প্রতিবেশী
মযহারুল ইসলাম বাবলা
প্রকাশ : ২০ অক্টোবর ২০২৪ ০৮:২৯ এএম
মযহারুল ইসলাম বাবলা
১৯৭৭ সাল থেকে ৩৪ বছর বামফ্রন্ট পশ্চিম বাংলা প্রদেশের ক্ষমতায় ছিল।
ওই সময়টা গত হয়েছে এক যুগের বেশি সময় আগে। বামফ্রন্টের সমর্থক কিন্তু শহর কলকাতায় এবং
মধ্যবিত্তরা ছিল না, মফস্বল এবং প্রান্তিক জনপদেই ছিল বামফ্রন্টের মূল ভিত্তি। উচ্চ
ও মধ্যবিত্তরা বরং বামফ্রন্ট-বিরোধী অবস্থানেই ছিল। সংখ্যাগরিষ্ঠ সাধারণ মানুষই ছিল
বামফ্রন্টের সমর্থক-ভোটার। কেননা তাদের স্বার্থ দেখার ক্ষেত্রে বামফ্রন্টের বিকল্প
অন্য কোনো দল ছিল না। আজও নেই। বামফ্রন্টের পতন ঘটে ২০১১ সালের বিধান সভা নির্বাচনে।
ওই নির্বাচনে বামফ্রন্টকে ক্ষমতাচ্যুত করতে মধ্যবিত্তরাই আদাজল খেয়ে নেমেছিল এবং তাদেরই
অগ্রণী ভূমিকা ছিল। বামফ্রন্টের বিদায়ে তৃণমূল কংগ্রেসকে ক্ষমতায় আনয়নে আরএসএসের ভূমিকাও
ছিল খুবই জোরালো। কলকাতার লেখক, শিল্পীদের একটি অংশ এবং বামপন্থি হওয়ার দাবিদার একটি
রাজনৈতিক দল পর্যন্ত তৃণমূলের পক্ষে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। মধ্যবিত্তের শ্রেণি-আকাঙ্ক্ষার
সফলতা পায় ওই নির্বাচনে।
২০১১ সালের পর শাসক তৃণমূলের হাত ধরে পশ্চিম বাংলার রাজনীতিতে অনুপ্রবেশ
ঘটে হিন্দু জাতীয়তাবাদী বিজেপির। তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিজেপির জোটবদ্ধ
সরকারের কেন্দ্রীয় রেলমন্ত্রীও হয়েছিলেন। তৃণমূলের নির্বাচনী নিবন্ধনে সুপারিশ করেছিলেন
বিজেপি নেতা এল. কে. আদভানি। সুযোগের মওকায় আরএসএস সারা পশ্চিম বাংলায় অগণিত সংগঠন
গড়ে তুলেছে। ধর্মনিরপেক্ষ এবং অসাম্প্রদায়িক পশ্চিম বাংলা এখন সাম্প্রদায়িক রাজনীতির
চারণভূমি। শূন্য অবস্থান থেকে বিজেপি এখন পশ্চিম বাংলায় রাজ্য ক্ষমতায় দ্বিতীয় অবস্থানে
চলে এসেছে। গত বিধান সভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস পেয়েছিল ২ কোটি ৮৭ লাখ ভোট এবং বিজেপি
২ কোটি ২৮ লাখ ভোট। বিধান সভায় বামফ্রন্ট ছিল আসনশূন্য অবস্থানে। এই রাজনৈতিক পরিবর্তনের
প্রভাবের ফলে পশ্চিম বাংলার ঐতিহ্যপূর্ণ সাংস্কৃতিক অবস্থানেও ধস নেমে আসে। এমনকি রাজনৈতিক
সংস্কৃতিতেও গণতন্ত্রের বিপরীতে ফ্যাসিবাদী তৎপরতা ক্রমাগত বৃদ্ধি পেয়ে এখন এমন অবস্থায়
পৌঁছেছে যে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ সিপিএমকে দমনে শাসক দল তৃণমূল নিষ্ঠুরতা প্রদর্শনে
কসুর করছে না। অথচ তাদের প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বিজেপির সঙ্গে রয়েছে মধুর সম্পর্ক।
সে কারণে তৃণমূল ও বিজেপিকে বলা হয় ‘বিজেমূল’। বামপন্থি দমনে তৃণমূল যেমন সিদ্ধহস্ত
তেমনি বিজেপিও। শত্রুর শত্রু সে আমার মিত্র’র দশা। পশ্চিম বাংলার বেশিরভাগ হিন্দু ভোটারের
ভোটেই হিন্দুত্ববাদী বিজেপি এগিয়ে আছে। তাদের সমর্থক ক্রমাগত বৃদ্ধি পেয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ
ছাড়াও, সারা ভারতে হিন্দু জাতীয়তাবাদীদের উত্থানকে অতীতের দ্বিজাতিতত্ত্বে প্রত্যাবর্তন
বলা যায়। এটা তো সত্য যে, কংগ্রেস যদি এক জাতির আওয়াজ না তুলত, তবে মুসলিম লীগ দ্বিজাতিতত্ত্বকে
সামনে আনতে পারত না। জিন্নাহর দ্বিজাতিতত্ত্ব এখন সারা ভারতে বিস্তার লাভ করেছে।
পশ্চিম বাংলার সাংস্কৃতিক অবক্ষয় মোটা দাগে স্পষ্ট। সেখানকার সংস্কৃতি
অতীতের গৌরবোজ্জ্বল অবস্থান থেকে ছিটকে পড়েছে। বাংলা ভাষা-সংস্কৃতি এখন চরম সংকটের
কবলে। বাংলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য প্রায় হারিয়েই গেছে, হিন্দির আগ্রাসনে। বাঙালি সাংস্কৃতিক
সকল মাধ্যম মুখ থুবড়ে পড়েছে। সেখানে জায়গা করে নিয়েছে বোম্বেটে সংস্কৃতি। অর্থাৎ বলিউডের
স্থূল সংস্কৃতি। গানে, নাটকে, চলচ্চিত্রে সেটা লক্ষ করা যায়। একসময়ে কলকাতার বাংলা
চলচ্চিত্রের রিমেক হতো ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে। আর এখন হিন্দি, দক্ষিণী চলচ্চিত্রের
কদর্য রিমেক হচ্ছে পশ্চিম বাংলায়। ভাষাটাই কেবল বাংলা; কাহিনী, আঙ্গিক সমস্তই বাঙালি
সংস্কৃতির সম্পূর্ণ বিপরীত। বরেণ্য চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায় যথার্থই বলেছিলেন, ‘বাংলা
ভাষার সাংস্কৃতিক নেতৃত্ব পশ্চিম বাংলার অধীনে থাকবে না। বাংলা সাংস্কৃতিক নেতৃত্ব
বাংলাদেশই দেবে।’ তার কথার যৌক্তিকতা ক্রমেই প্রমাণিত হচ্ছে।
ক্ষুদ্র জাতিসত্তাবাদে বাংলাদেশজুড়ে আমরা কেবল একটি ভাষাতেই কথা বলি,
বিকল্প ভাষার প্রয়োজন পড়ে না। অথচ পশ্চিম বাংলার মানুষেরা ভারতের অন্যত্র তো পরের কথা,
নিজ প্রদেশেই বাংলায় কথা বলতে পারে না। হিন্দি ভাষার আশ্রয় নিতে হয়। পশ্চিম বাংলার
ব্যবসা-বাণিজ্য, অর্থনীতির নিয়ন্ত্রণ মাড়োয়ারিদের দখলে, বাঙালিদের হাতে নেই। বাঙালিদের
প্রদেশের রাজধানী কলকাতায় বাঙালিরা সংখ্যালঘুতে পরিণত। বাংলাভাষীদের প্রভাব ক্রমাগত
হ্রাস পাচ্ছে। কলকাতায় ট্রামে, বাসে, রিকশায়, অটোতে, ট্যাক্সিতে, দোকানে, মার্কেটে,
শপিংমলে, রাস্তায়, হোটেল, যেখানেই কথা বলার প্রয়োজন সেখানেই, কথা বলতে হয় হিন্দিতে।
পুরাতন কলকাতার পরিসরে বাংলার প্রচলন থাকলেও, সেন্ট্রাল এবং বর্ধিত অর্থাৎ বৃহত্তর
কলকাতায় বাংলায় কথা বলার সুযোগ প্রায় নেই।
মনে পড়ে, ১৯৮৮ সালে কলকাতার নাট্যদল ‘নান্দীকারে’র আমন্ত্রণে নাট্য
উৎসবে অংশ নিতে ঢাকা থিয়েটারের সবাই কলকাতা গিয়েছিলাম। নাট্য-উৎসবটি হয়েছিল রবীন্দ্রসদনে।
বাংলা ভাষা ছাড়াও ভারতের বিভিন্ন ভাষার নাটকও উৎসবে অংশ নিয়েছিল। সে উৎসবে ঢাকা থিয়েটারের
কেরামত মঙ্গল নাটকটির প্রদর্শনীর দিন রবীন্দ্রসদন দর্শকে পরিপূর্ণ ছিল। অথচ নাটক শেষে
দর্শকদের মাঝে তীব্র হতাশা ও ক্ষোভ দেখে কারণ জানতে চাইলে তারা যা বলেন তা শুনে রীতিমতো
আঁতকে উঠি। ‘কেরামত মঙ্গল’ নাটকের পূর্ববঙ্গীয় গ্রামীণ সংলাপ নাকি তাদের মোটেও বোধগম্য
হয়নি। এজন্যই তাদের ক্ষোভ ও হতাশা। ‘নান্দীকার’Ñপ্রধান রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্তকে বিষয়টি
জানালে তিনি আক্ষেপে-শ্লেষে আমাদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করে বলেছিলেন, ‘হিন্দি ভাষার দৌরাত্ম্যে
কলকাতার বাঙালিদের এই দশা। হিন্দি শুনতে শুনতে তাদের কান নষ্ট হয়ে গেছে। হিন্দি বলতে
বলতে বাংলা ভাষা পর্যন্ত ভুলতে বসেছে। সেখানে পূর্ববঙ্গীয় বাংলা ভাষার কেরামত মঙ্গল
নাটকের সংলাপ তাদের বোধগম্য হওয়ার উপায় কোথায়? এটিই হচ্ছে এখনকার মধ্যবিত্ত বাঙালির
দশা।’
শহর কলকাতায় বাংলা মাধ্যমের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর এখন ভগ্নদশা। অথচ
ইংরেজি ও হিন্দি মাধ্যমের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর রমরমা অবস্থা। উচ্চবিত্তরা তো বটেই,
মধ্যবিত্ত বাঙালিরা পর্যন্ত সর্বভারতীয় জীবিকার প্রলোভনে ইংরেজি ও হিন্দি মাধ্যমের
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়েছে, যার সাদৃশ্য আমাদের দেশেও ইংরেজি মাধ্যমের
প্রতি প্রীতিতে দেখা যাচ্ছে। কলকাতায় পাঞ্জাবি, গুজরাটি, মাড়োয়ারি প্রভৃতি বিভিন্ন
জাতির বাস। সেখানে হিন্দি ও ইংরেজির পাশাপাশি তাদের মাতৃভাষারও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তারা
সেখানে গড়ে তুলেছে। হিন্দি ভাষা-সংস্কৃতির প্রভাবে-আগ্রাসনে পশ্চিম বাংলা প্রায় কোণঠাসা
হয়ে পড়েছে। পশ্চিমবঙ্গের মানুষেরা নিজেদের যতটা বাঙালি মনে করে তার চেয়ে অধিক মনে করে
ভারতীয়। নিজেদের জাতিসত্তাকে বিসর্জন দিয়ে ভারতীয় জাতীয়তাবাদেই তারা আস্থা রাখে এবং
গর্ব অনুভব করে।
কলকাতার সাংস্কৃতিক অবক্ষয়ের পেছনে রয়েছে বাঙালি জনপ্রিয় গায়ক, অভিনেতা, নির্মাতা, সুরকারদের কলকাতা ত্যাগ করার হিড়িক, যেটি অনেক আগে থেকেই লক্ষ করা গেছে। হালে আরও বেহাল দশা। বাংলা গানের চেয়ে হিন্দি গানের প্রতিই শিল্পীদের শ্রোতা-দর্শকদেরও তেমনি অধিক আকর্ষণ-টান লক্ষ করা যায়। বাংলা টিভি চ্যানেলগুলো পর্যন্ত হিন্দি মুক্ত নয়। হিন্দির আগ্রাসন বাংলা সাংস্কৃতিক মাধ্যমগুলোকে গিলে ফেলেছে। বাংলা ভাষা পশ্চিম বাংলায় প্রাদেশিক ভাষা। প্রদেশের বাইরে সে আঞ্চলিক ভাষামাত্র। সর্বভারতীয় প্রচার-প্রতিষ্ঠার মোহে বাংলা ভাষার শিল্পী-কুশলীরা অনেক আগে থেকেই মুম্বাই যাত্রা শুরু করেছিলেন, তারই ধারাবাহিক পরিণতি আজকের পশ্চিম বাংলার সাংস্কৃতিক দুর্দশা, যা বর্তমান সময়ে আরও প্রকট হয়েছে।