× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

সম্পাদকীয়

উন্নয়নের অগ্রভাগে থাকুক পরিবেশের সুরক্ষা-ভাবনা

সম্পাদকীয়

প্রকাশ : ২০ অক্টোবর ২০২৪ ০৮:৩৩ এএম

উন্নয়নের অগ্রভাগে থাকুক পরিবেশের সুরক্ষা-ভাবনা

উন্নয়ন মানে দেশের জনগণের কল্যাণ। কিন্তু সেই উন্নয়নকে ঘিরেই যদি অকল্যাণের বার্তা উঠে আসে, তাহলে তা দুঃখজনক ও উদ্বেগের। ‘উন্নয়ন প্রকল্পেই পরিবেশ ধ্বংসের যত আয়োজন!’ শিরোনামে ১৯ অক্টোবর প্রতিদিনের বাংলাদেশে প্রকাশিত প্রতিবেদনে যে চিত্র উঠে এসেছে তা আমাদের উদ্বিগ্ন না করে পারে না। পরিবেশের ওপর অভিঘাত জনস্বাস্থ্যের জন্য কতটা ক্ষতিকর এর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণও নতুন করে নিষ্প্রয়োজন। রাজধানী ঢাকা বিশ্বের দূষিত শহরগুলোর মধ্যে অন্যতম তা সচেতন মানুষ মাত্রেরই জানা। পরিবেশদূষণের কারণে জনস্বাস্থ্য পড়েছে হুমকির মুখে এবং নানা ধরনের গুরুতর রোগব্যাধি মানুষের চিকিৎসার ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দূষণে বছরে পরিবারপ্রতি চিকিৎসার ব্যয় গড়ে ১০ হাজার টাকারও ওপরে দাঁড়িয়েছে। ক্ষমতাচ্যুত বিগত রাজনৈতিক সরকার উন্নয়নকাজ চালাতে গিয়ে জনস্বাস্থ্যের বিষয়টি আমলেই নেয়নি। পরিবেশের ক্ষতির তোয়াক্কা না করেই নেওয়া হয়েছে উন্নয়ন প্রকল্প এবং দেখা গেছে, ১২টি উচ্চ ব্যয়ের প্রকল্প ‘লাল তালিকাভুক্ত’ এলাকায় নেওয়া হলেও এক্ষেত্রে নেওয়া হয়নি পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র, মানা হয়নি আইনের বাধ্যবাধকতাও।

অন্তর্বর্তী সরকারের পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেছেন, পরিবেশের জন্য যেসব প্রকল্প ক্ষতিকর এবং যেগুলো পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের অধীন সেগুলো বন্ধে তারা কাজ করছেন। জাপানের পরিবেশ আন্দোলনকর্মী কেনতারো ইয়ামামোতো এ ব্যাপারে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে গিয়ে বলেছেন, মাতারবাড়ী প্রকল্পের কারণে অন্তত ২০ হাজার মানুষ নানাভাবে বিপন্ন হবে। বিগত সরকারের আমলে দেশের পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর প্রকল্পগুলো বাতিলের দাবিতে আন্দোলন করলেও সরকার তা আমলেই নেয়নি। তারা উন্নয়নের ‘হাতিয়ার’ হিসেবে এই প্রকল্পগুলো দৃশ্যমান করতেই ছিল মরিয়া। অনেক প্রকল্পে ক্ষমতার অপব্যবহার এবং বিধিবিধানের লঙ্ঘনজনিত ত্রুটিগুলোর ব্যাপারেও নানা মহল থেকে প্রতিবাদ জানানো হলে তাও হয়েছে অগ্রাহ্য। শুধু তাই নয়, অনেক প্রকল্পের কারণে ষড়ঋতুর বাংলাদেশের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য হারিয়ে গেছে এবং হাওরাঞ্চল কিংবা ভাটিবাংলার উল্লেখযোগ্যসংখ্যক জনগোষ্ঠীর বহুমাত্রিক ক্ষতির রাস্তা চওড়া হয়েছে। প্রতিদিনের বাংলাদেশের প্রতিবেদনেই বলা হয়েছে, গৃহীত ১২টি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে এর বিরূপ প্রভাব পরিবেশ ও মানুষের ওপর সরাসরি পড়বে এবং এর পরিপ্রেক্ষিতে অনেক প্রাণহানির সম্ভাবনাও রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে আমরা প্রশ্ন রাখতে চাইÑ এই যদি হয় অবস্থা তাহলে এর নাম কি উন্নয়ন?

বঙ্গোপসাগরের কূলঘেঁষে মাতারবাড়ীতে পরিত্যক্ত লবণের মাঠে নির্মাণ হচ্ছে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট ধারণক্ষমতার তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র। ২০২৩ সালের জুলাই থেকে এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট থেকে উৎপাদন শুরু হয়েছে এবং আগামী ডিসেম্বরে দ্বিতীয় ইউনিট থেকে উৎপাদন হবে। পরিবেশকর্মীদের ভাষ্য, এই বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থানীয়দের জীবন-জীবিকা চরম ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। অন্যদিকে সুন্দরবনের পরিবেশ বিপন্ন করে নির্মাণ করা রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাজ শুরু হয়েছে পরিবেশগত ছাড়পত্র না নিয়েই! আমরা জানি, সুন্দরবনকে ইউনেস্কো বিশ্ব ঐহিত্যের অংশ হিসেবে ঘোষণা করেছে। রামপালে যে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নির্মিত হচ্ছে তা ওই হেরিটেজ অংশ থেকে খুব বেশি দূরে নয়। এ প্রকল্পের পরিবেশগত ছাড়পত্র দিতে সরকারের উচ্চপর্যায়ের অনুমোদন প্রয়োজন বলে পরিবেশ অধিদপ্তর তখন মত দিলেও শেষ পর্যন্ত তা চাপা পড়ে যায়। বিজ্ঞানীরা বলছেন, আলট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল প্রযুক্তি মানে হচ্ছে অধিক চাপে-তাপে কয়লা পোড়ানো এবং তাতে পরিবেশের দূষণ তো ঘটবেই পাশাপাশি বিদ্যুৎকেন্দ্রের বর্জ্য পানিতে মিশে যাওয়ার কারণে আশপাশের জলাশয়েও দূষণের বিস্তার ঘটবে।

হাওর বা ভাটিবাংলার প্রকৃতিগত বৈশিষ্ট্যকে উপেক্ষা করে কিশোরগঞ্জের হাওরে যে উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদিত ও বাস্তবায়িত হয়, এর ফলে হাওরের সর্বনাশ তো ঘটেছেই, পার্শ্ববর্তী কয়েকটি জেলায় বন্যা যেন নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিগত দুই বছরে এ জেলাগুলোর ফসলি জমি, অবকাঠামো ও হাওরের স্বাভাবিকতা যেভাবে নষ্ট হয়েছে, এর জন্য ভবিষ্যতে আরও বড় মাশুল দিতে হবে। অন্যদিকে পরিবেশ সংরক্ষণ আইন উপেক্ষা করে পাহাড় ও গাছ কেটে সাফারি পার্ক নির্মাণ চিন্তার পরিপ্রেক্ষিতে পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর দাবির মুখে এ প্রকল্প সরকার বাতিল করলেও চট্টগ্রামে পাহাড় কেটে কয়েক কিলোমিটার সড়ক তৈরি করতে প্রকৃতির যে ক্ষতি করা হয়েছে, তার মাশুলও নিশ্চয়ই গুনতে হবে। আমরা জানি, পরিবেশ সংরক্ষণ বা জলাধার সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী যেকোনো জলাশয় ভরাট করা নিষিদ্ধ। এ আইন অমান্য করলে ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ডের পাশাপাশি আইন অমান্যকারীকে নিজ খরচে তা আগের অবস্থায় ফিরিয়ে দেওয়ার কঠোর বিধান রয়েছে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, সরকারি অনেক প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বিল ও জলাশয় ভরাট করা হয়েছে এবং এ পর্যায়ে সমাজে বলবানরাও পিছিয়ে থাকেননি।

কৃষিজমির ওপর আঘাতও নতুন কিছু নয়। কৃষিজমি ধ্বংসের অপরিণামদর্শী পরিণামের বিষয়টি সংবাদমাধ্যমে বারবার উঠে এলেও তাতেও কোনো কর্ণপাত করা হয়নি। সরকারি অনেক স্থাপনা কিংবা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে কৃষিজমি ধ্বংস করেই। আমরা দেখছিÑ পাহাড়-গাছ কেটে, জলাশয়-নদী ভরাট করে, খেলার মাঠ দখল করে তথাকথিত যে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড চলছে তা কোনোভাবেই বৃহৎ বিবেচনায় উন্নয়ন হিসেবে গন্য হতে পারে না। বিশ্বের দেশে দেশে যখন পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন কার্যক্রম চলছে তখন আমরা হাঁটছি এর বিপরীত পথে। জলবায়ু ও প্রাকৃতিক পরিবর্তন মোকাবিলায় দ্রুত ও সময়োপযোগী কর্মপরিকল্পনার তাগিদ যখন নানা মহল থেকে উঠেছে তখনও তা উপেক্ষিতই থেকেছে। আমরা আশা করব, দেশের পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্র পরিচালনার ভার যে অন্তর্বর্তী সরকারের স্কন্ধে বর্তেছে তারা বৃহৎ জনস্বার্থে উল্লিখিত বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনাক্রমে সর্বনাশা বৃত্ত থেকে বের হয়ে আসার চেষ্টা চালাবে। প্রকল্পের নামে বন, নদী, জলাশয়ের ক্ষতি কোনোভাবেই করা যাবে না। বর্তমান বিশ্ববাস্তবতায় জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে অনেক দেশে সাম্প্রতিক প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলোকে মাথায় রেখে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে পরিবেশ সুরক্ষার ব্যাপারে তারা অধিক মনোযোগী হয়ে উঠেছে।

আমাদের দেশে প্রকল্প প্রণয়নের আগে দৃশ্যত সমীক্ষা চালানো হয় বটে, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এর কার্যফল কতটা প্রতিফলিত হয় এ নিয়ে প্রশ্ন আছে। পরিবেশ-প্রকৃতির সুরক্ষা করে যে উন্নয়ন হয় তাকেই বলা হয় টেকসই উন্নয়ন। পাশাপাশি পরিবেশ-প্রকৃতি ধ্বংস না করে যে প্রবৃদ্ধি হয় সরল ভাষায় তাকেই বলা যায় সবুজ প্রবৃদ্ধি। আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশে উন্নয়ন প্রকল্পগুলো যেন বানরের তৈলাক্ত বাঁশে ওঠার গল্প না হয়। আমরা টেকসই উন্নয়ন চাই। আমরা চাই প্রতিটি উন্নয়ন প্রকল্প প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে যথাযথ গবেষণা হোক। উন্নয়ন প্রকল্পে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য ধ্বংসের যে অনুষঙ্গগুলো রয়েছে তা অনতিবিলম্বে বাতিল করা হোক। 

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা