× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

আন্তর্জাতিক রাজনীতি

মধ্যপ্রাচ্যে উপনিবেশের ছায়া বিস্তৃত হচ্ছে

অ্যালেইন অ্যালামেডাইন

প্রকাশ : ২২ অক্টোবর ২০২৪ ০৮:২৪ এএম

আপডেট : ২২ অক্টোবর ২০২৪ ০৮:২৬ এএম

অ্যালেইন অ্যালামেডাইন

অ্যালেইন অ্যালামেডাইন

গাজায় গত এক বছর নির্বিচারে গণহত্যার ফলে গোটা বিশ্ব সম্প্রদায়ই নড়েচড়ে বসেছে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে, কোনো প্রতিবন্ধকতা ছাড়াই তারা কীভাবে গণহত্যা চালিয়ে যাচ্ছে? জাতিসংঘ কেন এখনও অকার্যকর? আন্তর্জাতিক বিচারিক আদালত কি অকার্যকর তবে? আসলেই কি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়গুলো নিরপেক্ষ? এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন সংস্থার উত্তর অনেক সরল, বিদ্যমান আন্তর্জাতিক আইনে নানা সংকট ও ত্রুটি রয়েছে। আন্তর্জাতিক আইনের মধ্যকার দুর্নীতি ও বৈষম্যের কথাও আলোচনায় আসে। তবে অনেক স্কলারই এ মন্তব্যের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন। আন্তর্জাতিক আইনের বিশেষজ্ঞ র‍্যালফ ওয়াইল্ড জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক আইন মূলত মনিবদের জন্য মোক্ষম অস্ত্র। এ ছাড়া সাংবিধানিক বিষয়ে দীর্ঘদিন গবেষণায় থাকা এমিলিও ডাবেদ জানান, আন্তর্জাতিক আইন তার গতিতে বিভিন্ন স্থানে ব্যবহৃত হচ্ছে এবং তার কার্যকারিতাও পাচ্ছে। এই দুই স্কলারের মতে, আন্তর্জাতিক আইন কোনো যুদ্ধ থামানোর জন্য নয় বরং উপনিবেশবাদী আচরণে রাষ্ট্রের স্বার্থোদ্ধার করে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের জন্মলগ্ন এবং গঠনতন্ত্র যাচাই করলেই এর মধ্যকার উপনিবেশবাদী আচরণ লক্ষ করা যাবে।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর আন্তর্জাতিক একটি সংস্থার তাগিদ দেখা দেয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এরই ধারাবাহিকতায় জাতিসংঘের আত্মপ্রকাশ ঘটে। দুটো যুদ্ধই ইউরোপের। আর ওই সময় বিশ্বের অন্য অংশ এই যুদ্ধের সঙ্গে ঔপনিবেশিক বাস্তবতায় যুক্ত হয়েছে। উপনিবেশের চাপেই তারা যুদ্ধে যুক্ত হয় এবং আজকের ফিলিস্তিনের ভাগ্যের পেছনে উপনিবেশেরও দায় রয়েছে। ইউরোপকেন্দ্রিকতার কারণে আফ্রিকার বিশাল ভূখণ্ড আজও নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো সেদিকে গভীর মনোযোগ রাখলেও বাস্তবে তা ইউরোপ বা পশ্চিমা জগতের স্বার্থেই কাজ করছে। মূলত কোনো ঔপনিবেশিক শক্তি যখন অন্য ঔপনিবেশিক শক্তির সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে ঠিক তখনই আমরা দেখি এই সংস্থাগুলো কার্যকর হয়ে উঠছে। যেমনটি আমরা দেখতে পেয়েছি রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময়।

জাতিসংঘে পাঁচটি রাষ্ট্রের ভেটো ক্ষমতা রয়েছে। এই পাঁচ রাষ্ট্রের যেকোনো একটি কোনো মতে ভেটো দিলেই জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ কিংবা নিরাপত্তা পরিষদে উত্থাপিত প্রস্তাবনা বাতিল হয়ে যেতে পারে। এই ভেটো ক্ষমতার মাধ্যমে ঔপনিবেশিক শক্তিগুলো গোটা বিশ্বের অন্য প্রান্ত থেকে আলাদা হতে পারে। জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য ছিল এই পাঁচ ভেটোসম্পন্ন রাষ্ট্রের দরকষাকষির আন্তর্জাতিক মাধ্যম। অবাক হওয়ার কিছু নেই, পাঁচটি রাষ্ট্রই পারমাণবিক অস্ত্র উৎপাদনের ক্ষমতা রাখে। জায়োনিজমও মূলত উপনিবেশের ফল, কারণ উপরিউক্ত পাঁচ ক্ষমতাধর রাষ্ট্রই ইসরায়েলকে জায়নবাদী রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। আর ঐতিহাসিক এই অপরাধের জন্য তাদের ওপর কোনো দায় চাপানো যাবে না। নিরাপত্তা পরিষদের ক্ষেত্রেও আমরা একই দৃশ্য দেখতে পাই।

আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালেও একই দৃশ্যের দেখা মেলে। জাতিসংঘের সব সদস্যই এর অন্তর্ভুক্ত হলেও ঔপনিবেশিক শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, এ বিষয়ে একমাত্র জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সিদ্ধান্তই অগ্রগণ্য বলে বিবেচিত হবে। এর একটি জলজ্যান্ত উদাহরণ হলো, ২০২২ সালে রাশিয়া ইউক্রেনে যাতে সামরিক অভিযান পরিচালনা করতে না পারে সেজন্য রুল জারি করতে গিয়েও লাভ হয়নি। রাশিয়ার ভেটো ক্ষমতা থাকায় তা সম্ভব হয়নি। এও বলে নেওয়া ভালো যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীন আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের সদস্য না হওয়ায় এই তিন দেশের ওপর সংস্থাটির কোনো নিয়ন্ত্রণ বা আদেশ কার্যকর হবে না। এজন্যই জর্জ ডব্লিউ বুশ ও টনি ব্লেয়ার ইরাকে এত মানুষ হত্যার পরও দায়ী হননি। তবে ট্রাইব্যুনাল থাকায় এক ধরনের আশ্বাস ও ভ্রম কাজ করে। মনে হয় আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আইনের সুশাসন রয়েছে।

কিন্তু আন্তর্জাতিক শক্তিধর রাষ্ট্রের কাছে এসব আইন মূল্যহীন। বরং ঔপনিবেশিক শক্তিগুলোর দরকষাকষি ও লাভালাভের হিসাব করার জন্যই এসব ট্রাইব্যুনালকে বেশি ব্যবহার করা হয়। আন্তর্জাতিক আইনের মধ্যে উপনিবেশের ঝোঁক বেশি। যেমন জেনেভা কনভেনশনের অতিরিক্ত প্রটোকলের অধিভুক্ত ৫১ ধারায় বলা হয়েছে, নির্বিচারে কোনো হামলা পরিচালনা করা যাবে না। অর্থাৎ বেসামরিক কোনো নাগরিকদের ওপর এমন হামলা চালানো যাবে না। কিন্তু যেসব রাষ্ট্র মুক্তির জন্য লড়াই করে তাদের জন্য এই আইন কীভাবে প্রয়োগ হবে তা স্পষ্ট নয়। ইসরায়েলকে সরবরাহ করা বোমায় হাজারো ফিলিস্তিনি মারা যাচ্ছে নির্বিচারে। কিন্তু তাদের আইনের আওতায় আনা সম্ভব হয়নি। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আমাদের জানা দরকার। দখলদার ঔপনিবেশিক ক্ষমতা কি মানবতার অন্যতম জঘন্য অপরাধ কি না। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের মতে এমনটি অবশ্যই অপরাধ। এ ক্ষেত্রে শুধু দেশ থেকে বিতাড়ন কিংবা বাস্তুচ্যুত করাকে অপরাধ বলা হয়। দখলদারত্বের অন্য উপাদান যেমন নির্বিচারে হামলা এবং জোর করে অভিবাসী বানানোর বিষয়টিকে এই আইন অন্তর্ভুক্ত করে না।

গোটা বিশ্বে এখনও এক ধরনের ঔপনিবেশিক বাস্তবতা রয়েছে তা অনুধাবন করার মাধ্যমেই আমরা ন্যায়বিচার ও মানবিকতার বিষয়ে ধারণা পাব। তবে এর মানে এই নয় যে, বিদ্যমান অবস্থায় আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যবহারের সুযোগ নেই কিংবা তাদের ওপর সম্পূর্ণ আস্থা হারিয়ে ফেলা উচিত। শান্তিপূর্ণ আলোচনার প্রতীক্ষায় বসে থাকার বদলে আমাদের উচিত বিভিন্ন রাষ্ট্রের মধ্যে ভূ-রাজনৈতিক ক্ষমতার সাম্য প্রতিষ্ঠা করা এবং কূটনৈতিকভাবে দরকষাকষির মাল্টিপোলার কাঠামো গড়ে তোলা। শান্তির প্রত্যাশা করে আসলে খুব লাভ হবে না। কারণ জাতিসংঘের নিয়ম অনুসারেই ফিলিস্তিনের মানুষদের নিজ গৃহে ফেরার অধিকার থাকলেও ইসরায়েল অপরপক্ষে যুক্তি দিতে পারে তাদের এ অধিকার নেই। কারণ ফিলিস্তিনিরা যে মুক্তির সংগ্রাম করছে তা জেনেভা কনভেনশন স্বীকার করে না। আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে বিশ্বের অনেক স্থানেই যে সংঘাত-সহিংসতা চলছে, তার সমাধান পাওয়া যাচ্ছে না মূলত এ কারণেই। আমাদের এই ঔপনিবেশিক বিশ্ববিক্ষাকে অনুধাবন করতে হবে। কীভাবে কূটনৈতিকভাবে ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রগুলো তা সামলাবে তা ভাবতে হবে। জাতিসংঘে ভেটোর ক্ষমতা দূর করা এ ক্ষেত্রে জরুরি। কিন্তু তার আগে ভাবতে হবে ভূ-রাজনৈতিক অক্ষগুলো কীভাবে বিস্তৃত হবে এবং এর বণ্টন কীভাবে সুনিশ্চিত করা যাবে। গণতান্ত্রিকীকরণের এক ধরনের প্রভাব রয়েছে। সেদিকে যেতে হবে।

গণতান্ত্রিকীকরণের অবশ্য কিছু সমস্যাও রয়েছে। কারণ সারাবিশ্বে সার্বভৌমত্বের ধারণা এক নয়। সারাবিশ্বের কেন্দ্রীভূত একটি সংস্থা থাকলে সব অঞ্চলকে সমান আইনের আওতায় আনার ফলে সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিকতা লঙ্ঘন ঘটতে পারে। আর ফলে নির্দিষ্ট অঞ্চলে প্রভাব খাটানোর মতো অবস্থাও তৈরি হয়, যা আমরা মধ্যপ্রাচ্যেই বেশি দেখি। বিশেষত সিরিয়া, ইরাক এবং সুদানের প্রসঙ্গ টেনে আনলে তা-ই স্পষ্ট হয়। এসব রাষ্ট্রের মূল ক্ষমতাকাঠামোকে ভেঙে দেওয়ার ফলে প্রশাসনিক ব্যবস্থাও ভেঙে গেছে। ফলে সামাজিক কাঠামোয় বিভাজন বেড়ে গৃহযুদ্ধের ন্যায় পরিস্থিতি দেখা গেছে। এজন্যই বৈদেশিক হস্তক্ষেপ এসব অঞ্চলে সামাজিক প্রতিরোধের মুখে পড়েনি। অথচ শান্তি প্রতিষ্ঠাকারী সংস্থাগুলোর প্রথম কাজ ছিল, এসব অঞ্চলে গণতান্ত্রিক পদ্ধতি প্রতিষ্ঠা করা। এভাবে যদি ক্ষমতাকাঠামোকে সাজানো যেত তাহলে মধ্যপ্রাচ্যের অনেক অঞ্চলে স্বৈরতান্ত্রিক পদ্ধতি অবলোপন করা কঠিন কিছু হতো না। গণতান্ত্রিক কাঠামো প্রশাসনিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও মানবাধিকারকে সমুন্নত রাখার ক্ষেত্রে বেশি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারত। অবশ্য তা নিশ্চিত করতে হলে স্থানীয় রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর হতে হবে। বৈশ্বিক উত্তর ও দক্ষিণ গোলার্ধের রাষ্ট্রগুলোকে এখন গণতান্ত্রিকীকরণের মাধ্যমে এগোতে হবে। অন্তত মানবিক বিশ্ব গড়ে তোলার সদিচ্ছা থাকলে সংঘাত ও শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রথম পদক্ষেপ বলে এমনটিকে বিবেচনায় আনতে হবে।

উপনিবেশকে অস্বীকার করে স্বাধীনতা আদায়ের সংগ্রামের জন্য যারা লিপ্ত তাদের একত্রিত হওয়ার বাধা রয়েছে। কিন্তু বিদ্যমান বৈশ্বিক রাজনীতিতে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার আগ্রাসনকে শনাক্ত করে তার আঞ্চলিক রূপ চিহ্নিত করতে না পারলে সমাধান আসবে না। আর উপনিবেশে পুঁজিবাদ ও রাজনীতিকীকরণের কাজটিই বেশি হয়। বামপন্থি ঘরানার আদর্শকে অনুসরণ করে সরাসরি অনুকরণ করে ফেললেই হয় না। বিগত দুই দশকে বামপন্থি রাজনীতির তাত্ত্বিক ও বিশ্লেষণাত্মক ধারাকে নিয়ে আলোচনা করতে হবে। সংগ্রামের কাজটি সহজ নয়। কিন্তু উপনিবেশ যে এখনও রয়ে গেছে তা আজও স্পষ্ট বলেই লেবানন, ফিলিস্তিন, ইউক্রেন, সুদান ইত্যাদি অঞ্চলে এখনও সংঘাত রয়েছে। মানবিক বিপর্যয়ের ছায়াও সেসব অঞ্চলে অনেক প্রলম্বিত। তাই গোটা অঞ্চলের দেশগুলোকে নিজ স্বার্থ শনাক্ত করে এগোতে হবে।

  • কো-অর্ডিনেটর, ওয়ান ডেমোক্রেটিক স্টেট ইনিশিয়েটিভ, মধ্যপ্রাচ্য

মিডল ইস্ট মনিটর থেকে অনুবাদ : আমিরুল আবেদিন

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা