ক্রিকেট দলের ভারত সফর
ইকরামউজ্জমান
প্রকাশ : ১৬ অক্টোবর ২০২৪ ০৯:১৩ এএম
ইকরামউজ্জমান
ভারতের ক্রিকেট লেখক ও বিশ্লেষক দীপক দেশপান্ডে তার রবিবাসরীয় কলামে
পাকিস্তানের মাটিতে বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের দুই টেস্ট সিরিজে হোয়াইটওয়াশ হওয়া
প্রসঙ্গে লিখেছেনÑ ‘বাংলাদেশ পাকিস্তানকে শুধু প্রথমবারের মতো পরাজিতই করেনি, একটি
মনে রাখার মতো সিরিজও জিতেছে। একজন বাঙালি পাকিস্তানের ২৪ বছরের ইতিহাসে টেস্ট দলে
স্থান পায়নি। অথচ সেই পাকিস্তানকেই বাঙালি ক্রিকেটাররা ১৯৯৯ সালে ইংল্যান্ডে অনুষ্ঠিত
ওয়ানডে বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো খেলতে নেমেই পরাজিত করেছিল। এবার ২০২৪-এ পাকিস্তানের
কন্ডিশনে টেস্ট ক্রিকেটে দাপটের সঙ্গে খেলেই জিতেছে।’ এরপর তিনি বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে
সদ্য সমাপ্ত ভারত সফর প্রসঙ্গে ওই লেখাতেই লিখেছিলেন, ‘বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত ভারতের
বিপক্ষে টেস্ট ক্রিকেটে জয়ের মুখ দেখেনি। সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে বাংলাদেশ দল ভারত সফর
করবে, তখন তারা দুটি টেস্ট ও তিনটি টি-টোয়েন্টি খেলবে।
গত পাঁচ-ছয় বছরে ভারতের তিন সংস্করণে যে পরিবর্তন এসেছে খেলার ‘অ্যাপ্রোচ’ এবং দর্শনে
এতে করে আমার মনে হয় বাংলাদেশের সঙ্গে লড়াইয়ের কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতাই হবে না। ভারতের
ক্রিকেট এখন যে অবস্থানে আছে বাংলাদেশ এর অনেক অনেক পেছনে পড়ে আছে। ভারত দেশে এবং দেশের
বাইরে অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকার মতো ক্রিকেট শক্তির সঙ্গে লড়াই করে
চোখে চোখ রেখে। ভারতের ক্রিকেট এমন একটা উচ্চতায় পৌঁছে গেছে যেখানে শুধু বাংলাদেশ
নয় অন্যান্য দেশও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সুবিধা করার কথা নয়। ক্রিকেট অনিশ্চিত, তবে
ভালো দল শেষ পর্যন্ত জেতে।’
তিনি বাংলাদেশ দলের ভারত সফর সম্পর্কে আগাম যে মন্তব্য করেছিলেন,
তা শুরুতে অত্যুক্তি মনে হলেও সিরিজ শেষে তা আর অত্যুক্তি হয়ে থাকেনি বরং আমাদের ক্রিকেট
দল কোনো ফরম্যাটের ক্রিকেটেই যে ভারতের ক্রিকেট শক্তির সঙ্গে লড়াই করা তো দূরের সামান্য
প্রতিরোধও গড়ে তুলতে পারেনি, তাও তো নির্মম সত্য। সিরিজ শুরুর আগেই, দীপক দেশপান্ডে
তার কলামে বাংলাদেশ দলের পাকিস্তান সফরে সফলতার পেছনের কারণ হিসেবে বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশ
পাকিস্তানের মাটিতে টেস্টে স্বাগতিকদের পরাজিত করেছে, এর কারণ হলো ওদের ক্রিকেট প্রতিভার
খরা চলছে। তাদের ‘গ্রেটদের’ বিদায়ের পর রিপ্লেসমেন্ট ভালো হয়নি। অপর দিকে ভারতের তিন
সংস্করণে প্রতিভার ছড়াছড়ি। স্কোয়াড গঠন করতে নেমে নির্বাচকরা মুশকিলে পড়েন, স্কোয়াডে
কাকে রাখবেন কাকে বাদ দেবেন।’
সদ্য সমাপ্ত ভারত সফরে (দুটি টেস্ট ও তিনটি টি-টোয়েন্টি) বাংলাদেশের
অর্জন বলতে যা বোঝায় তার কিছুই নেই। বরং এ সফরে আমাদের অভিজ্ঞতা অত্যন্ত করুণ এবং ভয়াবহ।
ভারত সিরিজ জিতেছে এটি বড় কথা নয়, দুটি সংস্করণে বাংলাদেশকে একদম পাড়ার ক্লাব বানিয়ে
নাস্তানাবুদ করে ছেড়েছে। ক্রিকেটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা বলতে যা বোঝায় সম্প্রতি সমাপ্ত
হওয়া এই সিরিজে তা পুরোপুরি অনুপস্থিত ছিল। ভারতের ক্রিকেটের সঙ্গে বাংলাদেশের ক্রিকেটের
তুলনা হয় না। ক্রিকেটের বনেদি পরিবারের সদস্য ভারত। অন্যদিকে বাংলাদেশ অনেক বছর ধরে
টেস্ট ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেললেও এখনও অনেক সীমাবদ্ধতা থেকেই বের হতে পারেনি।
ক্রিকেটে প্রয়োজন আত্মবিশ্বাস, সাহস এবং নিজের সামর্থ্যের ওপর আস্থা। এই তিনটি বিষয়
ধর না রাখতে পারলে ভালো খেলা সম্ভব হবে না। ক্রিকেটে চাপ থাকবেইÑ আর এটি সামলে নিয়েই
খেলতে হবে।
ক্রিকেটে একসময়ে যে ধাঁচের খেলা হতো, আজকে খেলার সেই ‘অ্যাপ্রোচ’
পুরোপুরি পাল্টে গেছে। আমরা তা প্রতিদিনের ক্রিকেট মাঠেই লক্ষ করছি। ক্রিকেটের নতুন
নতুন এসব অ্যাপ্রোচের সঙ্গে যদি মেলবন্ধন সম্ভব না হয়, তাহলে পেছনে পড়ে থাকতেই হবে।
ব্যর্থতার মধ্যে বারবার হাবুডুবু খেতে হবে। খেলায় হারজিত আছে। এটি খেলার ধর্ম। তবে
সবকিছুর একটা সীমা আছে। খেলার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে শুধু খেলোয়াড়ের কৃতিত্বই নয়, জড়িয়ে
থাকে দেশের ভাবমূর্তি এবং সুনামও। ভারত সফরে বাংলাদেশ ক্রিকেট দল মাঠে পুরোপুরি আত্মসমর্পণ
করে দেশে ফিরে এসেছে। বাংলাদেশ দল মাঠে পুরোপুরি ‘আউট প্লেইড’ হয়েছেÑ এর কারণ সামর্থ্যের
অভাব। প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার মতো মানসিক শক্তি দেখা যায়নি। দলগতভাবে যদি বিশ্বাস করা
সম্ভব না হয় যে আমাদের লড়াই করার সামর্থ্য আছে, তাহলে তো মাঠে মুখ থুবড়ে পড়তেই হবে।
ক্রিকেটে আমাদের স্বপ্ন বারবার নিরাসার স্রোতে ভেসে যাচ্ছে। ভারতের
বিপক্ষে এত লজ্জাজনক পরাজয় কেন? ভারতের বিপক্ষে টেস্ট এবং টি-টোয়েন্টিতে বলতে গেলে
কোনো প্রতিরোধই তৈরি হয়নি। ভারতের যে দলগত শক্তি, এক্ষেত্রে জেতার চিন্তা কেউ করেনি।
কিন্তু মাঠে আমাদের ক্রিকেটাররা কি তাদের খেলাটা খেলেছেন?
প্রযুক্তির বদৌলতে এখন আর সাদাকে কালো বলার সুযোগ নেই। খেলা শেষে বারবার শেখানো কৈফিয়ত
দিয়ে এখন মানুষকে বিভ্রান্তি করা যাবে না। সবকিছুই তো সবাই দেখছেন। দেখেছেন স্কিল আর
মানসিকতার অবস্থা। পরিকল্পনা তো থাকতে হবে এবং মাঠে সেটা বাস্তবায়িতও করতে হবে। শুরুটা
ভালো, এরপর সবকিছুতে এলোমেলো। ব্যাটিং বোলিং উভয় বিভাগে একই অবস্থা। সময় এসেছে ক্রিকেটে
তারুণ্যের শক্তিকে কাজে লাগানোর।
টেস্ট এবং টি-টোয়েন্টি দুই সংস্করণ তো দুই রকম ক্রিকেট। ‘ওভার অল’ বিশ্ব ক্রিকেট দুনিয়ায় খেলার অ্যাপ্রোচ ভীষণভাবে পাল্টে গেছে। টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের প্রভাব এখন ওয়ানডে এবং টেস্ট ক্রিকেটে সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে আলোচিত। টেস্ট ম্যাচগুলোতে আমরা দেখেছি পাঁচ দিনের ক্রিকেটে আমাদেরকে হারানোর জন্য ভারতের মাত্র দুই দিনই যথেষ্ট ছিল। টেস্ট ক্রিকেট এখন শতভাগ ফলদায়ক। ভারতের বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি ম্যাচগুলোও আমাদের কাছে ছিল বিভীষিকা। মাঠে স্বাগতিক দলের ব্যাটারদের তাণ্ডব দেখে বারবার মনে হয়েছেÑ কত সময় লাগবে বিশ ওভার শেষ হতে। ব্যাটাররা ব্যাট করেছেন মনের সুখ মিটিয়েÑ আর সৃষ্টি করেছেন তিন ম্যাচে নতুন এগারোটি রেকর্ড। ভারতের ব্যাটারদের ‘স্ট্রাইক রেট’ আর বাউন্ডারির বাইরে বল পাঠানো দেখে তো আগে থেকেই হেরে বসেছে বাংলাদেশ দল। এত ‘ডট’ বল আর পুওর স্ট্রাইক রেট নিয়ে তো ভালো দলের সঙ্গে কিছু আশা করা যায় না। পাকিস্তানের বিপক্ষে টেস্ট সিরিজ জয়ের পর ভারতের বিপক্ষে অসহায়ভাবে পরাজয়ের কারণ নিয়ে প্রয়োজন আত্মসমালোচনা। আমাদের ব্যর্থতার কারণগুলো যথাযথভাবে বিশ্লেষণ এবং তা আগামীতে সংশোধনের মাধ্যমেই সফলতার পথ খুলবে। কিন্তু তা কি হবে? আমরা কি আত্মসমালোচনার মাধ্যমে নিজেদের ভুল-ত্রুটি সংশোধন ও আগামীর সফলতার জন্য প্রস্তুত হবো? না-কি গড্ডালিকা প্রবাহেই গা ভাসিয়ে দেব।