সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ১৪ অক্টোবর ২০২৪ ০৮:১০ এএম
আমাদের রপ্তানি পণ্যের তালিকা খুব দীর্ঘ নয়। মূলত সুনির্দিষ্ট কিছু
খাতের ওপর ভিত্তি করে আমাদের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের যে মাধ্যমগুলো রয়েছে এর মধ্যে
অন্যতম অগ্রগণ্য তৈরি পোশাক শিল্প খাত। এই শিল্প খাতে বিদ্যমান পরিস্থিতি আমাদের কপালে
দুর্ভাবনার ভাঁজ ক্রমেই পুরো হচ্ছে। ১৩ অক্টোবর প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনটি
এরই অংশ বটে। ‘গার্মেন্টসের ক্রয়াদেশ চলে যাচ্ছে ভারতসহ অন্য দেশে’Ñএই শিরোনামে প্রতিদিনের
বাংলাদেশ-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনটি আমাদের উদ্বিগ্ন না করে পারে না। আমরা দেখছি, দেশের
পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে শান্তিপ্রিয় মানুষ যখন রাষ্ট্র বিনির্মাণের স্বপ্ন দেখছে এবং
অন্তর্বর্তী সরকার মানুষের স্বপ্ন পূরণে নানামুখী সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে, তখন আমাদের
রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক শিল্পে ফিরে ফিরে দেখা দিচ্ছে অস্থিতিশীলতা।
রাজনৈতিক অস্থিরতার বিরূপ প্রভাব এই খাতে অতীতেও দৃশ্যমান হয়েছে।
কিন্তু এবার দেশের সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রেক্ষাপটে তৈরি পোশাক শিল্পে ইতোমধ্যে দফায় দফায়
যে শ্রমিক অসন্তোষ পরিলক্ষিত হয়েছে, তাতে নিরুদ্বিগ্ন থাকার কোনো অবকাশ নেই। বিদ্যমান
পরিস্থিতিতে এই রপ্তানি খাতের ওপর গভীর সংকটের ছায়া বিস্তৃত হয়েছে। প্রকাশিত প্রতিবেদনে
বলা হয়েছে, বিদেশি বিভিন্ন ব্র্যান্ডের ক্রেতা এবং দেশের তৈরি পোশাক কারখানার মধ্যে
মধ্যস্থতাকারী একটি প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, সময়মতো শিপমেন্ট করতে না পারায় তাদের নব্বই
শতাংশ ক্রয়াদেশ প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতে চলে গেছে। ডিসেম্বরের মধ্যে ২৫-৩০ ভাগ ক্রয়াদেশ
সরে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আমরা জানি, দেশের বড় পোশাক কারখানাগুলো গড়ে উঠেছে ঢাকা ও
এর পার্শ্ববর্তী অঞ্চল আশুলিয়া, সাভার ও গাজীপুর এলাকায়। এর বাইরে চট্টগ্রাম ও দেশের
অন্যান্য অঞ্চলে কিছু তৈরি পোশাক শিল্প কারখানা গড়ে উঠলেও মূলত এই খাতের শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো
ঢাকা ও এর আশপাশেই বেশি।
পোশাক খাতের সমস্যা আগেও বহুবার পরিলক্ষিত হয়েছে, কিন্তু এবার যে
পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে এর উৎস সন্ধানে নজর গভীর করার তাগিদ আমরা দিয়েছিলাম এই সম্পাদকীয়
স্তম্ভেই। আমরা এও বলেছিলাম, পোশাক খাতে অস্থিরতায় কোনো পক্ষের অদৃশ্য ইন্ধন রয়েছে
কিনাÑ তাও গভীরভাবে খতিয়ে দেখা হোক। এ খাতের মতো একটি বিকাশমান শিল্প খাতে যে চিত্র
দেখা যাচ্ছে তাতে স্পষ্টতই প্রতীয়মান হয়, আমাদের অর্থনীতির ‘লাইফলাইন’-এ বড় ধরনের অভিঘাত
লেগেছে।
কয়েক দিন আগে ঢাকা ও এর পার্শ্ববর্তী শিল্পাঞ্চলে পোশাক খাতের কর্মীদের
সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের দফায় দফায় সংঘর্ষে হতাহতের ঘটনা ঘটেছে
এবং অনেক কারখানা টানা কয়েক দিন বন্ধ থাকায় উৎপাদন ব্যবস্থায়ও বিরূপ ধাক্কা লেগেছে।
আমরা মনে করি, শিল্প ও কর্মীদের সুরক্ষার মধ্য দিয়েই এই খাতটিকে আরও চাঙ্গা করা সম্ভব।
মনে রাখা দরকার, বিশ্বের প্রতিযোগিতামূলক বাজারে আমাদের আরও অনেক প্রতিদ্বন্দ্বী রয়েছে,
কিন্তু আমাদের এই খাতের পণ্যের দিকে বিদেশি ক্রেতাদের বিশেষ আগ্রহ থাকলেও তা এখনও ব্যাহত
হচ্ছে। আমাদের স্মরণে আছে, গত ১২ সেপ্টেম্বর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে ‘ন্যাশনাল বিজনেস
ডায়লগ’ অনুষ্ঠানে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, ‘শ্রমিক-মালিক-সরকার
টিম হয়ে কাজ করবে। ব্যবসা করা একটা সংগ্রাম, এ সংগ্রামটা আমরা সহজ করব। ওই অনুষ্ঠানে
পোশাক শিল্প খাতের সংগঠনের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন। তখন আমরা এই সম্পাদকীয় স্তম্ভেই
আরও বলেছিলাম, প্রধান উপদেষ্টার এ আহ্বান যথার্থ এবং নিঃসন্দেহে সময় উপযোগী। আমরা স্পষ্টতই
মনে করি, শিল্পাঞ্চলে স্থিতিশীলতা নিশ্চিতকল্পে যূথবদ্ধ প্রয়াসের কোনো বিকল্প নেই।
একই সঙ্গে অনুকূল ব্যবসা পরিবেশ তৈরি করা সবার স্বার্থেই জরুরি।
আমরা মনে করি, পোশাক শিল্পের কর্মী ও মালিকপক্ষের মধ্যে যদি সদ্ভাব
এবং পারস্পরিক সহযোগিতা-সহমর্মিতার বিষয়গুলো পুষ্ট করা যায়, তাহলে শিল্প ও শিল্পের
শ্রমিক-কর্ণধারদের স্বার্থ সুরক্ষা নিশ্চিত করা কঠিন কোনো বিষয় নয়। আমরা আরও মনে করি,
জাতীয় স্বার্থে সরকারকে এ খাতের দিকে আশু নজর গভীর করা অত্যন্ত জরুরি। আমরা জানি, দেশে
কর্মসংস্থানেরও বড় একটি খাত তৈরি পোশাক শিল্প। নিকট অতীতে সংবাদমাধ্যমেই কিছু শ্রমিকনেতার
ভাষ্য উঠেছিল। তারা ভিন্ন ভিন্ন অবস্থান থেকে প্রায় একই রকম মন্তব্য করেছিলেন। তাদের
বক্তব্য, ক্ষমতার পালাবদলে একটি সুবিধাবাদী গোষ্ঠী তাদের হীনস্বার্থ চরিতার্থকরণে মরিয়া।
ঝুট ব্যবসা ও চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করতে শিল্পাঞ্চলে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির অপচেষ্টা
তারাই ফিরে ফিরে করে থাকে। আমরা মনে করি, তাদের এ অভিযোগ খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। বেকার
সমস্যা সমাধানে এবং দেশের অর্থনীতির বিকাশে যে খাতটির এত ব্যাপক ভূমিকা রয়েছে, সে খাতে
অস্থিতিশীলতা যদি জিইয়ে থাকে, তাহলে এর বিরূপ প্রভাব কতটা বহুমুখী হতে পারেÑ এর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ
নতুন করে নিষ্প্রয়োজন। দেশের পোশাক খাতে অস্থিরতার একাধিক কারণ সামনে এসেছে। ঝুট ব্যবসা
নিয়ে দ্বন্দ্ব, মালিকানার সমস্যা, বকেয়া পাওনা, কোনো কোনো ক্ষেত্রে বহিরাগতদের উস্কানি
এবং শ্রমিকদের নতুন কিছু দাবিদাওয়া এর পেছনে কাজ করছে। এমন প্রেক্ষাপটে তৈরি পোশাক
খাতের ক্রয়াদেশ সংগত কারণেই প্রতিবেশী ভারতসহ অন্য দেশে চলে যাচ্ছে। আমরা জানি, শ্রমিক
অসন্তোষ নিরসনে মালিক-শ্রমিকদের মধ্যে কিছুদিন আগে, আঠারো দফা চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও
অনেক কারখানায়ই এই চুক্তি বাস্তবায়নের কাজ শুরু হয়নি। গার্মেন্টস শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন
কেন্দ্রের সহসভাপতি বলেছেন, ‘অবিলম্বে এই চুক্তি বাস্তবায়ন করতে সরকারকে পদক্ষেপ নিতে
হবে। আমরা এর আগে বলেছি, বিদ্যমান সংকটের উৎসে সরকারকে গভীর নজর দিতে হবে। এই সংকট
শুধু শিল্প কারখানার মালিক ও কর্মীদেরই ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়নি, জাতীয় অর্থনীতির
জন্যও শঙ্কার বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা মনে করি, জাতীয় স্বার্থে অনতিবিলম্বে এর
নিরসন করতেই হবে। এই সংকট যত দীর্ঘায়িত ও জটিল হবে আমাদের জন্য দুঃসংবাদের তালিকাও
ততই দীর্ঘ হবে। সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মধ্যে যথাযথ সমন্বয় নেই, এই অভিযোগও আছে। আমরা
মনে করি, সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এরও নিরসন ঘটাতে হবে। তৈরি পোশাক খাতে অস্থিরতা নতুন
কোনো বিষয় নয় এবং এর কারণগুলোও যেহেতু অচিহ্নিত নয়, সেহেতু সংশ্লিষ্ট সব পক্ষ যূথবদ্ধভাবে
যথাযথভাবে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করলে বিদ্যমান সংকটের নিরসন করা দুরূহ কিছু নয়। মালিক-শ্রমিক
এবং সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়সহ অন্য পক্ষগুলোকেও সময়ক্ষেপণ না করে বিদ্যমান পরিস্থিতি
আমলে নিয়ে পর্যালোচনা ক্রমে সংকট নিরসনের পথ সুগম করা ছাড়া বিকল্প নেই। মনে রাখতে হবে,
এর সঙ্গে আমাদের জাতীয় স্বার্থ জড়িত এবং শ্রমিক অসন্তোষসহ নানাবিধ কারণে ক্ষতির তালিকা
ইতোমধ্যে কম দীর্ঘ হয়নি। আমরা আরও মনে করি, এই শিল্পের বিকাশে সংশ্লিষ্ট সব মহলের সজাগ-সতর্ক-দায়িত্বশীল
থাকারও বিকল্প নেই। সংখ্যানুপাতে বিশ্বের সর্বোচ্চসংখ্যক পরিবেশবান্ধব তৈরি পোশাক কারখানা
এখন বাংলাদেশে। এই প্রেক্ষাপটে যেকোনো মূল্যে এ খাতের টেকসই উন্নয়নের পাশাপাশি স্থিতিশীলতা
নিশ্চিত করতেই হবে।