জলবায়ু পরিবর্তন
ড. মো. হুমায়ুন কবির
প্রকাশ : ১৮ অক্টোবর ২০২৪ ১০:৪৩ এএম
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পৃথিবীব্যাপী বিভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক বিপর্যয় যেমনÑ বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও খরার তীব্রতা আগের তুলনায় বেড়েছে। বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে যেসব প্রাকৃতিক বিপর্যয় ঘটে তার মধ্যে বন্যা অন্যতম। সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে স্বাভাবিকভাবেই এ অঞ্চলে বৃষ্টিপাতের প্রবণতা রয়েছে। বাংলাদেশে বর্ষায় প্রচুর বৃষ্টি হয়। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব। এ পরিবর্তনের সঙ্গে বন্যার সরাসরি সম্পর্ক আছে। প্রথমত, জলবায়ু পরিবর্তনে বৈশ্বিক উষ্ণতা বাড়ে, বায়ুমণ্ডল উষ্ণ হয়, ফলে বেশি পরিমাণে জলীয় বাষ্প বায়ুমণ্ডল ধারণ করে এবং একই সময়ে অতিরিক্ত বৃষ্টি হয়। নিশ্চিতভাবেই অতিবৃষ্টি বন্যার একটি বড় কারণ। অতিবৃষ্টিপাত থেকে অতিরিক্ত পরিমাণ পানি দ্রুততম সময়ে নিষ্কাশন খুব কঠিন। যার ফলে তীব্র বন্যার সৃষ্টি হয়। বন্যাসংক্রান্ত এক প্রতিবেদনে জানা যায় যে, বায়ুমণ্ডল স্বাভাবিকের থেকে ১.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি উষ্ণ হলে তা ৮.৪ শতাংশ বেশি আর্দ্রতা ধরে রাখতে পারে, যা ভারী বৃষ্টিপাতের প্রধান কারণ। দ্বিতীয়ত, বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে সমুদ্রের পানির স্তর বেড়ে যায়, অধিক তাপমাত্রায় মেরু অঞ্চলের বরফগুলো গলতে শুরু করে, আইস ক্যাপগুলো ভেঙে যায়, সমুদ্রের পানির উষ্ণতা বেড়ে যায়, ফলে পানির আয়তন বেড়ে যায়। তাই যখন নিম্নচাপ সৃষ্টি হয়, সাইক্লোন বা হারিকেন হয়, তখন শুরুতে এর গতিবেগ অনেক বেশি থাকে। বাতাসের গতিবেগের তীব্রতা বেশি থাকার ফলে বেশি পরিমাণ পানি স্থলভাগে ঢুকে পড়ে এবং তীব্র জলোচ্ছাস থেকে বন্যা হয়। বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে এ বছর জার্মানিতে বন্যার তীব্রতা আগের বছরের তুলনায় অনেকগুণ বেশি দেখা গেছে। কয়েক মাস আগে সংযুক্ত আরব আমিরাতে ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে বন্যা দেখা দেয়। বৈজ্ঞানিক তত্ত্বমতে, সেখানকার রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টি সঙ্গে সম্পর্কিত মানুষের জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানো।
আমাদের দেশের ইতিহাসে বিভিন্ন সময়ে প্রলয়ঙ্করী বন্যা দেখা গেছে। তবে সম্প্রতি দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের ১১টি জেলা বিশেষ করে ফেনী, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর ও কুমিল্লায় প্রবল বন্যা দেখা দেয়Ñযা অতীতে কখনও ঘটেনি। সম্প্রতি ক্যালিফোর্নিয়া অ্যাটমোস্ফিয়ারিক রিভার ফরকাস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছর এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে বায়ুমণ্ডলীয় নদী (অ্যাটমোসফিয়ারিক রিভার) মাত্রাতিরিক্ত আর্দ্রতা সৃষ্টি করায় প্রচুর বৃষ্টিপাত ঘটেছে। আর এই বায়ুমণ্ডলীয় নদীর কারণে অধিক বৃষ্টিপাত হয়েছে। তাছাড়া সমুদ্রে নিম্নচাপের কারণে বেশ কিছু দুর্যোগ এদিকে আঘাত হেনেছে। আকস্মিক বন্যার ক্ষেত্রে নদীর ক্যাচমেন্ট এরিয়া গুরুত্বপূর্ণ। দেশের দক্ষিণাঞ্চলে নদীগুলোর ক্যাচমেন্ট এরিয়া পাহাড়ি ঢলের পানি সামলাতে না পারায় ওই অঞ্চলের অনেক জেলা প্লাবিত হয়। তাছাড়া দেশে দুর্বল পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থাপনা, নদী-খাল দখলের কারণে পানি নিষ্কাশন বাধাপ্রাপ্ত হওয়া এবং তার ওপর পার্শ্ববর্তী দেশের বাঁধের কপাটগুলো খুলে দেওয়ায় অতিরিক্ত পানি যোগ হয়ে পানির প্রবাহ বেড়ে যায়। এভাবে বন্যার তীব্রতা বেড়ে যায় এবং লাখ লাখ পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সম্প্রতি শেরপুর ও ময়মনসিংহ অঞ্চলে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত ও পাহাড়ি ঢলে বন্যা তীব্র আকার ধারণ করে। গোটা বিশ্বে আবহাওয়ার যে ছন্দপতন ঘটেছে তার নেতিবাচক প্রভাবই আমরা প্রতিনিয়ত লক্ষ্য করছি। এক্ষেত্রে ত্রান ও পুনর্বাসন বিষয়ে আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে। এর আগে আমরা সিলেট অঞ্চলের বন্যা দেখেছি। সব ঘটনার পেছনে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সুস্পষ্টভাবে জড়িত।
জলবায়ু পরিবর্তন সাম্প্রতিক বিশ্বে পরিবেশবিষয়ক সবচেয়ে আলোচিত ও গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। জলবায়ু হলো ভূপৃষ্ঠের কোনো স্থানের ২৫-৩০ বছরের আবহাওয়ার গড় অবস্থা। এটি মূলত কোনো স্থানের দীর্ঘদিনের বায়ুপ্রবাহ, বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা, সূর্যালোক ইত্যাদির উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনকে নির্দেশ করে। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে গ্রিনহাউস গ্যাসের নির্গমন বাড়ার ফলে জলবায়ু পরিবর্তন ত্বরান্বিত হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ক্ষতিকর ধরনগুলোর মধ্যে তাপমাত্রা বৃদ্ধি, অতি বন্যা, অতিরিক্ত বৃষ্টি, অসময়ে বৃষ্টি, দীর্ঘমেয়াদি খরা দেখা দেবে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে দেশের অভ্যন্তরে নদীগুলোতে লোনা পানি প্রবেশ, দেশে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও সাইক্লোনের তীব্রতা বৃদ্ধি পাবে। প্রাকৃতিক নানা কারণে জলবায়ু স্বাভাবিকভাবে পরিবর্তন হলেও মূলত মানবসৃষ্ট কারণ যেমনÑ জীবাশ্ম জ্বালানির অতিরিক্ত ব্যবহার, কলকারখানা, যানবাহন থেকে নির্গত বিষাক্ত গ্যাস, কয়লা পোড়ানো, ইটভাটার ধোঁয়া, নির্বিচারে গাছ কাটা ইত্যাদি কারণেই জলবায়ু দ্রুত পরিবর্তন হয়। দিনদিন জলবায়ুর পরিবর্তন জীববৈচিত্র্যের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলায় তা সংশ্লিষ্টদের চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইন্টারগভার্নমেন্টাল প্যালেন অন ক্লাইমেট চেঞ্জ (আইপিসিসি)র জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক এআর-৬ সিন্থেসিস রিপোর্ট ২০২৩-এ মূল যে বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়েছে, সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে যে, মানুষের নানা কার্যক্রমে সৃষ্ট গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের ফলে ২০১১-২০২০ দশক সময়কালে ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রা ১৮৫০-১৯০০ সময়কালের চেয়ে ১.১ ডিগ্রি বৃদ্ধি পেয়েছে। বায়ুতে কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়ায় তাপমাত্রা ব্যাপকহারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এতে বায়ুমণ্ডলের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে।
বাংলাদেশে এবারের বন্যায় কৃষিতে ক্ষতির পরিমাণ অপূরণীয়। এ ক্ষতি মোকাবিলার সঙ্গে ভবিষ্যতের নিরাপত্তায় আমাদেরকে প্রথমে বসতবাড়ি কেন্দ্রিক কৃষি পুনর্বাসনের কাজ শুরু করতে হবে। ইতোমধ্যে কোনো কোনো এলাকায় বন্যার পানি কমতে শুরু করায় বসতবাড়ির আশপাশের জায়গাগুলো আগে দৃশ্যমান হচ্ছে। ১৬ অক্টোবর প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আবহাওয়া অনুকূলে না থাকায় এ বছর কুমিল্লা জেলার বুড়িচং উপজেলায় সবজির চারা উৎপাদনকারীদের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। টানা বৃষ্টিতে ওই অঞ্চলের প্রত্যেক কৃষক এক লাখ থেকে পাঁচ লাখ টাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। ফলে পুনর্বাসনের ক্ষেত্রে যেমন অঞ্চল অনুসারে পরিকল্পনা নিতে হবে তেমনি পরিস্থিতি মোকাবিলায় বসতবাড়িকেন্দ্রিক কৃষিতে গুরুত্ব দিয়ে কৃষকের খাদ্যনিরাপত্তা ও আয় বাড়ানোর দিকে নজর দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। এক্ষেত্রে সরকারি, বেসরকারি এবং ব্যক্তিগত—অর্থাৎ সমন্বিত সহায়তার বিষয়টি ভাবা দরকার। দুর্গতদের যেহেতু চারা উৎপাদনের সুযোগ নেই, তাই বাইরে থেকে তৈরি সবজির চারা যেমনÑ লাউ, মিষ্টি কুমড়া, বরবটি, শিম, টমেটো, মরিচ, বেগুন ইত্যাদির চারা পলিব্যাগে তৈরি করে তাদের সরবরাহ করে সহযোগিতা করতে হবে। সবজির চারার পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের শাক ও সবজির বীজও সরবরাহ করা আবশ্যক। সবজির চারাগুলো বসতবাড়ির আঙিনায় এবং বসতবাড়ির আশপাশে উপযোগী জায়গাগুলোতে লাগাতে হবে। অবস্থাভেদে চারাগুলোকে সরাসরি মাটিতে, বস্তায়, পলিথিন ব্যাগে, প্লাস্টিক ক্রেটে, মাটির চাড়িতে, কাঠের বাক্সে, কাটা ড্রামে, পুরনো টিনে অথবা কলার ভেলায় লাগানো যাবে। বাড়ির পাশে জলাবদ্ধ জমিতে যদি কচুরিপানা ও অন্যান্য জলজ আগাছা থাকে, তবে ভাসমান বেড প্রস্তুত করেও সবজি লাগানো যেতে পারে। এ সময় বসতবাড়িতে স্বল্পমেয়াদি লালশাক, পুঁইশাক, ডাঁটা শাক ইত্যাদি চাষ করা যেতে পারে। এ বন্যায় যেহেতু ফসলের মাঠ, বসতবাড়ির ফলের গাছ, গবাদিপশু, হাঁস-মুরগি, পুকুরের মাছ পানিতে ভেসে গেছে। তাই সবজির চারা ও বীজের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের ফলের গাছ যেমনÑ কাঁঠাল, আম, পেয়েরা, লেবু, জাম্বুরা গাছের চারা কৃষকদের সরবরাহ করা যেতে পারে। বসতবাড়িতে লালন-পালনের জন্য মুরগির বাচ্চা, পুকুরের জন্য মাছের পোনা প্রদান করা যেতে পারে।
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী শিক্ষকরা ইতোমধ্যে সবজির চারা ও বীজ সরবরাহ কর্মসূচি, মুরগির বাচ্চা প্রদান কার্যক্রম শুরু করেছে। এ বিষয়ে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে ঢাকা ব্যাংকের একটি পারস্পরিক সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যানতত্ত্ব বিভাগ বিভিন্ন ধরনের সবজির চারা তৈরি করে বন্যার্তদের মাঝে বিতরণ করছে। ইতোমধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সবজির চারা ও বীজের প্রথম চালান ব্রাহ্মণপাড়া, দেবীদ্বার, কুমিল্লায় বিতরণের জন্য হস্তান্তর করেছে। উদ্যানতত্ত্ব খামারে উৎপাদিত সবজির চারা পরবর্তীকালে ফেনী জেলার সোনাগাজী ও লক্ষ্মীপুর জেলার রায়পুরে পাঠানো হয়। উদ্যানতত্ত্ব খামারে চারা তৈরির এ প্রক্রিয়া চলমান আছে এবং থাকবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব ও এর অভিঘাত সম্পর্কে আমাদের দ্রুত সচেতন হতে হবে। দেশের একটি অংশ ইতোমধ্যে পুনর্বাসনের মধ্যে থাকাকালে দুর্ভিক্ষপীড়িত উত্তরবঙ্গেও বন্যা ভয়াবহ রূপ নেয়। ওই অঞ্চলের দিকে অবশ্য পুনর্বাসনের বিষয়ে মনোযোগ কিছুটা কমই দেখা গেছে। ত্রাণ ও পুনর্বাসনের ক্ষেত্রে আমাদের সমন্বিতভাবে উদ্যোগ নিতে হবে। পুনর্বাসন পরবর্তী খাদ্য উৎপাদন বাড়াতে বসতবাড়িকেন্দ্রিক কৃষিব্যবস্থার প্রতি জোর দিতে হবে। তাছাড়া বসতবাড়ি কেন্দ্রিক কৃষি উৎপাদন বাড়াতে সংশ্লিষ্ট অধ্যয়নে নিযুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভাগ এবং কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে হাব হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। একটি সমন্বিত, বৈজ্ঞানিক ও সুষ্ঠ পরিকল্পনার নিরিখে বন্যাদুর্গতদের পুনর্বাসন প্রক্রিয়া চালু করা গেলে দ্রুত সংকট সমাধান সম্ভব।