পরিপ্রেক্ষিত
মো. রায়হান আলী
প্রকাশ : ২১ অক্টোবর ২০২৪ ০৮:২৮ এএম
দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি নিম্ন-মধ্যবিত্তের কপালে দুর্ভাবনার
ভাঁজ ফেলেছে। নিম্ন আয়ের মানুষের আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের হিসাব যেন মিলছেই না। নিত্যপণ্যের
বাজারে গিয়ে অনেকেই চাহিদার তুলনায় কম বাজার নিয়ে বাসায় ফিরছেন, বাজারের ব্যাগ ভরা
যেন দুঃস্বপ্ন হয়ে পড়েছে। সেপ্টেম্বরে মুদ্রাস্ফীতি ১ শতাংশ কমলেও বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয়
দ্রব্যমূল্য অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। প্রায় ৮০ শতাংশ জনসংখ্যা গ্রামীণ এলাকায় বসবাস
করে। গ্রামীণ পরিবেশেও আজ আধুনিকতার ছোঁয়া লাগতে শুরু করেছে কিন্তু দ্রব্যমূল্য মানুষের
ক্রয় ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে। গত ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর ড. মুহাম্মদ
ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ইতোমধ্যে রাষ্ট্র সংস্কারের কাজ শুরু করেছে।
মানুষের মৌলিক চাহিদা হলোÑ খাদ্য, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসস্থান।
সরকার রাষ্ট্র সংস্কারের যে কাজগুলো শুরু করেছে তা অবশ্যই জরুরি। তবে একই সঙ্গে আমাদের
খাদ্যের স্বয়ংসম্পূর্ণতা এবং বাজার নিয়ন্ত্রণ তথা বাজারে সিন্ডিকেট ভাঙার কাজটিও করা
জরুরি। কারণ মানুষ বাজারে স্বস্তি না পেলে, তার আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের সংগতি না থাকলে এর
বিরূপ প্রভাব নানাক্ষেত্রে পড়তে বাধ্য। অনেক বিশ্লেষকই অন্তর্বর্তী সরকারকে বাজার নিয়ন্ত্রণেও
নজর দেওয়ার কথা বলছেন। বিগত রাজনৈতিক সরকারের সময়ে যেভাবে সিন্ডিকেট গড়ে বাজার থেকে
হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে, সেই পরিস্থিতির অবসান মানুষ প্রত্যাশা করে।
সরকার পরিবর্তন হলেও সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য কমেনি। আর সিন্ডিকেট যে এখনও ক্রীড়াশীল
তা বাজারের নিত্যপণ্যের দাম দেখলে সহজেই অনুমেয়। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির সর্বশেষ উদাহরণ
হচ্ছে ডিমের দাম ডজন প্রতি ২০ টাকা পর্যন্ত বেড়ে যাওয়া।
বৈশ্বিক নানা প্রকার প্রভাব আর দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে নিম্ন
মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষজন সংসার চালাতে অনেকটা হিমশিম খাচ্ছে। নিম্ন আয়ের মানুষজনের
সংসার চালাতে প্রায় নাভিশ্বাস উঠছে। লাগামহীন নিত্যপণ্যের বাজারে স্বস্তি ফিরছে না
কোনোকিছুতেই। পাল্লা দিয়ে দাম বাড়ছে নিত্যপ্রয়োজনীয় সবকিছুর। ডিম, মাংসের পর এবার বেড়েছে
‘গরিবের মাংস’ খ্যাত পাঙাশের দামও। সেই সঙ্গে অন্যান্য মাছের দামও বাড়তি। দ্রব্যমূল্যের
এই ঊর্ধ্বগতির বাজারে কোনোরকম খেয়ে-পড়ে ঘর সংসার চালানো পরিবারগুলোতে বাড়ছে অস্বস্তি,
কমছে সুখ-শান্তি। এ অবস্থা সৃষ্টি হওয়ার পিছনে অনেক কারণ দাঁড় করিয়েছেন বিশ্লেষকরা।
কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম হলোÑ কোভিড-১৯-এর বৈশ্বিক মহামারির অর্থনৈতিক বিরূপ প্রভাব,
ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের প্রভাব, ইসরাইল-ফিলিস্তিন যুদ্ধ অব্যাহত, বন্যা, অতি বৃষ্টি-অনাবৃষ্টি,
খরা প্রাকৃতিক নানা প্রকার দুর্যোগের ফলে কৃষির ক্ষতি সাধন।
সবজি ব্যবসায়ীরা বলছেন, বর্ষার সময় সবজিক্ষেত ডুবে যায়, গাছের ক্ষতি হয়। উৎপাদন কম হওয়ার কারণে মূল্য বৃদ্ধি পায়। এবার দেশের পূর্ব ও উত্তরাঞ্চলে ভয়াবহ বন্যায় ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এ ছাড়া মধ্য সেপ্টেম্বর থেকে অতিবৃষ্টির ফলে সবজির ক্ষতি মারাত্মক। সরবরাহ অস্বাভাবিক কমে যাওয়ায় মূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। অপরদিকে কিছু পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির জন্য ব্যবসায়ীদের কারসাজিও আছে। এ অবস্থা থেকে মানুষকে মুক্তি দিতে হবে। জীবন-যাপনে আমাদের মিতব্যয়ী হতে হবে, অপচয় রোধ করতে হবে। সরকারি উদ্যোগ বৃদ্ধির পাশাপাশি বেসরকারি উদ্যোগকে আরও বেগবান করতে হবে। সাম্প্রতিক বন্যা পরিস্থিতির কারণে কৃষিতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বন্যা-দুর্গত এলাকাগুলোর কৃষি পরিস্থিতি এখনও অস্বাভাবিক। কৃষির ওপর প্রাকৃতিক দুর্যোগের আঘাতের কারণে আমাদের নিত্যপণ্যের পর্যাপ্ত চাহিদা মেটাতে সক্ষম নই আমরা। বাজার নিয়ন্ত্রণে কৃষির উৎপাদন বৃদ্ধিতে আমাদের মনোযোগী হতে হবে ও বাজার সিন্ডিকেট ভাঙতে কঠোর অবস্থানের বিকল্প নেই।