× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

রেনু হত্যা মামলার রায়

ন্যায় বিচারের আলো ছড়াক

এলিনা খান

প্রকাশ : ১৪ অক্টোবর ২০২৪ ০৮:০৮ এএম

আপডেট : ১৫ অক্টোবর ২০২৪ ২০:০৫ পিএম

ন্যায় বিচারের আলো ছড়াক

বিগত এক দশকের অন্যতম বড় হৃদয়বিদারক ঘটনাই বলা যায় রেনু হত্যাকাণ্ডকে। সাম্প্রতিক সময়ে মব জাস্টিসের বিষয়টি নিয়ে এই স্তম্ভেই লিখেছিলাম। আইন চলবে আইনের নিজস্ব গতিতে, সেখানে জনগণ কোনোভাবেই আইন নিজের হাতে তুলে নিতে পারে না। দুঃখজনক হলেও সত্য, সাম্প্রতিক সময় তো বটেই, অতীতের ঘটনা থেকেও আমরা ন্যায় ও রাষ্ট্রীয় মানবিক মূল্যবোধের প্রকৃত শিক্ষা নিতে পারিনি। ২০১৯ সালের ২০ জুলাই ঢাকার উত্তর বাড্ডার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়েছিলেন দুই সন্তানের জননী ৪২ বছর বয়সি তাসলিমা বেগম রেনু। তার সেখানে যাওয়ার কারণ ছিল, দুই মেয়েকে ভর্তির জন্য কিছু তথ্য সংগ্রহ করা। তখন স্কুল গেটে কয়েকজন নারী তাসলিমা বেগমের নাম-পরিচয় জানতে চান। তাদের মাধ্যমেই ‘ছেলেধরা’ গুজব ছড়িয়ে পড়লে কয়েকশ মানুষ জড়ো হয়ে তাসলিমা বেগমকে স্কুলের প্রধান শিক্ষকের কক্ষ থেকে বের করে আনে। স্কুলের ফাঁকা জায়গায় তাদের এলোপাতাড়ি মারপিটে গুরুতর জখম হন রেনু। আহত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। মর্মান্তিক ও হৃদয়বিদারক এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের বিচার সম্পন্ন হওয়ার পর আইনজীবী হিসেবে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারছিকারণ এমন একটি সময়ে আলোচিত এই হত্যা মামলার রায় এলো যখন আমরা ‘মব জাস্টিস’-এর নামে পিটিয়ে মানুষ হত্যার মতো বর্বরতাকে নতুন করে প্রত্যক্ষ করছি। ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মাধ্যমে রাজনৈতিক সরকারের পতনের পর ‘মব জাস্টিস’, যা আসলে ‘মব কিলিং’-এর নামে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার অনেকগুলো ঘটনা আমাদের প্রত্যক্ষ করতে হয়েছে।

দীর্ঘ পাঁচ বছর পর বিচারিক আদালত রেনু হত্যা মামলার রায় দিয়েছেন। ১০ অক্টোবর প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ঢাকার ষষ্ঠ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালত ৯ অক্টোবর আলোচিত এ মামলার রায় ঘোষণা করেন। আদালত তার রায়ে তাসলিমা বেগম রেনুকে ছেলেধরা সন্দেহে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগে একজনকে মৃত্যুদণ্ড এবং চারজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন। দণ্ডপ্রাপ্ত প্রত্যেক আসামিকে আদালত এক লাখ টাকা জরিমানা এবং অনাদায়ে আরও এক বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন। ইতঃপূর্বে এই স্তম্ভেই লিখেছি, মব জাস্টিস বলে আইনত কোনো বিধান নেই। বরং এই বিষয়টিই আইনবহির্ভূত। মব জাস্টিস যখন প্রকট আকার ধারণ করে তখন তা রাষ্ট্রের অস্থিতিশীল ও অরাজক পরিস্থিতির আলামত বলেই বিবেচিত হয়। দেশের প্রচলিত আইনে মব জাস্টিস বলে কোনো ধারণাই নেই। বিচার করার জন্য প্রতিটি রাষ্ট্রের মতো আমাদেরও নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান রয়েছে, আদালত রয়েছে এবং প্রতিষ্ঠানগুলোতে অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার পাশাপাশি পুনর্বাসনের জন্যও আইন রয়েছে। মূলত মব জাস্টিসের নামে একটি অংশ নিজেদের প্রতিহিংসা চরিতার্থ করে। অর্থাৎ মব জাস্টিস বলা হলেও আসলে কেউ না কেউ এক্ষেত্রে ইন্ধন জোগান। আর তার ইন্ধনে নিরীহ মানুষ আহত হন এমনকি মারাও যান। তাই মব জাস্টিস বিষয়টি রাষ্ট্রের জন্য একটি কালো দাগ। আইনের দৃষ্টিতে একজন অপরাধীরও বিচার পাওয়ার অধিকার রয়েছে। একজন মানুষ যদি কোনো অপরাধ করে তাহলে তাৎক্ষণিকভাবে তাকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে সোপর্দ করা জরুরি। কারণ অপরাধের যেমন মাত্রা রয়েছে এবং তেমনি তার প্রভাবও রয়েছে। এই মাত্রা ও প্রভাব নিরপেক্ষভাবে বিবেচনা করার জন্যই রয়েছেন আদালত। কিন্তু অপরাধীকে বিচারের সম্মুখীন না করে তার কৃত অপরাধের জন্য আইন বহির্ভূতভাবে মেরে ফেলা স্পষ্টতই মানবাধিকারের লঙ্ঘন। কারণ রাষ্ট্র তার নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। রাষ্ট্রের কোনো নাগরিক অপরাধে জড়িয়ে পড়লে তাকে আইন অনুযায়ী উপযুক্ত শাস্তি দেওয়ার বিধান রয়েছে। আধুনিক রাষ্ট্র ধারণায় স্বাধীনতা বলতে মূলত আইনের প্রতি নাগরিকের শ্রদ্ধাকেই বোঝায়। এজন্যই উন্নত দেশগুলোতেও আমরা দেখি, রাষ্ট্রপ্রধানও যদি অপরাধ করেন, তাহলে তাকেও প্রচলিত আইনের আওতায় এনে শাস্তি দেওয়া হয়। আইন কারও ক্ষেত্রে বৈষম্য করে না এবং আইনি অবকাঠামো যদি স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ থাকে তাহলে সমাজে কোনো অপরাধীরই পার পাবার সুযোগ থাকে না। কিন্তু মব কিলিং বেড়ে যাওয়া মানে মানুষ আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল নয় অথবা বিদ্যমান আইনি ব্যবস্থার প্রতি তাদের আস্থা কিংবা শ্রদ্ধা নেই।

মব কিলিং কেন হয়? এ বিষয়টিকে একটু ভেবে দেখা জরুরি। আগেই বলেছি, সম্পূর্ণ একটি মব কখনই আইন হাতে তুলে নিতে পারে না। কেউ না কেউ ইন্ধন জোগায়। এক্ষেত্রে হতে পারে কারও প্রতি পূর্বপ্রতিহিংসা রয়েছে, তা-ই মবকে উত্তেজিত করে তিনি কোনো ব্যক্তিকে শাস্তি দিতে চান। আবার অনেক বিকৃত রুচির মানুষও রয়েছেন যারা সহিংসতাকে উস্কে দিতে পছন্দ করেন। আমাদের সমাজে আইনের শাসন সঠিকভাবে প্রতিষ্ঠিত না হওয়ায় অনেকে এলাকাভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। রাজনৈতিক প্রভাববলয় যারা তৈরি করেন তারাও অনেক সময় দলবদ্ধ হয়ে অনেককে মারধর করেন। এগুলোও অপরাধ। আমাদের এখন থেকে মব জাস্টিস শব্দটিকেই বাদ দেওয়া উচিত। কারণ মব বা মানুষ কখনও বিচার করতে পারে না। কাউকে শুধু কোনো অভিযোগের কানাঘুষার ভিত্তিতে আচমকা পিটিয়ে বিচার নিশ্চিত করা যায় না, যেতে পারে না। কাউকে বেধড়ক পেটানো তো বিচার নয়। বরং এটি সহিংসতা এবং অপরাধ। একজন মানুষের মানবাধিকার লঙ্ঘন করাও বটে। সে যদি অপরাধীও হয়ে থাকে, তবু তার আদালতের কাছে বিচার পাওয়ার অধিকার রয়েছে। তাই রাষ্ট্রের নাগরিকদের দায়িত্ব অপরাধীদের শনাক্ত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সহায়তা করা। মব জাস্টিস শব্দটি ব্যবহার করে বরং মানুষকে বিচারবর্হিভূত হত্যাকাণ্ডের দিকেই বরং আরও বেশি উস্কে দেওয়া হয়। ছাত্র-জনতার সফল গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দেশে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করলও এখনও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পরিপূর্ণভাবে কার্যকর হয়েছে, এমনটি বলা যায় না। এমন সময়ে রাজনৈতিক অঙ্গনেও এক ধরনের স্থবিরতা লক্ষ করা যাচ্ছে। ফলে অনেকে রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির উদ্দেশ্যে মব কিলিং উস্কে দিতে পারেন, এমন অভিযোগ সচেতন অনেক মহলের তরফেই পাওয়া যাচ্ছে।

পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে রেনু হত্যাকাণ্ডের বিচার সম্পন্ন হওয়া আমাদের আশাবাদী করার পাশাপাশি একটি শঙ্কাও রেখেছে। আমরা অতীতেও অনেক সময়ে দেখেছি, নিম্ন আদালতের রায়ের পর অভিযুক্ত ব্যক্তি আইনের নানা ফাঁকফোকর গলিয়ে হাইকোর্ট বা সুপ্রিম কোর্টে গিয়ে অনেক সময় ছাড়া পেয়ে যান। আইনের নানা ফাঁকফোকর দেখিয়ে তারা নিজেদের শাস্তি কমিয়ে আনতে পারেন। এমনটি যাতে না হয় এবং মব কিলিংয়ের মতো ঘৃণ্য অপরাধের দৃষ্টান্তযোগ্য শাস্তির প্রতিবিধান নিশ্চিত করার কাজটি রাষ্ট্র কতটা সূক্ষ্মভাবে করবে, তা নিয়ে ভাবতে হবে। রেনু হত্যাকাণ্ডের বিচার যদি দৃষ্টান্ত হিসেবে আমাদের সামনে উঠে আসে, তাহলে আগামীতে মব কিলিংয়ের মতো ঘৃন্য অপরাধের কোনো অস্তিত্ব থাকবে না।

মব জাস্টিসের নামে মন কিলিংয়ের উস্কানি তখনই হয় যখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মাঠপর্যায়ে থাকার পরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হয়। প্রভাবশালী মানুষ দুর্নীতির আশ্রয়-প্রশ্রয়ের পাশাপাশি যেকোনো অপরাধের বিচারের দীর্ঘসূত্রতা দেখা দেয়, তখন অপরাধীর পক্ষে আইনি ফাঁকফোকর বের করা সহজ হয়ে ওঠে। তা ছাড়া অনেক ক্ষেত্রে অপরাধের আলামতও নষ্ট করার সুযোগ থাকে। মব কিলিংয়ের পেছনে বৈষম্যেরও একটি বড় প্রভাব রয়েছে। বিগত দিনে যারা রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের কারণে নানাভাবে নির্যাতিত-নিপীড়িত হয়েছে এবং ন্যায়বিচার পায়নি তাদের একাংশ একসময় আইনের প্রতি আস্থা হারিয়ে মব কিলিংয়ের আশ্রয় নেয়। এমনটি মোটেও কাম্য নয়। আমাদেরকে আইনের মাধ্যমে অপরাধীর বিচার নিশ্চিতকরণে কাজ করতে হবে।

এজন্য এ মুহূর্তে আমাদের জন্য জরুরি হলো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দ্রুত সংস্কারের মাধ্যমে তাদেরকে পরিপূর্ণভাবে দায়িত্বপালনের উপযুক্ত করা। আইনের গতিশীলতা যেন কোনোভাবেই বাধাগ্রস্ত না হয় তা নিশ্চিত করার জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মাঠপর্যায়ে কাজ করবে। সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে দ্রুত কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। এক্ষেত্রে তাদের কাছে প্রযুক্তির সহায়তা রয়েছে। দেশের অনেক স্থানেই এখন সিসিটিভি ফুটেজ থাকে। এই প্রযুক্তির সহায়তায় অনেক অপরাধী ও অপরাধের সূত্র শনাক্ত ও চিহ্নিত করা যায়। রেনু হত্যা মামলায় আদালত ভিডিও ফুটেজকে আলামত হিসেবে গ্রহণ করেছেন। এটি এ মামলার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। বর্তমান প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বের প্রযুক্তির ভালো দিকগুলোকে আমরা সহজেই গ্রহণ করতে পারি। বিচারিক প্রক্রিয়াতেও এর ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আদালতে বিচার প্রক্রিয়ার সহায়ক হিসেব প্রযুক্তিকে খুব সহজেই ব্যবহার করা যায়। এক্ষেত্রে আমাদের সাক্ষ্য আইনের প্রয়োজনীয় সংস্কার প্রক্রিয়াও জরুরি। অপরাধী সনাক্তে এবং তার বিচার প্রক্রিয়াকে দ্রুততর করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে প্রযুক্তি আত্তীকরণের জন্য আলাদা কার্যক্রম ও পরিকল্পনা নির্ধারণ করতে হবে। যেকোনো মব কিলিংয়ে ইন্ধনকারী কিংবা অপরাধীকে দ্রুত শনাক্ত করে বিচারের আওতায় আনতে হবে। এক্ষেত্রে কোনো বৈষম্য যেন না হয় তা নিশ্চিত করাই মূল চ্যালেঞ্জ।

  • আইনজীবী ও চেয়ারপারসন, বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশন
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা