নির্বাচন কমিশন সংস্কার
মুনিরা খান
প্রকাশ : ২১ অক্টোবর ২০২৪ ০৮:৩৪ এএম
মুনিরা খান
যার অনুরোধে নির্বাচনব্যবস্থার
সংস্কার নিয়ে লিখছি, তিনি জুলাই ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে গুলিবিদ্ধ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের
শিক্ষার্থী এবং একই সঙ্গে একজন সাংবাদিক। তার উন্নত চিকিৎসা এখন পর্যন্ত সম্পন্ন না
হলেও প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে আন্দোলন এবং পাশাপাশি নিজ পেশাগত দায়িত্ব সমান্তরালেভাবে
পালন করছেন এবং একসময় আমাকে এ বিষয়টি নিয়ে লেখার অনুরোধ করেন। এ রকম অসংখ্য সংগ্রামী
শিক্ষার্থী জীবন বাজি রেখে নানাভাবে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে অবদান রেখেছেন এবং
আন্দোলন-পরবর্তী সময়েও তারা স্ব-স্ব অবস্থান থেকে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিচ্ছেন।
এই আন্দোলনে সক্রিয়
ও আহত প্রত্যেককেই আন্তরিক শ্রদ্ধা জানাই এবং একই সঙ্গে নিহতদের আত্মার শান্তি কামনা
করি। দীর্ঘদিন দেশে নির্বাচনব্যবস্থা নিয়ে রয়েছে অসন্তোষ। আর এই অসন্তোষের যে স্ফুরণ
আমরা জুলাই ও আগস্টে দেখলাম তার পেছনে নির্বাচনী ব্যবস্থা নির্ধারিত শাসনকাঠামোর প্রতি
মানুষের তীব্র ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। ফলে দেশে নির্বাচনব্যবস্থার সংস্কারের বিষয়টি সর্বাধিক
গুরুত্বের দাবি রাখে। ইতঃপূর্বে এই স্তম্ভেই নির্বাচনব্যবস্থার স্বচ্ছতা, কাঠামোর সংস্কার
নিয়ে অনেকবার লিখেছি। এবার পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে এবং সংস্কারের স্বপ্নে থাকা তরুণ
প্রজন্মের প্রত্যাশার দিকে তাকিয়ে নতুন কিছু সংযোজনের ইচ্ছেপ্রকাশ করছি।
আমরা জানি, নির্বাচনের
মাধ্যমে গণপ্রতিনিধিত্বশীল রাষ্ট্র পরিচালনাকারী কাঠামো গঠন করা হয়। বিশ্বের বিভিন্ন
গণতান্ত্রিক দেশ বিভিন্ন সময় নির্বাচনব্যবস্থাকে প্রতিনিধিত্বশীল করার লক্ষ্যে নির্বাচনী
আয়োজনের গুণগত মান বৃদ্ধির জন্য নানাবিধ কৌশল অবলম্বন করেছে ভোটাধিকারের মতো মানবাধিকার
সুনিশ্চিত করতে কাজ করেছে, যা দেশ-বিদেশে নির্বাচন পর্যবেক্ষক হিসেবে উপস্থিত থাকার
বদৌলতে প্রত্যক্ষ করার সুযোগ হয়েছে। এক্ষেত্রে ভালো ব্যবস্থাও যেমন প্রত্যক্ষ করেছি,
তেমনি কিছু কিছু ক্ষেত্রে বাজে নজিরও দেখেছি। তবে এশিয়ার কয়েকটি দেশে নির্বাচন পদ্ধতিতে
প্রভাব খাটিয়ে গণতান্ত্রিক কাঠামোকে দুর্বল করার অপপ্রয়াস বেশি পরিলক্ষিত হয়, যার মধ্যে
আমাদের দেশ অন্যতম।
অনেক ক্ষেত্রে
এসব দেশে গণতন্ত্রের আড়ালে স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থা কায়েমের অপপ্রচেষ্টাও কম চালানো
হয়নি। ফলে আমাদের দেশে বিভিন্ন সময় জনতা অভ্যুত্থান ঘটিয়ে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ফিরিয়ে
আনতে হয়েছে। কিন্তু বারবার কাঠামোতে এমন অপচেষ্টায় এক ধরনের শূন্যতা তৈরি হয়েছে। এ
ধরনের শূন্যতা কিংবা ফাঁক দূর করতে হলে প্রথমেই জনগণের নির্বাচিত সরকার গঠনের প্রক্রিয়া
শুরু করার কোনো বিকল্প নেই। একটি সুষ্ঠু-অবাধ-স্বচ্ছ-নিরপেক্ষ এবং সবার অংশগ্রহণমূলক
নির্বাচন আয়োজনের মাধ্যমে জনগণের প্রতিনিধির কাছে দেশের শাসনভার অর্পণ করাই হবে রাষ্ট্র
সংস্কারের মূখ্য ধাপ। এজন্য সবার প্রথমে জনগণের মতের প্রতিফলন ঘটায়, এমন নির্বাচন কমিশন
গড়ে তুলতে হবে।
নির্বাচনব্যবস্থার
সংস্কারের লক্ষ্যে দেশে একটি কমিশন গঠন করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। এই সংস্কার কমিটি
একটি স্বচ্ছ-জবাবদিহিমূলক নির্বাচন কমিশন গঠন করার পাশাপাশি নির্বাচনব্যবস্থায় প্রয়োজনীয়
সংস্কারের বিষয়টি পর্যালোচনার কাজ শুরুও করেছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, ভোটার ও সংশ্লিষ্ট
প্রতিষ্ঠান অর্থাৎ সংশ্লিষ্ট সব অংশীনজনের মতামতের ভিত্তিতে আসন্ন নির্বাচনের ব্যবস্থাপনা
কাঠামো, সংস্কার পদ্ধতি, সুপারিশমালা ও অংশীজনদের মতামত অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে উপস্থিত
করবে। দেশের জাতীয় সংসদে নির্বাচন পদ্ধতি ‘দ্য রিপ্রেজেন্টেশন অব দ্য পিপলস রিপ্রেজেন্টেটিভ-১৯৭২’
এবং ‘কন্ডাক্ট অব ইলেকশন রুলস-১৯৭২’ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। এসব অর্ডার রাষ্ট্রপতির আদেশ,
বিধিমালা ও সবকিছু বিবেচনা করে সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের নিমিত্তে প্রয়োজনীয় সময় গঠিত
কমিশনের প্রধান এবং অন্য সদস্যদের অবশ্যই দিতে হবে।
অন্তর্বর্তী সরকারের
গঠিন নির্বাচন সংস্কার কমিটির সদস্যরা দীর্ঘদিন ধরেই দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থার ত্রুটি-বিচ্যুতি
সম্পর্কে অবগত রয়েছেন এবং এ বিষয়ে তাদের দক্ষতারও ঘাটতি নেই। তবু দেশে জনগণের নির্বাচিত
জনপ্রতিনিধি নেই। ফলে এই কমিশনের উপস্থাপিত সুপারিশমালা কতটা জনমতের সমর্থন আদায়ের
পাশাপাশি আইনগতভাবে বাস্তবায়ন করা যাবে এবং ঠিক কোন পদ্ধতিতে বাস্তবায়ন করা হবেÑ এ
নিয়ে এখনও আমরা স্পষ্ট নই। পূর্বাপর মতামতগুলোকে যেমন বিবেচনায় আনতে হবে, তেমনি সব
পক্ষের সমান সহযোগিতাও এক্ষেত্রে জরুরি। বিশেষত রাজনৈতিক দলগুলোকে এ ব্যাপারে বিশেষ
ভূমিকা রাখতে হবে। কারণ রাজনৈতিক সদিচ্ছা ব্যতীত এত বড় কর্মযজ্ঞ সফল করা সম্ভব নয়।
দেশে অনেকগুলো রাজনৈতিক দল নিবন্ধিত রয়েছে। তাদের সঙ্গে অনেকটা মাশরুমের মতো অনেকগুলো
অঙ্গসংগঠনও রয়েছে। আছেন নির্বাচন পর্যবেক্ষকরাও। এক্ষেত্রে রাজনৈতিক দল এবং রাজনৈতিক
অংশীজনদের বিষয়ে কী নির্দেশনা থাকবে তা বিবেচনায় রাখতে হবে এই কমিশনকে।
বিদ্যমান কমিটির
গ্রহণযোগ্য ও বাস্তবসম্মত সুপারিশমালা থাকতে হবে। এই সুপারিশের আওতায় নির্বাচন কমিশনের
আকার, কার্যক্রম এবং তাদের কার্যক্রমের জবাবদিহিতার ধরন এবং তাদের ক্ষমতায়নের রোডম্যাপ
থাকা বাঞ্ছনীয়। স্বচ্ছ, গ্রহণযোগ্য, জবাবদিহিমূলক এবং সর্বজনগৃহীত নিরপেক্ষ নির্বাচন
কমিশন গঠন করাই এই কমিটির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। নির্বাচনব্যবস্থার আয়োজনে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের
গঠন প্রক্রিয়ার প্রতি সবার আস্থা গড়ে তুলতে হবে। যদি তা না করা যায় তাহলে আবারও নির্বাচন
প্রশ্নবিদ্ধ হবে। স্বাধীনতার ৫৩ বছর অতিক্রান্তেও তর্কের ঊর্ধ্বে কোনো নির্বাচন দেশের
মানুষ দেখেনি। আমরা অনেকেই দেশে একটি সুষ্ঠু নির্বাচনী ব্যবস্থা আয়োজনের বিষয়ে নানা
প্রস্তাবনার বিষয়টি উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছি এবং দেশে-বিদেশে বিভিন্ন স্থানে নির্বাচনব্যবস্থা
পর্যবেক্ষণ করেছি।
দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার
নিরিখে বলতে পারি- নির্বাচন কমিশনের যদি সমন্বয়ক্ষমতা, সাহসী মনোভাব, দৃঢ়তা এবং সুষ্ঠু
নির্বাচন আয়োজনের প্রতিজ্ঞায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকার জবাবদিহি না থাকে, তাহলে সুষ্ঠু-স্বচ্ছ
নির্বাচন আয়োজন কঠিন হয়ে যায়। রাজনৈতিক দল ও ভোটারÑ এই দুই বড় অংশীজন নির্বাচন কমিশনের
ওপর আস্থা না রাখলে সুষ্ঠু ভোটের আয়োজন কঠিন হয়ে পড়ে। তাই নির্বাচন কমিশন যাতে স্বাধীনভাবে
কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে সে স্বাধীনতা ও ক্ষমতা তাদের দিতে হবেই। নির্বাচন পরবর্তী
সময়ে তাদের দায়িত্ব পালনে সততার জন্য রাজনৈতিক হেনস্থা যাতে না হতে হয় সেজন্যও আইন
থাকা জরুরি। এখানে আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ, আমরা দেখি নির্বাচন কমিশনে থাকা প্রতিটি
সদস্যই থিতু হয়ে কাজ করেন। টানা পাঁচ বছর মেয়াদে নির্বাচন কমিশনের সদস্যরা কাজ করে
যান এবং অতীতে আমরা দেখেছি তারা বিভিন্ন সময়ে বিতর্কিত মন্তব্য করে তাদের ব্যর্থতার
দৃশ্য আরও করুণভাবে উপস্থাপন করেও পার পেয়ে গেছেন। নির্বাচন কমিশন শুধু জনগণের কাছে
জবাবদিহি করবে। দায়িত্বে থাকাকালীন কোনো সদস্য দায়িত্ব পালনে গাফিলতি, অসততা, অযোগ্যতার
পরিচয় দিলে তাকে অপসারণের ব্যবস্থা রাখতে হবে। সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের স্বার্থে সদস্য
সংখ্যা বাড়ানোও যেতে পারে। তবে সদস্য নির্বাচনের ক্ষেত্রে অবশ্যই অনেক যাচাই-বাছাই
করতে হবে।
আমরা দেখেছি,
সুষ্ঠু নির্বাচনের ধ্যানধারণার মধ্যেই পড়ে না এমন তিনটি নির্বাচন টানা তিন মেয়াদে সম্পন্ন
হয়েছে। আর এভাবেই জনগণের সার্বভৌম অধিকার খর্ব হয়েছে এবং মানুষ ভোটদানের প্রতি আগ্রহ
হারিয়েছে। অর্থাৎ পুরো নির্বাচনী ব্যবস্থা বা প্র্রক্রিয়া ভোটারের আস্থা হারিয়েছে।
সার্বভৌম অধিকারের ভিত্তিতে জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত না হওয়ার ফলে শাসনব্যবস্থায় যে বড়
ফাঁক তৈরি হয়েছে তার ফলে জনপ্রশাসন ও রাজনৈতিক দলের সঙ্গেও সাধারণ মানুষের বিরাট বিভাজন
সৃষ্টি হয়েছে। দেখা দিয়েছে শাসনব্যবস্থায় দুর্নীতি ও হতাশাজনক নৈরাজ্য। বিশৃঙ্খল এই
শাসনব্যবস্থার শূন্যতাকে তরুণ প্রজন্ম চিহ্নিত করতে পেরেছে। তারা বিদায়ি সরকারকে স্বৈরাচারী
আখ্যা দিয়ে নতুন গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের স্বপ্ন বুনতে শুরু করেছে। ফলে আঘাত নিয়েও অনেকে
যেমন নানাভাবে সংস্কারের আলোচনা চালাচ্ছেন, তেমনি সংস্কারের প্রত্যাশা নিয়ে তারা ভাবছেন।
ভোটাধিকার এক ধরনের মানবাধিকার। ভোটাধিকার নিশ্চিত হলে রাষ্ট্র মানবাধিকারের অন্য অনুষঙ্গগুলো
নিশ্চিত করার সুষ্ঠু ভিত পায়। এই প্রজন্ম তা উপলব্ধি করেছে বলেই কাঠামোর মধ্যে বৈষম্যকে
শনাক্ত করেছে। এমন বৈষম্য যেন না থাকে, সেজন্য আমাদের প্রথমে অপশাসন মুক্ত করার দিকেই
এগোতে হবে।
তখনই সম্ভব হবে যখন জনপ্রতিনিধিত্বের ভিত্তিতে কেউ শাসন কাঠামোয় বসবেন এবং সেই জনপ্রতিনিধি জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য থাকবেন। আর তা করতে হলে আমাদের প্রয়োজন সুষ্ঠু নির্বাচনব্যবস্থা। নির্বাচনব্যবস্থা আয়োজনের দায়িত্ব যে প্রতিষ্ঠানের, সেই নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতায়ন ও স্বচ্ছতার ভিত মজবুত করতে হবে। একই সঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে তাদের জবাবদিহিও। স্বচ্ছতা ও সমন্বয়ের ভিত্তিতে এগোক আগামীর নির্বাচন কমিশন। তবে এ ব্যাপারে রাজনৈতিক দলগুলোর এবং জনগণের সহযোগিতা দরকার। যূথবদ্ধ প্রয়াসেই সূচিত হতে পারে কাঙ্ক্ষিত পথ। বিশ্বাস করি, ব্যবস্থা স্বচ্ছ হলে নিশ্চয়ই অবস্থা ভালো হবে।