কঠিন হয়ে পড়ে। বিশ্বের চারটি বৃহৎ হিসাব প্রতিষ্ঠানের অন্যতম
লন্ডনভিত্তিক ডেলওটি। এই প্রতিষ্ঠানের
প্রতিবেদনে দেখা যায়,
যেসব প্রতিষ্ঠান তাদের কর্মীদের নিয়ে ভাবে এবং জেন জির
পারিপার্শ্বিক বিশ্বকে মূল্যায়ন করে, সেসব প্রতিষ্ঠানেই কাজ করতে
আগ্রহী জেন জি। কিন্তু যেসব প্রতিষ্ঠানে এর বিপরীত স্রোত বয়ে যায়, সেসব
প্রতিষ্ঠানে নিজেদের উজাড় করে দিতে পারে না জেন জি; তখনই তাদের সরিয়ে দেওয়া
হয়। ২০২৩ সালের ডেলওটি পরিচালিত জরিপে দেখা গেছে, জেন জির ৫০% উত্তরদাতা
পছন্দের কোনো কাজের কথা বিবেচনা করার সময় কর্মজীবনের ভারসাম্যকে তাদের শীর্ষ
অগ্রাধিকার হিসেবে স্থান দিয়েছে। তাদের আরেক পরিচয় তারা ‘আপনার মনের কথা বলুন’
প্রজন্ম। তাদের পক্ষে বিষাক্ত কর্মক্ষেত্রের পরিবেশ সহ্য করার সম্ভাবনা কম। তাদের
প্রত্যাশা পূরণ করে নাÑ
এমন একটি অবস্থান ছেড়ে যাওয়ার জন্য তারা দ্রুতই সিদ্ধান্ত
নেওয়ার ক্ষমতা রাখে।
দ্বিতীয়ত, কর্মক্ষেত্রে একটি অন্যতম অনুষঙ্গ হলো
যোগাযোগ। আর যোগাযোগের জন্য প্রয়োজন ভাষার ব্যবহার। বর্তমান সমাজে কেবল কিছু শব্দ
উচ্চারণ কিংবা লেখার নামই ভাষা নয়। ছোট্ট একটি গ্রাফিতি বা দেয়াল চিত্র, একটি স্লোগান,
হাতের আঙুলের অবস্থান কিংবা সম্পূর্ণ নীরবতাও যে বলিষ্ঠ
ভাষা হতে পারে,
তার জ্বলন্ত উদাহরণ বাংলাদেশের সাম্প্রতিক বিপ্লব। এটি সমাজের
পরিবর্তন কিংবা সংস্কার সহায়ক হওয়ার নজিরও সৃষ্টি করেছে। এই নজির আগামীর শক্তিও বটে। জেন জির একটি অন্যতম চ্যালেঞ্জ হলো কর্মক্ষেত্রে তাদের ভাষা তথা যোগাযোগ
প্রক্রিয়ার সাথে অনেকেই তাল মিলিয়ে উঠতে পারে না। তারা একটি ডিজিটাল নেটিভ
প্রজন্ম হিসেবে সর্বমহলে প্রশংসিত হলেও সনাতনী চিন্তাধারার মানুষের কাছে তাদের এই
দক্ষতার মূল্যায়ন হয় না। অন্যদিকে সোশ্যাল মিডিয়া এবং টেক্সটভিত্তিক যোগাযোগে
নিমজ্জিত হয়ে বেড়ে ওঠা জেন জির তরুণ সদস্যরা অনেক ক্ষেত্রেই মুখোমুখি কথোপকথন বা
তথাকথিত উপস্থাপনার ক্ষেত্রে দক্ষতা দেখাতে পারে না বা যেখানে প্রয়োজন সেখানে কাঙ্ক্ষিত
কায়দায় যুক্তি উপস্থাপন করে একটি উদ্দেশ্যসাধন করতে পারে না। হার্ভার্ড ল
স্কুলের ২০২২ সালের একটি নিবন্ধে দেখানো হয়েছে যে, মহামারি
বা কোভিড-১৯ চলাকালে জেন জি সদস্যদের একটি বড় অংশ কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করেছিল। এই
প্রজন্ম তাদের কর্মজীবন শুরু করেছিলেন এমন একটি সময়ে, যখন
একটি টিম মিটিং অথবা আনুষ্ঠানিক ব্রিফিংয়ের পর কোনো কিছু লিখিতভাবে উপস্থাপন করার
বদলে দূর থেকে দ্রুততম সময়ে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন লিখে প্রেরণ করার বা তার ওপরে
মূল্যায়ন করে বা দূর থেকে পাঠানো কোনো প্রতিবেদন মূল্যায়ন করে বিষয়টিকে নবরূপে
উপস্থাপনের প্রয়োজন ছিল। তবে প্রযুক্তির কল্যাণে অতি সংক্ষেপে শুধু একটি চিহ্ন
কিংবা ইমোজি দিয়ে মনের ভাব প্রকাশে অভ্যস্ত জেন জির সদস্যের জন্য এমন দায়িত্ব
শুরুতেই গ্রহণ করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দেয়। তাদের জীবন থেকে একটি
গুরুত্বপূর্ণ সময় তথা অফিসে গ্রুমিং আপ বা অফিসে এসে নিজেদের গড়ে তোলার মূল্যবান
সময় হারিয়ে ফেলে। অনেকে এই সময়টিতে অফিসে আসার বদলে নিজ নিজ অবস্থানে থেকেই কাজ
করেছে। অনেক ক্ষেত্রেই এমন পরিস্থিতি তাদের বাস্তবমুখী কর্মকৌশল শেখার ক্ষেত্রে
বাধা হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষত, যেসব শিল্প বা প্রতিষ্ঠানে সভা, উপস্থাপনা
এবং দলগত সহযোগিতার মাধ্যমে কোনো কিছু তুলে ধরা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, সেসব
প্রতিষ্ঠান বা শিল্পের ক্ষেত্রে তারা নিজেকে যোগ্য বা চৌকস প্রমাণ করার ক্ষেত্রে
বাধাগ্রস্ত হয়। এমন বাস্তবতার কারণে কর্মক্ষেত্রে সহজেই ভুল বোঝাবুঝি হয়, যোগাযোগের
ব্যবধান বেড়ে যায়,
এমনকি কাজের প্রতি জেন জির অনীহা দেখতে পায় ঊর্ধ্বতন মহল।
কিন্তু বাস্তবে হয়তো তারা যোগাযোগের জন্য কেবল একটি ভিন্ন পদ্ধতি আন্তরিকতা
নিয়েই ব্যবহার করেছিল। এই আন্তরিকতার অবমূল্যায়ন জেন জির সদস্যরা সহজে মেনে নিতে
পারে না। ফলে তাদের মাঝে আনফ্রেন্ড, ডিলিট কিংবা রিসেট প্রবণতা
প্রবল হয়ে ওঠে।
তৃতীয়ত, প্রাণ চাঞ্চল্যহীন সর্বাত্মক কাজের মানসিকতাকে
প্রত্যাখ্যান করা জেন জির অন্যতম বৈশিষ্ট্যÑ যা অনেক ক্ষেত্রেই
কর্মপরিবেশের স্বার্থে মেনে নিতে অক্ষম ঊর্ধ্বতন মহল বা নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ।
বিশেষত, যে ধরনের কাজের জন্য দীর্ঘ সময় ধরে কর্মক্ষেত্রে অবস্থান করতে হয় এবং
একটু হাঁটাচলা বা বৈচিত্র্য উপভোগের বদলে দীর্ঘক্ষণ একই স্থানে অবস্থান করতে হয়
বা একাগ্রচিত্তে একই কাজে সর্বাত্মক মনোনিবেশ করে বসে থাকতে হয়Ñ এমন
কাজে জেন জি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে না। একটা সময় ছিল যখন সাফল্যের জন্য কঠোর
পরিশ্রম এবং নিজের পেশার জন্য ব্যক্তিগত বা পারিবারিক জীবনকেও বিসর্জন দেওয়ার বহু
ঘটনা ঘটত। এমনকি মিলিনিয়ালরাও বহু ক্ষেত্রে তাড়াতাড়ি এগিয়ে যাওয়ার জন্য রাতে, সপ্তাহ
শেষে কিংবা ছুটির দিনগুলোতে কাজ করে অভ্যস্ত ছিল। কিন্তু জেন জি এতে আদৌ আগ্রহী
নয়। তারা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে কেবল বেতনই প্রত্যাশা করে না, বরং
আরও বেশি কিছু চায়। তারা চায় একটি ভারসাম্যমূলক কর্ম ও ব্যক্তিজীবন, চলার
মতো অর্থ এবং ব্যক্তিগত অনুভূতির পরিপূর্ণ মূল্যায়নÑ যা
অনেক ক্ষেত্রেই বিরাজমান কর্মপরিবেশে পাওয়া যায় না।
জেন জি কর্মজীবনের অগ্রগতির চেয়ে ব্যক্তিগত সুস্থতা ও মানসিক স্বাস্থ্যকে অগ্রাধিকার দিতে বেশি ইচ্ছুক। বড়দের অনেকেই এটিকে অলসতার সমতুল্য মনে করেন। জেন জির অগ্রাধিকারের এই পরিবর্তন অনেক ক্ষেত্রেই তাদের বয়স্ক সহকর্মী এবং সংস্থাগুলোর জন্য উদ্বেগজনক হতে পারে। বর্তমান বা বাস্তবতায় এটা স্বীকার করা অপরিহার্য যে, কর্মক্ষেত্রে জেন জির অনেক সমস্যা সম্পূর্ণরূপে তাদের দোষ নয়। তারা দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বে বড় হয়েছে, যেখানে চাকরি, নিরাপত্তা এবং কর্মজীবনের অগ্রগতির ঐতিহ্যবাহী প্রতিশ্রুতিগুলো সব সময় সত্য বা বাস্তব সত্য বা বাস্তব হয় না। তারা শিখেছে, এমন একটি সংস্থার জন্য কাজ করার চেয়ে জীবনে আরও অনেক কিছু করার আছে। ফলে তারা বেছে নেয় রিসেট বাটন।