সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ১৬ অক্টোবর ২০২৪ ০৯:২১ এএম
পুষ্টির অন্যতম
উপাদান ডিমের বাজারদর উল্লেখযোগ্য জনগোষ্ঠীর ক্রয়সাধ্যের বাইরে। আমরা দেখছি, ডিমের
বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারের উদ্যোগ-আয়োজনের পরিণতি ‘অশ্বডিম্ব’। ডিমের বাজারে চরম অস্থিরতা
বিরাজ করার পেছনে বহুমাত্রিক কারণ বিদ্যমান। ‘ডিমের দাম আর কত বাড়বে!’ শিরোনামযুক্ত
প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ ১৫ অক্টোবর প্রকাশিত প্রতিবেদনে যে চিত্র উঠে এসেছে তাতে দেখা
যাচ্ছে, ডিমের বাজারে দামের পারদ ঊর্ধ্বমুখী হওয়ার পেছনে বহুমাত্রিক নেতিবাচক কারণ
রয়েছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের স্থিতিশীলতা ও সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার লক্ষ্যে ১৫ অক্টোবর
সন্ধ্যায় রাজধানীর কারওয়ান বাজারে তদারকিতে নামেন অর্থ ও বাণিজ্য উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন
আহমেদ। পণ্যটির দাম কমাতে বাজারে অভিযানে নেমে সরকার খুব একটা সুফল দৃশ্যমান করতে পারেনি।
উপরন্তু কিছু কিছু পাইকারি বাজারে ডিম বিক্রি বন্ধ অথবা কমিয়ে দিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
তাতে সাপ্লাই চেইন অর্থাৎ সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হয়েছে। ব্যবসায়ীদের বক্তব্য, সরকার নিজে
ডিম সরবরাহ করুক এবং তারা সেখান থেকে সরকার নির্ধারিত দামে পণ্যটি ক্রয় করে বিক্রি
করবে। আড়তদারদের কাছ থেকে তারা বেশি দামে কিনছেন এবং সেই হারে তাদের মুনাফা নির্ধারিত
করে বিক্রি করছেন।
বাণিজ্য উপদেষ্টা
বাজার পরিদর্শনে গিয়ে বলেছেন, দেশের বাজারে দৈনিক এক কোটি ডিমের ঘাটতি থাকায় সরবরাহ
সংকট তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে কয়েকটি উৎপাদক প্রতিষ্ঠানের ডিম নিয়ে কারসাজি করার অভিযোগের
বিষয়টিও সাংবাদিকদের সামনে তুলে ধরেন। একই সঙ্গে তিনি আরও জানিয়েছেন, ব্যবসায়ীদের সঙ্গে
আলোচনা করে সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে কাজ করছে সরকার। কিন্তু আমরা বিক্রেতা ও উৎপাদকদের
বক্তব্যের মধ্যে পার্থক্য লক্ষ করছি। পোলট্রি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতির বরাত দিয়ে প্রতিদিনের
বাংলাদেশ-এর প্রতিবেদনেই বলা হয়েছে, সরকার যদি সব সময় বাজার তদারকি নিশ্চিত করতে পারে,
তাহলে এখন যে দাম নির্ধারণ করা হয়েছে তা দিয়ে প্রান্তিক খামারিরাও লাভবান হতে পারেন।
কিন্তু সেটা হচ্ছে না। সেই সঙ্গে উর্ধ্বমুখী উৎপাদনব্যয়ের প্রসঙ্গও তিনি সামনে এনেছেন।
আরও বিস্ময়কর তথ্য তার বক্তব্যে উপস্থাপিত হয়েছে। করপোরেট কোম্পানিগুলো ৭০ হাজার ডিমের
চাহিদার বিপরীতে মাত্র এক হাজার ডিম সরবরাহ করছে। করপোরেট কোম্পানিগুলো নামমাত্র কিছু
ডিম সরকারের নির্ধারিত দামে বিক্রি করলেও বাকিগুলো অতিরিক্ত দামেই বিক্রি করছে।
অন্যদিকে বাংলাদেশ
পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ সেন্টাল কাউন্সিলের সভাপতির বরাত দিয়ে একই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে,
খামার পর্যায়ে প্রতিটি ডিম সরকারের নির্ধারণ করা দামে বিক্রি করা হচ্ছে। সরকারের নির্ধারিত
যৌক্তিক দাম বেঁধে দেওয়া সত্ত্বেও বাজারে কেন তা কার্যকর হচ্ছে নাÑ এ নিয়ে বহু প্রশ্ন
আছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ডিম বিক্রি বন্ধ কিংবা কম করার পরিপ্রেক্ষিতে সরকার কী ভাবছেÑ
সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের উত্তরে কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা যে
বক্তব্য রেখেছেন, তা একেবারেই দায়সারা গোছের। অথচ ঢাকা ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন আড়তে
আড়তদাররা কৌশলে ডিম বিক্রি কমিয়ে দিয়েছেন এবং করপোরেট কোম্পানিগুলোর সঙ্গে তাদের যোগসূত্রের
অভিযোগও রয়েছে। সবকিছু মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে, ডিমের বাজারে ‘শুভংকরের ফাঁকি’ শব্দটি বিদ্যমান
বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে বহুলাংশে প্রযোজ্য হয়ে পড়েছে। উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় যদি
স্বাভাবিক পরিস্থিতি বিরাজ করে, তাহলে বাজারে যেকোনো পণ্যের ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব
পরিলক্ষিত হওয়ার কথা নয়। আমরা জানি, মূল্যস্ফীতির টানা অভিঘাতে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস
উঠছে। কখনও এই পণ্য, কখনও ওই পণ্য এমনকি শাকসবজিতেও মূল্যস্ফীতির অভিঘাতের ছায়া অনেক
বিস্তৃত। পুষ্টির আধার হিসেবে বিবেচিত ডিম কিংবা আমিষ জাতীয় পণ্যও এর বাইরে নয়।
আমরা দেখছি, অনেক
ক্ষেত্রেই হাতবদলে পণ্যের দাম অনেকাংশে বেড়ে যাচ্ছে। ডিমের ডজন এখন ১৮০ টাকা, কোথাও
কোথাও তার চেয়েও বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে।
আমাদের স্মরণে
আছে, সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) হিসেবে গত আগস্টে ডিমের
দাম ডজনপ্রতি ১৫০-১৬০ টাকার তথ্য জানানো হয়েছিল। সরকার এর দাম নির্ধারণ করার ক্ষেত্রে
নিশ্চয়ই উৎপাদন খরচ থেকে শুরু করে আনুষঙ্গিক সবকিছুর হিসাব-নিকাশ কষেই দাম নির্ধারণ
করেছিল। এটিই স্বাভাবিক বিষয়। কিন্তু সরকার নির্ধারিত দাম নিয়েও যেসব প্রশ্ন এখন সংশ্লিষ্ট
বিভিন্ন মহল থেকে উঠছে তার কোনো যৌক্তিকতা আছে বলে আমরা মনে করি না। আমাদের আরও স্মরণে
আছে, স্বল্প আয়ের মানুষের প্রাণিজ আমিষের অন্যতম উৎস ডিমের দাম ২০২২ সালের মাঝামাঝি
ধাপে ধাপে বেড়ে ১৭০-১৮০ টাকা ডজনে দাঁড়িয়েছিল। এর আগে বছর জুড়ে ডিম ডজনপ্রতি ৮০-১২০
টাকার মধ্যে ওঠানামা করত। এবার যখন এর দাম ঊর্ধ্বমুখী হয়, তখন সরকার চাহিদার নিরিখে
ডিম আমদানির অনুমতি দেয়। সেক্ষেত্রেও অসাধু ব্যবসায়ীদের নানা রকম কারসাজির চিত্র সংবাদমাধ্যমে
উঠে এসেছিল। এখন আমরা দেখছি, সরকার নির্ধারিত দামে ডিম বিক্রি সম্ভব তো হচ্ছেই না বরং
আড়তদারদের তরফে হুমকি দেওয়া হয়েছে, যত দিন সরবরাহকারীরা সরকারের নির্ধারিত মূল্যে ডিম
সরবরাহ করবেন না, তত দিন তারা আড়ত বন্ধ রাখবে। ডিমের মূল্যবৃদ্ধির পেছনে চাহিদা অনুযায়ী
সরবরাহ করতে না পারার বিষয়টি কোনোভাবেই হেলাফেলার নয়। চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে যখন
অসামঞ্জস্যতা দেখা দেয়, তখন সুযোগসন্ধানী ও সুবিধাবাদী চক্র নানা রকম অপকৌশলের ছক কষতে
থাকে এবং ডিমের ক্ষেত্রে এখন তা-ই পরিলক্ষিত হচ্ছে। আমরা এও লক্ষ করছি, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়সহ
সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল পক্ষগুলোর মধ্যে এক ধরনের সমন্বয়হীনতাও বিরাজ করছে। আমরা মনে
করি, শুধু ডিমই নয়; সব পণ্যেই দেশীয় উৎপাদকদের নির্দিষ্ট মাত্রায় সুরক্ষা দিয়ে আমদানির
সুযোগ রাখা বাঞ্ছনীয়। ভোক্তা-উৎপাদক, আড়তদার সবারই স্বার্থ রক্ষা করা প্রয়োজন বটে,
কিন্তু উৎপাদক কিংবা আড়তদার এবং করপোরেট কোম্পানিগুলো যাতে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির
জন্য ভোক্তার ওপর চাপ সৃষ্টি না করতে পারে, সেই ব্যবস্থা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
প্রবাদ আছে, ধলা কিংবা কালা যাই হোক না কেন, উপকারী উপাদান চাই।
২০১৪-১৫ অর্থবছরে
দেশে ডিমের উৎপাদন ছিল প্রায় ১১ বিলিয়ন, যা এক দশকের ব্যবধানে প্রায় ২৩ দশমিক ৭৫ বিলিয়নে
পৌঁছেছে। তার পরও যেহেতু চাহিদা এবং উৎপাদনের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে, সেহেতু ডিমের বাজার
নিয়ন্ত্রণে আমদানির ব্যবস্থা করা বাঞ্ছনীয় বলে আমরা মনে করি। ডিমের বাজারে যে ‘শুভংকরী’
হিসাব-নিকাশের ম্যারপ্যাঁচ ও সরকার এবং সংশ্লিষ্ট মহলগুলোর মধ্যে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য
শোনা যাচ্ছেÑ এসব কিছুর নেতিবাচক ছায়া পড়েছে ডিমের দামে। ভোক্তাকে স্বস্তি দিতে হবে,
নেতিবাচকতার ছায়া সরিয়ে এবং সরকারের তরফে যথাযথ যৌক্তিক ব্যবস্থা নিয়ে। আমাদের প্রত্যাশা,
বদলে যাওয়া সময়ের প্রেক্ষাপটে পুরোনো ব্যাধির উপশম ঘটাতে আশু কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া
হবে।