অভয়াকাণ্ড
গৌতম রায়
প্রকাশ : ১৫ অক্টোবর ২০২৪ ০৮:১৩ এএম
গৌতম রায়
কলকাতা শহরে এমন
ছড়া চর্চা কবে হয়েছে, নগরবাসী মনে করতে পারছেন না। প্রতিদিন অগুনতি নতুন নতুন ছড়া আসছে।
কে যে তার লেখক জানার কোনো উপায় নেই। পুজোর আগে যেদিন দেবীপক্ষ শুরু হয় সেদিন সকাল
থেকে নতুন যে ছড়া দুটি দেখা যাচ্ছে তা হচ্ছেÑ‘যতই তুমি দেখাও ভয়/এই বিপ্লব থামার নয়’,
এবং দ্বিতীয়টি ‘বাজছে শঙ্খ, বাজছে ঢাক/আমার দুর্গা বিচার পাক’। পাশে দুর্গার একটি ছবি
এঁকে নিচে লেখা ‘অভয়া’। মানে এবারের শারদোৎসবে একাকার হয়ে গেছে অভয়া আর দুর্গা।
রাজনীতি-বিশেষজ্ঞরা
চলতি আন্দোলনের মধ্যে কিন্তু একটা পালাবদলের ইঙ্গিত খুঁজে পাচ্ছেন। বাংলার ভদ্রলোক,
এলিট সম্প্রদায় হঠাৎ রুখে দাঁড়িয়েছে। সত্যি বলতে কি এ তেজ, এ বিপুল প্রাণশক্তি, এ মরিয়া
মনোবৃত্তি এতদিন অদৃশ্য ছিল। কেউ ভাবতে পারেনি আরজি করের মতো একটা প্রান্তিক হাসপাতালে
একজন জুনিয়র ডাক্তার নিহত হয়েছেন বিধায় সমগ্র কলকাতা শহর সারা রাত জেগে কাটাবে। এমনকি
মধ্যরাতে যখন ভূতপেতনিরা গড়ের মাঠে বেড়াতে বেরোয় তখনও ধর্মতলার রাস্তাজুড়ে দেখা গেছে
হাজারো মানুষ, তাদের হাতে মোমবাতি কিংবা নানা বর্ণের পতাকা, শোনা গেছে সেই অবিনশ্বর
গান দুটিÑ‘কারার ঐ লৌহকপাট’ আর ‘সর্ব খর্বতারে দহে তব ক্রোধদাহ’। এলিটরা যদি রাস্তায়
নেমে স্লোগান দেন তাহলে কি রবীন্দ্রনাথ আর নজরুল দূরে থাকতে পারেন! ইফ উইন্টার কামস
ক্যান স্প্রিং বি ফার বিহাইন্ড।
‘কারার ঐ লৌহকপাট’
মানে ভাঙার গান নজরুল লিখেছিলেন ১৯২১ সালে। হঠাৎ একদিন কলেজ স্ট্রিটে তার মেসে চিত্তরঞ্জন
দাশের স্ত্রী বাসন্তী দেবীর দূত হিসেবে সুকুমার রঞ্জন দাশ এসে হাজির। জানা গেল বাসন্তী
দেবী দূতমারফত দুটি আর্জি পাঠিয়েছেন নজরুলের কাছে। তার প্রথমটি. মায়ের বাড়িতে পুত্রকে
একদিন খেতে আসতে হবে এবং দ্বিতীয়টি. তার ‘বাংলার কথা’ পত্রিকার জন্য নজরুল যেন সত্বর
একটি কবিতা পাঠান। দেশবন্ধু তখন কারাবন্দি। শুধু তিনি একা নন, অসহযোগ আন্দোলনের কারণে
শহরের জেলখানাগুলো রাজবন্দিতে পূর্ণ হয়ে আছে। নজরুল সুকুমার রঞ্জনকে সামনে বসিয়ে রেখে
তখনই ভাঙার গান কবিতাটি লিখে দিয়েছিলেন। সেটি মুদ্রণের অপরাধে দেশবন্ধুপত্নীর ছয় মাস
জেল হয়ে গেল, রচনাকার রয়ে গেলেন বাইরে। পরে অবশ্য নজরুলকেও তার সৃষ্টির জন্য দীর্ঘকাল
কারাবাস ভোগ করতে হয়েছে।
আবার বাংলার বিপ্লবী
যতীন দাস ৬৪ দিন অনশনের পর সুদূর লাহোর জেলে মৃত্যুবরণ করেন। তিনি পানীয় জল পর্যন্ত
খেতে অস্বীকার করেছিলেন, তার তৃষ্ণা উস্কে দেওয়ার জন্য জেল কর্তৃপক্ষ তার সেলে একটি
জলভর্তি কুঁজো রেখে দিয়ে আসে এবং তিনিও তা লাথি মেরে ভেঙে দেন। মৃত্যুর সময় তার দেহটা
সদ্যোজাত শিশুর মতো ছোট হয়ে গিয়েছিল। শবাধারে করে তার সেই দেহ কলকাতায় পৌঁছালে তা
ঘাড়ে নিয়ে এক বিশাল মিছিলে নেতৃত্ব দেন সুভাষচন্দ্র বসু। সেদিন লক্ষাধিক মানুষ জড়ো
হয়েছিল হাওড়া স্টেশনে।
রবীন্দ্রনাথ তখন
ছিলেন শান্তিনিকেতনে তাঁর আশ্রমে ‘তপতী’ নাটকের মহড়ায় ব্যস্ত। যতীন দাসের মরদেহ শহরে
আসার খবর পেয়ে তার মনঃসংযোগ ছিন্ন হয়ে গেল। তিনি বাকিদের মহড়া চালিয়ে যেতে বলে নিজের
ঘরে ফিরে গিয়ে লিখে ফেলেন, ‘সর্ব খর্বতারে দহে’। গানটি পরে তপতী নাটকে যুক্তও হয়েছিল।
এখন যে প্রশ্নটা
গুরুত্বপূর্ণ তা হলো, কলকাতার এলিট সম্প্রদায় হঠাৎ এমন তেরিয়া হয়ে উঠল কেন। সাধারণের
বিশ্বাস, অভয়া হত্যার বিশেষ বৈশিষ্ট্যই নাগরিক সমাজকে এমন ক্ষিপ্ত করে দিয়েছে। ময়নাতদন্তের
রিপোর্টে বলা হয়েছে, রীতিমতো আসুরিক শক্তিতে গলা টেপার ফলে নিহতের চোখের মণি দুটি বাইরে
ঠেলে বেরিয়ে আসে এবং চোখ, মুখ, গলা দিয়ে অঝরে রক্তপাত শুরু হয়। তা ছাড়া তার শরীরের
ওপরের অংশেও একাধিকবার মারাত্মক আঘাত করে আততায়ীরা। গোয়েন্দারা নিশ্চিত, অনূর্ধ্ব ত্রিশ
শীর্ণ, ছোটখাটো চেহারার এ মহিলাকে হত্যা করার জন্য সেখানে একাধিক বলশালী পুরুষের সমাগম
হয়েছিল। গোয়েন্দারা আরও অনুমান করছেন, ওই মহিলাকে ধর্ষণ করা হয়েছে হত্যার পরে। অর্থাৎ
যাতে মনে হয় কোনো যৌন তাড়না থেকেই এ আক্রমণ। সুতরাং ধরে নেওয়া যায়, আততায়ীদের উদ্দেশ্য
ছিল হত্যার কারণ সম্পর্কে তদন্তকারীদের বিভ্রান্ত করা। এমনকি মনে রাখতে হবে, প্রাথমিক
পর্যায়ে ওই হাসপাতাল থেকে একটা আত্মহত্যার তত্ত্বও প্রচার করা হয়েছিল।
ক্রমে জানা গেছে,
কিছু চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীর যোগসাজশে রাজ্যে গড়ে উঠেছে একটি অশুভ চোরাকারবারি চক্র
এবং দুর্ভাগ্যবশত তার প্রধান ঘাঁটি ওই আরজি কর হাসপাতাল। জানা গেছে, এ চক্রের কাজ ছিল
জাল ওষুধ মজুদ ও বিক্রি, হাসপাতালে নতুন সরঞ্জাম কেনার নামে আত্মসাৎ করা সরকারের বিপুল
অর্থ, মর্গের লাশ গোপনে বের করে এনে অন্যত্র পাচার করা ইত্যাদি। এরা ছিল এমনই প্রভাবশালী
যে কোনো চিকিৎসকের পদোন্নতি বা অন্যত্র বদলি হওয়া ছিল এদের সম্মতির ওপর নির্ভরশীল।
এমনকি অর্থের বিনিময়ে হাসপাতালের অভ্যন্তরীণ পরীক্ষাগুলোয় বাড়তি নম্বর পাইয়ে দেওয়ার
ক্ষমতাও এদের ছিল। ওই হাসপাতালের চিকিৎসক হওয়ার সুবাদে এ অশুভ চক্রের হদিস পেয়েছিল
অভয়া। শোনা যাচ্ছে, সে নাকি কয়েক মাস ধরেই সহকর্মীদের জানাচ্ছিল, এ চক্রের খবরাখবর
সে প্রকাশ্যে আনবে। শাস্তি হবে অপরাধীদের। সিবিআই গোয়েন্দারা মনে করছেন, এ দুরন্ত চিকিৎসকের
মুখ বন্ধ করতেই ঘটানো হয়েছে এ হত্যা। সুতরাং ধর্ষণের উদ্দেশ্য আততায়ীদের মোটেই ছিল
না।
সবচেয়ে লজ্জার
বিষয় এ কলেজের অধ্যক্ষ সন্দীপ ঘোষ ছিলেন এ চোরাকারবারি চক্রের অন্যতম পান্ডা। শুধু
তাই নয়, অভয়াকে যে রাতে হাসপাতালের বিশ্রামকক্ষে হত্যা করা হয় সেদিন ভোর ৪টায় তিনি
অতিসংগোপনে হাসপাতালে আসেন এবং ফিরে যান ৬টার মধ্যে। গোয়েন্দারা নিশ্চিত, মৃতদেহ যাতে
নির্বিঘ্নে লোপাট করা যায় তার আয়োজন করতেই ছিল তার আবির্ভাব। তার নাম ও ভূমিকা নিয়ে
গুঞ্জন শুরু হতেই তিনি দুই দিনের মধ্যে ওই হাসপাতালের অধ্যক্ষ পদে ইস্তফা দেন এবং ঘণ্টাখানেক
পরে তাকে স্বাস্থ্যমন্ত্রক ন্যাশনাল মেডিকেলের অধ্যক্ষ পদে পুনর্নিয়োগ দেয়। বর্তমানে
তিনি সিবিআইয়ের সুপারিশে জেলহাজতে বন্দি।
মনে রাখতে হবে,
স্বাধীনতার পর থেকে বাংলার রাজ্য রাজনীতি ছিল কলকাতার বর্ণহিন্দু ভদ্রলোকদের নিয়ন্ত্রণে।
বাংলায় মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন কিংবদন্তি চিকিৎসক বিধানচন্দ্র রায়, বিশিষ্ট আইনজীবী
সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়, বিলেতফেরত জ্যোতি বসু। এ ভদ্রলোক শ্রেণি যখন ক্ষমতায় ছিলেন তখন
বাংলায় একটা সুস্থ, জনমুখী সংস্কৃতি ছিল, রাজনীতিতে ব্যাপক দুর্নীতি বা দুর্বৃত্তায়নের
ঘটনা শোনাই যেত না। প্রশ্ন উঠতে পারেÑএ এলিট সম্প্রদায় বিশ শতকের শেষ দিকে এসে রাজ্য
রাজনীতিতে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলল কেন? এর দুটি কারণ হতে পারে। প্রথমত. নয়া উদারনীতিবাদ
চালু হওয়ার ফলে এক আদ্যোপান্ত মুনাফামুখী নব্য পুঁজিবাদের বিকাশ এবং দ্বিতীয়ত. কমিউনিস্ট
পার্টিগুলোর দরিদ্রনির্ভর চরিত্র হারিয়ে সর্বার্থে বর্ণহিন্দু এলিট সম্প্রদায়ের কুক্ষিগত
হয়ে পড়া। এতদিন দরিদ্র শ্রেণি ও মধ্যবিত্ত বা উচ্চবিত্তের মধ্যে সেতুটি ছিল কমিউনিস্ট
পার্টি কিন্তু দীর্ঘকাল ক্ষমতায় থাকায় তার চরিত্রের পরিবর্তন হলো, পার্টি হয়ে দাঁড়াল
ক্ষমতাসীন বর্ণহিন্দুদের আরও নাম, যশ ও উচ্চে আরোহণের সোপানবিশেষ। কার্যত এ সময় থেকেই
প্রান্তিক মানুষের প্রতিনিধি হিসেবে উঠে আসে তৃণমূল। প্রায় এক দশক এ অবস্থা অপরিবর্তিত
ছিল।
যেহেতু দরিদ্র
শ্রেণির মধ্যে শিক্ষা ও জনমুখী সংস্কৃতির অভাব স্বাভাবিক, লুম্পেন বৈশিষ্ট্যগুলোই তাদের
প্রবল তাই তৃণমূল দলটি শুরু থেকেই মমতা ব্যানার্জির নেতৃত্বে হয়ে পড়ে দুর্নীতিগ্রস্ত
ও অশিক্ষিত নরনারীর এক প্রতিষ্ঠান। এদের বাদ দিয়ে দল চালানো নেত্রীর পক্ষে সম্ভব নয়।
যে কাজে এরা পারঙ্গমÑ মারদাঙ্গা, লুটপাটÑ সে পথেই দল চালান নেত্রী। তিনি কোনো বিকল্প
পথের সন্ধান করলে তার দলের কর্মীরাই তার থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবেন। বছর তিনেক আগে যখন
শিক্ষক নিয়োগ নিয়ে দুর্নীতির খবর প্রকাশ্যে আসে, শিক্ষামন্ত্রীর মেয়ের বয়সি বান্ধবীর
বাড়ি থেকে কোটি কোটি টাকা উদ্ধার হয়; তখন রাজ্যের নাগরিক সমাজ ক্ষুব্ধ হয়েছিল এবং দুয়েকটি
পরিহাসের শব্দও শোনা যাচ্ছিল। কিন্তু তারা গলা খুলে কোনো প্রতিবাদ করেননি। নিয়োগ দুর্নীতিতে
আরও অসংখ্য তৃণমূল নেতা ও কর্মীর নাম উঠে আসে। তারপর রেশন দুর্নীতিতে গ্রেপ্তার হন
রাজ্যের খাদ্যমন্ত্রী। সেখানেও কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ পাওয়া গেছে এবং তিনি
বর্তমানে শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে আলিপুর জেলে বন্দি। এর পর থেকে অসংখ্য আর্থিক দুর্নীতি
ও নারীনিগ্রহের ঘটনা নিয়মিত স্থান করে নিচ্ছে শহরের সংবাদপত্রগুলোয়। দেখা যাচ্ছে, গোটা
রাজ্যে কার্যত প্রশাসন বলে কিছু নেই। পুলিশ রয়েছে শাসকের হাতের পুতুল হয়ে।
বস্তুত এমন এক
পরিস্থিতিতে ভদ্রলোক সমাজের বিস্ফোরণ অস্বাভাবিক নয়। তা ছাড়া চিকিৎসকরা যেহেতু শিক্ষিত,
মার্জিত, তাদের সামাজিক গুরুত্ব ও মর্যাদা অনস্বীকার্য। সে কারণে এলিটরাও খুব দ্রুত
এ আন্দোলনে সমর্থ হয়েছেন আত্মপ্রকাশে। তারা নির্দ্বিধায় নিজেদের বিলিয়ে দিতে পেরেছেন।
শুধু ছড়া বা গান
নয়, কলকাতার অনেক প্রথিতযশা শিল্পী এখন তুলি আর রঙ হাতে রাস্তায় বসে অভয়ার ছবি আঁকছেন।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ উপেক্ষা করে অভিনীত হচ্ছে বহু পথনাটিকা, এমনকি সিনেমা। সিরিয়ালের
নায়ক-নায়িকারাও হেঁটে চলেছেন রাস্তায়। প্রবীণ বাম নেতারাও স্বীকার করছেন, আন্দোলন যে
এমন শক্তি অর্জন করবে তা তাদের ধারণায় ছিল না।
তবে এ কথা ঠিক,
চিকিৎসকদের আন্দোলনে সরকার পতনের কোনো সম্ভাবনা নেই। সে লক্ষ্যও আন্দোলনকারীদের নয়।
বস্তুত চিকিৎসকরা শুধু চান তাদের ১০ দফা দাবি যেন মেনে নেয় সরকার। যারা আজ ক্ষমতায়
থাকার কারণে অনমনীয় ভাব দেখাচ্ছেন, তারা যেন বাধ্য হন নতিস্বীকারে। সেটা অবশ্য শুধু
সময়ের অপেক্ষা মাত্র।
কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ হলো, এ অভয়াকাণ্ড কেন্দ্র করে এলিট সমাজ আবার গা ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়িয়েছে। অতীতে বহুদিন তারা ছিল সমাজের নেতার আসনে, তারা কি আবার সেই পুরোনো সিংহাসন ফিরে পেতে পারে না? যদি তা হয় তাহলে বাংলা আবার সারা দেশের সামনে গৌরব হয়ে উঠে দাঁড়াবে। সুলক্ষণ হলো, এ এলিট নিয়ন্ত্রিত লড়াই সেই অভিমুখই নির্দেশ করে।