× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

বৈষম্যহীন রাষ্ট্র বিনির্মাণ

দক্ষতাভিত্তিক সমাজ গঠনের তাগিদ

ড. মাহরুফ চৌধুরী

প্রকাশ : ১৯ অক্টোবর ২০২৪ ০৮:২০ এএম

ড. মাহরুফ চৌধুরী

ড. মাহরুফ চৌধুরী

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের ফসল হিসেবে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ আজ এক নতুন যুগের সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে। দেশের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর প্রাশাসনিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে যেসব সংস্কার প্রক্রিয়া চলছে, তার মূল লক্ষ্য হলো একটি সমতাপূর্ণ ও বৈষম্যহীন সমাজ গঠন যেখানে দায় আর দরদ দিয়েই গড়ে উঠবে সম্প্রীতির এক মেলবন্ধন। বিশেষ ব্যক্তি, গোষ্ঠী, দল বা গোত্রের নয়; সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের গুণগতমান উন্নয়নের জন্য সামষ্টিক কল্যাণই হবে সরকার ও রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের সব কর্মকাণ্ডের মূল লক্ষ্য। একটি বৈষম্যহীন রাষ্ট্র বিনির্মাণের জন্য দেশের সর্বস্তরে সমাজের সব ক্ষেত্রে নানা বৈষম্যের উৎসগুলো নির্মূল করতে হবে। নচেৎ বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় কাঠামো ও প্রশাসন ঢেলে সাজিয়ে একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্র হিসেবে বিনির্মাণের এ স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যাবে। একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্র গঠনে ছাত্র-জনতার আকাঙ্ক্ষা পূরণে সব নিয়মনীতি থেকে অন্যান্য বৈষম্য নিরোধের পাশাপাশি বয়সবৈষম্য দূর করা অত্যাবশ্যক।

আমরা যে রাষ্ট্রীয় আদর্শ ‘বৈচিত্র্যের মাঝে ঐক্য’ রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় সন্নিবেশিত করে রাষ্ট্র সংস্কারের কথা বলছি, তা পুরোপুরি বাস্তবায়নের জন্য এখনই উত্তম সময় সরকারি চাকরিতে বয়সসীমার শর্তগুলো তুল দেওয়া। রাষ্ট্রের কাজ যথাযথভাবে পরিচালনার জন্য যোগ্য লোকজনদের সঠিক জায়গায় বসাতে না পারলে রাষ্ট্রের অগ্রগতি ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত করা যাবে না। আর যোগ্য মানুষকে সঠিক জায়গায় বসানোর পথে অন্যতম বাধা হলো চাকরিতে নিয়োগে বয়সসীমা বেঁধে দেওয়া। চলমান সমাজবাস্তবতার প্রেক্ষাপটে বয়সবৈষম্যকে আমরা স্বাভাবিক ভাবছি। তাই বলে এটা যে একটা বৈষম্য এবং সম্পূর্ণরূপে সমতার ধারণার বিরোধী ও সর্বসাধারণের সমসুযোগের অধিকারের পরিপন্থি, তা অস্বীকার করার কোনো সুযোগ আমাদের নেই। কিন্তু আমাদের অনেকের মনেই কথাটা মানুষের মধ্যে সমতা ও ন্যায্য অধিকারের প্রেক্ষাপট থেকে আসে না। আর আমাদের চিন্তার সে সীমাবদ্ধতাটাই রাষ্ট্রীয় নীতিমালার মধ্য দিয়ে সংস্কৃতির অংশ হিসেবে বিশ্বাসে ও আচার-আচরণে প্রতিফলিত হচ্ছে।

বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় নিয়মনীতিতে বয়সবৈষম্য খুবই স্পষ্ট। চাকরি ক্ষেত্র থেকে শুরু করে রাজনীতি, শিক্ষা এবং সামাজিক বিভিন্ন পর্যায়ে বয়সকে একটি প্রধান মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ‘তুমি এখনও ছোট, তোমার সময় হয়নি’ বা ‘তুমি তো এখন বৃদ্ধ, তোমার আর নতুন কিছু শেখার প্রয়োজন নেই’Ñএ কথাগুলো আমাদের সমাজে নিয়মিত শোনা যায়। এ ধরনের মনোভাব একদিকে যেমন ব্যক্তিমানুষের প্রতিভার অবমূল্যায়ন ও অপচয়, অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক অগ্রগতিতে নিত্যনতুন উদ্ভাবনের পথে বাধা সৃষ্টি করে। আমাদের মনে রাখতে হবে, বয়স নয়, জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা হলো কোনো একটি বিশেষ পদে দায়দায়িত্ব পালনের জন্য নিয়োগ পাওয়ার প্রকৃত মাপকাঠি। কথায় বলে, শেখার কোনো বয়স নেই। তাই বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, একদিকে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের দক্ষতা বা সৃজনশীলতা কিংবা নতুন কিছু শেখার ক্ষমতা কমে যায় না। বরং বয়সের ধারাবাহিকতায় অভিজ্ঞতার আলোকে তারা আরও যোগ্য হয়ে ওঠে। অন্যদিকে কম বয়সি মানুষের মধ্যে থাকে প্রাণপ্রাচুর্য্য, উদ্ভাবনী শক্তি ও নতুন চিন্তার ক্ষমতা। প্রকৃতপক্ষে বয়সের কোনো সীমা বা মাপকাঠিতে এ গুণগুলো বাঁধা যায় না। সরকারি চাকরিতে নিয়োগদানের ক্ষেত্রে আমাদের প্রয়োজন বয়স নয়, বরং জ্ঞানীয় যোগ্যতা, কর্মের অভিজ্ঞতা এবং সমস্যা সমাধানের দক্ষতার ভিত্তিতে প্রত্যেক চাকরিপ্রার্থীকে মূল্যায়ন করা উচিত।

বিষয়টা বোঝার জন্য অন্যান্য দেশের নিয়মনীতি বিবেচনা করা যেতে পারে। সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে অনেক রাষ্ট্রের বয়সবৈষম্যহীন নিয়মনীতির বৈশ্বিক উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। অর্থনৈতিকভাবে উন্নত বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এ বিষয়টি অনেক আগেই উপলব্ধি করেছে এবং বয়সবৈষম্য দূর করার জন্য সমতা, বৈচিত্র্য ও অন্তর্ভুক্তির নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, নরওয়ে ও ডেনমার্কের মতো দেশগুলোয় বয়সের ভিত্তিতে কোনো বিশেষ পদে চাকরি গ্রহণ বা প্রদানের বৈষম্য নেই। কর্মক্ষেত্রে এ ধরনের সংস্কৃতির কারণে কোনো বিশেষ পদে অতিসহজেই যোগ্য লোকবল পেতে তারা কোনো অসুবিধায় পড়ে না। এ দেশগুলোয় নেতৃত্বদান এবং নিত্যনতুন উদ্ভাবনে তরুণবয়স্কনির্বিশেষে সবাইকে একইভাবে সুযোগ দেওয়া হয়, যার ফলে যথাসময়ে যথাযথভাবে কাজ শেষ এবং বয়সনির্বিশেষে প্রতিভা বিকাশের সুযোগ অবারিত হয়। অর্থনৈতিকভাবে উন্নত বিশ্বের দেশগুলোয় বয়সের সীমা ভেঙে নেতৃত্ব দেওয়ার অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে। বিশেষ করে রাজনৈতিক, প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক, এমনকি অ্যাকাডেমিক ক্ষেত্রেও দক্ষতা, অভিজ্ঞতা এবং যোগ্যতাকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়, বয়সকে নয়। এ দেশগুলোয় নেতৃত্বের ক্ষেত্রে বয়স কোনো বাধা হিসেবে কাজ করে না, বরং বয়সের সীমা উপেক্ষা করা একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হিসেবে দেখা হয়। তরুণদের মধ্যে উদ্ভাবনী ক্ষমতা ও শক্তি রয়েছে, যা নেতৃত্বের ক্ষেত্রে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি আনতে পারে। অন্যদিকে প্রবীণদের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা এবং জ্ঞানের ভিত্তিতে প্রাজ্ঞ নেতৃত্বের সুযোগ থাকে। বিশ্বের নানা দেশে অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান বা রাজনৈতিক দলের নেতারা তাদের কর্মজীবন শুরু করেছেন খুব কম বয়সে, আবার অনেকে অবসর বয়সের পরও প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করেছেন। প্রকৃতপক্ষে যোগ্যতা এবং দক্ষতা কখনও বয়সের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না।

বাংলাদেশের বর্তমান পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে বয়সবৈষম্য দূর করা অত্যাবশ্যক হয়ে পড়েছে। বিষয়টা খাটো করে দেখা বা অবহেলা করার আর কোনো সুযোগ নেই। সরকার ব্যবস্থাপনায় এবং সরকারি, আধাসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর বয়সভিত্তিক নিয়োগের নিয়ম সংস্কার করা জরুরি। বর্তমান সময়ে চাকরি বা পদোন্নতির ক্ষেত্রে বয়সকে একটি প্রধান যোগ্যতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যা মূলত যোগ্য ও দক্ষ প্রার্থীদের প্রতিভা বিকাশের পথে বাধা সৃষ্টি করে। এ ধরনের প্রবণতা পরিবর্তন করা এখন সময়ের দাবি। নিয়োগ প্রক্রিয়ায় বয়স নয়, বরং প্রার্থীর যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা এবং দক্ষতাকে মূল মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। মানুষের মেধা, কর্মক্ষমতা এবং নেতৃত্ব প্রদানের সক্ষমতা বয়সের ওপর নির্ভরশীল নয়। একজন তরুণ কর্মী তার উদ্ভাবনী শক্তি এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতার মাধ্যমে একটি প্রতিষ্ঠান সামনে এগিয়ে নিতে পারে, অন্যদিকে একজন অভিজ্ঞ প্রবীণ কর্মী তার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও প্রজ্ঞা দিয়ে জটিল সমস্যার সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তাই উভয় বয়সের মানুষের জন্য সমান সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে, যাতে প্রত্যেক ব্যক্তি তার পূর্ণ সম্ভাবনা অনুযায়ী কাজ করতে পারে। সমতা ও সমঅধিকার নিশ্চিত করার জন্য এ ধরনের পরিবর্তন সমাজকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করবে, যেখানে প্রত্যেক ব্যক্তি বয়সনির্বিশেষে তার প্রকৃত দক্ষতা ও যোগ্যতা অনুযায়ী মূল্যায়িত হবে। এটি কেবল সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করবে না, বরং রাষ্ট্রের সার্বিক উন্নয়ন প্রক্রিয়া আরও বেগবান, টেকসই ও সফল করবে। কর্মক্ষেত্রে তরুণদের সৃজনশীলতা এবং প্রবীণদের প্রজ্ঞা একসঙ্গে কাজ করার সুযোগ পেলে দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতির গতিও বহুগুণে বাড়বে।

বৈষম্যহীন রাষ্ট্র বিনির্মাণের স্বপ্ন ও বয়সভিত্তিক বৈষম্য একসঙ্গে যায় না। একটি সুষম ও শক্তিশালী রাষ্ট্র গড়তে হলে আমাদের বয়সের পরিবর্তে যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও দক্ষতাকে প্রধান মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করতে ও মেনে নিতে হবে। বাংলাদেশে এ পরিবর্তনের উত্তম সময় এখনই, যখন রাষ্ট্র তার সামগ্রিক উন্নয়ন এবং বৈষম্যহীন সমাজ গঠনের জন্য সংস্কারকাজ শুরু করেছে। এজন্য বয়সের কোনো নির্দিষ্ট সীমারেখায় না ফেলে সরকার ও রাষ্ট্রীয় প্রশাসনে সবাইকে সমান অংশগ্রহণের সুযোগ দিয়ে একটি প্রগতিশীল ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে এগিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করতে হবে। তাই আমরা বর্তমান পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে বয়সবৈষম্য দূর করার ও দক্ষতাভিত্তিক সমাজ গঠনের আহ্বান জানাই, যা নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের জন্য বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের রাষ্ট্রসংস্কার প্রক্রিয়াকে আরও সুসংগঠিত ও সংহত করবে।

  • ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি, ইউনিভার্সিটি অব রোহ্যাম্পটন, যুক্তরাজ্য
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা