সাইবার নিরাপত্তা
মো. ফজলুল করিম পাটোয়ারী
প্রকাশ : ১৬ অক্টোবর ২০২৪ ০৯:১৯ এএম
মো. ফজলুল করিম পাটোয়ারী
তথ্য-প্রযুক্তির এই যুগে অপরাধ ও বৈষম্যের শিকারÑ এই দুটোর বহুমাত্রিক বাস্তবতা
রয়েছে, যা নিয়ে এখনও আমরা সচেতন হয়ে উঠতে পারিনি। তথ্য-প্রযুক্তির ব্যবহারে অপরাধ যেমন
বেড়েছে, তার চেয়ে বেশি বেড়েছে অর্থ পাচার, অবৈধ পন্থায় লেনদেন; এমনকি জুয়ার সাইটের
মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মের ধ্বংসের প্রবণতা। আবার তথ্য-প্রযুক্তি জীবনকে এতটা ব্যক্তিগত
রাখার পরও তা সব সময় ব্যক্তিগত থাকে না। সম্প্রতি সংবাদমাধ্যমের এক প্রতিবেদনে বলা
হয়, সাইবার অপরাধের অভিযোগে ৫,৫১৮টি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে স্পিচ
অফেন্স-সম্পর্কিত মামলা ১,৩৪০টি। গত ৩০
সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ঢাকার সাইবার ট্রাইব্যুনালে মোট ১ হাজার ৭১৭টি এবং স্পিচ-সংক্রান্ত ৬৪টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। সাইবার নিরাপত্তা আইনের
অধীনে কার্যকর কিছু অগ্রগতি যেমন হয়েছে, তেমনি তার বিপরীতে কিছু সংকটও রয়েছে। আর এই
সংকট মূলত আইনটির কাঠামোগত দিক থেকে। একজন আইনজীবী না হলেও অন্তত তথ্য-প্রযুক্তি খাতসংশ্লিষ্ট
বিষয়ে অধ্যাপনায় যুক্ত থাকায় সংকটগুলো চোখে পড়ে।
এছাড়া আরও একটি খবর থেকে জানা যায়, আলোচিত ই-কমার্স
প্রতিষ্ঠান ই-অরেঞ্জ ডট শপের মাধ্যমে ৩৫৮ কোটি টাকা মানি লন্ডারিং হয়েছে। আদালতে ই-অরেঞ্জের
ওপর পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) দাখিল করা সাম্প্রতিক অভিযোগপত্রে এমন তথ্য
উঠে এসেছে। সম্প্রতি প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর অনলাইন সংস্করণের এ সম্পর্কিত
একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছর মে মাসে অনলাইনে জুয়া ও হুন্ডি
বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে এর সঙ্গে অবৈধ অর্থ লেনদেনে জড়িত থাকার সন্দেহে তিন বছরে
মোবাইল ফোনে আর্থিক সেবাদাতা কোম্পানির ৪৮ হাজার ৫৮৬টি ব্যক্তিগত হিসাব স্থগিত করা
হয়। একই সঙ্গে হুন্ডি সংশ্লিষ্টতা সন্দেহে এমএফএসের ৫ হাজার ২৯টি এজেন্টশিপ বাতিল
এবং ১০ হাজার ৬৬৬টি এজেন্ট হিসাবের লেনদেন ব্লক করা হয়। দেশে যত ধরনের অপরাধ
রয়েছে তার মধ্যে সাইবার অপরাধ অন্যতম। তবে সাইবার অপরাধের ক্ষেত্রে কিছু বিষয়ে এখনও
অস্পষ্টতা রয়ে গেছে।
উপরোল্লিখিত দুটো সংকটকেই আমরা আলাদাভাবে একটু বিচার করার চেষ্টা করি। দেশ থেকে
নানা উপায়ে অর্থ পাচার করা হয় অর্থনৈতিক লেনদেনের উদ্দেশ্যে। হুন্ডি কিংবা অন্য কোনো
অননুমোদিত পেমেন্ট গেটওয়ে, যেগুলোর মাধ্যমে অবৈধভাবে অর্থ পাচার হয়, সেগুলোকে আর্থিক
ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোর সুপারিশে বন্ধ করা হয়েছে। কিন্তু তারপরও নানা পন্থায় এবং অন্য
অনেক পেমেন্ট গেটওয়ে কিংবা পেমেন্ট ওয়ালেটের মাধ্যমে অর্থ পাচার চলছেÑ যা সত্যিকার
অর্থে পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব নয়। প্রশ্ন হচ্ছে, সাইবার নিরাপত্তা আইন কিংবা আইসিটি
অ্যাক্টের ক্ষেত্রে দুর্বলতা কোথায়। সাইবার নিরাপত্তা আইন ২০২৩-এর ৩০ নাম্বার ধারায়
বলা হয়েছে, ‘কোনো ব্যাংক, বীমা বা অন্য কোনো আর্থিক
প্রতিষ্ঠান বা মোবাইল আর্থিক সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান হইতে কোনো ডিজিটাল বা
ইলেকট্রনিক মাধ্যম ব্যবহার করিয়া আইনানুগ কর্তৃত্ব ব্যতিরেকে ই-ট্রানজেকশন করেন, তাহলে
তিনি অপরাধী বলে গণ্য হবেন।’ এই ধারাটির বড় দুর্বলতা ই-ট্রানজেকশন শব্দটি। আর্থিক প্রতিষ্ঠান
কিংবা মোবাইল সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ই-ট্রানজেকশন ব্যতীতও অর্থ পাচার
সম্ভব। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কেউ ক্রিপ্টোকারেন্সিকে মুদ্রায় রূপান্তর করল। সেই মুদ্রাকে
তারা অন্য কোনো ব্যক্তির কাছে বিক্রি করে নির্দিষ্ট কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠান এমনকি এমএফএসের
মাধ্যমেও নিতে পারে। ফলে এখানে ই-ট্রানজেনশন সরাসরি হয়নি। ই-ট্রানজেকশন সচরাচর আমরা
এটিএম বুথে টাকা উত্তোলন, শপিং করার সময় ক্রেডিট-ডেবিট কার্ড ব্যবহার, এমএফএসের মাধ্যমে
টাকা লেনদেন, অনলাইনে সেবার টাকা পরিশোধ করার সরাসরি লেনদেনের প্রক্রিয়াকে বিবেচনা
করে থাকি। এ জন্যই এই আইনে ই-ট্রানজেকশনের আওতায় পড়া অপরাধ স্পষ্ট নয়। অর্থাৎ কেউ যদি
সরাসরি ই-ট্রানজেকশন না করে শারীরিকভাবেও লেনদেন করেন, তাহলে তা এই অপরাধের আওতায় আসে
না। আবার বলা হয়েছে, ব্যক্তি যদি বিশেষ কোনো অ্যাকাউন্টে অর্থ লেনদেন করে আইনবহির্ভূতভাবেÑ
তাহলেও তা অপরাধ বলে গণ্য হবে। একজন সাধারণ মানুষ কীভাবে তা শনাক্ত করবে বোঝা কঠিন।
ফলে এই আইনের মধ্যে কিছু অস্পষ্টতা রয়েছেÑ যা অনেক ক্ষেত্রেই ভোগান্তি বাড়ায়।
আইনে আরও বলা হয়েছে, ‘যদি কোনো ব্যক্তি উপধারা (১) এর অধীন কোনো
অপরাধ সংঘটন করেন,
তাহা হইলে তিনি অনধিক ২৫ (পঁচিশ) লক্ষ টাকা অর্থদণ্ডে
দণ্ডিত হইবেন।’ অর্থাৎ কোনো ই-ট্রানজেকশন আইনবহির্ভূত বলে ঘোষিত হলে কেউ
যদি তারপরও লেনদেন করেন, তাহলে তাকে অপরাধী বলে গণ্য করা হবে। এক্ষেত্রে জনগণকে সচেতন
করার জন্য অননুমোদিত অ্যাকাউন্ট, পেমেন্ট ওয়ালেট, গেটওয়ে সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সংশ্লিষ্ট
মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে স্পষ্ট উল্লেখ করা জরুরি। যেকোনো পেমেন্ট গেটওয়ে, ব্যাংকিং
খাতের অ্যাকাউন্টে লেনদেন করার ক্ষেত্রে আমরা সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্ট সম্পর্কে তথ্য সহজেই
পাই। কিন্তু সরকারের নির্দেশনাগুলো সহজে পাওয়ার ক্ষেত্রে একধরনের বিড়ম্বনা বরাবরই রয়েছে।
এ ছাড়া আরও কিছু সমস্যা রয়েছে আমাদের প্রযুক্তি খাতে। প্রাথমিকভাবে আইনগত। আইনে সব
হয়তো ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়, তবে আইনের আওতায় সাইবার সিকিউরিটি এজেন্সির সক্রিয় কার্যক্রম
শুরু হওয়ার কথা থাকলেও তা এখনও শুরু হয়নি।
ইতোমধ্যে ফ্রিল্যান্সিং খাতও বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের বড় একটি উৎস। কিন্তু ফ্রিল্যান্সাররা
যে ধরনের অনলাইন মার্কেটপ্লেসে কাজ করেন, সেসব মার্কেটপ্লেস থেকে নির্ধারিত কিছু পেমেন্ট
ওয়ালেট কিংবা গেটওয়ের মাধ্যমে তাদের পারিশ্রমিক দেওয়া হয়। সরাসরি ব্যাংকে ট্রান্সফারের
ক্ষেত্রে এখনও তেমন অবকাঠামো আমরা গড়ে তুলতে পারিনি। এক্ষেত্রে পেপ্যাল, গুগল পে, পায়জাসহ
অনেক ওয়ালেটের কথা বলা যেতে পারে। ওয়ালেট সচরাচর পেমেন্ট আদায়ের একটি ক্ষেত্র হিসেবে
কাজ করে থাকে। ফলে ফ্রিল্যান্সারদের জন্য এটি অনেক গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু পেপ্যাল কিংবা
গুগল পে এখনও আমাদের দেশে চালু করা সম্ভব হয়নি। ফলে আপওয়ার্ক কিংবা ফাইভারের মতো অনেক
মার্কেটপ্লেসে ফ্রিল্যান্সাররা পারিশ্রমিক আদায়ে ভোগান্তির শিকার হন। বিগত সরকার অনেক
আগে পেপ্যাল চালু করার ঘোষণা দিলেও এখনও তা কার্যকর হয়নি। অথচ আমাদের পার্শ্ববর্তী
দেশে অন্তত ১৪৪টি পেমেন্ট ওয়ালেট রয়েছে। এসব পেমেন্ট ওয়ালেটের মধ্যে ভারতীয় ওয়ালেটও
রয়েছে। পেমেন্ট ওয়ালেট না থাকায় অনেকে ডলার সংগ্রহ করলেও তা ব্যাংকবহির্ভূত মানি এক্সচেঞ্জ
কিংবা ডলার ব্যবসায়ী চক্রের কাছেই তা বিক্রি করেন। ফলে আমাদের রেমিট্যান্স খাত বিপুল
অর্থ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
পেমেন্ট গেটওয়ে বা বিভিন্ন ওয়ালেট চালু করার বিষয়ে সরকারকে ভাবতে হবে। আইটি অবকাঠামো
গড়ে তোলার জন্য সাইবার সিকিউরিটি এজেন্সিকে তদারকির দায়িত্ব দিতে হবে। যেসব ওয়ালেট
বা পেমেন্ট গেটওয়েকে অনুমোদন দেওয়া হবে, তাদেরকে আমাদের দেশের পক্ষে কিছু শর্তও দিতে
হবে এবং তাদেরও জবাবদিহির আওতায় আনা জরুরি। এক্ষেত্রে সাইবার নিরাপত্তা আইনের একটি
দিক প্রশংসার দাবি রাখে। কারণ আর্থিক প্রতিষ্ঠান কিংবা পেমেন্ট গেটওয়ের ই-ট্রানজেকশনে
নজরদারি দৃঢ় হলে জবাবদিহি নিশ্চিত হয়। যেমনÑ পেপ্যালে যে ধরনের মুদ্রার লেনদেন হয় তা
কোনো রাষ্ট্র দেখে না। বিশেষত, ইউরোপে উন্মুক্ত বাজার হওয়ায় এর প্রয়োজন পড়ে না। কিন্তু
পেপ্যাল বা এমন কোনো এজেন্সিকে যদি আমাদের দেশে দায়িত্ব দেওয়া হয়, তাহলে বিদ্যমান আইনের
সঙ্গে সংগতি রেখেই চুক্তি করতে হবে। আর এই আইনের মাধ্যমেই মূলত অনেক সাইবার অপরাধ নির্মূল
করা সম্ভব। চাইলেই প্রযুক্তি খাতের সবকিছুতে পুঙ্খানুপুঙ্খ নজরদারি রাখা না গেলেও জবাবদিহির
আওতায় আনা যায়। প্রযুক্তি বিষয়ে যারা নিয়মিত খোঁজ রাখেন, তাদের কাছে বিষয়টি অজানা নয়।
তাই দেশে লেনদেন বা ই-ট্রানজেকশনের বৈশ্বিক সুযোগ-সুবিধা অর্জন করতে হলে আমাদেরও আধুনিকায়ন
ও সুষ্ঠু আইনি কাঠামো গড়তে হবে।
সাইবার নিরাপত্তা মামলার অধীনে বিচার আমাদের জন্য দ্বিতীয় একটি সংকট তৈরি করেছে। কারণ এক্ষেত্রে অধিকাংশ সময়ে অভিযুক্তের পক্ষে পর্যাপ্ত তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপন কঠিন হয়ে পড়ে। আবার রাজনৈতিক কারণেও যখন আইনের অপপ্রয়োগ হয়, তখন তা বড় সংকট তৈরি করে। প্রযুক্তি যেহেতু আমাদের জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেছে, তাই মানবাধিকারের অনেক অনুষঙ্গও এর সঙ্গে জড়িত। দুঃখজনক হলেও লক্ষণীয়, সাইবার নিরাপত্তা আইনে সাজার বিষয়ে বক্তব্য থাকলেও অভিযুক্তের পুনর্বাসনের বিষয়ে কোনো তথ্য নেই। নিকট অতীতে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক নারী শিক্ষার্থী ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেওয়ায় সাইবার অপরাধে অভিযুক্ত হন। তার একটি শিক্ষাবর্ষে যে ক্ষতি হয়েছে তার পাশাপাশি মানসিক, সামাজিক মর্যাদাহানিও যুক্ত হয়েছে। এসব বিষয় ভেবেই আইনকে আরও মানবিক করে তোলা জরুরি। প্রযুক্তি খাত নিয়ে আমাদের স্বপ্ন অনেক। কিন্তু রাষ্ট্রশাসন, সমাজব্যবস্থা, অর্থনীতি, পরিকল্পনা, প্রয়োজনের নিরিখে সমন্বয়সাধন হয় না বলেই আমাদের প্রযুক্তি খাত এখনও পিছিয়ে। অথচ এখানে রয়েছে অপার সম্ভাবনা। লেনদেনের সুযোগ-সুবিধার অভাবে যেমন অনেকে আয়ের উৎস কম পাচ্ছেন, তেমনি অর্থ পাচার হচ্ছে। আবার অনেকের সম্ভাবনা নষ্ট হচ্ছে স্পিচ-সংক্রান্ত মামলায়। তাই আমাদের এ বিষয়টিকে নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে। শুধু জলের উপরিভাগ দেখে প্রযুক্তির অতল সমুদ্রের ঘনত্ব ও সংকট আন্দাজ করা যাবে না।